সোমবার, এপ্রিল ২২

সূর্যোদয়ের দেশ, আবার হত্যালীলারও , বছরে খুন হয় দুহাজার ডলফিন

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সারা পৃথিবীর কাছে জাপান মানেই শান্তির সাদা পায়রা। রুপকথার ফিনিক্সের মতো  হিরোশিমা-নাগাসাকির ছাই থেকে যে ডানা মেলেছিল মুক্তির আকাশে। শিক্ষিত সুসভ্য দেশ জাপান। যার শিক্ষা, সংস্কৃতি,রুচি, সর্বোপরি বিনয়ের কাছে মাথা নোয়ায় বিশ্ব। সেই জাপান চোখের আড়ালে গর্বিত ভাবে বয়ে নিয়ে চলেছে এক কলঙ্কময়  ইতিহাস। হ্যাঁ, হত্যার ইতিহাস। মানুষ নয়, ডলফিন।  শান্তিপ্রিয় সামুদ্রিক প্রাণী ডলফিনদের সবচেয়ে নৃশংস ঘাতক হলো শান্তির পূজারী জাপান।

খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হচ্ছে ডলফিনদের

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে হয়ত। তাহলে নজর ফেলুন জাপানের কানসাই অঞ্চলে। জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলবর্তী  এবং প্রশান্ত মহাসাগরের তীরের আধা শহর তাইজির উপর। প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় কুখ্যাত  তাইজি ডলফিন হান্টিং  ড্রাইভ । শেষ হয় পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে। মারা যায় পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ও নিরীহ প্রাণী ডলফিন, কাতারে কাতারে। জাপান সরকার প্রতি বছর কম বেশি  ২০০০ ডলফিন মারার অনুমতি দেয় কিন্তু বেসরকারি হিসেবে  ১০-১৫ হাজার ডলফিন মেরে ফেলা হয়। এছাড়াও আরও ২৫,০০০ অন্যান্য ছোট বড় সামুদ্রিক প্রাণী মেরে ফেলা হয়।

পালাবার পথ বন্ধ

কেন মারা হয় ডলফিন ! 
ডলফিনের মাংস জাপানে একটি দুর্লভ ডেলিকেসি। ডলফিনের পাখনার স্যুপের দাম কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন কন্টিনেন্টাল রেস্তোরাঁয় ডলফিনের পদের আকাশ ছোঁয়া দাম। চোরাপথে বিশ্বের নানা প্রান্তে তাই পাড়ি দেয় ক্যানবন্দি ডলফিনের মাংস। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা এবং আরব শেখদের মনোরঞ্জনের জন্য জীবিত ডলফিন ধরা হয়। জাপানের তাইজি থেকে ধরা ডলফিনের বড় ক্রেতা চিন, তাইওয়ান এবং মিশর। বাৎসরিক ডলফিন শিকার নাকি তাইজি গ্রামের অধিবাসীদের সারা বছরের রোজগার দেয়। সেই টাকায় চলে তাঁদের সংসার। তাই সারা পৃথিবীর সমালোচনা ও অভিশাপকে তুড়ি মেরে, সমুদ্রের জল লাল করে , বুক ফুলিয়ে চলে ডলফিন শিকার। জাপান সরকারের প্রত্যক্ষ মদত ও প্রশ্রয়ে।

