রে টমলিনসন নয়! শিভা আয়াদুরাই আবিষ্কার করেছিলেন ই-মেল! ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল কৃতিত্ব!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    সালটা ছিল ১৯৭৮,  নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির Courant Institute of Mathematical Sciences-এ গ্রীষ্মের ছুটিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখছিল তামিলনাড়ুর রাজাপালায়াম থেকে বাবা মায়ের সঙ্গে ৭ বছর আগে আমেরিকা আসা এক কিশোর। নাম শিভা আয়াদুরাই। বয়স সবে ১৪। পড়ে নিউজার্সির লিভিংস্টোন হাইস্কুলে।

    একই সঙ্গে সেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছিল  University of Medicine and Dentistry -এর অফিসে, যেখানে তাঁর মা চাকরি করতেন করতেন। মায়ের অফিসে গিয়ে কিশোর শিভা দেখেছিল, কাগজের চিঠি নিয়ে লোক ছুটছে একঘর থেকে অন্য ঘর, এক অফিস থেকে অন্য অফিস, এই বাড়ির সাততলা থেকে ওই বাড়ির পাঁচতলা। সঙ্গে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথির ফাইল। মানুষ দৌড়াচ্ছে চিঠির বোঝা নিয়ে।

    University of Medicine and Dentistry

    কিশোর শিভা ভেবেছিল, এই পরিশ্রম যদি কমানো যেত। যাঁকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে তিনি যদি সঙ্গে সঙ্গে সিটে বসেই পেয়ে যেতেন। তাহলে কাগজের চিঠি ও ফাইল বহনকারী মানুষগুলির এত কষ্ট হত না। তাছাড়া চিঠির গোপনীয়তা বজায় থাকত। কিশোর শিভার মাথায় এসেছিল এমন একটি সফটওয়্যার তৈরির চিন্তা, যেটি তৈরি করতে পারলে কাউকে আর রানার হয়ে দৌড়তে হবে না। চিঠি সুরক্ষিত ভাবে ও সঙ্গে সঙ্গে প্রাপকের কাছে পৌঁছাবে।

    অল্পদিনের মধ্যেই কিশোর শিভা তৈরি করে ফেলেছিল নিজস্ব সফটওয়্যার, যার সাহায্যে এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে দ্রুত চিঠি ও ফাইল পাঠান যাবে। আবিষ্কারের চার বছর পর, ১৯৮২ সালে শিভা আয়াদুরাই তাঁর সফটওয়্যারের কপিরাইট পেলেন, যার নাম “EMAIL“।  শিভার বয়স তখন মাত্র ১৯।

    শিভা আয়াদুরাই কিশোর বয়েসে

    কৃতিত্ব নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক

    তখনও এত জনপ্রিয় হয়নি বর্তমানের ই-মেল। পরে যখন ই-মেল জনপ্রিয় হল তখন আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক। ইমেল আবিষ্কারের দাবি করেছিলেন দু’জন। রে টমলিনসন ও শিভা আয়াদুরাই। দুজনেই মার্কিন নাগরিক। সংবাদ মাধ্যমে জানা গিয়েছিল শিভার EMAIL আবিষ্কারের ৭ বছর আগেই কম্পিউটারের মাধ্যমে অন্য কম্পিউটারে চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছিল।

    Raytheon নামে এক প্রযুক্তি কোম্পানির হয়ে ARPANET( Advanced Research Projects Agency Network) নামক প্রাথমিক অবস্থার ইন্টারনেটের সাহায্যে ই-মেল পাঠিয়ে ছিলেন কম্পিউটার পোগ্রামিং-এর পথিকৃত রে টমলিনসন। মার্কিন সেনাদের জন্যই তৈরি হয়েছিল এই সুরক্ষিত ই-মেল পদ্ধতি। তাই রাতারাতি ই-মেলের আবিষ্কারক হিসেবে পুরো কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে গেলেন রে টমলিনসন

    রে টমলিনসন

    তবুও হাল ছাড়লেন না শিভা আয়াদুরাই

    আয়াদুরাই বলেছিলেন, “উনি (রে টমলিনসন) ইমেল আবিষ্কার করেননি। তাঁর ই-মেল আবিষ্কারের কাহিনি টেকনোলজির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যে। রে টমলিনসন কেবলমাত্র টেক্সট মেসেজ পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। আজকের যে ফরম্যাটে ইমেল পাঠানো হয় সেই ই-মেল আমার আবিষ্কার।”

    ক্ষুব্ধ শিভা ইয়াদুরাই বলেছিলেন,সামান্য রিসার্চ করলেই বোঝা যাবে, ইলেকট্রনিক মেসেজ আর ইমেল এক নয়। ইমেলের সব ফিচার, যেমন cc, bcc, attachments, Inbox, Outbox, Folders, Attachments, Memo তাঁর আবিষ্কার এবং এর জন্য তিনি রে টমলিনসনের প্রযুক্তির বিন্দুমাত্র সাহায্য নেননি। তাঁর প্রযুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা। বরং তাঁর কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিয়েছেন রে টমলিনসন ও  Raytheon

    শিভা আয়াদুরাই

    ২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিনের প্রযুক্তি বিভাগে শিভা আয়াদুরাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, যেটির শিরোনাম ছিল “The Man Who Invented Email“, সেখানে বলা হয়েছিল শিভা আয়াদুরাইয়ের EMAIL-ই বর্তমান ইমেলের জনক।আমেরিকার বেশ কিছু মিউজিয়াম ও রিসার্চ সেন্টারের সম্মেলনকারী সংস্থা The Smithsonian Institution। ১৮৪৬ সালে তৈরি সরকার পরিচালিত এই সংস্থাটিও শিভা আয়াদুরাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ওয়াশিংটন পোস্ট। 

