সুপারস্টারের আলো থেকে রাজনীতির কলঙ্ক! ‘জীবন’ চলে গেলেও ‘সাহেব’ হয়ে রয়ে যাবেন তাপস পাল

রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি, জেল, লাগামহীন কথা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করার শাস্তি পেলেন এত অকালে চলে গিয়ে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    এক মহাতারকার অকাল প্রয়াণ। বাংলা ছবির প্রথম সারির সুপারস্টার নায়ক যেন তাঁর শেষ জীবনের ভুলের মাশুল দিয়ে চলে গেলেন চিরতরে। আজকের দিনে তার ভুল পার করে অভিনয়-জীবনে পৌঁছতে পারলে এ কথা বলাই যায়, যে তাঁর প্রতিভা টলিউড ধরতেই পারেনি। তিনি তাপস পাল।

    তরুণ মজুমদারের মানসপুত্র হিসেবে উত্থান

    তরুণ মজুমদারের মানসপুত্র বলা হয় তাঁকে। তরুণ মজুমদারের নিজের ছেলের থেকে কোনও অংশে কম ছিলেন না তাপস। আটের দশকে মহানায়ক উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণ, সুচিত্রা সেন পর্দানসীন হয়ে যাওয়া, বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতে ভাঁটা, টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় তালা ঝুলছে—এমন সময়ে তরুণ মজুমদার তারুণ্যের মুক্ত বাতাস আনলেন বাংলা ছবিতে। ‘দাদার কীর্তি’।

    নামভূমিকায় নবাগত তাপস পাল। সঙ্গে মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়, অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, শমিত ভঞ্জ, অনুপ কুমার প্রমুখ। ঝকঝকে প্রেক্ষাপটে নতুন সজীবতার রঙিন গল্প। সাদা-কালোতে উত্তম সুচিত্রার রোম্যান্টিক প্রেম থেকে কালারে তাপস-মহুয়া এবং অয়ন-দেবশ্রীর প্রেম নতুনের বার্তা দিল।

    দাদার কীর্তি দিয়েই তাপস পালকে আমরা চিনলাম। কিন্তু তরুণ মজুমদার কীভাবে পেলেন তাপস পালকে?

    শ্যুটিংয়ে এনে তাপসকে তিন দিন চুপচাপ বসিয়ে রাখেন

    ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সালে জন্ম তাপস পালের। চন্দননগরের ছেলে তিনি। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হুগলী মহসিন কলেজ থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতক হন। জানা যায়, কলেজ পাশ করার পরে একদিন চন্দননগর স্টেশনের কাছে এমনিই ঘোরাঘুরি করছিলেন তাপস পাল। সেখানেই তাঁকে পাকড়াও করেন তরুণ মজুমদারের সহকারী শ্রীনিবাস চক্রবর্তী।

    তরুণ মজুমদার তখন ‘দাদার কীর্তি’ করবেন বলে নতুন মুখ খুঁজছেন। তাপস এই প্রথম এল টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ায়। ঘুরে ঘুরে অডিশন দিতে হয়নি, শুধু লুকটা পছন্দ হয়ে যেতেই এক মহাতারকার অভিষেক ঘটল। কেদার চরিত্রে এক কথায় ফাটিয়ে দিলেন আনকোরা তাপস। বাণিজ্যিক ছবিতে অমন নিচু তারের অভিনয় তখন মুগ্ধ করেছিল দর্শকদের।

    শ্যুটিংয়ে এনে তাপসকে তিন দিন চুপচাপ বসিয়ে রাখেন তরুণ মজুমদার। কোনও অভিনয় করাননি। কারণটা পরে বলেছিলেন তরুণবাবু– “তাপসকে এনে তিন দিন বসিয়ে রেখে আমি ওঁর সাইলেন্ট অভিব্যক্তিগুলো দেখতে চেয়েছিলাম। কারণ ছবির নায়ক কেদার তো মুখে নয়, বোকা ও নরম চোখ দিয়েই বেশি কথা বলে। আর তাপসের ভাইয়ের রোলে অয়ন ব্যানার্জীকে রেখেছিলাম বিপরীত ধরনের দুষ্টুমিষ্টি চরিত্রে, যাতে একটা কনট্রাস্ট তৈরি হয়। যাতে তাপসের নীরব অভিব্যক্তিগুলো আরও বেশি করে প্রকাশ পায়”