ডলফিনদের বধ্যভূমি The Cove

শিকারি কারা !
ঘাতকেরা ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্বেই। সমস্ত উপকূলীয় রাষ্ট্রের মৎসজীবীরাই লুকিয়ে ডলফিন মারে। ফারো আইল্যান্ড, সলমন আইল্যান্ড-এর শিকারিরা ডলফিন, তিমি, হাঙর মারতে ওস্তাদ। কিন্তু সবাইকে হারিয়ে দিয়েছে জাপান। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে তাইজি।   জাপানের এই শহর সারা বিশ্বের সামনে বুক ফুলিয়ে  লক্ষ লক্ষ ডলফিন মেরে আসছে কয়েকশো বছর ধরে। বাণিজ্যিক ভাবে ১৬০৬ সাল থেকে তাইজি  তিমি, হাঙর, ডলফিন মেরে আসছে। শুরু করেছিলেন তিমি শিকারি  ইয়োরোমোতো ।  প্রাথমিক ভাবে তিনি ছোটো নৌকা করে সমুদ্রে গিয়ে হার্পুন দিয়ে তিমি শিকার করতেন। ১৬৭৫ সাল থেকে তিমি শিকারের জন্য জাহাজ ভাসাতে শুরু করল তাইজির মৎস ব্যবসায়ীরা। ধীরে ধীরে সারা জাপানে ছড়িয়ে পড়েছিল তিমি,হাঙর,ডলফিনের শিকার ও মাংস রপ্তানির ব্যবসা। তাইজিতে এই বাৎসরিক ডলফিন শিকার, উৎসবের আকার ধারণ করে  ১৯৬৯ থেকে।

সমুদ্রের জল আর বালির রঙ যখন লাল

ডলফিন শিকারের মরসুম
সেপ্টেম্বরের এক তারিখ থেকে শুরু হয় এই নির্মম ইরুকা হত্যালীলা। ডলফিনকে জাপানিরা বলে ইরুকা। চলে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন পর্যন্ত। পুরো ছ’মাস তাইজি গ্রামের সমুদ্রতটের বালির রঙ থাকে লাল। গোনডো( তিমি) শিকার শেষ হয় আরও দু’মাস পরে। এপ্রিলের শেষে।

শিকারির নিশানায় যারা

বটল নোজ ডলফিন, প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড ডলফিন, প্যাসিফিক হোয়াইট সিটেড ডলফিন, শর্ট ফিন পাইলট হোয়েল, রিসসোস ডলফিন, স্ট্রাইপড ডলফি। এছাড়াও ফলস কিলার হোয়েল মারা হয় প্রচুর সংখ্যায়। শুশুক জাতীয় প্রাণী পরপোইজেস-এর কথা বাদই দিলাম। ওদের হত্যা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না। যে সব প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীদের হত্যা করা হয় তাদের সব কটিকেই  WWF ( World Wild Fund) বিপন্ন প্রজাতি বলে ঘোষণা করেছে।

তুলে নেওয়া হচ্ছে নৌকায়

যে ভাবে মারা হয়

তাইজির কিছু বাছা ডলফিন শিকারি সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে  শিকারে নামে। গভীর সমুদ্রে চলে যায় কয়েকশো ট্রলার।  ডলফিনদের ঝাঁক দেখতে  পেলে ,ট্রলারগুলি একটি ব্যুহ তৈরি করে ঝাঁকটিকে ঘিরে।। একটা ট্রলার থেকে স্টিলের পাইপের এক প্রান্ত সমুদ্রের জলে নামিয়ে দেওয়া হয়। তারপর একটি কাঠের হাতুড়ি দিয়ে পাইপে আঘাত করা হয়। জলের ভেতর শব্দের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে।  ডলফিনরা পাইপের তোলা সুরেলা আওয়াজে আকর্ষিত হয়ে  ট্রলারটির আশপাশে পাক খেতে থাকে। ট্রলারগুলি থেকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ছোট ছোট মাছ।  তারপর জলের নিচে শব্দ তৈরি করতে করতে ট্রলারটি রওনা দেয় তীরের দিকে।  পিছনে ইউ আকৃতির ব্যুহ তৈরি করে  তীরের দিকে এগোতে থাকে বাকি ট্রলারগুলিও। ডলফিনরা জানতে পারে না, তাদের পিছন পিছন সমুদ্রের জলে নেমে পড়েছে বিশাল এক জাল। যা তাদের আর সমুদ্রে ফিরে যেতে দেবে না। এই ভাবে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো শব্দের জাদুতে সম্মোহিত ডলফিনদের  একটি নির্দিষ্ট খাঁড়ির দিকে নিয়ে আসে তাইজির শিকারিরা। যে খাঁড়ির ভেতরে ডলফিনরা ঢুকতে পারবে, কিন্তু বেরোতে পারবে না। কারণ বেরোবার পথ জাল দিয়ে বন্ধ করা।

