বুধবার, মার্চ ২০

ভূতে বিশ্বাস করেন? কেন মানুষ ভূত দেখে জানেন? কী বলছে বিজ্ঞান!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

“আমি ভূতের সঙ্গে সহবাস করেছি!” ইংল্যান্ডের বছর ত্রিশের অ্যামেথিস্ট রিয়েলম (Amethyst Realm) এমন দাবি করার পরই বেশ নড়েচড়ে বসেছিল তাবড় বিজ্ঞানীমহল। বলে কী মেয়েটা? ভূতের সঙ্গে সহবাস, তাই কখনও হয় নাকি? গতমাসেই The Sun এবং  ITV  কে  অ্যামেথিস্ট বলেছিলেন, তিনি এখনও পর্যন্ত মোট ২০ জন ভূতের সঙ্গে সহবাস করেছেন। এর মধ্যে একজন ভূতের সঙ্গে সত্যিই সত্যিই প্রেম করছেন। যাঁর সঙ্গে তাঁর প্লেনের টয়লেটে পরিচয়। প্রেম নাকি এতটাই জমে উঠেছে যে, সেই প্রেমিক ভূতকেই বিয়ে করবেন অ্যামেথিস্ট। তবে তাঁর একটাই খেদ, বিছানায় তৃপ্ত হলেও প্রেমিককে দেখতে পাবেন না।যাই হোক সে প্রসঙ্গ এখন থাক! গুগল সার্চ করে পুরোটা পড়ে নেবেন না হয়। এখন একবার ভাবুন, ভূতেরা এসব কী শুরু করেছে!

অ্যামেথিস্ট রিয়েলম

কিন্তু সত্যিই কি ভূতেরা কিছু করতে পারে? আবছায়া শরীরে স্পর্শ করাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত? এবার বহু চর্চিত প্রশ্ন, সত্যিই কি ভূত আছে? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে এই বিতর্ক। ভবিষ্যতেও চলবে। বৈজ্ঞানিকরা বহুদিন আগে ভূতের অস্তিত্ব নাকচ করে দিলেও, দেখা গেছে পৃথিবীর ৩০% মানুষ এখনও ভূত ও অতিপ্রাকৃতিক ঘটনায় বিশ্বাস করেন। আমরা প্রায় প্রত্যেকেই আমাদের জীবনে এমন কিছু লোককে চিনি বা জানি বা গল্প শুনেছি, যাঁরা ভূত দেখেছেন। কেউ তাঁর আত্মীয়ের আত্মা দেখেছেন, আবার কেউ দেখেছেন কোনও নাম না জানা অশরীরীকে। প্রতিমুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটে ভূতের লক্ষ লক্ষ ভিডিও (বলা হয় আসল), সিসিটিভিতে ধরা পড়া ভূতের ভিডিও ও ছবি আপলোড ও ডাউনলোড হয়ে চলেছে। হন্টেড ছবি মানেই সেটা হাউসফুল। ছবির ট্রেলরে গুচ্ছ লাইক, শেয়ার।  শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত বাজারে ভূত কোম্পানির সেনসেক্স পড়েনি, ক্রমশ উর্ধ্বমুখী হয়েছে। আসলে ভূতকে দেখা, শোনা ও লালনপালন করার জন্য পৃথিবীতে প্রচুর মানুষ আছেন। সেটা চেতনায় হতে পারে আবার বাস্তবেও হতে পারে। কিন্তু, সচক্ষে ভূত দেখেছেন বা ভুতুড়ে ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন এমন কথা কটা শুনতে পান? আর যাঁরা সচক্ষে ভূত দেখার দাবি করেন, তারা সেটা করেনই বা কেন আর কী করেই বা করেন? এই ব্যপারে বিজ্ঞান তার বৈজ্ঞানিক  ব্যাখ্যায় বলছে,

