বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

বিজ্ঞানীদের আজব পরীক্ষা, ৪০টি দেশে ইচ্ছে করে হারালেন টাকা ভর্তি ১৭০০০ মানিব্যাগ, পেলেন অবিশ্বাস্য ফলাফল

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আর্থিক দুর্নীতিতে জর্জরিত আজকের পৃথিবী। পৃথিবীতে এমন একটাও দেশ নেই যেখানে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কত যে নেতা মন্ত্রী জেলে আছেন, তার পরিসংখ্যানে চোখ বোলালে হতবাক হতে হয়। ভারতের অবস্থা তো আরও সঙ্গিন। ‘ঋণ খেলাপি’, ‘তহবিল তছ্রুপ’, ‘তোলা’ ‘কাটমানি’ ও ‘সিন্ডিকেট’ নামের শব্দগুলো এখন ভীষণ পরিচিত হয়ে গেছে আমাদের কাছে। অতিরিক্ত অর্থের হাতছানি মানুষকে অসৎ করে তুলেছে, এমন উদাহরণও কম নেই ভূভারতে।

আপনাদের মনে মাঝে মাঝে নিশ্চয় প্রশ্ন জাগে, ‘পৃথিবীতে কি সত্যিই আর ভালো লোক আর নেই’! একই প্রশ্ন জেগেছিল বেশ কিছু বিজ্ঞানীর মনে। এঁরা মানুষের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন। এঁদের বলা হয় behavioral scientists। আমাদের মনের প্রশ্ন মনেই থাকে। কিন্তু এঁরা বিজ্ঞানী, উত্তর পেতে নাছোড়বান্দা। তাই মনে জেগে ওঠা প্রশ্নের উত্তর পেতে সমীক্ষা চালাবেন বলে ঠিক করলেন।

শুরু হলো আজব পরীক্ষা

তাঁরা ঠিক করলেন জনবহুল স্থানে নিজেরা কিছু টাকা ভর্তি মানিব্যাগ ছড়িয়ে দেবেন। এবং সেগুলি নিজেরাই কুড়িয়ে নিয়ে অন্য লোকদের দেবেন। বলবেন তাঁরা এটা রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছেন। কার মানিব্যাগ সেটা তাঁরা জানেন না। মানিব্যাগগুলিতে রাখা থাকবে বিভিন্ন অঙ্কের ডলারের আসল নোট ও যিনি ছড়িয়ে দেবেন তাঁর গবেষক সঙ্গীর ঠিকানা ও ফোন নাম্বার লেখা একটি কার্ড ও টুকিটাকি কাগজ।

এসবই ছিল মানিব্যাগগুলিতে

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিয়েছিলেন ফিনল্যান্ডকে। দু’জন গবেষক সেখানে পর্যটকের ছদ্মবেশ ধরে যান। এবং একটি শহরের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক , পোস্টঅফিস, সিনেমা হলে গিয়ে এক গবেষক বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু মানিব্যাগ বিভিন্ন শ্রেণির লোকের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, “কেউ এটা হারিয়েছেন। আমি শহরে নতুন এটা আপনি রাখুন যদি কেউ খোঁজ করেন দিয়ে দেবেন প্লিজ।”

বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত ছিলেন মানিব্যাগে টাকা থাকলে প্রাপক এটা ফেরত দেবে না। কারণ ‘ফ্রি লুজ ক্যাশ’।  কিন্তু গবেষকরা চমকে দেওয়া রেজাল্ট পেয়েছিলেন। কারণ যা ভেবেছিলেন উল্টোটা হয়েছিল।

গবেষকদের প্রধান মিশিগান ইউনিভার্সিটির অ্যালেন কোহেন জনিয়েছেন ” মানুষরা সেই সব মানিব্যাগ ফেরত দিয়েছেন যেগুলিতে বেশি অঙ্কের টাকা ছিল। প্রথমে আমরা বিশ্বাস করিনি, সহ-গবেষকদের বলেছিলাম মানিব্যাগে টাকার অঙ্ক তিনগুণ করে দিতে। কিন্তু আমরা আশ্চর্য্যজনকভাবে একই ফলাফল পাই।

