সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

তুরস্কের প্লুটোনিয়ন মন্দির কিংবা ‘নরকের দ্বার’, ঢুকলে কেউ নাকি বেঁচে ফেরে না

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বর্তমান তুরস্কের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পামুক্কালের কাছেই ছিল, ফ্রিজিয়া সাম্রাজ্যের একটি বিখ্যাত শহর হিয়েরাপোলিস। গ্রিক ভাষায় যার অর্থ হল পবিত্র নগরী। অজস্র প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবনের জলের ওষধি গুণের জন্য, প্রাচীনকালে আরোগ্যনিকেতন হিসেবে হিয়েরোপোলিসের সুখ্যাতি ছিল।

অনুমান করা হয়, আনাতোলিয়ার অধিবাসীরা নয়তো পারস্যের অধিবাসীরা আজ থেকে প্রায় ২৬০০ বছর আগে হিয়েরাপোলিস শহরটি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে গ্রীক ও তারপর রোমানরা শহরটির দখল নিয়েছিল।

হিয়েরাপোলিস

১৮৮৭ সালে এই অঞ্চলে খননকার্য চালাতে গিয়ে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ কার্ল হুম্যান এই ঐতিহাসিক শহরটি আবিষ্কার করেন। এর পর, ১৯৫৭ সালে পাওলো ভারজোনের নেতৃত্বে ইতালীয় বিজ্ঞানীদের দল নতুন করে খনন চালালে মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসে এক উন্নত শহর।

ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝা যায়,  এই অঞ্চলের অধিবাসীদের রীতিমতো আধুনিক ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন। খননক্ষেত্রটি থেকে পাওয়া গিয়েছিল যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা, গরম ও ঠান্ডা জলের সুবিধাযুক্ত স্নানাগার, গ্রন্থাগার, ব্যায়ামাগার, ১২০০০ আসন বিশিষ্ট একটি আ্যম্ফিথিয়েটার ও সমাধিক্ষেত্র।

হিয়েরাপোলিসের আ্যম্ফিথিয়েটার

আবিষ্কৃত হয়েছিল প্লুটোনিয়ন

১৯৬৫ সালে এই এলাকায় আবার খননকার্য চালালে আবিষ্কৃত হয় একটি মন্দির, প্লুটোনিয়ন। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শুরুতে এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। একটি গুহার ওপর তৈরি করা হয়েছিল এই প্লুটোনিয়ন মন্দির।

ফ্রিজিয়াবাসীরা বিশ্বাস করত মন্দিরের নীচে আছে পাতালের যাওয়ার পথ। একজন মানুষ গলতে পারে এরকম সংকীর্ণ গুহামুখ থেকে ধাপে ধাপে নীচে নেমেছে পাথুরে সিঁড়ি। গুহার নীচের পাথরে আছে এক গভীর ফাটল। যার ভেতর টর্চ মারলে দেখা যাবে, নীচে দিয়ে দ্রুতবেগে বইছে ফুটন্ত জলের স্রোত।

মন্দিরের পুরোহিতরা বলতেন, এই ফুটন্ত জলের স্রোতের নীচেই নাকি আছে পাতাল। যেখানে বিরাজ করেন গ্রীক ও রোমানদের ধর্মের পাতালের দেবতা প্লুটো। এই গুহাপথ দিয়ে নাকি পৌঁছানো যায় বদরাগী দেবতা প্লুটোর কাছে। তবে সে পথ সাধারণের জন্য নয়।

এই সেই প্লুটোনিয়ন

প্লুটোনিয়ন কেন নরকের দরজা!

প্লুটোনিয়নের কথা উঠে এসেছিল, স্ট্রাবো, ক্যাসিয়াস ও দামাসসিয়াসের মত সুপ্রাচীন ইতিহাসবিদদের লেখায়। ঐতিহাসিক স্ট্রাবো লিখেছিলেন, “কোনও পশু বা পাখি প্লুটোনিয়নের ভেতরে গেলে অনিবার্য ভাবে তার মৃত্যু ঘটবে। আমি কিছু চড়াই ভেতরে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে তারা মারা গিয়েছিল।”

প্লুটোনিয়নের গোপন কথা শুনে পরবর্তীকালে শিউরে উঠেছিল আধুনিক বিশ্ব। এই রহস্যময় গুহার ভেতরে গিয়ে একমাত্র পুরোহিতরা ছাড়া, আর কেউ জীবিত অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে আসেননি। বহু মানুষ ও পশুপাখির মৃত্যু ঘটেছিল এই গুহার ভেতর। তাই হিয়েরাপোলিসের জনসাধারণ মন্দিরটিকে বলত নরকের দরজা গুহাটিকে বলত প্লুটোর গুহা

সেই গুহামুখ 

ফ্রিজিয়ার অধীবাসীরা ভাবতেন, পাতাললোকে প্রবেশের চেষ্টা করলে দেবতা প্লুটো ক্রুদ্ধ হন। অবিশ্বাসীদের নিজে হাতে গুহার ভেতর নির্মম মৃত্যু উপহার দেন। এ সব জানার পর, দূর্দমনীয় রোমানরাও মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে ভয় পেত।

