বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

কে তুমি? পেল না উত্তর

হিন্দোল ভট্টাচার্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনার গতিপ্রকৃতি যে ভিন্ন ছিল, সে বিষয়ে হয়ত আজ আর কারও মনে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তিনি ছিলেন সেই মানুষ যিনি বলে উঠেছিলেন- ‘অতি ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচালে মোরে’। বঞ্চিত হওয়া যে এক প্রকার বাঁচা, সে কথা তিনি গানেই প্রকাশ করেছেন। কথা হল, রিক্ততা কি তাঁকে স্পর্শ করত না? মেনে নিলাম, তিনি এই ভারতবর্ষের মানুষ। আধুনিকতার বিষাক্ত তির তাঁকে স্পর্শ করেনি। বা, স্পর্শ করলেও, তিনি প্রতিনিয়ত আধুনিকতার বিষাক্ত সেই সব তিরের সঙ্গে কথোপকথন করে যেতেন। যে আধুনিকতার বীজমন্ত্র অশুভ ও অমঙ্গলবোধ, সেই আধুনিকতাকে তিনি গ্রহণ করে উঠতে পারেননি। যে কারণে জীবনানন্দ দাশের কবিতা কেবল তাঁর কাছে ছিল চিত্ররূপময়। তার চেয়ে বেশি কিছু না। কিন্তু কথা হচ্ছিল শূন্যতা বিষয়ক। এবং তাও রবীন্দ্রনাথের শূন্যতা। পাত্রের আধার যত বড় হয়, তার আধেয় তত বেশি। সেই পাত্র ততই যেমন অপেক্ষা করে থাকতে পারে প্রকৃতির নিবিড় নিভৃত কথাগুলিকে ধরার জন্য, ঠিক তেমন, শূন্যতার অন্দরমহলের সঙ্গেও তার দেখা হয়, শব্দের নীরবতার সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। কিন্তু এই নীরবতা, এই শূন্যতা আমাদের নিত্য ব্যবহার্য শূন্যতা ও নীরবতার থেকে এতটাই আলাদা, যে সেই শূন্যতার পরিসরে যে অনেক বেশি পূর্ণতার প্রকাশ, তাও আমাদের কাছে অধরাই থাকে।

আরও পড়ুন : চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ যেন এক বিষণ্ণ নাবিক

এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের অবতারণা করতে চাই্‌, যা বহুকাল ধরে আমার মনে উঁকি মারে। কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বধূ শুয়েছিল পাশে, শিশুটিও ছিল, প্রেম ছিল, আশা ছিল” , তবু সেই কবিতার লোকটি চাঁদের আলোয় কোন ভূত দেখল, যে সেই বিপন্ন বিস্ময় তাকে নিয়ে লাশকাটা ঘরে? কামু যেমন বলেন মিথ অফ সিসিফাসে- Killing yourself amounts to confessing, it is confessing that life is too much for you or rather you do not understand it” হয় জীবন এত বড় যে আমি তাকে বুঝতে পারছি না, আর নয়, জীবন আমার পক্ষে যথেষ্ট। কথা হল, এই ভাবনাটি তাঁর মনের মধ্যে যে শূন্যতার জন্ম দিচ্ছে, তা তাঁকে কী করছে? গভীর ভাবে রিক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং জগতের প্রতি একধরণের রিজেকশন আসছে তাঁর। আমি ভাবার চেষ্টা করি, বিপন্ন বিস্ময় কি তাঁকে এতটাই বিস্মিত করছে, যে তিনি জীবনের ক্ষুদ্রতর দিকগুলিকে ছেড়ে বৃহত্তর দিকগুলিকে আঁকড়ে ধরছেন? এই বিপন্ন বিস্ময় কি তাঁকে নিশ্চেষ্ট করছে? নীরব করছে? উদাসীন করছে? নিস্পৃহ করছে? জরা, জীর্ণ এবং মৃত্যু কেন? দুঃখ কেন? এই বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে এতটাই অর্থহীন বলে মনে হল গৌতম বুদ্ধের, যে তিনি, পাশে শুয়ে থাকা বধূ, শিশু, প্রেম, আশা, ক্ষমতা, ঐশ্বর্য, আরাম ছেড়ে, বেরিয়ে পড়লেন মানুষের এই নিয়তিনির্দিষ্ট সাফারিংস-এর কারণ জানতে। শোক এবং প্রকৃত দুঃখের যে পার্থক্য, শূন্যতার অবসাদ ও শূন্যতার প্রজ্ঞার মধ্যে তার চেয়ে বেশি পার্থক্য।  কিন্তু বুদ্ধ, যে বিপন্ন বিস্ময়ের মুখোমুখি হলেন, তাতে তিনি অবসাদগ্রস্ত হলেন না, বরং, বোধি অর্জন করলেন।  আত্মদীপ জ্বলে উঠল তাঁর অন্তরে। এই দুই জীবনদর্শনের মধ্যেই রয়েছে এক বিরাট পার্থক্য। তাই রবীন্দ্রনাথ লেখেন- কী গাহিবে, কী শুনাবে, বল মিথ্যা আপনার সুখ, / মিথ্যা আপনার দুঃখ/ স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ/ বৃহৎ জগত হতে/ সে কখনও শেখেনি বাঁচিতে। তিনি বলেন- মৃত্যুর গর্জন শুনেছে সে সঙ্গীতের মতো।