গবেষক দলের লিডার, বিজ্ঞানী কোহেন

পরীক্ষা ছড়াল ৪০টি দেশের ৩৫৫টি শহরে

গবেষকরা তখন ভাবেন, সততা হয়তো ফিনল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষের চরিত্রে জেঁকে বসে আছে, তাই এই ফল এসেছে। তাঁরা নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাটি করবেন বলে মনস্থির করেন। সেই মতো তৈরি হন পর্যটকের ছদ্মবেশ ধরা ৮০ জনেরও বেশি বিজ্ঞানী। ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের বিভিন্ন দেশের নানা শহরে ছড়িয়ে পড়েন তাঁরা। মোট ১৭০০০ মানিব্যাগ  ৪০টি দেশের ৩৫৫টি ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে।

কাজটি বেশ কঠিন। বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক নজরদারি এড়িয়ে অতগুলো মানিব্যাগ ও প্রচুর ডলার  নিয়ে কোনও দেশে ঢোকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এক এক জন গবেষককে দু’শোর বেশি মানিব্যাগ নিয়ে নির্দিষ্ট দেশে ঢুকতে হয়েছে পর্যটকের ছদ্মবেশে। বিভিন্ন দেশের সীমানা ও এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি এড়িয়ে। অসংলগ্ন ও সন্দেহজনক ব্যবহার করায় কেনিয়ার এয়ারপোর্টে এক গবেষক আটক পর্যন্ত হয়েছিলেন। পরে কূটনৈতিক দৌত্যে তাঁকে ছাড়িয়ে আনা হয়। ততক্ষণে অন্য আর একজন গবেষক ঢুকে পড়েছেন সেই দেশে। মিশন সফলের লক্ষ্য নিয়ে।

ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ১৭০০০ মানিব্যাগ

গবেষকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরের সমুদ্র তীরে, হোটেলে, স্টেশনে, ব্যাঙ্কে, এয়ারপোর্টে, কফিশপে, বারে  ১৭০০০ মানিব্যাগ ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। civic honesty-এর ওপর চালানো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বার্থে। অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে। গবেষণার কথা স্থানীয় কাউকে জানানো যাবে না। কারও সাহায্য নেওয়া যাবে না। কারণ এক এক দেশের এক এক নিয়ম। কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মানুষের স্বার্থে যুগে যুগে নিজের জীবন বিপন্ন করেছেন। তবু তাঁদের পথ থেকে তাঁদের সরানো যায়নি।

কী হলো মানিব্যাগগুলোর!

১৭০০০ মানিব্যাগের মধ্যে কিছু মানিব্যাগে টাকাপয়সা ছিল না, কিছুতে ছিল ১৩ ডলার এবং কিছুতে ছিল ১০০ ডলার।গবেষকদের অবাক করে দিয়ে ১০০ ডলার থাকা মানিব্যাগগুলির মধ্যে ৭২ শতাংশ মানিব্যাগ ফেরত এসেছিল, টাকা সমেত। ১৩ ডলার থাকা মানিব্যাগগুলির মধ্যে ৬১ শতাংশ মানিব্যাগ টাকা সমেত ফেরত এসেছিল। আর টাকা না থাকা মানিব্যাগ ফেরত এসেছিল ৪৬ শতাংশ। এবং সমস্ত মানিব্যাগই অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিয়ে গিয়েছিলেন প্রাপকরা। ফোন করে ঠিকানা জেনে নিয়ে।

বিজ্ঞানী অ্যালেন কোহেন বিখ্যাত সায়েন্স পত্রিকায় ছাপা তাঁদের গবেষণাপত্রে লিখেছেন, “মানিব্যাগে থাকা টাকার পরিমাণও আমাদের সাবজেক্ট বা জনগণের ওপর প্রভাব ফেলেছে। বেশি টাকা থাকা ব্যাগই মানুষ বেশি ফেরত দিয়েছেন। এটা আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। আমরা ভেবেইছিলাম এই ব্যাগগুলি আর ফেরত আসবে না”।

কী পাওয়া গেল পরীক্ষাটি থেকে!