    ‘দাদার কীর্তি’ (১৯৮০) সুপার ডুপার হিট হল। বন্ধ টালিগঞ্জ পাড়ায় নতুন প্রদীপ জ্বলল।

    কিন্তু তাপস পালকে যে শ্রীনিবাস চক্রবর্তী খুঁজে এনেছিলেন তিনি এখন ফিল্ম-সমাজ-সংসার সব ছেড়ে তারাপীঠের সাধু হয়ে গেছেন। লাল বাবা নামেই তাঁকে চেনেন সকলে। জীবনে উত্তরণ এভাবেই খুঁজে নিয়েছেন তিনি। অথচ তাঁরই আবিষ্কার তাপস পালকে ভাগ্যের ফেরে এবং নিজের দোষে খাটতে হল জেল।

    উত্তমকুমারের উত্তরসূরি খোঁজা হল তাপসের মধ্যে

    ‘দাদার কীর্তি’ তে তরুণ মজুমদার বয়ঃসন্ধির প্রেম যে ভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন, তা আজও বাঙালির আবেগকে নাড়া দিয়ে যায়। অথচ দাদার কীর্তি ছবিতে নায়ক-নায়িকা তাপস-মহুয়া খুব বেশি হলে হয়তো ছ’-সাতটি সংলাপ বলেছেন। তাই নিয়েই অন্য এক স্নিগ্ধ প্রেম দেখাতে চেয়েছেন তরুণ বাবু। ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’ গানে অমন অপাপবিদ্ধ চেহারার তাপস পাল আর হেমন্তের ভরাট কণ্ঠ যেন মন পবিত্র করে দেয়।

    এর পরে অরুন্ধতী দেবী সুচিত্রার কন্যা মুনমুন সেনকে আনলেন ‘দীপার প্রেম’ ছবিতে। বিপরীতে নায়ক তাপস পাল। দর্শক তখন মিস করছে উত্তম-সুচিত্রা কেমিস্ট্রি। এই সব ছবিগুলো দিয়েই সেই ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা চলল। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তাপস-মুনমুন-আলপনা গোস্বামীকে নিয়ে বানালেন ‘অজান্তে’। তপন সিনহা এঁদের তিন জনকে নিয়েই বানালেন ‘বৈদুর্য্য রহস্য’।

    আলপনা গোস্বামীও মফস্বলের ব্যান্ডেলের মেয়ে। তাপস পালকে ‘প্রতিবেশী’ বলে ডাকতেন আলপনা গোস্বামী ৷ কারণ তাপস চন্দননগর থেকে এসেছিল, আলপনা ব্যাণ্ডেল৷ তাই মজা করে নিজেদের প্রতিবেশী বলতেন ওঁরা দুজন।

    তাপস-মুনমুন জুটি দিয়ে তখনকার পরিচালকরা উত্তম-সুচিত্রা গড়তে চাইলেও, মুনমুন সেই সময়ের বাঙালি ঘরানার অভিনেত্রী হিসেবে যথাযথ ছিলেন না। কিন্তু মহুয়া-তাপস বক্সঅফিস ঝড় তোলা জুটি হয়ে উঠেছিল। একের পর এক হাউসফুল ছবি দিয়েছে তারা দাদার কীর্তির পর থেকে।

    ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ তে সেই কিশোর-লতার গান

    “ও পারের ডাক যদি আসে
    শেষ খেয়া হয় পাড়ি দিতে
    মরণ তোমায় কোনদিনও
    পারবেনা কভু কেড়ে নিতে
    আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও।”

