বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

‘শিরদাঁড়া শক্ত করে লিখুন,’ বলেছিলেন রমাপদ চৌধুরী  

অরিন্দম বসু

অনেকখানি সময় পেরিয়ে এসেও কিছু কিছু স্মৃতিতে ধুলো পড়ে না। কোনও কোনও মানুষের মুখ কিংবা সংলাপ জেগে থাকে মনে।

তখন আমার সাতাশ-আঠাশ হবে। ‘দেশ’ পত্রিকায় প্র‌থম একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে। ’৯৫ সাল। তার বছরখানেক আগে থেকে লিখতে শুরু করেছি। নভেম্বরে ওই গল্পটি ছাপা হল। পরের বছর জানুয়ারিতে গল্প পাঠালাম আনন্দবাজার রবিবাসরীয়তে। সেই সময় আনন্দবাজার অফিসের বাইরের সিঁড়ির ডানদিকে কাঠের একটি বড় বাক্স রাখা থাকত। লেখার খাম জমা দেওয়া যেত সেখানে।

লেখাটি দেওয়ার দিন কয়েক পরেই একদিন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আনন্দবাজারের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ ঘটে গেল। তার বেশ কিছু আগে থেকেই ওই মানুষটির সঙ্গে আমার মেলামেশা। সেদিন আনন্দবাজারে যাওয়ার দরকার ছিল ওঁরই। আমি বাহুল্যমাত্র। তবু গিয়েছিলাম। নিজের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর শ্যামলবাবু বললেন, ‘চল, রমাদা আর নীরেনদার সঙ্গে দেখা করে যাই।’ আসলে দেখা তো করবেন উনি। আমি তো শুধু দেখব।

ঘরে ঢুকলাম। দরজা ঠেলতেই বাঁদিকে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, উল্টোদিকের টেবিলের ওপাশে রমাপদ চৌধুরী। পাঞ্জাবি ও ধুতি। গায়ে একটি নস্যি রঙের চাদর চাপানো। আমরা ঢুকে ডানদিকের দুটি চেয়ারে বসলাম। ওঁরা কথা বলছেন। আমি শুনছি। আর দেখছি রমাপদ চৌধুরীকে। কিশোরবেলায় পাড়ার এক লাইব্রেরি থেকে বড়দের ফরমায়েশ মতো বই নিয়ে যেতে হত আমাকে। ফেরত দেওয়ার আগে সেই সব বই থেকে চুরি করে পড়ে নিতাম। নিশ্চয়ই আমার অকালপক্কতার কারণ ছিল ওই বইগুলো। সেভাবেই পড়ে ফেলেছি ‘লালবাঈ’, ‘বন পলাশীর পদাবলী,’ ‘দ্বীপের নাম টিয়ারঙ’, ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’, ‘পিকনিক’, ‘এখনই’। তখনই যে সব বুঝেছিলাম এমন নয়। কিন্তু আমার পাঠের অভ্যেসের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি। তার পরে তো আরও অনেক লেখা পড়েছি। ‘খারিজ’, ‘পরাজিত সম্রাট’, ‘অ্যালবামে কয়েকটি ছবি’, ‘বীজ’, ‘চড়াই’, ‘অভিমন্যু’, ‘বাড়ি বদলে যায়’। সেই লেখকের সামনে বসে আছি আজ। কণ্ঠস্বরটি দানাদার। ভুরুর ওপরে কপালের অনেকটা অংশ উঁচু। চশমার কাচের ওপারে বড় বড় দুটি চোখ। তাকালে মনে হয় খোঁচা লাগছে মনের কোথাও। সব মিলিয়ে বড্ড কঠিন যেন।

কথা চলতে চলতে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী শ্যামলবাবুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমার সঙ্গে এই ছেলেটি কে শ্যামল?’

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের যেমন স্বভাব। আমার নাম বলার পর বললেন, ‘অত্যন্ত বদ ছেলে। সবে লিখতে শুরু করেছে। দেশে একটি গল্প বেরিয়েছে বলে মনে করছে ডানা গজিয়েছে। রমাদা, ও আপনার কাছেও একটি গল্প পাঠিয়েছে।’

রমাপদ চৌধুরী তখন রবিবাসরীয়র সম্পাদক। স্পষ্ট করে একবার আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘ও, কবে পাঠিয়েছেন?’

