বৃহস্পতিবার, জুন ২০

মিশরের ষষ্ঠী বাঙালির জামাই

প্রদীপ দে সরকার

ইজিপ্টের ফুটবলার মহম্মদ সালাহ্‌ যদি বাঙালির জামাই হতেন তবে এই বিশ্বকাপের মাঝেই তিনি হয়ত একবেলার জন্যে হলেও কলকাতায় ঢুঁ মারতেন। তারপর ধুতি পাঞ্জাবি পড়ে একহাতে দই-মিষ্টির হাঁড়ি আর অন্য হাতে জোড়া ইলিশ দোলাতে দোলাতে শ্বশুরবাড়ি যেতেন। এটা পড়ে যদি ভাবেন যে রোনাল্ডো, মেসি, নেমারের মত বড় বড় প্লেয়ার থাকতে মহম্মদ সালাহ্‌ কেন, তাহলে বলব তিনি মিশরীয় বলে। বাঙালি বাদে এ দুনিয়ার আর কোনও জাতি যদি জামাইষষ্ঠীর ভাগীদার হওয়ার দাবিদার হয় তবে তারা অবশ্যই মিশরীয়। ব্যাপারটা বুঝি ঘেঁটে গেল? আরে বাবা রুমাল দুজনার হাতেই ছিল। বাঙালি সে রুমালকে বেড়াল বানিয়েছে মিশরীয়রা পারে নি। তাই বাঙালি জামাইয়ের জামাইষষ্ঠী আছে, মিশরের জামাইয়ের নেই। কিন্তু থাকতে তো পারত, না কি? আর থাকলে মহম্মদ সালাহ্‌ও জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন পেতেন।

মিশর নিয়ে পরে ভাবা যাবে, জামাইষষ্ঠীতেও একটু পরে আসা যাবে। আপাতত আসুন এ বাঙলার ষষ্ঠী পুজো নিয়ে একটু আলোচনা করি। দেব দেবী তৈরিতে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। মানুষ, পশু, দেব-দেবী সব মিলেমিশে একাকার। সবাই যেন আমাদের পরিবারেরই সদস্য। কখনও দেবী একেবারে চাষীর ঘরের কিশোরী মেয়েটির মত পুকুরপাড়ে কদম তলায় বসে রাখালের বাঁশি শোনে। কখনও বা সে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে ভেলায় স্বামীর দেহ নিয়ে পাড়ি দেয় স্বর্গে। কিংবা বাড়ির বিবাহিত মেয়েটি, যে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বছরে একবার বাপের বাড়ি আসে, চার-পাঁচদিন বাপের বাড়ির ভাল মন্দ খেয়ে দেয়ে আরাম করে আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যায়। ষষ্ঠীবুড়িও তেমনই এক ঘরোয়া দেবী। ঠিক যেন প্রৌঢ়া শাশুড়ি মা, বাড়ির বাচ্চাদের প্রিয় ঠাকুমা, যিনি নাতি পুঁতিদের বকাবকি করলে, মারলে রেগে যান আবার বাড়ির শিশুদের যে ভালবাসে তাকে খাতির করেন। শিশুদের রক্ষার্থে এবং নূতন জন্মের আশীর্বাদ দিতেই এই দেবীর জন্ম।

দেবীর গায়ের রঙ একেবারে দুধে আলতা, মুখখানা চাঁদপানা, উন্নত বক্ষ, পরনে বাহারি শাড়ি, কোলে-কাঁখে হাফ-ডজন বাচ্চা আর পায়ের গোড়ার মিঁউমিঁউ করছে একটা বেড়াল। এই বেড়ালটাই হল গিয়ে মিসিং-লিঙ্ক। আমাদের মিশর যাত্রার ভিসা।