    আজও অমর গান বাংলা ছবির ইতিহাসে।

    ছবিতে ডাবল রোলে তাপস পাল আর প্রতিমামুখী মহুয়া রায়চৌধুরী ফুলসজ্জার গানে সুপার ডুপার হিট। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ হয়ে অকালমৃত্যু হল মহুয়ার। মহুয়ার শেষ ছবিও তাপসের সঙ্গেই। বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘আর্শীবাদ’। শেষ শটে মহুয়া তাপসকে বলেছিলেন, “আশিস আমি ভাল নেই।” শোনা যায়, অগ্নিদগ্ধা মহুয়া ক্যালকাটা হসপিটালের বেডে শুয়ে নায়ক তাপসকে মুখ দেখাতে চাননি। ফিরিয়ে দেন। শ্রাবণ মাসে আকাশের সঙ্গেই দর্শকদের কাঁদিয়ে শেষঘুমে চলে যান মহুয়া।

    তাপসের প্রয়াণে কাতর দেবশ্রী

    এর পরে শুরু হল দেবশ্রী রায়ের যুগ। তাপস-দেবশ্রী জুটি নিয়ে তরুণ মজুমদার আবার দিলেন প্রেমের গল্পে বক্সঅফিস হিট ছবি। ভালোবাসা ভালোবাসা। ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ তে শিবাজী চট্টোপাধ্যায় তাঁর সিগনেচার গান গাইলেন তাপসের লিপে ‘এই ছন্দ, কী আনন্দ এ যে বিধাতার মহাদান।’

    এর পরেই এল সমাপ্তি, নিশান্তে, সুরের আকাশে, আগমন, চোখের আলোয়। এই ‘চোখের আলোয়’ ছবিতে তাপস নায়ক। প্রসেনজিৎ সহ-নায়ক। দেবশ্রী রায় নায়িকা। প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী জুটির থেকেও তাপস-দেবশ্রী ছবির সংখ্যা বেশি ছিল সে সময়ে। ভাল ছবি, ভাল পরিচালকও সমসাময়িক অভিনেতাদের তুলনায় অনেক বেশি পেয়েছেন তাপস পাল। প্রসেনজিৎ বরং অনেক পরে লিড রোলে ভালো ছবি পেয়েছেন। কিন্তু নিজের অভিনয় ক্ষমতা কতটা, সেটা হয়তো নিজেও বুঝতেন না তাপস পাল। নিজেকে ধরেও রাখেতে পারেননি।

    তাপস পালের মাত্র ৬১ বছরে প্রয়াণ আজ আর মেনে নিতে পারছেন না দেবশ্রী রায়। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তিনি। ফোনে জানালেন, সেই শুরুর দিন থেকে যাঁদের একসঙ্গে পথ চলা শুরু, সেই জুটির এক জন চলে গেল। কখন তাপসের দেহ মুম্বই থেকে কলকাতায় আসবে সেই অপেক্ষায় নায়িকা।

    এক দিন উত্তম কুমারের মৃত্যুতে সুচিত্রা সেন ছুটে গেছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও।আজও সেরকমই একটা দিন দেবশ্রী চোখের জলে নীরব হয়ে গেছেন। বললেন, “কী বলব বলো তো, এত অকালে চলে গেল। কিছু বলা যায় এই মুহূর্তে? গল্প পরে কখনও আরও বলব। আমি মানতে পারছি না ওঁর মৃত্যু।”

    দেবশ্রীর দিদি তনুশ্রী ওরফে ঝুমকি রায় জানালেন, “তাপসের সঙ্গে সেই দাদার কীর্তি থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। যখন তাপসের বাইশ বছর বয়স। সেই বাইশ বছর থেকে ও আমাদের বাড়ি আসছে। শুধু চুমকির সঙ্গেই বন্ধুত্ব নয়। আমাদের সবার সঙ্গে ওঁর বন্ধুত্ব। আমার মা আরতি রায় তাপসকে স্নেহ করে খুব। সেই অত বছর আগে মায়ের রান্না খেতে ভালোবাসত তাপস। মা এই বয়সে এসে এই দুঃসংবাদ পেয়ে ভেঙে পড়েছেন। আমি, চুমকি কেউই কিছু বলার অবস্থায় নেই। বাইশ বছরের একটা ছেলেকেই আমাদের মনে আছে। তার পরে কত গল্প, বন্ধুত্ব, স্মৃতি। খুব অকালে চলে গেল।”

    মুনমুন সেন, দেবশ্রী রায় দু’জনেরই বেশি ছবি তাপসের সঙ্গে। ওঁরা তিন জনেই খুব ভাল বন্ধু। মুনমুন দেবশ্রীকে ডাকেন দেবী বলেন। একবার মুনমুন সহজাত ঢংয়ে তাপসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন “তাপস তুই কাকে বেশি ভালোবাসিস, আমায় না দেবীকে?”

