ঘুমিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা, সাহারা মরুভূমির আগুন গরম বালির নিচে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমি হলো সাহারা। আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় তিনভাগের একভাগ জুড়ে আছে এই মরুভূমি, আয়তনে প্রায় ৩৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ৫৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসে। বাতাসে জলীয় বাস্প মাত্র ২%। কিন্তু ভাবতে পারেন, এখানেই একদিন সবুজের স্বর্গ ছিল।

    সাহারা আজ পৃথিবীর উষ্ণতম ও শুষ্কতম স্থান হলেও, ১০,০০০ বছর আগে জীবজগতের বসবাসের আদর্শ স্থান ছিল। ভূবিজ্ঞানীরা সাহারা মরুভূমির তলায় এক অতিকায়  প্রাগৈতিহাসিক হ্রদের খোঁজ পেয়েছিলেন ২০১০ সালে। হ্রদটির আয়তন ছিল ৪৫,০০০ বর্গকিলোমিটার। এই অতিকায় হ্রদ ও তিনটি  বিরাটনদী, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সাহারা অঞ্চলে তৈরি করেছিল গ্রিন করিডোর।

    আমরা যদি লিবিয়ার দক্ষিণ পূর্বে তাসসিল্লিতে যাই, আজও সাহারার এই অংশে এমন কিছু সাইপ্রেস আর অলিভ গাছ দেখতে পাব। যেগুলির বয়েস কয়েক হাজার বছর। গাছগুলি এখনও তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। মূলগুলি মাটির অনেক নিচে নামতে বাধ্য হয়েছে জলের জন্য। কিন্তু গাছগুলি বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এই গাছগুলি শেষ হয়ে গেলে হয়তো আরও এক ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটবে। তবে বিজ্ঞানীরা গাছগুলির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্য ব্যবস্থা নিয়েছেন।

    এই গাছগুলি ছাড়াও আগে সাহারা মরুভুমির বুক জুড়ে ছিল ওক, সিডার,অ্যাশ, ওয়ালনাট, মাইটল আর লেবু গাছের ঘন ঝোপ জঙ্গল। জঙ্গলে ছিল বিভিন্ন ধরনের পশু ও পাখি। সবুজ সাহারার অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল সাভানা তৃণভূমি। তৃণভুমি ও নদীর ধারে বাস করতো বিভিন্ন শ্রেণীর সরীসৃপ। সাহারা মরুভূমির বালির নিচে পাওয়া কুমিরের প্রচুর কঙ্কাল প্রমাণ করে, এই অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া অতিকায় হ্রদ ও নদীগুলিতে প্রাচীন কালে কুমির গিজগিজ করতো।

    আর, অতিকায় হ্রদের পাশে বাস করত মানুষ।  হ্যাঁ, এই  সবুজ সাহারা মরুভুমির বুকেই গড়ে উঠেছিল এক সুপ্রাচীন সভ্যতা। যা আজ  ঘুমিয়ে আছে সাহারা মরুর উত্তপ্ত বালির তলায়। ৫,০০০ বছর আগেও মানুষ সাহারায় বসবাস করতেন, মাছ ধরতেন, শিকার করতেন, গরু চরাতেন, ফসল ফলাতেন,মাটির বাসনপত্র ও পাথরের গয়না তৈরি করতেন।


    কেন সবুজ সাহারা শুকিয়ে গেল

    আজ থেকে ৮ -১০ হাজার বছর আগে হটাৎ সাহারার আবহাওয়া পরিবর্তন হতে শুরু করে। এর কারণ হলো সূর্যের যে কক্ষপথে পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়, তার আকারের পরিবর্তন। নাসার, গডার্ড  ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডি-এর আবহাওয়া বিজ্ঞানী গেভিন স্কীমড-এর মতে আজ থেকে ৮,০০০ বছর আগে পৃথিবীর কক্ষপথ আজকের মতো ছিল না। কক্ষপথে ভ্রমণরত পৃথিবীর অক্ষ ২৪.১ ডিগ্রি কোনে হেলে ছিল ।

    কিন্তু ৮ থেকে ১০ হাজার বছর আগে কোনও মহাজাগতিক সংঘর্ষে কক্ষপথে গঠনগত পরিবর্তন আসে। এর ফলে পৃথিবীর অক্ষ ২৩.৫ ডিগ্রি কোনে হেলে যায়। পৃথিবীর অক্ষের সামান্য কৌণিক পরিবর্তন, পৃথিবীর আবহাওয়ার বিরাট পরিবর্তন ঘটায়। সেই আবহাওয়া পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে সবুজ সাহারার ওপর। মাত্র কয়েকশো বছরের মধ্যে শুকিয়ে যায় অতিকায় হ্রদ ও তিনটি বিরাট নদী ও প্রচুর শাখা নদী সমেত গোটা সবুজ সাহারা।

    বৃষ্টি থেমে যায় এই অঞ্চলে, ফলে সাহারা সভ্যতার মানুষ বাধ্য হয় এলাকা ছাড়তে এবং পূর্ব দিকের নীল নদের উপত্যকায় চলে যেতে। ধীরে ধীরে মরুভূমির নিচে হারিয়ে যায় সহস্রাব্দ প্রাচীন সাহারা সভ্যতা। ওদিকে নীল নদের অববাহিকায় জেগে ওঠে মিশরীয় সভ্যতা এবং ফারাওদের রাজত্ব।

    সাহারা সভ্যতা ছিল তার কী প্রমাণ আছে?