    শুরু হয়েছিল হেয় করার চেষ্টা

    আমেরিকার অনান্য প্রধান সারির মিডিয়া ও ব্লগে শিভা আয়াদুরাইকে হেয় করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। শিভা আয়াদুরাইয়ের দাবী, সংগঠিত এই ষড়যন্ত্রের পিছনে ছিল রে টমলিনসনের পৃষ্টপোষক Raytheon। শিভা আয়াদুরাই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আসলে এটা ছিল অন্যের কৃতিত্বকে নিখুঁতভাবে নস্যাৎ করে কোটি কোটি ডলার উপার্জনের প্রচেষ্টা। কিন্তু সত্যের থেকে ওঁরা অনেক দূরে। Raytheon প্রচার করে তাঁরাই ই-মেলের আবিষ্কারক। কিন্তু ARPANET-এর সবচেয়ে পুরোনো ব্রোশিওরটি ছাপা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। সেখানে email বা EMAIL বা electronic mail শব্দগুলির একটিরও নাম গন্ধ নেই। অথচ আমি EMAIL-এর কপিরাইট পেয়েছিলেন ১৯৮২ সালের ৩০ আগস্ট। এটাই প্রমাণ করছে ই-মেলের আবিষ্কারক আমি।”

    সংঘবদ্ধ আক্রমণের  প্রভাব পড়েছিল

    শিভা আয়াদুরাইয়ের পাশ থেকে সরে গিয়েছিল ওয়াশিংটন পোস্ট ও The Smithsonian Institution। ওয়াশিংটন পোস্ট  লিখেছিল, তারা ভুল করে শিভাকে ই-মেলের আবিষ্কারক লিখে ফেলেছিল। ইমেলের কিছু ফিচার যেমন ‘bcc’, ‘cc’, ‘to’ ‘from’ আগেই আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবিষ্কারক কে সেটা জানাতে ভুলে গেছিল কাগজটি।

    সাংবাদিক স্যাম বিডল শিভার বিরুদ্ধে লিখলেন, “প্রযুক্তিকে একটি প্রডাক্টের নাম দিয়ে হাইজ্যাকের চেষ্টা করলে হয়ত প্রচুর সম্পত্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু একটা নতুন মডেলের এরোপ্লেনের নাম AIRPLANE রাখলে এরোপ্লেনের আবিষ্কারক, উইলবার রাইট হওয়া যায় না।”

    শিভা পরবর্তী জীবনে যেখানে পড়াশুনা করেছিলেন সেই ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজি, শিভার সংস্থা EMAIL Lab এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। রিসার্চে অর্থ দেওয়া বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে লেকচার দেওয়ার চুক্তিও প্রত্যাহার করেছিল।

    স্ত্রী ফ্রাঁ ড্রেসরের সঙ্গে

    তবুও কৃতিত্ব পুনরুদ্ধারের হাল ছাড়েননি শিভা

    ২০১৬ সালে প্রয়াত হন রে টমলিনসন। মৃত্যুর খবর পেয়ে টুইট করেছিলেন শিভা আয়াদুরাই  “I’m the low-caste, dark-skinned, Indian, who DID invent #email. Not Raytheon, who profits for war & death. Their mascot Tomlinson dies a liar”। এই টুইটটাই প্রমাণ করে কতটা ক্ষোভ ও হতাশা মনে পুষে রেখেছিলেন শিভা আয়াদুরাই, তাই মৃত্যুর পরও প্রতিদ্বন্দীকে মিথ্যাবাদী বলতে দ্বিধা করেননি।

    আয়াদুরাইয়ের বয়েস এখন ৫৬। আজ তাঁর বিশ্বজোড়া নাম Systems biology, Computer science, Scientific visualization, Traditional medicine বিভাগগুলিতে। তবুও তিনি হারানো কৃতিত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাঁর মতে ই-মেলের আবিষ্কারক তিনিই।

    শিভার সঙ্গে আছে নোয়াম চমস্কির আশীর্বাদ

    শিভা বলেন তাঁর সঙ্গে আছে আর এক বিশ্ববরেণ্য মানুষের আশীর্বাদ। তিনি হলেন বিশ্বখ্যাত দার্শনিক, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ নোয়াম চমস্কি। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজির Department of Linguistics and Philosophy  প্রফেসর, ৯১ বছরের নোয়াম চমস্কি, তাঁর একদা ছাত্র শিভার দাবিকে সমর্থন করেছিলেন এবং এখনও করেন।

    লড়াই চলবে

    শিভা আয়াদুরাই বলেন, তাঁর কৃতিত্বকে হেয় করার পিছনে আছে ঔপনিবেশিক মানসিকতা, আছে জাতিবিদ্বেষ ও বর্ণবৈষম্য।  ইউরোপ ও আমেরিকা ভাবে, একমাত্র সাদা চামড়ার মানুষেরাই বড় বড় আবিষ্কার করতে পারেন এবং পৃথিবীর সমস্ত মহতকর্মের পিছনে থাকেন কোনও না কোনও শ্বেতাঙ্গ। এই মিথ ভাঙার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কালো চামড়ার এক ভারতীয় অভিবাসী শিভা আয়াদুরাই। কারণ তিনি জানেন, সমস্ত বড় আবিষ্কারের কৃতিত্ব আবিষ্কারকদের হাতে আসে লড়াই করেই  ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More