তখনও জানি না উনি সবাইকেই ‘আপনি’ করেই কথা বলেন। উত্তরটা দিতে যাচ্ছি, চোখে পড়ল ওঁর ডানপাশের তাকে আমারই পাঠানো খামটি আড়াআড়ি রাখা। অতি উৎসাহে বলে উঠলাম, ‘ওই তো ওখানে, দেখতে পাচ্ছি।’

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী হেসে উঠলেন। রমাপদবাবু একটু হাসলেন না। নড়লেনও না। শুধু চোখের মণি ডানদিকে ঘুরেই আবার ফেরত এল। তারপর দুটি কথা। ‘ঠিক আছে।’

এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর, ওই জানুয়ারিতেই শেষ রবিবার রবিবাসরীয় খুলে দেখি আমার গল্পটি বেরিয়ে গিয়েছে। তার আগে আমার কোনও গল্প এত দ্রুত ছাপা হয়নি কোথাও। আমি অবাক। আনন্দে লাফিয়ে উঠে সোজা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি। ততক্ষণে তিনিও দেখেছেন। বললাম, ‘এত তাড়াতাড়ি ছাপলেন উনি লেখাটা!’ শ্যামলবাবু বললেন, ‘এসব আর তোমাদের সময়ে হবে না। দেখলে! যেমন লেখক, তেমনই সম্পাদক। হাওয়া থেকে আসল জিনিসটি মুঠোয় নিয়ে আসতে পারেন। তুমি গিয়ে দেখা করে এসো ওঁর সঙ্গে।’

এবার আমি কীরকম যেন বেঁকে বসলাম। ‘কেন, দেখা করব কেন?’

শ্যামলবাবু বললেন, ‘করবে না? গিয়ে বলবে আপনি আমার গল্পটা ছেপেছেন। আমার খুব ভাল লেগেছে। সম্পাদককে জানালে তাঁরও ভাল লাগে। রমাদার হাত দিয়ে কত লেখক সামনে এসেছে জান!’

আমি গেলাম। সেই একই ভঙ্গি। কাঠের চেয়ারে কাঠের মতোই বসে থাকা। আমার কথা শোনার পর বললেন, ‘আপনি আর একটা গল্প দেবেন। তবে একটু ছোট। এটা বড় হয়ে গেছিল। আমাদের এখানে জায়গার সমস্যা আছে।’

চলে এলাম। এত কম কথা বললে কি আর থাকা যায়! অবশ্য আমি নেহাতই এক নতুন লেখক। তার সঙ্গে কত কথাই বা বলবেন। তখনই তাঁর বয়স তিয়াত্তর। তবু, উনি তো শুধুই সম্পাদক নন। যাঁদের লেখা পড়তে পড়তে বড় হয়েছি তাঁদের মধ্যে উনি যে বিশেষ একজন। পরে যদিও আস্তে আস্তে জানতে পারছিলাম রমাপদ চৌধুরী নাকি ওইরকমই। যারা বলেছে তারাও যদিও আমারই মতো বাইরের লোক। রমাপদবাবুর কাছকাছি যাঁরা ছিলেন বা থাকতেন তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনার কোনও উপায় আমার অন্তত ছিল না।

এরপর আবার গল্প দিলাম রবিবাসরীয়র জন্য। কিন্তু সে গল্প আর ছাপা হয় না। বেশ কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর একদিন বাড়িতে নীল রঙের একটি ইনল্যান্ড লেটার এল। রমাপদ চৌধুরীর হাতে লেখায় ছোট একটি চিঠি। ‘আপনার গল্পটি মনোনীত হয়ে আছে তবে বিশেষ কারণে ছাপতে দেরি হবে। ইতিমধ্যে আপনি চাইলে আর একটি গল্প পাঠাতে পারেন।’

পড়ে কিছু বুঝতে পারলাম না। রাগও হল। এ আবার কী! একটা গল্প মনোনীত হয়ে ছাপাই হল না, আর একটা দিতে যাব কেন? ফিরে তো আর চিঠি লেখার কোনও উপায় নেই। চুপ করে রইলাম। তারপর বন্ধুদের সঙ্গে পুরুলিয়ায় বেড়াতেও চলে গেলাম।

ফিরে আসার পর মনে পড়ল সেই চিঠির কথা। কিন্তু চাইলেই গল্প লিখতে পারব সে ক্ষমতা আমার নেই। তাছাড়া ব্যাপারটাতে একটা খটকাও রয়েছে। সময় নিলাম। মাস দুয়েক পর একটা গল্প নিয়ে গেলাম আনন্দবাজারে।

ঘরে ঢুকতেই সেই চোখ। বসতেও বললেন না। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আপনি তো আমার কোনও চিঠি পাননি, তাই না?’