তবে মিশর যাওয়ার আগে চলুন একটু পুঁথি ঘাঁটি। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ষষ্ঠীদেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে রাজা প্রিয়ব্রত ষষ্ঠীদেবীর পুজো করে তাঁর মৃত সন্তানদের ফিরে পান। স্কন্দপুরাণেও ষষ্ঠীদেবীর উল্লেখ আছে। কবি মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ষষ্ঠীবুড়ির কথা পাওয়া যাচ্ছে আর কবি কৃষ্ণরাম দাস তো ষষ্ঠীদেবীকে নিয়ে ষষ্ঠীমঙ্গল কাব্যই লিখে ফেলেছেন। তা মোটামুটি যা জানা যাচ্ছে তাতে বাংলায় এ দেবীর বয়স এক হাজার থেকে বারোশ বছর। কিন্তু বেড়াল ধরে এগোলে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের আর এক দেবীকে পাওয়া যাচ্ছে। দেবীর নাম ব্যাস্টেট, সাকিন মিশর।

ব্যাস্টেট আর ষষ্ঠী এক কিনা সেসব বিচার করুন গবেষকরা। আমরা বরং হাতে তাস পেয়েছি, রঙ মিলান্তি খেলি। মিশরে ব্যাস্টেট ছিলেন একজন যুদ্ধের দেবী। এদিকে ষষ্ঠীদেবীও দেবসেনা, ষড়ানন কার্তিক তাঁর স্বামী। দুই দেবীরই বাহন কিংবা পোষ্য যা-ই বলুন তা হল বেড়াল। দুজনাই প্রজননের দেবী, শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী। ফসলেরও রক্ষা করেন এঁরা। মজার ব্যাপার দেখুন শিশু থেকে চলে এল ফসল। না্রী, ভূমি, সন্তান উৎপাদন, কৃষি সব মিলেমিশে কেমন একাকার। বেড়াল ইঁদুর খেয়ে জমির ফসল বাঁচাবে, সাপ তাড়িয়ে শিশুকে সুরক্ষা দেবে। আবার একসময় মনে করা হত বেড়ালের দুধ স্ত্রীরোগ নিরাময় করে। এই গোটা ভাবনাটাতেই বাংলা আর মিশর কোথায় যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফেলল। তবে কি মিশরের ব্যাস্টেট বাংলার ষষ্ঠী হয়ে পুনর্জন্ম পেলেন?

মিশর ব্যাস্টেটকে খুব তাড়াতাড়িই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু মিশরে ভুলে যাওয়া দেবী যেন প্রায় একইরকমের সমস্ত দোষগুণ নিয়ে প্রায় তিন হাজার বছর পর ফুঁড়ে বেরলেন বাংলায়। এমনকি বেড়ালটাকেও নিয়ে এলেন। বাংলা উড়িষ্যার একটা বড় অঞ্চল জুড়ে প্রতি মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে ষষ্ঠীদেবীর পুজো শুরু হল আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে। বৈশাখে ধূলাষষ্ঠী, জ্যৈষ্ঠে অরণ্যষষ্ঠী, আষাঢ়ে কোড়াষষ্ঠী, শ্রাবণে নোটনষষ্ঠী, ভাদ্রে মন্থনষষ্ঠী, আশ্বিনে দুর্গাষষ্ঠী, কার্তিকে গোটাষষ্ঠী, অঘ্রাণে মূলাষষ্ঠী, পৌষে পাটাইষষ্ঠী, মাঘে শীতলাষষ্ঠী, ফাল্গুনে অশোকষষ্ঠী এবং চৈত্রে নীলষষ্ঠী। প্রতিমাসের এই ষষ্ঠী ব্রতগুলি গ্রামবাংলায় আজও যথেষ্ট প্রচলিত। সন্তান কামনায় কিংবা সন্তানের স্বাস্থ্য কামনায় মায়েরা এই ব্রত রাখত আর ব্রত রাখা হত কৃষিকার্যে সাফল্য কামনায়। আজও বহু গ্রামে ভাদ্র মাসে কৃষিজমিতে গারবষষ্ঠী পূজা হয়। কিন্তু এসবের মধ্যে কোথাও জামাই টামাইয়ের গল্প ছিল না।