    প্রস্তর যুগের কঙ্কাল

    বিজ্ঞানীরা সাহারার বুকে খুঁজে পেয়েছেন ২০টি প্রস্তরযুগের কঙ্কাল। তাঁরা মনে করছেন সেই জায়গাটি সাহারা সভ্যতার মানুষদের  সমাধিক্ষেত্র ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সাহারা মরুর বালি সরিয়ে একটু একটু করে, এক অবাক করা পৃথিবীকে সামনে আনতে শুরু করেছেন।

    পুরো সাহারা মরুভূমি জুড়ে প্রায় ১০০ টি খনন ক্ষেত্র থেকে বিজ্ঞানীরা ভূতাত্ত্বিক নমুনা, পশুর হাড়, মানুষের ব্যবহৃত আদিম যন্ত্রপাতি, নাটকীয় ও রঙিন ছবি আঁকা পাথর আবিস্কার করেছেন। তাঁরা সেগুলো দিয়ে সবুজ সাহারায় জন্ম নেওয়া এক প্রাচীন সভ্যতার আকার দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

    গুহাচিত্র

    হেনরিখ বার্থ নামে এক জার্মান অভিযাত্রী এই অঞ্চলে পাঁচ বছরের ওপর কাটিয়ে হাজারের ওপর প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র উনি আবিস্কার করেন। এই আদিম চিত্রগুলি উনি খুঁজে পান পশ্চিম সাহারার দেশ মালির মরুশহর টিম্বাকটু থেকে পূর্ব সাহারার চাদ এলাকার মরুশহর সালেহ-এর মধ্যে। দক্ষিণ-পশ্চিম লিবিয়ার তাসসিল্লি-এন-আজারের  এক প্রাচীন গুহাতেও হেনরিখ বার্থ  হাজারের ওপর গুহাচিত্র খুঁজে পান।

    এই সাহারা রক আর্ট থেকে, হাজার হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সাহারা সভ্যতার বিষয়ে অনেক কিছু জানা সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। কারণ ‘সাহারা রক আর্ট’  ফ্রাঁস ও স্পেনে আবিস্কৃত গুহাচিত্রগুলির চেয়েও অনেক সুস্পষ্ট ও প্রকৃতির কোলে নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত।

    গুহাচিত্রগুলিতে নাটকীয়ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে সাহারা সভ্যতার মানুষদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে পুরুষদের তীর ধনুক দিয়ে শিকার করতে,মহিলাদের চুল আঁচড়াতে বা কোনও ছবিতে বৃত্তাকারে নাচতে। ছবিগুলি থেকে জানা যাচ্ছে সাহারা সভ্যতার মানুষরা পশুপালন করতো, বিশেষ করে গরু, ছাগল, ভেড়া, শুয়োর এবং কুকুর। দলবেঁধে নদীতে মাছ ধরতো।

    গুহাচিত্রগুলিতে সাহারা সভ্যতার মানুষদের বাড়িঘরও ফুটে উঠেছে। অর্ধগোলকাকৃতি  ঘর, ঘরের সামনে বাসনপত্র দেখা গেছে কিছু ছবিতে। গুহাচিত্রগুলিতে প্রচুর পশুর ছবি আছে। যেমন হাতি, গন্ডার, সিংহ, জিরাফ, জলহস্তী, উটপাখি, বুনো মোষ এবং অ্যান্টিলোপ হরিণ। এর অর্থ ১০,০০০ বছর আগে এই সবুজ সাহারায় এরা বাস করতো। কিন্তু, শুনলে আশ্চর্য্য হবেন,  ১০,০০০ বছর আগে সাহারা সভ্যতার মানুষরা উট দেখেননি। জীববিজ্ঞানীরা বলছেন মাত্র হাজার দুয়েক বছর হলো, সাহারায় উট এসেছে,সবুজ সাহারা মরুভুমিতে পরিণত হওয়ার পর।

    স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি

    স্যাটেলাইট আর্কিওলজি ফাউন্ডেশন-এর প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলা মিকল সাহারা এলাকায় বালির নিচে খুঁজে পেয়েছেন অদ্ভুত সব কাঠামো। সেগুলির কোনওটা আবার পিরামিডের মতো দেখতে। সবচেয়ে বড়টি কাঠামোটি একটা বর্গাকার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু এগুলির কাছে পৌঁছতে গেলেও কোটি কোটি টন বালি সরাতে হবে। তবে এই স্যাটেলাইট চিত্রগুলি প্রমাণ করতে চলেছে সাহারা অঞ্চলে ছিল এক বড়সড় সভ্যতা।

    আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। আর বিজ্ঞান আমার আপনার মতো চটপট যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করতে পারে না। তাই বিজ্ঞানকে সময় দিতেই হবে। যেটুকু সময় দিয়েছিলেন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো আবিস্কারের ক্ষেত্রে, সেটুকু সময়ই না হয়  দিন সাহারা সভ্যতাকে পৃথিবীর দরবারে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে।

    The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More