বুঝতে পারলাম একটা গোলমাল পাকিয়েছি। বললাম, ‘হ্যাঁ, পেয়েছিলাম।’

‘তাহলে আসতে এত দেরি হল যে!’

‘আমি ছিলাম না। পুরুলিয়ায় গেছিলাম।’

‘পুরুলিয়ায় কী করতে?’

‘বেড়াতে, বন্ধুদের সঙ্গে।’

একটা আঙুল সোজা করে চেয়ার দেখিয়ে এবার বললেন, ‘বসুন।’

বসলাম। রমাপদবাবু আবার বললেন, ‘তারপর গল্প লেখা শেষ করে আজ এলেন, তাই তো?’

মাথা নাড়লাম। মনে হচ্ছিল কেন এভাবে কথা শুনছি বা বলছি। এটা কোনও পাঠশালা নয়। আমিও ওঁর ছাত্র নই। আপাতত উনি সম্পাদক আর আমি লেখক। বড়জোর যশোপ্রার্থী বলা যেতে পারে আমাকে। তবে সেটা গল্প ছাপা হওয়ার লোভ নয়।

খাম থেকে নতুন গল্পটা বের করে দেখলেন। ‘ঠিক আছে।’

অদ্ভুত! আগের গল্পটার কী গতি হবে তা নিয়ে তো কিছুই বলছেন না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আর থাকতে না পেরে বললাম, ‘আমি আগে যে গল্পটা দিয়েছিলাম…’

কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন, ‘ওই চিঠিতেই তো যা জানানোর জানিয়ে দিয়েছি আপনাকে।’

একরকম হতভম্ব হয়ে বেরিয়ে এলাম। এ কী লোক রে ভাই! জানাননি তো কিছুই। তবে ভাবতে ভাবতে ভাবনাটাই বন্ধ করে দিলাম। যা হয় হবে। যাঁর সঙ্গে একটা একস্ট্রা কথা বলা যায় না তাঁকে নিয়ে আর ভাবব কী!

ভাবার বাকি ছিল যদিও। আমাকে চমকে দিয়ে সেই বছর শারদীয় আনন্দবাজারে সেই গল্পটি প্র‌কাশিত হল। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আবার বললেন, ‘দেখলে! কেমন মানুষ আর কেমন সম্পাদক। আবার যাও।’

গেলাম। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রমাপদবাবু বললেন, ‘বসুন।’

আমার মুখে তখনও নিশ্চয়ই খুশি মাখানো ছিল। বললাম, ‘খুব ভাল লেগেছে আমার। তবে খুব অবাকও হয়েছি।’

রমাপদ চৌধুরী হাসলেন। অল্প। প্র‌শান্ত হাসি। বললেন, ‘আপনাকে অবাক করে দেব বলেই আগে কিছু বলিনি। তাছাড়া এখানে আগে কিছু বলাও যায় না। আপনার যে ভাল লেগেছে সেটাই ভাল।’

পরে আমার লেখক বন্ধুদের মধ্যে একজন বলেছিলেন, ‘আমরা তো কোনওদিন রমাপদবাবুর হাসিমুখ দেখতে পাইনি। সে তো বিরল ব্যাপার। তুমিই মনে হচ্ছে একমাত্র যে দেখলে। লটারির টিকিট কাটো।’

তারপর আমার আরও গল্প আনন্দবাজার পুজোসংখ্যা ও রবিবারের পাতায় বেরিয়েছে। এখানে সে কথা ব্যাখ্যান করার দরকার নেই।

কিছুদিনের মধ্যেই আবার রমাপদ চৌধুরীর আর একটি চিঠি পেয়েছিলাম। যে কোনওদিন দুপুর দুটোর পর আনন্দবাজার অফিসে গিয়ে দেখা করার কথা লেখা ছিল সেখানে। মনে আছে, তখন পার্ক স্ট্রিটে বইমেলা চলছিল। গিয়ে পৌঁছনোর পর তিনি আমায় নিয়ে বাইরের করিডোরে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘গল্প তো লিখছেন, উপন্যাস লেখার কথা ভেবেছেন কখনও?’

