আজও আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, সাদ্দাম হোসেনের লেখা একমাত্র প্রেমের উপন্যাসটি

মেসোপটেমিয়ান আরবি ভাষায় লেখা উপন্যাসটির নাম 'জাবিবা অ্যান্ড দ্য কিং'। উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল সাদ্দামের জন্মস্থান তিকরিতের পটভূমিকায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    সাদ্দাম হোসেন নামটি শোনেননি এমন লোক এই পৃথিবীতে খুবই কম আছেন। ইরাকের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক ছিলেন, সাদ্দাম হোসেন আব্দুল মজিদ আল-তিকরিতি। প্রায় চার দশক ধরে ইরাক শাসন করেছিলেন। আমেরিকার চিরশত্রু সাদ্দাম, কারও কাছে ছিলেন মসিহা। আবার কেউ বিশ্বাস করেন তাঁর নামের সাথে জড়িয়ে থাকা নৃশংস গণহত্যার কলঙ্ককে।

    সেই সাদ্দাম হোসেন লিখেছিলেন, অসামান্য একটি প্রেমের উপন্যাস। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা না করলেও, ঘটনাটি কিন্তু সত্যি। আরব্য রজনীর মতোই রহস্য রোমাঞ্চে ভরপুর ছিল জমজমাট উপন্যাসটি। মেসোপটেমিয়ান আরবি ভাষায় লেখা উপন্যাসটির নাম ‘জাবিবা অ্যান্ড দ্য কিং’। উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল সাদ্দামের জন্মস্থান তিকরিতের পটভূমিকায়।

    প্রাক্তন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন
    এক মর্মস্পর্শী প্রেমের মর্মস্পর্শী উপাখ্যান

    তিকরিত শহরে বাস করতেন এক অসাধারণ রুপসী। তাঁর নাম ছিল জাবিবাকে। জাবিবা ছিলেন বিবাহিতা। কিন্তু জাবিবার বিবাহিত জীবন সুখের ছিল না। বাল্যকালে জাবিবার বিয়ে হয়েছিল এক নিষ্ঠুর মানুষের সঙ্গে। যিনি জাবিবার ওপর অমানুষিক অত্যাচার করতেন। যন্ত্রণাদায়ক শারীরিক সম্পর্ক ও অর্থ ছাড়া কিছু বুঝতেন না জাবিবার স্বামী।

    তিকরিত শহরেই ছিল আরবের প্রাসাদ। ‘আরব’ ছিলেন ইরাকের স্বাধীনচেতা সুলতান। বসন্তের এক বিকেলে সুলতান ‘আরব’ তাঁর দুধসাদা আরবী ঘোড়ায় চড়ে, দেহরক্ষী ছাড়াই শহর থেকে কিছু দূরে থাকা মরুভূমিতে গিয়েছিলেন বেড়াতে। সেখানে একটি পাথরের ওপর বসে থাকতে দেখেছিলেন রুপসী জাবিবাকে। পড়ন্ত সূর্য্যের দিকে তাকিয়ে ছিলেন জাবিবা। শেষ সূর্য্যের আবীর মাখা জাবিবাকে, মানুষ বলে মনে হয়নি যুবক সুলতান আরবের। মনে হয়েছিল বেহেস্ত থেকে নেমে আসা কোনও পরী। কাছে গিয়ে ঘোড়া থামিয়েছিলেন সুলতান। জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কেন এখানে একা বসে আছে!

    সাদ্দাম হোসেনের লেখা বইটি

    জাবিবা উত্তর দিয়েছিলেন,”মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরব বলে।” আরব বুঝতে পেরেছিলেন অসহায় নারীটি আত্মহত্যা করতে চলেছে। জাবিবার হাত চেপে ধরেছিলেন আরব। জাবিবার পোশাকের ভেতর লুকিয়ে রাখা শাণিত ছুরিটি কেড়ে নিয়েছিলেন। তারপর তাঁর নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন আরব। জাবিবার হাত ধরে বলেছিলেন,”আমি তোমার পাশে আছি।” আরবের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকিয়ে বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন জাবিবা। তারপর আরবকে বলেছিলেন তাঁর দুঃখের কাহিনী।