ষষ্ঠীপুজোয় জামাই ঢুকল অনেক পরে। আর এখানেই বাংলা মিশরকে ছাপিয়ে গেল। মিশর যা ভাবতেও পারে নি সেটা বাংলা করে দেখালো। জ্যৈষ্ঠের অরণ্যষষ্ঠীকে পরবর্তীকালে জামাইষষ্ঠী বানিয়ে ফেলল। জামাইষষ্ঠীর উল্লেখ কিন্তু খুব প্রাচীন গ্রন্থে নেই। দীনবন্ধু মিত্রের রচনায় জামাইষষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। ইতিহাসবিদেরা এ বিষয়ে বিশদে বলতে পারেন। তবে যেটুকু জানা যাচ্ছে তাতে পরিষ্কার যে কলকাতার বাবু কালচার জামাইকে জামাইবাবু বানিয়েছে এবং একইসঙ্গে জামাইষষ্ঠীর প্রচলন করেছে। পণ প্রথা, সতীদাহ প্রথা, বধুনির্যাতন ইত্যাদিতে জর্জরিত বাঙালি সমাজ বোধহয় শ্বশুড়বাড়িতে জামাই আদরের বন্দোবস্ত করে সেই ক্ষতে সামান্য প্রলেপ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল। জামাইষষ্ঠী তাই মূলত নাগরিক উৎসব। নাগরিক ভাবনাগুলি যদিও প্রায় সর্বক্ষেত্রেই গ্রামীন ভাবনা কিংবা আচারকে প্রভাবিত করে তবুও খোঁজ করলে দেখা যাচ্ছে আজও গ্রাম বাংলার বহু অঞ্চলেই অরণ্যষষ্ঠীতে সন্তানাদির দীর্ঘ জীবন কামনায় ব্রত রাখা হয়। সেখানে সন্তানতূল্য জামাই থাকলে ভাল, না থাকলেও বিশেষ কিছু হেরফের হয় না।

তবে আপনি যদি জামাই হন তাহলে এত সব ভেবে লাভ নেই। ইংরেজি ক্যালেণ্ডারে হ্যাপি মাদার্স ডে, ফাদার্স ডে, লাভার্স ডে সব পাবেন কিন্তু জামাইষষ্ঠী পাবেন না। এ আমাদের আদি অকৃত্রিম বাঙালি কালচার। গোবলয় আর বলিউডের চরম সাংস্কৃতিক অত্যাচারের পরেও এই আচার আর কতদিন টিকে থাকে ঠিক নেই। ভবিষ্যতে হয়ত স্কাইপে কিংবা ভিডিও কলে শাশুড়ি জামাইকে আশীর্বাদ করবেন। তালপাখার বাতাস খেতে খেতে আম-কাঁঠালের গন্ধ শুঁকতে কেমন লাগে সে গল্প বলার জন্য লোক খুঁজতে হবে। মা ষষ্ঠীর কৃপায় যদি এক গণ্ডা ছেলেমেয়ে নাতি পুঁতি বাগাতে পারেন তবে বৃদ্ধ বয়সে তাদেরকে জামাইষষ্ঠীর গল্প শোনাতে পারবেন আপনিই। তাই যদি জামাই হন আর নেমন্তন্ন পেয়ে থাকেন তাহলে অতসব না ভেবে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্যান্টোপ্রাজল কিংবা ওমনিপ্রাজল খেয়ে বেড়িয়ে পড়ুন। আর বেরনোর আগে শালাবাবুকে ফোন করে বলুন এমন ছাতি ফাটা গরমে ফ্রিজে যেন চিলড বিয়ার মজুত রাখে। বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখুন। হ্যাপি জামাই ডে!

পুনশ্চ : অবাক কাণ্ড! বেড়াল নাকি বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ বলে  দিচ্ছে। মা ষষ্ঠী কি তবে বিশ্বকাপেও পৌঁছে গেলেন? না কি ব্যাস্টেট? মহাম্মদ সালাহ্‌র জামাইষষ্ঠীটা পাওনা আছে যে।

(প্রদীপ দে সরকারের লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, বর্তমান রবিবার, উনিশ-কুড়ি, সুখী গৃহকোণ, কিশোর ভারতী, আনন্দমেলা, তথ্যকেন্দ্র, শুকতারা ইত্যাদি পত্র-পত্রিকায় এবং বাংলালাইভ ডট কম ওয়েব ম্যাগাজিনে।)

Leave A Reply