না, তখনও একেবারেই ভাবিনি। সে কথাই বললাম। উনি বললেন, ‘ভাবুন তাহলে। প্র‌থম উপন্যাস তো, বেশি বড় করবেন না। চল্লিশ হাজার শব্দের মধ্যে রাখার চেষ্টা করবেন। লেখা হয়ে গেলে নিয়ে আমার কাছে চলে আসবেন।’

এবার বলেই ফেললাম, ‘বেশিদিন তো লিখছি না। এখনই কি উপন্যাস ধরতে পারব!’

‘না পারার তো কোনও কারণ দেখছি না। যান, বাড়ি গিয়ে মন দিয়ে লেখাটা লিখতে বসে যান। শিরদাঁড়া শক্ত করে লিখুন।’ কথাগুলো বলার সময়ে তিনি সোজাসুজি আমার চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন।

রমাপদ চৌধুরীর কথাতেই আমার প্র‌থম উপন্যাস লেখা। তারপর অবশ্য সে বছরই বিমল করও আরও একটি উপন্যাস লিখতে বলেছিলেন। দুটোই লিখেছিলাম। একটিও প্র‌কাশিত হয়নি সে বছর। পরের বছর, ’৯৭ সালে প্রথমটিই ছাপা হয়েছিল। তবে ওই দুটি লেখা নিয়ে বিমল কর ও রমাপদ চৌধুরীর মধ্যে আমাকে প্রায় ছোটাছুটি করতে হয়েছিল। কেন, সে কথা এখানে এবং এখনই বলার মতো নয়। তবে বলতে পারি, স্মৃতি তিক্ত হয়ে উঠতে পারত। হয়নি। বরং মধুরই হয়েছে। এছাড়াও রমাপদ চৌধুরীকে নিয়ে বলার মতো আরও অনেক কথা আপাতত রয়ে গেল স্মৃতির ভেতরেই। শুধু একটিমাত্র তুলে আনব সেখান থেকে।

অনেক পরে একদিন, ২০০৭ সালে, আনন্দবাজারে যেতে হয়েছিল রমাপদ চৌধুরীর কাছে। একটি গল্প সংকলন তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। পৌঁছে দিতে গিয়েছিলাম। তখন তিনি নির্ধারিত ঘরটির বাইরে এক জায়গায় বসেন। বেশি কথা হয়নি তখনও। বইটি উল্টেপাল্টে দেখলেন। চলে আসার আগে বললাম, ‘আপনাকে একবার প্র‌ণাম করতে চাই।’ মুখ তুলে তাকালেন। গায়ে তাঁর চাদর চাপানো ছিল সেদিনও। গুটিয়ে নিয়ে অত্যন্ত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে পা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘করুন।’ তারপর ঠিক চলে আসার মুখে বললেন, ‘যেখানেই হোক, লিখবেন।’

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় চলে গিয়েছেন সতেরো বছর হয়ে গেল। তারপর বিমল কর, সেও পনেরো বছর। এই ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই চলে গেলেন রমাপদ চৌধুরী। এই লেখাটি লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল যিনি এসব পড়বেন, এমনও তো হতে পারে তাঁর কাছে আমার এইসব অক্লান্ত স্মৃতি আসলে অবান্তর। তাহলে কেন লিখলাম? আমি রমাপদ চৌধুরীর সান্নিধ্য কতখানি পেয়েছিলাম তা বলার জন্য এ লেখা নয়। অন্য কারণ তো আছে নিশ্চয়ই। অল্প হলেও তা না বললে চলে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন রমাপদ চৌধুরী কিশোর। যখন তিনি সেই অর্থে লেখালেখি শুরু করেছেন এবং লিখে চলেছেন তার মধ্যেই তাঁকে দেখতে হয়েছে দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্‌বাস্তু স্রোত, মন্বন্তর, স্বাধীনতা। প্রে‌মেন্দ্র মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, সুবোধ ঘোষ, সতীনাথ ভাদুড়ী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার সময় এবং কিছুকাল পরে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সন্তোষকুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্রর, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সময়টিকে হয়তো মনোযোগী পাঠক খেয়াল করে দেখবেন। চল্লিশের দশককে ধরলে সমরেশ বসু, গৌরকিশোর ঘোষ, মহাশ্বেতা দেবী, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরীকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আসলে এঁরা অনেকেই অনেকটা সময় জুড়ে লিখেছেন। যে যাঁর নিজের মতো করে।