    সুলতান লক্ষ্য করেছিলেন, স্বামী ধনী হলেও জাবিবার পোশাক ছিল অতি সাধারণ। সারা গায়ে ছিল অসংখ্য কালশিটে, স্বামীর অত্যাচারের চিনহ। সুলতান আরব সেদিন তাঁর সঙ্গে থাকা কিছু মোহর দিয়েছিলেন জাবিবাকে। বলেছিলেন স্বামীর নজর থেকে লুকিয়ে রেখে খরচ করতে। কোনও অসুবিধা হলে তাঁকে জানাতে। ধীরে ধীরে অবিবাহিত যুবক আরবের সঙ্গে বিবাহিতা জাবিবার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, বন্ধুত্ব পরিণত হয়েছিল ভালবাসায়। কিন্তু দুজনেই জানতেন তাঁদের প্রেমকে সমাজ মেনে নেবে না। তাঁদের প্রেম অবৈধ। তাই তাঁরা ছদ্মবেশ ধরে লুকিয়ে দেখা করতেন শহরের বাইরে।

    কখনও রাতের অন্ধকারের নিজেকে ঢেকে জাবিবা যেতেন সুলতান আরবের প্রাসাদে। আরব ও জাবিবার মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হলেও, জাবিবার সঙ্গে কথা বলতেই বেশি ভালোবাসতেন ‘আরব’। কারণ সৌন্দর্যের সাথে সাথে জাবিবার মেধাও মুগ্ধ করেছিল আরবকে। জাবিবা খুব সুন্দর কথা বলতে পারতেন। কখনও ধর্ম নিয়ে, কখনও দেশের মানুষের দূর্দশা নিয়ে, কখনও কী ভাবেও দেশ চালাতে হয়, এসব নিয়ে সুলতান আরব কথা বলতেন জাবিবার সঙ্গে। তারপর আদরে সোহাগে কেটে যেত বাকি রাত। মরুভূমির প্রাণহীন রাত হয়ে উঠত মায়াবী।

    কিন্তু আরব জাবিবার গোপন সম্পর্কের কথা জেনে ফেলেছিলেন জাবিবার স্বামী। কিন্তু ইরাকের সুলতানের বিরুদ্ধে একা লড়াই করার ক্ষমতা জাবিবার স্বামীর ছিল না। তাই আরব আর জাবিবাকে খতম করার জন্য জাবিবার স্বামী জোট বেঁধেছিলেন আরবের শত্রুদের সঙ্গে। সুলতান ও জাবিবার অবৈধ প্রেমের কথা জানিয়েছিলেন, আরবের প্রধান প্রতিপক্ষকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমির হেজকেল, আমির শামিল ও আমির নূরি চালাবি। যাঁরা বহুদিন ধরেই আরবকে হটিয়ে ইরাকের সুলতানের সিংহাসন দখল করতে চাইছিলেন।

    ১৭ই জানুয়ারি রাতে সুলতানের প্রাসাদ থেকে ফেরার পথে জাবিবাকে মরুভূমিতে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছিল। কারন, আরবের প্রতিপক্ষ চেয়েছিল জাবিবাকে বদনাম করে দিতে পারলে, সুলতানের সঙ্গে জাবিবার সম্পর্ক ছিন্ন হবে। ভেঙে পড়বেন আরব।  কিন্তু সুলতান আরব, জাবিবাকে মনেপ্রাণে ভালোবেসে ফেলেছিলেন, তাই জাবিবার এই লাঞ্ছনার পরেও তিনি জাবিবার পাশেই ছিলেন।

    জাবিবার মুখে তাঁর লাঞ্ছনার ঘটনাটি জেনে, আরব যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন জাবিবার স্বামীর বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে জাবিবার স্বামীর পক্ষ নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেছিল আরবের শত্রুপক্ষের বিদেশী বন্ধুরা। শুরু হয়েছিল রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধ। জাবিবা নিজে আরবের একটি সৈন্যদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আরবের বারণ সত্বেও। হয়ত তা ছিল নিয়তির বিধান। কয়েক হাজার সশস্ত্র ঘোড়সওয়ারের বিরুদ্ধে নিজের বাহিনী নিয়ে লড়তে লড়তে যুদ্ধের ময়দানেই প্রাণ হারিয়েছিলেন আরবের প্রেয়সী জাবিবা।

