দুঃসহ জীবন কাটিয়েছিলেন চিনের নিঃসঙ্গ শেষ সম্রাট পুয়ি, বাধ্য হয়েছিলেন কমিউনিস্ট হতে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মুঘল সাম্রাজ্যের ১৯তম এবং শেষ সম্রাট মির্জা আবু জাফর সিরাজউদ্দিন মুহাম্মদ বা বাহাদুর শাহ জাফরের অন্তিম জীবন সুখের ছিল না। ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে মসনদচ্যুত করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের গ্যারেজে সম্রাটকে শুতে হত পাটের দড়ির খাটিয়ায়। চরম দুঃখকষ্টের মধ্যে কিছুকাল কাটিয়ে রেঙ্গুনেই প্রয়াত হন শেষ মোগল সমাট।

    বাহাদুর শাহ জাফরের কথা জানা থাকলেও। আমরা অনেকেই জানি না এশিয়ার আরেক প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটের কথা। তিনি হলেন সম্রাট পুয়ি। শক্তিশালী চিনের শক্তিশালী কুইং সাম্রাজ্যের ১২ তম ও শেষ সম্রাট। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাঁর জীবন ছিল পুতুলনাচের পুতুলের মতো অপরের হাতের সুতোয় বাঁধা। জীবনের বেশিরভাগ কেটেছিল প্রাসাদে গৃহবন্দি হয়ে। কখনও বিদেশে নির্বাসিত হয়ে, কখনও বা দেশের কারাগারের দণ্ডিত কয়েদি হয়ে।

    চিনের শেষ সম্রাট পুয়ি

    চিনের শেষ সম্রাট পুয়ি

    যাঁকে চিনে বলা হত জুয়ানটং সম্রাট ও মঙ্গোলিয়ায় খেভ ইয়স খান । ১৯০৮ সালে মাত্র দুই বছর বয়েসে উত্তরাধিকার সূত্রে  সিংহাসন লাভ করেন। মাত্র চার বছরের মধ্যে, ১৯১২সালে, জিনহাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে কুইং সাম্রাজ্যের পতন ঘটান সান ইয়াত সেন। রাজতন্ত্রের শাসনে ২০০০ বছর ধরে থাকা চিন শ্বাস নিতে শুরু করে প্রজাতন্ত্রের জমিতে।

    সিংহাসনচ্যুত হলেও শিশু পুয়িকে তাঁর সম্রাট উপাধি ব্যবহার করার ও প্রাসাদে বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁকে দেখভাল করার জন্য বেশ কিছু খোজা প্রহরী ও কর্মীর ব্যবস্থা করা হয়। দুপুরে তাঁকে ৪০ পদের দ্বিপ্রাহরিক আহার দেওয়া হত, খেলার সময় দেওয়া হত খেলার সঙ্গীও। জন্ম থেকে বিলাসব্যসনে থেকে অভ্যস্ত শিশু সম্রাট পুই বুঝতেই পারেননি তিনি কী হারিয়েছেন। পুয়ি-এর জীবনীকার এডওয়ার্ড বের লিখেছিলেন, এই প্রাসাদই ছিল পুয়ি-এর জীবনের প্রথম জেল।

    সম্রাটের পোশাকে শিশু পুয়ি

    ১৬ বছর বয়সে তাঁকে চারটি মেয়ের ছবি দেখানো হয়। বলা হয় সেখান থেকে একজনকে রানী এবং একজনকে রাজকীয় রক্ষিতা হিসেবে বেছে নিতে। পুয়ি নিজের নামটা  পছন্দ করতেন না, তাই তিনি নিজের নাম রেখেছিলেন হেনরি, কারন তিনি ইংল্যান্ডের রাজা Henry VIII -এর ভীষণ ভক্ত ছিলেন। ১৯২৪ সালে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে তাঁকে তিয়েনতসিন পাঠানো হয়।এলাকাটি ছিল জাপানের দখলে। উনিশ বছরের সদ্য যুবক সম্রাট পুয়িকে সাদরে গ্রহণ করে জাপান।

    চিনের বিরুদ্ধে  রাজনৈতিক দাবার অন্যতম ঘুঁটি হিসাবে পুয়িকে সাজায় জাপান

    ১৯৩২ সালে জাপান মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে দখল করে মাঞ্চুকুয়ো নামে একটা রাষ্ট্র তৈরি করে। ডাটং উপাধি দিয়ে পুয়িকে সেই রাষ্ট্রের সম্রাট করে দেওয়া হয়। ১৯৩৪ সালে তাঁকে কান্গটে সম্রাট হিসেবে ঘোষনা করে জাপান।  ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মাঞ্চুকুয়ো শাসন করেন, জাপানের হাতের পুতুল হয়ে। সামান্য ক্ষমতাও তাঁর হাতে ছিল না।