    তাপস বলেছিলেন, “দেবশ্রীকে”। অভিমান করেছিলেন মুনমুন।

    শুধু তাই নয় তাপসের প্রথম ছবি ‘দাদার কীর্তি’র সহনায়ক ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ তথা অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনিও এখন ষাটোর্ধ্ব। দেবশ্রী রায়কে ফোন করেছেন তাপসের খবর জানতে। বন্ধুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ও কাতর।

    বললেন, “চন্দননগর থেকে তাপস যখন কলকাতায় আসে, তখন ওর থাকার জায়গা ছিল না। তরুণ মজুমদারকে আমি বললাম “তাপস আমার ভাই। ও আমার বাড়িতে আমার সঙ্গেই থাকবে।” তখন ঢাকুরিয়াতে অয়নের বাড়িতে থাকলেন তাপস।
    আজ অয়ন ভাবতেই পারছেন না ভাইয়ের অকালপ্রয়াণ।

    দেবশ্রীর দিদি তনুশ্রী রায় জানালেন “শুরুর দিনগুলোয় অয়নের বাড়িতে ছিল তাপস। পরে রাসবিহারীতে চলে আসে। বিয়ে হয় নন্দিনী পালের সঙ্গে। নন্দিনী ছোট বয়সে মা হয়েছিল। তাই ওর মেয়ের দুধ খাওয়ানো, সামলে রাখা—সব করেছি আমি ওঁদের সেই বাড়ি গিয়ে। কতদিনকার কথা আজ সব মনে পড়ছে।” ‘

    অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও তাপস

    অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই যেন কাল হল তাপস পালের। নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। সুপারস্টার হয়ে যাওয়ার পরে নিজের ইমেজ নিজেই খারাপ করলেন। শুধু তাই নয়, তাপস খেতে বড় ভালোবাসতেন। দই-শসা খেয়ে চেহারা মেনটেন করতে পারতেন না। মফস্বলের ছেলে তিনি। ভাত ডাল আলুভাতে না হলে মেজাজ ঠিক থাকত না।

    এক সময়ে স্নায়ুরোগের শিকার হতে শুরু করলেন। মাথায় শিরায় স্নায়ুরোগ এসে গেল। তাও তখন অত খারাপ অবস্থা হয়নি। এক সময়ে বেড়ে গেল ওজন। তখন তিনি বাবরি চুল রাখলেন কাঁধ অবধি। এ সময়ে অর্থাৎ নব্বই দশকে, অঞ্জন চৌধুরীই ছিলেন তাপসের একমাত্র পরিত্রাতা। চুটিয়ে ছবি করেছেন অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে। তবে তার অনেক আগেই আশির দশকের শেষ ভাগে অঞ্জন-তাপস জুটির সুপারহিট ছবি ‘গুরুদক্ষিণা’।

    অঞ্জনকন্যা রিনা চৌধুরী জানালেন “এখন যে ভবানীপুরে ভারতী সিনেমা হল বন্ধ, সেখানেই সুপারহিট হয় তাপসদার গুরুদক্ষিণা। এত লোক ছবিটা দেখতে আসত যে স্টপেজটার নামই হয়ে যায় গুরুদক্ষিণা। তাপসদা আমার পরিচালিত ছবি ‘ছায়াসূর্য’ তেই শেষ কাজ করে গেলেন। কামব্যাক খুব করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা আর হল না।”

