রবিবার, আগস্ট ১৮

সৌদি আরবে মুণ্ডচ্ছেদের অপেক্ষায় ‘আরব বসন্তের ক্ষুদিরাম’ ১৮ বছরের মুর্তাজা

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯০৮ সালে ফাঁসি হওয়ার সময় মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর, ৭ মাস এবং ১১ দিন। সেই দিন, ১১ আগস্ট সারা ভারত ফেটে পড়েছিল ক্ষোভে। দুঃখে শোকে বাড়িতে বাড়িতে পালিত হয়েছিল অরন্ধন। সেই ঘটনার ১১১ বছর পর সৌদি আরবে মুণ্ডচ্ছেদ হতে চলেছে কিশোর মুর্তাজা কুরেইরিসের। তার ১০ বছর বয়েসে করা অপরাধের জন্য।

সারা বিশ্ব উত্তাল হলেও আশ্চর্যজনক ভাবেই শান্ত সৌদি রাজতন্ত্র। যে রাজতন্ত্র উপড়ে ফেলার ডাক দিয়েছিল এক কিশোর। আরব কাঁপিয়ে দেওয়া বসন্ত বিপ্লবের অন্যতম মুখ মুর্তাজা কুরেইরিস। যাকে আমরা হয়তো কেউ চিনি না।মুণ্ডচ্ছেদের আগে তাকে বাঁচাবার জন্য ঝাঁপিয়েছে বিশ্ব, তার জন্য কাঁদছে আরব মায়েরা।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে সৌদি আরব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে তৃতীয় স্থানে আছে। বাকি দেশগুলি হল চিন, ইরান, ভিয়েতনাম ও ইরাক। সৌদি আরবে শুধু গত বছর ১৪৯ জনকে মুণ্ডচ্ছেদ কর হয়েছে।

এই বছরে এখনও পর্যন্ত ১০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। এর মধ্যে শুধু এপ্রিলেই ৩৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু মানুষের দেহ প্রকাশ্য রাস্তায় টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের জন্য।

 ২০১০, আরব দুনিয়ায় বসন্ত এসেছিল ডিসেম্বরেই

আরব বসন্তে উত্তাল হয়েছিল আরব দুনিয়া। রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান চেয়ে রাস্তায় নেমেছিল আরব দুনিয়ার লক্ষ লক্ষ শোষিত ও বঞ্চিত মানুষ। গণজাগরণের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল একের পর এক আরব দেশ। নিপীড়ন, বঞ্চনা, বেকারত্ব,  দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র আনতে চেয়েছিলেন আরব দুনিয়ার সাধারণ মানুষ। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আরব বসন্তের মশাল জ্বালেন তিউনিসিয়ার ফেরিওয়ালা বাওয়াজিজি।

বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে আরব ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। এদের মধ্যে আছে তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরিন,  সিরিয়া, ইরান, জর্ডন, আলজেরিয়া, মরক্কো, ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সোমালিয়া, সুদান এমনকি সৌদি আরবও। আরব বসন্তের ঝড়ে সিংহাসনচ্যুত হন তিউনিশিয়ার স্বৈরশাসক জয়নাল আবেদিন বেন আলি, মিশরের হোসিনি মুবারক, ইয়েমেনের আলি আবদুল্লাহ সালেহ, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি সহ বিভিন্ন দেশের একনায়করা।

ঢেউ আসে সৌদিতেও

সৌদি রাজতন্ত্রের অবসান চেয়ে রাস্তায় নামেন সৌদির সাধারণ মানুষ। তৎকালীন সৌদি আরবের রাজা ফাহাদ নির্মম দমন পীড়ন চালান তাঁরই দেশের নাগরিকদের ওপর। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলি কুরেইরিস নামে এক ১৭ বছরের কিশোর। ওই বয়েসেই নেতৃত্ব দেয় জনগণকে। রাতের অন্ধকারে পোস্টার মারে সৌদি আরবের প্রশাসনিক ভবনগুলিতে। ঘরে বসে পোস্টার লিখতে সাহায্য করে তার ১০ বছর বয়সী ভাই মুর্তাজা।