ছিন্নপত্রের একটি চিঠিতে তিনি যখন লিখছেন, ছোট দুঃখে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু বড় দুঃখে হৃদয় প্রশান্ত হয়ে আসে। এই যে তিনি ছোট দুঃখ ও বড় দুঃখের মধ্যে ফারাক করে দিলেন, এটিই তাঁর জীবনদর্শনের অন্যতম সার কথা। রবীন্দ্রনাথের কাছে জীবনের এই অপ্রত্যাশিতের প্রতি এক নীরব দ্রষ্টার চোখ ছিল । যে কারণে, তিনি ক্রমশ শোক, দুঃখ, বিষাদকে ধীরে ধীরে প্রজ্ঞার জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। যে কারণে শমী মারা যাওয়ার পরে তিনি সমস্ত দুঃখকে  নিজের মধ্যে গ্রহণ করতে করতে লিখেছিলেন, জগতের কোথাও একবিন্দু কিছু কমে যায়নি। সব একরকম আছে। একেই বলে দুঃখ। একেই বলে শূন্যতা। কিন্তু এই প্রজ্ঞা একদিনে আসে না। বিনয় মজুমদারের  ভাষায় বলতে গেলে- নিষ্পেষণে ক্রমে ক্রমে অঙ্গারের  মতন সংযমে / হীরকের জন্ম হয়, দ্যুতিময়,  আত্মসমাহিত।

আবার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দু বছর পরে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- রথী, কিছুদিন থেকে আমার মনের মধ্যে যে উৎপাত দেখা দিয়েছে সেটা একটা শারীরিক ব্যামো…আমার একটা নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে, তার সন্দেহ নেই। দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করেছে। মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে না, আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ;- কেবলি মনে হচ্ছিল যখন এ জীবনে আমার আইডিয়ালকে রিয়েলাইজ করতে পারলুম না তখন মরতে হবে…।আমি ডেলিবারেটলি সুইসাইড করতেই বসেছিলুম- জীবনে আমার লেশমাত্র তৃপ্তি ছিল না। ( চিঠিপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়)

তার মানে তাঁর মধ্যেও এক গভীর ব্যর্থতাবোধের হতাশা ছিল। কিন্তু সেগুলিকে অতিক্রম করেছিলেন। মনের মধ্যে যদি বা থাকে, তাকে এক বৃহত্তর দর্শনের প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত করে রেখেছিলেন। মানুষ তো, দেবতা তো নয়। তাই তাঁর মধ্যেও যে অবসাদ আসবে, এ তো স্বাভাবিক বিষয়। নানাপ্রকারের কাটাকুটি যে তাঁকে ছেয়ে ফেলত, এ তাঁর চিত্রগুলি দেখলেও বোঝা যায়। কিন্তু অবসাদকে তিনি বিষাদে পরিণত করতেন। এই বিষাদ কিন্তু রিক্ততার বিষাদ নয়। রবীন্দ্রনাথের শূন্যতায় রিক্ততা নেই। বরং বিষাদের হাত ধরে এক পূর্ণতার দিকে অভিযাত্রা আছে। তিনি যেমন দেবতা ছিলেন না, যেমন ছিলেন এক রক্তমাংসের মানুষ, তেমন তিনি এক শাশ্বতকালের প্রেক্ষিত থেকেই ব্যক্তিগত বিষাদকে ছড়িয়ে দিতেন অনন্তকালীন বিষাদের জগতে। জীবনকে ঠিক কীভাবে অনন্ত চৈতন্যের অংশের মতো করে অনবভব করা যায়, তা-ই  ছিল তাঁর সারাজীবনের সন্ধান। ক্ষুদ্রকে যখন ক্ষুদ্র অর্থেইই দেখা হয়, তখন ক্ষুদ্র তার মহত্বের অর্থে পৌঁছতে পারে না। রথীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠির রবীন্দ্রনাথ যদি সেই সময়ে ক্ষুদ্রকে ক্ষুদ্রের অর্থে দেখছেন, তো ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে,  তখন তিনি জগতের সমস্ত ক্ষুদ্রকেই স ংযুক্ত  অবস্থায় বৃহতের প্রেক্ষিত থেকেই দেখছেন। ফলে, জীবনানন্দের হেমন্তের রিক্ততা রবীন্দ্রনাথের শূন্যতা নয়। তাঁর শূন্যতা অনেক বেশি পূর্ণতার বিষাদ। এই বিষাদ কি তবে আনন্দ? আনন্দ কি তাই, যা আমরা আনন্দের আভিধানিক অর্থে বুঝি? বুদ্ধের যে নিশ্চেষ্ট বোধি, যে নিস্পৃহ সংযোগ, জগতের প্রতি যে করুণামিশ্রিত ভালোবাসা, – তার মধ্যে কি বিষাদ নেই? শূন্যতা যে এক পূর্ণতার অংশ, আর সেই শূন্যতার মধ্যে সমস্ত দুঃখ পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। যেন এক পরিব্যাপ্ত দিগন্ত। যেখানে রবীন্দ্রনাথ গাইছেন- হৃদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে। এই হৃদয়ে যেমন ছোট ছোত খুশি আছে, তেমন ছোট ছোট দুঃখ-ও আছে। অবসাদ যেমন আছে, বিষাদ-ও আছে। রবীন্দ্রনাথের শূন্যতা তাই অনেকটা মহাকাশের মতো, যার বিন্দু অসংখ্য, কিন্তু কেন্দ্র নেই। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে এই কবিতাটি-

 

প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে –
কে তুমি?
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল।
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিমসাগরতীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় –
কে তুমি?
পেল না উত্তর।

এই হল ‘বড় দুঃখ’। যা রবীন্দ্রনাথের শূন্যতার প্রজ্ঞা।

হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।

Leave A Reply