মনে রাখা দরকার যে বাঙালি মধবিত্ত শ্রেণির উঠে আসা মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন এবং লিখেছেন রমাপদ চৌধুরী। তাঁর লেখা নিয়ে আলোচনায় সে কথা প্রায়ই উঠে আসে। তবে সেইসঙ্গে তাঁর ‘রেবেকা সোরেনের কবর’, ‘ঝুমরা বিবির মেলা’, ‘উত্তরাধিকার’ ও আরও বেশ কিছু গল্পের কথা মনে রাখা ভাল যেখানে তিনি আদিবাসী জনজাতির মানুষদের জীবনকে কাহিনিতে বুনেছেন। ‘ভারতবর্ষ’ গল্পটি তো বহু আলোচিত। লেখক তো ইতিহাস লেখেন না। সচেতন লেখক সচেতন ভাবেই ইতিহাসকে ব্যবহার করেন। ইতিহাস বদলে যাওয়ার ইঙ্গিতও থাকে তাঁর লেখায়। এ বিষয়ে বোধহয় রমাপদ চৌধুরীর লেখাকে অনুসরণ করা যায়।

হ্যাঁ, রমাপদ চৌধুরী বেশি লিখেছেন মধ্যবিত্ত মানুষ ও তাদের জীবনের কথাই। ধরে নেওয়া যেতে পারে সেটা দোষের কিছু নয়। মনে হয় ভেঙে যাওয়া সময় আর গড়ে ওঠা সময়ের সারল্য ও জটিলতাকে একসঙ্গেই লেখায় আনতে চেয়েছিলেন তিনি। সম্ভবত একই রেখাতেও। ‘উদয়াস্ত’ গল্পটি থেকে শুরু করে ‘বারো ঘোড়ার আস্তাবল’, ‘সহযোগ’, ‘কুসীদাশ্রিত’ হয়ে ‘আলমারিটা, ‘একটি মানিব্যাগ ও একফালি হাসি, ‘পোস্টমর্টেম’ পর্যন্ত অনেক গল্পই বাঙালি মধ্যবিত্তর সুখ ও অসুখকে আশ্রয় করেছে। ঠুনকো আত্মমর্যাদা, লোভ, ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা, ভালবাসা ও মনোবেদনাকে সামনে এনেছে। তাঁর কয়েকটি উপন্যাসের কথা লেখার গোড়াতেই বলেছিলাম। কয়েকটি বাদ দিলে বাকিগুলোয় এইসব সংকেত স্পষ্ট।

আয়তনে বেশ বড় উপন্যাস রমাপদ চৌধুরী কোনওদিনই লেখেননি। লিখতে চাননি, এমনটা ভেবে নেওয়াই কাজের হবে। তাঁর লেখা তাঁর আচরণের মতোই। অতিরিক্ত কোনও বাক্য তিনি ব্যয় করবেন না। যতটুকু বলবেন তা দিয়ে যতটা বোঝানো গেল ততটুকুই যেন চেয়েছেন। সামান্য বীজ ব্যবহার করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। লেখা তার নিজের ভেতরে ভেতরে কতটা বাড়ছে, কতটা বলিষ্ঠ হচ্ছে তার গঠন, সে নিজের কথা নিজে বলে উঠতে পারছে কিনা, হয়তো এই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

লেখায় যদি তিনি এমন হয়ে থাকেন, সম্পাদক হিসেবেও তাকেই মান্যতা দিয়েছেন। নিজে একটা সময়ের পর লেখা থামিয়ে দিয়েছিলেন এমনটা ঘোষিত আছে। আমার মনে হয়, থামাননি। খুঁজতে চেয়েছেন নতুন লেখক। নতুন বিষয়। নতুন আঙ্গিক। তাঁর লেখা ওইভাবেই চলেছিল। শুধু কলমটিই যা নামিয়ে রেখেছিলেন।

অরিন্দম বসুর এখনও পর্যন্ত আটটি উপন্যাস, দেড় শতাধিক গল্প ও একটি ভ্রমণকাহিনি প্র‌কাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্র‌ন্থ বারোটি। উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’র পুরস্কার, ‘নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার’। গল্পের জন্য পেয়েছেন ‘গল্পসরণি’ ও ‘গল্পমেলা’ পুরস্কার,  নবীন সাহিত্যিক হিসেবে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এর পুরস্কার।

Leave A Reply