ছবির মাঝখানে কালো গেঞ্জি পরা মুর্তাজা

একদিন, মুর্তাজার দাদা আলিকে বিক্ষোভরত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে সৌদি পুলিশ। আলির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শেষ হতেই, ক্ষোভে দুঃখে প্রতিবাদে নেমে পড়েছিল ১০ বছরের বালক মুর্তাজা। তিরিশ জন বালকের একটি  সাইকেল বাহিনী নিয়ে। মুর্তাজার তোলা ‘রাজতন্ত্র নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল এলাকা।

সেদিন থেকেই সৌদি প্রশাসনের দু’চোখের বিষ হয়ে উঠেছিল বালক মুর্তাজা। ওইটুকু বয়েসে সে সঙ্গীদের বোঝাত যতদিন রাজতন্ত্র থাকবে ততদিন সৌদি আরবের জনসাধারণের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। তার কথায় অনুপ্রাণিত হতে থাকে সমবয়সীরা, তাদের থেকে অনুপ্রাণিত হতে থেকে তাদের পরিবারের সদস্যরা। বিষয়টির ওপর নজর রেখে চলছিল সৌদি গোয়েন্দারা।

ধরা পড়ে যায় মুর্তাজা

মুর্তাজাকে পৃথিবী থেকে সরানোর ছক কষা হয়। মুর্তাজার পরিবার সৌদি আরব ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।  ২০১৪ সালে লুকিয়ে বাহরিন পালিয়ে যাওয়ার পথে সৌদি সীমান্তে গ্রেফতার করা হয় ১৩ বছর বয়সী মুর্তাজাকে। রাষ্ট্রদোহিতা, দাদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত থাকা, পুলিশ থানায় মলোটভ ককটেল বোমা ছুঁড়ে মারা ও সন্ত্রাসবাদী সংঘঠনে যোগ দেওয়ার মতো মারাত্মক সব অভিযোগ আনা হয় মাত্র ১৩ বছর বয়সী একজন বালকের বিরুদ্ধে।

এর পর মুর্তাজাকে রাখা হয় দাম্মামের জুভেনাইল ডিটেনশন সেন্টারে। বিচার শুরু হতে সময় লাগল ৪বছর। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে মুর্তাজার বিচার শুরু হওয়ার আগে তাকে আইনজীবী নিতেও দেওয়া হয়নি। এই চার বছর কিশোর মুর্তাজাকে জেলের একটি সেলে একলা রাখা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন মুর্তাজার ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়েছে।অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তদন্তকারী দল মুর্তজাকে বলেছিল, সে দোষ স্বীকার করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এই ভাবে তাকে তার উপর চাপিয়ে দেওয়া দোষ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

বাঁচানো যাবে কি মুর্তাজাকে!

বিচারের নামে প্রহসন ঘটিয়ে গত বছরের অগাস্ট মাসে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি আরব। মুর্তাজাকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ সারা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলি। সৌদি আরবের কাছে তারা আবেদন জানিয়েছে মুর্তাজা কুরেইরিসের মৃত্যুদণ্ড রদ করার জন্য। কিন্তু সত্যিই কি মুক্তি পাবে আরব বসন্তের অন্যতম মুখ ডেথ সেল-এ দিন গুণতে থাকা মুর্তাজা কুরেইরিস!

বিশ্বের আবেদনে আজ পর্যন্ত সাড়া দেয়নি সৌদি আরব। তাই আশঙ্কিত বিশ্বের মানবাধিকার সংঘঠনগুলি। তারা জানে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রোহ দমনের জন্য সৌদির প্রধান হাতিয়ার মৃত্যুদণ্ড। সে মানুষটি যে বয়েসেরই হোক না কেন। তবুও চেষ্টা চলছে সর্বস্তরে। সেই কিশোরকে বাঁচাবার জন্য, মাত্র ১০ বছর বয়সে যে হাতে তুলে নিতে চেয়েছিল গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা। এবং যে চলে গেলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে বিশ্বের।

Comments are closed.