দেবতা প্লুটোকে তুষ্ট করার জন্য হিয়েরোপোলিসের জনসাধারণ পশুপাখিদের পায়ে দড়ি বেঁধে ছুঁড়ে দিত গুহার ভিতর। কয়েক মিনিটের মধ্যে ছটফট করতে করতে মারা যেত প্রাণীগুলি।

মৃত্যুর পর তাদের নিথর দেহগুলি দড়ি টেনে বাইরে বার করে নিয়ে আসা হত। তারপর সেগুলি পুড়িয়ে তাদের মাংস প্রসাদ হিসাবে দেওয়া হত উৎসর্গকারীর হাতে।

নির্দ্বিধায় গুহায় প্রবেশ করতেন ‘গালি’ পুরোহিতেরা

মন্দির ও গুহায় প্রবেশের একমাত্র অধিকার ছিল ফ্রিজিয়ার দেবী সাইবেলের উপাসক খোজা পুরোহিতদের। যাঁদের নাম ছিল গালি (Galli)। হিয়েরোপোলিসের মানুষ যাঁদের ভাবতেন দেবতার প্রতিনিধি। তাঁরাই একমাত্র ঢোকার ক্ষমতা রাখতেন প্লুটোনিয়নে। হামাগুড়ি দিয়ে গুহায় ঢুকতেন। কয়েক ঘণ্টা পরে বেরিয়ে আসতেন।

হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ত বাইরের অপেক্ষমান জনতা। তারা ভাবত এটা মিরাকল। খোজা পুরোহিতরা প্লুটোনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসে উপস্থিত মানুষজনকে বোঝাতেন, তাঁরা দৈব ক্ষমতার অধিকারী। মানুষও বিশ্বাস করত, ফলে সেই সময় সমাজে গালি পুরোহিতরা সর্বোচ্চ ক্ষমতা উপভোগ করতেন।

গালি পুরোহিত

রহস্যটা কী!

গবেষকরা বলছেন, এই সব মৃত্যুর পিছনে অলৌকিক কোনও কারণ নেই। সবটাই ছিল ‘গালি’ পুরোহিতদের বুজরুকি। মানুষ ও পশুপাখির মৃত্যুর কারণ হল মন্দিরের নীচের গুহা থেকে উঠে আসা কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস। কারণ, বিজ্ঞানীরা গুহার ভেতর গবেষণা চালিয়ে বিশাল পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের ভান্ডার পেয়েছেন।

বাতাসে মাত্র  ১০% কার্বন ডাই অক্সাইডের উপস্থিতি যেখানে আধঘন্টার মধ্যে একজন মানুষকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে, সেখানে মন্দিরের নিচের গুহার বাতাসে এই গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৯১%। যা ভূতলের বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত তৈরি হয়ে চলেছে।

এ ছাড়াও প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেখেছেন গুহার নীচে থাকা উষ্ণ প্রস্রবন থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ারও মারণ ক্ষমতা আছে। মন্দিরের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখিরা গরম বাতাসের  আকর্ষণে গুহার ভেতরে প্রবেশ করে। এবং বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।

আগে এরকমই দেখতে ছিল প্লুটোনিয়ন

তাহলে পুরোহিতরা ভেতরে গিয়ে বেঁচে ফিরতেন কীভাবে!

কাকতালীয় ভাবেই পুরোহিতরাও আবিষ্কার করেছিলেন, মন্দিরের ভেতরে ঘটা মৃত্যুগুলির পিছনে আছে নীচে থেকে উঠে আসা কোনও গ্যাস। তাঁরা বুঝেছিলেন গ্যাসটি ভারী হওয়ায় গুহার মেঝের কাছাকাছি গ্যাসটির ঘনত্ব বেশী থাকে। তাঁরা জনগণকে দেখিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যেতেন গুহার ভেতরে। দমবন্ধ করা থাকত কয়েক মিনিটের জন্য।

গুহার ভিতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেন এবং দৌড়ে যেতেন গুহার ভেতর তাঁদের আবিষ্কার করা কিছু কিছু খোপে, যেখানে অক্সিজেন আছে। এই খোপগুলিতে অক্সিজেন ঢুকতো কিছু সংকীর্ণ ফাটল দিয়ে। তাঁরা ছাড়া এই খোপগুলির কথা সাধারণ মানুষ জানত না।

সেই খোপে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, আবার দম চেপে বাইরে আসতেন হামাগুড়ি দিয়ে। ‘গালি’ পুরোহিতদের দেখাদেখি অনেক সাধারণ মানুষ প্লুটোর করুণা পাওয়ার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে গুহার ভেতরে এগিয়ে যেতেন। কিন্তু তাঁরা পুরহিতদের বুজরুকিটা জানতেন না। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন। এইভাবে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে ‘গালি’ পুরোহিতেরা প্রচুর সম্পত্তি করতেন।

প্রত্নত্বাত্তিকদের মতে খ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত এই প্লুটোনিয়ন সক্রিয় ছিল। ষষ্ঠ শতকে খ্রীস্টানরা এই প্লুটোনিয়ন ভেঙে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে ভূমিকম্পের ফলে একেবারে মাটির নীচে চলে যায় প্লুটোনিয়ন। তাঁকে নিয়ে গড়ে ওঠা বুজরুকির সমাধিটি সেদিন হয়তো নিজের হাতেই খুঁড়েছিলেন পাতালের দেবতা প্লুটো।

Comments are closed.