   
ভূত বিশ্বাসীদের মনে গেঁথে থাকে ভূত

আসলে জন্ম থেকে মানুষের অবচেতন মনে ভূত বেশ বড় একটা জায়গা করে নিয়েছে। প্রচুর ভূতের গল্প শোনা বা টিভি, ইউটিউবে ভূতের ভিডিও দেখা সব কিছুই মনের অন্দরে বেশ থাবা গেড়ে বসে। এর ফলে মানসিক কাঠামোতেও ভূত তার পাকাপাকি একটা জায়গা করে নেয়।  ভূত দেখার মানসিকতা নিয়ে The Houran and Lange model মতবাদটি  বলছে, একজন মানুষই অপরকে ভূত দেখতে উদ্বুদ্ধ করেন। যদি একজন মানুষ কোনও জায়গায় ভূত দেখেছেন বলে দাবি করেন, তাহলে ভূতে বিশ্বাস করেন এমন মানুষরা সে কথার শোনার পর সেই নির্দিষ্ট জায়গায় ভূত দেখবেনই। এটা বাস্তবের থেকেও বড় অবচেতন মনের ক্রিয়ায় হয়ে থাকে। ১৯৯৭ সালে, একটি প্রাচীন পরিত্যক্ত থিয়েটারে ২২ জন মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে বলা হয়েছিল থিয়েটারটির পুনর্নির্মাণ হবে। বাকি ১১ জনকে বলা হয়েছিল, সাবধানে থাকতে, কারণ এই পোড়ো থিয়েটারে এমন কিছূ ঘটনা ঘটে, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না। গভীর রাতে থিয়েটারের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জন ঘণ্টা চারেক কাটিয়েছিলেন। প্রথম ১১ জন বলেছেন, “বড্ড নোংরা, সাপখোপ থাকতে পারে, পুনর্নির্মাণ না করে নতুন বানানো উচিত, থিয়েটার পুনর্নির্মাণ করতে খরচ অনেক বেশি হবে, এখন এই নকশা চলে না”, ইত্যাদি ইত্যাদি। বাকি ১১ জনের মধ্যে বেশিরভাগই  বলেছিলেন, তাঁরা পায়ের আওয়াজ শুনেছেন, একজনের কথায়, “একটা হাওয়ার মতো কি যেন যাচ্ছিল আর আসছিল, একটা ছায়ামূর্তি পর্দা ফেলছিল, মাটির ধুলোয় প্রকাণ্ড পায়ের ছাপ”, ইত্যাদি দেখেছেন।

আমেরিকার এক হানা বাড়ি

এই পরীক্ষায় এটাই প্রমাণিত হয়, মানুষের মনের ক্ষমতা সীমাহীন। আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন এমন কাওকে ভূত দেখতে বাধ্য করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, ভূতে বিশ্বাস রাখেন এমন একজন মানুষের মস্তিষ্ক নিজের অজান্তেই ভূতের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম। সাধারণ ভূতের গল্পে বা ছবিতে হানাবাড়ি হিসেবে ভাঙাচোরা গাছপালায় ঢাকা পোড়ো বাড়ি, কবরস্থান, বাঁশবাগান, চার্চ-এর কথা বলা হয়। কারণ মানুষ ওখানে ভূত দেখতে চায়।

পুরোটাই মস্তিষ্কের কারসাজি

বিজ্ঞান প্রমাণ পেয়েছে , যাঁরা প্রচন্ড ভূতে বিশ্বাস করেন বা ভূত দেখেছেন বলেন উপর কাজ করে এক বিশেষ বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। সেটা কী? ডি পিজ্জাগালি  নামে এক বিজ্ঞানী ২০০০ সালে একটি পরীক্ষা করেন। তাতে তিনি দেখিয়েছিলেন, ভূতে বিশ্বাসীরা তাঁদের মস্তিষ্কের ডান গোলার্ধে নিজের উপর অতিরিক্ত আস্থা পোষণ করেন। অন্য অর্থে, ভূতে অবিশ্বাসীদের থেকে ভূতে বিশ্বাসীদের মস্তিষ্কের ডান দিকে বৈদ্যুতিক ক্রিয়া বেশি সক্রিয়। মনের ভূত দেখার অদম্য বাসনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সামনের দেখা স্বাভাবিক জিনিসকে ভূতুড়ে করে তোলে মস্তিস্কের ডান গোলার্ধের  এই অতি সক্রিয় তরঙ্গগুলি। তাই যাঁরা ভূত দেখবেন বলে ব্রেন ওয়ার্ক করে রাখেন তাঁদের মস্তিষ্কই তাঁদের ভূত দেখায়।