    জাবিবার মৃত্যুর খবর পেয়ে উন্মত্ত আরব সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন প্রতিপক্ষকে। আরবের হাতে নিহত হয়েছিলেন জাবিবার স্বামী। আরবের হাতে ধ্বংস হয়েছিল সম্পূর্ণ প্রতিপক্ষ। কিন্তু, সুলতান আরব যুদ্ধে গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। সুযোগ বুঝে আরবের পক্ষে থাকা আমিররা, আহত আরবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তাঁরা আরবকে বলেছিলেন, ইরাক বিদেশীদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছে আরবের জন্যেই। কিন্তু দেশ এখন আরবকে আর সিংহাসনে দেখতে চায় না। ইরাক চালাবে জনগণ।

    শয্যাশায়ী আরবকে একটি দুর্গে বন্দী করে ফেলা হয়েছিল। প্রিয় মানুষের তঞ্চকতায় ভেঙে পড়েছিলেন সুলতান আরব। সবার আড়ালে, ক্ষতবিক্ষত দেহ ও মন নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। মৃত্যু যখন আরবের চোখের পাতাদুটি ক্রমশ ভারী করে দিচ্ছিল, ঝাপসা হয়ে আসছিল দৃষ্টি, সেই মুহুর্তেও তাঁর কানে ভেসে আসছিল, জাবিবার কন্ঠস্বর, “আমার হাত কোনও দিন ছেড়ো না প্রিয়তম।”। হাত ছাড়েননি আরব, প্রাণহীন দেহটি ফেলে রেখে, উড়ে গিয়েছিলেন জাবিবার হাত ধরার জন্য।

    উপন্যাসটি আসলে ছিল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস

    হ্যাঁ,পাঠক। উপন্যাসটির মাধ্যমে আসলে সাদ্দাম হোসেন বলতে চেয়েছিলেন তাঁর জীবনকাব্য। ইরাকের জনগণ (জাবিবা) ভালোবাসতেন সাদ্দামকে (আরব)। আমেরিকা (জাবিবার স্বামী ) ও তার সঙ্গীরা মিলে ইরাকের জনগণকে আক্রমণ (ধর্ষণ) করেছিল। ইজরায়েল (আমির হেজকেল),ইহুদি ও বণিক সম্প্রদায় (আমির শামিল) ও নূরি চালাবি (ইরাকি জাতীয় কংগ্রেসের নেতা আহমেদ চালাবি) এই ধর্ষণে আমেরিকাকে সাহায্য করেছিল।

    কিন্তু তবুও সাদ্দাম (আরব) ছিলেন ইরাকের জনগণের (জাবিবার) পাশে। সাদ্দাম ও ইরাকি জনগণ সম্মিলিতভাবে লড়াই শুরু করেছিলেন আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে প্রচুর ইরাকি (জাবিবা) মারা গিয়েছিলেন। যুদ্ধে আমেরিকা (জাবিবার স্বামী)পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু সাদ্দামের সঙ্গে বিশ্বাসসঘাতকতা করেছিলেন ইরাকেরই কিছু মানুষ। ধরা পড়েছিলেন সাদ্দাম। বন্দী অবস্থায় মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মৃত্যু মুহুর্তেও সাদ্দামের মনে পড়ছিল তাঁর প্রিয় দেশবাসীর (জাবিবা)কথা।

    বন্দী অবস্থায় সাদ্দাম হোসেন।

    সাদ্দামকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ‘জাবিবা অ্যান্ড দ্য কিং’ উপন্যাসটি ইরাকে প্রকাশিত হয়ে ছিল ২০০০ সালে। অর্থাৎ সাদ্দামের মৃত্যুর ছ’বছর আগে। নিজের মর্মান্তিক পরিণতি কি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন সাদ্দাম! তাই কি লিখে রেখে গিয়েছিলেন এই অসামান্য উপন্যাসটি! যা যুগ যুগ ধরে ইরাকের মানুষকে আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্দীপ্ত করবে।

    মনে প্রশ্ন জাগতে পারে,উপন্যাসটি যে রাজনৈতিক তার প্রমাণ কী! সাদ্দাম হোসেন কি বলে গিয়েছিলেন, এটি একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। না সাদ্দাম হোসেন বলে জাননি ঠিকই। কিন্তু ১৬০ পাতার বইটিতে একটিমাত্র তারিখ উল্লেখ করেছিলেন সাদ্দাম। সেটি হল ১৭ই জানুয়ারি। ১৭ই জানুয়ারি রাতে জাবিবাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ১৭ই জানুয়ারি রাতেই কিন্তু ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকা শুরু করেছিল ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’। সেই রাতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল ইতিহাস বিখ্যাত উপসাগরীয় যুদ্ধ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More