গবেষকরা সবচেয়ে খুশি, তাঁরা নিজেরা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন বলে। তাঁদের করা এই আজব পরীক্ষাটি প্রমাণ করেছে এখনও বিশ্বে বেশিরভাগ মানুষের অন্তরেই সততা আছে। এবং সেই সততাকে অর্থ টলাতে পারে না। কারণ তাঁরা পরের জিনিস নেওয়াটা অন্তর থেকে মেনে নিতে পারেন না।

মানিব্যাগ ফেরত দেওয়া মানুষদের সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে কথা বলে গবেষকরা তাঁদের দুটি শ্রেণিতে ফেলেছেন।

প্রথম শ্রেণি: এই শ্রেণির মানুষগুলি নিঃস্বার্থ (selfless)। তাঁরা সরলভাবে ভেবেছিলেন, যিনি মানিব্যাগটি হারিয়েছেন তিনি না জানি কত সমস্যায় পড়েছেন। মানিব্যাগ হারানো অজানা মানুষটির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন তাঁরা। গবেষকরা বলছেন এক্ষেত্রে এই মানুষগুলি সৎ থাকেন তাঁদের অন্তরে থাকা সহমর্মিতা জন্য।

দ্বিতীয় শ্রেণি: এই শ্রেণির মানুষরা নিজের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চেয়েছেন। বিজ্ঞানী কোহেন বলেছেন মানিব্যাগে থাকা বেশি টাকা তাঁদের ভাবিয়েছে, যদি তাঁরা মানিব্যাগ ফেরত না দেন, তাহলে নিজের কাছে নিজের ভাবমূর্তি চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। সারাজীবন ধরে অপরাধীর মনস্তাপ বয়ে বেড়াতে হবে। এটা তাঁরা চাননি।

কী বললেন অন্যান্য বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা!

ডিউক ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ ড্যান আরিয়েলি ‘মানুষের অসাধুতা‘ নিয়ে গবেষণা করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি উল্লসিত। তাঁর মতে, আর্থিক দিক থেকে লাভবান হবেন জেনেও বেশিরভাগ মানুষই অসৎ হননি। বরং সমাজ বহির্ভূত কাজ না করে তৃপ্ত হয়েছেন।

আজব পরীক্ষাটির ফলাফলে খুশি জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মনস্ত্বত্ববিদ আবিগেইল ম্যাকেইন। তিনি বলেছেন,“ “আমি দারুণ খুশি। বিশ্বজোড়া এই পরীক্ষা প্রমাণ করেছে, সারা বিশ্বে বেশিরভাগ মানুষ বেশিরভাগ সময়ে সঠিক কাজ করতে চেষ্টা করেন। এবং সারা বিশ্বে ভালো মানুষদের সংখ্যাই বেশি”।

গবেষকরা অনেক ধনী দেশে উল্টো ফলাফলও পেয়েছেন। আবার অনেক গরিব দেশে আশাতীত ফলাফল পেয়েছেন। সবচেয়ে সৎ দেশ হিসাবে এই পরীক্ষায় উঠে এসেছে সুইৎজারল্যান্ড,নরওয়ে ও হল্যান্ডের নাম। এই তালিকায় সবার শেষে আছে  পেরু, মরোক্কো ও চিনের নাম।

যদিও গবেষকরা এখনও জানাননি ৪০টি দেশের ৩৫৫টি শহরের মধ্যে  আমাদের ভারত ও ভারতের কোনও শহর ছিল কি না।  তবে এই পরীক্ষা কিন্তু কিছুটা হলেও আশার আলো দেখিয়েছে মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে শঙ্কায় থাকা মানুষের মনে। কারণ ‘সুযোগের অভাবে চরিত্রবান’ প্রবাদটিকে সামান্য হলেও ফিকে করে দিয়েছে এই অসামান্য পরীক্ষাটি।

Comments are closed.