তোলা হচ্ছে মোটরবোটে

খাঁড়িতে আটক হওয়া ডলফিন গুলি প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভারী জাল কেটে বেরোতে পারে না। তাদের শান্ত করার জন্য সারারাত তাদের কোনও ক্ষতি করা হয় না। অনেক সময় ছোট ছোট মাছ খাবার জন্য দেওয়া হয়। সকাল হতেই বোটে করে জলে নেমে পড়ে শিকারিরা।  যে ডলফিনগুলিকে জীবিত রাখা হবে অ্যাকোয়ারিয়ামের জন্য, তারা রয়ে যায় বড় জালের মধ্যে। যে ডলফিনগুলিকে মাংসের জন্য মারা হবে, তাদের কে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আরেকটি  জালের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।  এবং জালটা টেনে টেনে অগভীর জলে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে ডলফিনদের হারপুন দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হতো। তারপর  লম্বা হাত করাত দিয়ে গলা কেটে ফেলা হতো। কিন্তু জাপান সরকার বর্তমানে সেটা নিষিদ্ধ করেছে। এখন ডলফিনের স্পাইনাল কর্ডের ভেতর লম্বা একটি  ধাতব রড ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তাতে নাকি মুহূর্তের মধ্যে মারা যায় ডলফিনটি। কিন্তু  ২০১১ সালে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, স্পাইনাল কর্ডে রড ঢুকিয়ে দেবার পরও বেঁচে রয়েছে অনেক ডলফিন। ছটফট করছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। শরীরের সব রক্ত গিয়ে মিশছে জলে। প্রশান্ত মহাসাগরের  নীলচে-সবুজ জল হয়েছে আলতার মতো লাল।

পাশবিকতার প্রতিবাদ

প্রতিবাদ হচ্ছে না !

 চিত্র পরিচালক হার্ডি জোন্স   BlueVoice.org সংস্থার হয়ে ২০০০ সালে প্রতিবাদ শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন হলিউড অভিনেতা টেড ড্যানসন। তাঁরা বহুবার তাইজিতে যান। ডলফিন হত্যা নিয়ে তৈরি করেন ছবি The Dolphin Defender। সেই প্রথম বিশ্বের সামনে আসে তাইজির নৃশংসতা। ২০০৩ সালে তাইজিতে, রাতের অন্ধকারে জাল কেটে ডলফিনদের ছেড়ে দেন  দুই প্রতিবাদী যুবক। তাঁদের গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তাঁদের আর খোঁজ মেলেনি। তাইজির নৃশংসতা নিয়ে  জাপান টাইমসে লেখেন  সাংবাদিক বয়েড হার্নেল । সাড়া পড়ে যায় জাপান-সহ সারা বিশ্বে। লড়াই শুরু করে Taiji Twelveডলফিন শিকারের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে গড়ে ওঠে এক জাপানি সংগঠন। ওই বছর আফ্রিকার ডোমিনিকান রিপাবলিক-এর Ocean World Adventure Park কতৃপক্ষ ১২ টি ডলফিনের অর্ডার দেয়। তার বিরোধিতা করার জন্যই গড়ে ওঠে এই জাপানি সংগঠনটি । নামও তাই  Taiji Twelve তাদের আন্দোলনে অর্ডারটা বাতিল করতে বাধ্য হয় তাইজির এজেন্সি।

শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের নিস্ফল বিক্ষোভ

তাইজি ডলফিন হান্টিং  ড্রাইভ  নিয়ে ২০০৯ সালে তৈরি হয় একটি বিখ্যাত তথ্যচিত্র, The Cove বিশ্বের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলির শিরোনামে আসে তাইজির ডলফিন হত্যার খবর। শুরু হয় প্রতিবাদ, সারা বিশ্ব জুড়ে।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, তাদের মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম গুলিতে জাপান থেকে আমদানি হওয়া ডলফিন রাখা নিষিদ্ধ করে। ডলফিন শিকারের পাশবিক পদ্ধতি নিয়েও বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হওয়া একটি নিবন্ধে The Japanese Association of Zoos and Aquariums বলেছে তারা  ডলফিন শিকার সমর্থন করে না এবং তারা তাইজি ডলফিন হান্ট থেকে ডলফিন বা অন্য কোনও সামুদ্রিক প্রাণী কিনবে না।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রতিবাদের ঢেউ

ডলফিনদের জাপানি আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে Earth Island Institute, Surfers for Cetaceans , Dolphin Project Inc, Sea Shepherd Conservation Society , One Voice, Blue Voice , the Whale and Dolphin Conservation Society , World Animal Protection নামের সংস্থাগুলি। ২০১৫ সালের মে মাসে, the World Association of Zoos and Aquariums (WAZA) বিশ্বের সমস্ত চিড়িয়াখানা এবং অ্যাকোয়ারিয়ামে তাইজির ডলফিন কেনা বা আদানপ্রদানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

বিমানবন্দরে রাখা ফাইটার জেট নয়, ফ্যাক্টরির ফ্লোরে রাখা হাজার হাজার ডলফিন

এতকিছুর পরেও বাৎসরিক ডলফিন শিকার বন্ধ করেনি তাইজি। বরং, প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ২০০৭ সালে একটি অত্যাধুনিক কসাইখানা তৈরি করে। যেখানে ডলফিনদের মারা ও তাদের মাংস ক্যানবন্দি করে বাজারে পাঠানো হবে। তবে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পর , তাইজিতে এখন দিনের আলোয় ডলফিন হত্যা প্রায় বন্ধ । রাতের অন্ধকারে চলে ডলফিন নিধন যজ্ঞ। দিনের আলোয়  যখন ডলফিন মারা হয়, সুবিশাল প্লাস্টিকের আচ্ছাদনে ঢেকে ফেলা হয় এলাকা। দেখা যায় না নীল প্ল্যাস্টিকের ওপারে তাইজির পাশবিকতা।

কসাই করছে কসাইয়ের কাজ

আমেরিকার অ্যাম্বাসাডর ক্যারোলিন কেনেডি ২০১৪ সালে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে-এর  কাছে ডলফিন হত্যা বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছিলেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ছিলো , “ডলফিন শিকার তাইজির একটি সুপ্রাচীন প্রথা। এর শিকড় তাইজির সংস্কৃতি এবং সমাজ জীবনের অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। এই প্রথা তাদের জীবন চালানোর একমাত্র উপায়। প্রত্যেক অঞ্চল বা দেশেরই কিছু নিজস্ব রীতি রয়েছে। যেগুলি তারা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পেয়েছেন। আমি মনে করি এই রীতিগুলিকে সম্মান দেওয়া উচিত”

শেষ মুহুর্ত, বাতাসে অক্সিজেন খোঁজার চেষ্টায়

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কথায় বোঝাই যাচ্ছে, বিলুপ্তপ্রায় ডলফিন প্রজাতিকে পৃথিবী থেকে  নিশ্চিহ্ন করার আগে থামবে না জাপান। উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপান। বিশ্ব শান্তির পূজারী জাপান। বুদ্ধময় জাপান। তাই আজ ডলফিনরা, সুর্যোদয়ের দেশে অকাল সুর্যাস্তের অপেক্ষায়। 

Shares

Comments are closed.