মানুষ একা থাকতে ভয় পান, তাই একাকী মানুষ  ভূত দেখেন
যে মানুষরা ভূত দেখেছেন বলেন, খেয়াল করবেন সবাই একা একা ভূত দেখেছেন। তাঁর দেখা ঘটনার সাক্ষী পাবেন না।
সকালের বনগাঁ লোকালে কেউ ভূত দেখেছেন? কিন্তু রাত ১০.০৫ এর বনগাঁ লোকালের ভূতের গল্প বিখ্যাত। যখন মানুষ নির্জন, অচেনা  জায়গায় থাকেন, তখন তখন তাঁরা ভূত দেখেন। রাতের আঁধারে আমাদের একাকীত্ব ও একাকীত্বের ভয় মনে অন্য কারও উপস্থিতি জানান দেয়। ঘাড়ে কারও গরম নিঃশ্বাস, পার্কের গাছটার নড়ে ওঠা, ছাদে কারও পায়ের আওয়াজ টের পাই। এভাবেই আমরা আমাদের মনগড়া ভুতুড়ে পরিবেশ নিজেরাই তৈরি করে নিই।
তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র (Electromagnetic Fields)

জানেন কি, ভূত দেখার পিছনে রয়েছে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের কারসাজি? যে তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র আমাদের ভূত দেখায় বা ভূতের সঙ্গে পরিচয় করায় তার নাম ইনফ্রাসাউন্ড। আমরা যে কম্পাঙ্কের শব্দ শুনে অভ্যস্ত, এটি তার চেয়ে নিচু কম্পাঙ্কের শব্দ। ইনফ্রাসাউন্ডের সঙ্গে ভূতের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক ভাবে গবেষণা করেছেন কানাডার নিউরোসায়েন্টিস্ট ডঃ পারসিঙ্গার এবং তাঁর লরেনটিয়ান ইউনিভার্সিটির টিম।
তাঁরা একটি যন্ত্র তৈরি করেন যার নাম গড হেলমেট।  ভূত বিশ্বাসীরা এই হেলমেট  মাথায় পরলে, এটি চৌম্বকীয় সিগন্যাল ছুড়ে তাঁদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে উদ্দীপ্ত করে। তাঁরা অবাস্তব অকল্পনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। দেখা গেছে, নির্জন জায়গায় যতক্ষণ ভূত বিশ্বাসীরা হেলমেটটি পরে ছিলেন, সেই সময়ের মধ্যে তাঁদের অনেকে ভূত দেখেছেন বা ভূতের ছায়া দেখেছেন। এমনকী প্রভু যিশুকেও দেখেছেন। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সত্যিই কানাডার কিছূ ভুতুড়ে জায়গা বা বাড়ি যেমন, সাউথ ব্রিজ ভল্ট, হ্যাম্পটন কোর্ট প্রভৃতি জায়গায় এরকম শক্তিশালী অথচ অনিয়মিত চৌম্বকীয় ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই ভূতে বিশ্বাসী মানুষ সেখানে ভূত দেখেছেন।যাঁরা বলেন ভূত দেখেছেন, এঁদের সবাই মিথ্যেবাদী নন, একদম বাস্তবসম্মত ভাবেই বিজ্ঞান বলে দিয়েছে তাঁরা ভূত দেখেছেন, তবে একটু অন্যভাবে। হ্যাঁ সত্যিই ভূতেরা পৃথিবীতে আছে। তবে তেনারা প্রকৃতিতে বা পোড়ো বাড়িতে বাস করেন না। তেনাদের বাস কেবল সেই সব মানুষের মনে, যাঁরা ভূত দেখেন বা ভূত দেখতে চান।

Shares

Comments are closed.