    তাপসের আরও নায়িকাদের মধ্যে উল্লেখ করতে হবে ইন্দ্রাণী দত্তের। তুফান, পতি পরম গুরু ছবিতে তাপসের নায়িকা তিনি। ইন্দ্রাণী আর তাপস প্রায় পনেরো বছর এক আবাসনে থাকতেন। আজ বিশ্বাস করতে পারছেন না এই মৃত্যু। নয়না দাস বন্দ্যোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, চুমকি চৌধুরী, ইন্দ্রাণী হালদার, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শতাব্দী রায়—সকলেই বেশ অনেকগুলো ছবি করেছেন তাপসের বিপরীতে।

    এক সময়ে রটনা শোনা গেল, তাপস-নন্দিনীর জীবনে এক নতুন নারীর প্রবেশ হয়েছে। তাপস নাকি নিজের মাকেও তাড়িয়ে দিয়েছেন। সিনে-পত্রিকাগুলোয় উঠে গেল তৃতীয় নারীর ছবি। ঘর ভাঙল কি নন্দিনীর? সেই তৃতীয় নারী টালিগঞ্জ পাড়ার কোনও অভিনেত্রী ছিলেন না। পরে সেসব জল্পনা-কল্পনায় জল ঢেলে তাপস আবার মায়ের কাছে ফিরে গেলেন এবং নন্দিনী-তাপসের নতুন ইনিংস শুরু হল। প্রতি লক্ষ্মী পুজো খুব ঘটা করে করতেন তাপস-নন্দিনী। রং খেলতেন টলিউডের সবাইকে নিয়ে। তাঁদের মেয়ে সোহিনী, ইন্ডাস্ট্রিতে এলেন তিনিও।

    রাজনৈতিক জীবনে ভুল পদক্ষেপ

    যে দলের হয়েই রাজনীতি করুন না কেন, নিজের ব্যক্তিত্ব ও কথার লাগাম ধরে রাখার দায়িত্ব নিজের কাছেই থাকে। যেটা একেবারেই মেনে চলেননি তাপস। বারবার বেফাঁস মন্তব্য করেছেন। উগ্রতার পরিচয় দিয়েছেন। নিন্দার পাত্র হয়েছেন অশালীন মন্তব্যে। জড়িয়েছেন বহু টাকার কেলেঙ্কারিতেও। জেলেও কাটিয়েছেন এক বছরের বেশি সময়। জেল থেকে বেরোনোর পরে তাঁর ভেঙে যাওয়া চেহারা দেখে চমকে যান সকলে। সেই কন্দর্পকান্তি ‘দাদার’ অবাঞ্ছনীয় ‘কীর্তি’ই তাঁকে শেষ করে দিল। রাজনীতিকে ভুল ভাবে ব্যবহার করলে তা যে কারও পক্ষে কতটা খারাপ হতে পারে, সেই শিক্ষার উদাহরণ যেন তাপস পাল দিয়ে গেলেন।

    সব কিছুর পরেও তাপস পাল ফিরতে চেয়েছিলেন ইন্ডাস্ট্রিতে। চেয়েছিলেন নতুন করে শুরু করতে। তাঁর নায়কোচিত চেহারা আর ছিল না। তবু ক্যারেক্টার আর্টিস্ট ভূমিকাতেও ভাল রোলে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রোগের কাছে হেরে গেলেন। ফেরা হল না।

    অথচ এই তাপসই পালই কিন্তু মাধুরী দীক্ষিতের প্রথম নায়ক। ১৯৮৪ সালের ছবি ‘অবোধ’। তিনিও প্রসেনজিতের মত ইন্ডাস্ট্রি হতে পারতেন। সব গুণই ছিল। কিন্তু হয়নি। ভুল সময়ে ভুল পথে হেঁটেছেন তিনি! আমরা যখন কাউকে ট্রোল করি, তাঁর গুণগুলো মনে রাখি না। তাপস লাগামহীন কথা বলে যা ইমেজ তৈরি করেছিলেন, তাতে নিজের সম্মানহানি নিজেই করেছেন।

    তাপস পাল অভিনীত দুটো কিংবদন্তী ছবির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। একটা হয়তো সকলের দেখা, আর একটা খুব কম জন দেখেছেন।