    ১৯৩৭ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, ১৯৪৫ সাল নাগাদ জাপানের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে। সম্রাট পুয়ি জাপানে পালিয়ে যাবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করায় তিনি পড়ে গিয়েছিলেন বিপদে। চিনের রোষ থেকে বাঁচতে জাপানের দেওয়া উপাধি ত্যাগ করে তাঁর মাঞ্চুকুয়ো সাম্রাজ্যকে চিনের সম্পত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন সম্রাট পুয়ি।

    পুয়ি যখন জাপানের হাতের পুতুল সম্রাট

    চিনে এল গণপ্রজাতন্ত্র

    বিপদের সম্ভাবনা থাকায় সম্রাট পুয়ি মাঞ্চুরিয়া থেকে কোরিয়ায় পালাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুকদেন বিমানবন্দরে ধরা পড়ে যান সোভিয়েত সেনার হাতে। বিশেষ বিমানে তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সাইবেরিয়ায়। বন্দি করা হলেও সেখানে সম্রাট হিসেবে প্রাপ্য স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা হয় পুয়ির জন্য।

    ১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর মাও জে দং-এর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন ( People’s Republic of China) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সম্রাট পুয়িকে রাশিয়া ১৯৫০ সালে চিনের কমিউনিস্ট শাসকদের হাতে সমর্পণ করে। পুয়ি নিশ্চিত ছিলেন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। কিন্তু তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে লিয়াওনিং প্রদেশের কারাগারে যুদ্ধপরাধীদের সঙ্গে প্রায় ১০ বছর রাখা হয়েছিল।

    রাশিয়ার জেলে পুয়ি

    কারাগারে তিনি ছিলেন ৯৮১ নম্বর কয়েদি

    সশ্রম কারাদণ্ড, তাই সম্রাটকে সব্জি বাগানের কাজ দেওয়া হয়েছিল। জেলের সহবন্দিরা হাসত সম্রাটকে দেখে, তিনি নিজে নিজে জুতো পরতে পারতেন না। বিছানা পাততে ও তুলতে পারতেন না। কী করে আঙুল দিয়ে দাঁত মাজতে হয় জানতেন না। পদে পদে তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ সইতে হত।

    উত্তর দিতেন না পুয়ি, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো থাকতেন। ধীরে ধীরে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
    নিজের জামাকাপড় নিজে কাচতে শিখেছিলেন। জামা কাপড়ের একটা দাগ ওঠাতে প্রচুর সময় লাগিয়ে দিতেন। যতক্ষণ দাগটা না উঠত ততক্ষণ ঘষেই যেতেন। এর জন্য কাপড় অনেক সময় ছিঁড়ে যেত। ছেঁড়া হলেও, দাগহীন জামাকাপড়ই পরতেন তিনি।

    নিজের জুতো নিজে সেলাই করছেন সম্রাট পুয়ি

    সম্রাট হলেন কমিউনিস্ট

    কারাগারে আসার পর সম্রাটের মতাদর্শের পরিবর্তন ঘটিয়ে তাঁকে কমিউনিজমে দীক্ষিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু হয়েছিল। জেলের ভেতর নিয়মিত মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ ও মাওবাদের আলোচনা সভা হত। যখন প্রমাণিত হল সম্রাট কমিউনিজমকে ভালোবেসে ফেলেছেন এবং চিনের অনুগত নাগরিক হয়েছেন, তখন তাঁকে ক্ষমা করে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল

    মুক্তির পর চিনের মহাপরাক্রমশালী কুইং সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট পেয়েছিলেন সহকারি মালির চাকরি। ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৬১ সালের মার্চ পর্যন্ত কুইং রাজত্বের শেষ সম্রাট বেজিংয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের মালি হিসাবে কাজ করেছেন। আরও দুজনের সঙ্গে থাকতেন একটা ডর্মিটরিতে।

    বামে মাঞ্চুকুয়োর সম্রাটের পোশাকে পুয়ি, ডানদিকে সহকারী মালি পুয়ি

    বিদেশি অতিথিরা উৎসুক হলে তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে অতিথিদের সামনে হাজির করা হত। শত জোড়া কৌতুহলী চোখের সামনে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন চিনের শেষ সম্রাট। ১৯৬৭ সালে কিডনির ক্যানসার তাঁকে চিরতরে মুক্তি দিয়েছিল। বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।

    কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পুই নাকি রাস্তার ঝাড়ুদার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। সেই সময় তিনি  রাস্তায় চলা পথিকদের বলতেন, “আমি পুই, চিনের শেষ সম্রাট, আত্মীয়দের সঙ্গে থাকি, তোমরা আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে? আমি পথ চিনি না।”  সত্যিই এ জীবনে কখনই নিজের ইচ্ছামতো বাঁচার পথ খুঁজে পাননি সম্রাট পুই। কারণ তাঁর জীবন নাটকের চিত্রনাট্যটা নিজেদের ইচ্ছেমতো সাজিয়েছিল বিভিন্ন দেশ, তাদের মধ্যে ছিল তাঁর মাতৃভূমি চিনও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More