    ‘সাহেব’ বিজয় বসুর ছবি। কিডনি বেচার গল্প নিয়ে প্রথমে ছবিই করতে চাননি বিজয় বসু। অন্য রকম বিষয় নিয়ে ছবি করার সাহস বিজয় বসুকে জোগালেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। সাহেব করার অফার নিতে বলেন মাধবী। এমনকি ‘সাহেব’ বানাতে টাকাও দেন মাধবী। সেই সাহেবের নামভূমিকায় নেওয়া হল তাপস পালকে। সঙ্গে বোনের ভূমিকায় মহুয়া, বড়বৌদি মাধবী আর বাবা উৎপল দত্ত। পারিবারিক গল্পে নতুন বার্তা দিল এই সুপারহিট ছবি। হিন্দিতেও সাহেব হল। কিন্তু অনিল কাপুর পারেননি তাপস পালের মতো ‘সাহেব’ হতে। যে সাহেব নিজের কেরিয়ার জলাঞ্জলি দেয়, গ্র্যাজুয়েশনে বারবার ফেল করে, কিন্তু বাবাকে ঋণমুক্ত করতে নিজের কিডনি বেচে দেয়। গুণধর দাদাদের থেকেও ফেল করা সংসারের বোঝা বেকার সাহেব জিতে যায় এখানেই।

    সাহেব ছবির জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তাপস পাল।

    আর একটা ছবি ‘জীবন’। রাজেশ খান্না অমিতাভ বচ্চনের ‘আনন্দ’র বাংলা ছবি ‘জীবন’-এ তাপসই নায়কের রোলটা করেন। মহুয়া, চিরঞ্জিত, তাপস অভিনীত এ ছবি চোখে জল আনবে। সলিল চৌধুরীর সুরারোপিত, অর্ধ্বেন্দু চ্যাটার্জীর ছবি।

    জীবনের চলে যাওয়া সেদিন তাঁর বন্ধুরা মানতে পারেনি। কী অভিনয়টাই না করেছিলেন মৃত্যুপথযাত্রীর তাপস পাল। আজ আর কোনও অভিনয় নয়, সত্যিই জীবন চলে গেল তাঁর।

    পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তাপস পালের পড়ে যাওয়া কেরিয়ারে ভাল ছবি দেন ‘উত্তরা’। সেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আজ জানালেন “তাপস যা সব লাগামহীন কথা বলত, রাজনীতি বা অভিনয়, কোনও ক্ষেত্রেই সেগুলো ঠিক নয়। ও আমার বাড়িতে শেষের দিকে কয়েক বার এসেছিল। ফোনেও কথা হয়। বোঝাতাম ভেবে কথা বলো, বাইট দেওয়ার আগে চিন্তা করো। কিন্তু ও শুনত না।”

    সবকিছুর পরেও তাপসের শেষ দিকের একটা ছবিতে অভিনয় ভোলার নয়। ‘আটটা আটের বনগাঁ লোকাল’। কী দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন তাপস পাল। যেন নিজের যা কিছু খারাপ, সব ওই চরিত্রটি করে শুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। দেবাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দু টাকা’ শর্ট ফিল্মেও অভিনয় করেন।

    কিন্তু, তাঁর হাতে আর সময়ই ছিল না। অসুস্থতায় সবার চোখের আড়াল হয়ে গেলেন।তাঁর বন্ধুরাই জানতেন না তিনি মুম্বইতে। চূড়ান্ত দু:সংবাদটা এল ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ৬১ বছর বয়সে জীবন নদীর ওপারে চলে গেলেন আলোচিত, বিতর্কিত আর একরাশ আক্ষেপে ভরা এই মানুষটি। আনা হল তাঁর মরদেহ কলকাতায়, শেষ শ্রদ্ধায় ও আগুনে বিলীন হয়ে গেলেন তিনি।

    রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি, জেল, লাগামহীন কথা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করার শাস্তি পেলেন এত অকালে চলে গিয়ে। কিন্তু রাজনৈতিক জীবন যতই কালিমালিপ্ত হোক না কেন, উত্তমকুমার,সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরে একার জোরে ছবি সুপারহিট করানোর আর এক নাম তাপস পাল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More