বুধবার, মার্চ ২০

স্বস্তি! সেরে উঠছে পৃথিবীর রক্ষাকবচ ওজোন স্তরের ক্ষত

 দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ওপরের স্তরে আছে ওজোনোস্ফিয়ার বা ওজোন স্তর। যা  একটি পর্দার মতো ঘিরে আছে সবুজ পৃথিবীকে। এবং আমাদের পৃথিবীকে সূর্যের ক্ষতিকারক অতি বেগুনী রশ্মি থেকে রক্ষা করে আসছে। কারণ এটি  সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মিকে ভূপৃষ্ঠে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।

কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ক্রমবর্দ্ধমান ক্লোরিন পরমানুর প্রভাবে এই ওজোন স্তর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। ক্রমশ পাতলা হয়ে পড়ছিল ওজোন স্তর যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন Ozone Depletion। ফলে পাতলা হয়ে আসা ওজোন স্তরের স্থানে স্থানে তৈরি হচ্ছে গর্ত (Ozone Hole)। সেইসব গর্ত দিয়ে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি সরাসরি ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ছে। ১৯৮০ সালে প্রথম ধরা পড়ে যে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৮৫ সালে দেখা গেল যে দক্ষিণ গোলার্ধের ওজোন স্তরে বড়সড় একটি গর্ত তৈরি হয়েছে। ১৯৯০-এর  শেষদিকে  সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল পৃথিবীর এই সুরক্ষাকবচ। স্বাভাবিক অবস্থা থেকে  ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল ওজোন স্তর।

যেভাবে বেড়েছে ওজোন স্তরের ছিদ্র

 কেন ক্ষতি হয়েছিল ওজোন স্তরের 

প্রাকৃতিক কারণ: ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে যে প্রাকৃতিক কারণগুলি সেগুলি হলো, বজ্রপাত, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, বিভিন্ন আলোক-রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাব প্রভৃতি। তবে প্রকৃতি যেমন ওজোন স্তর ধ্বংস করে তেমনই প্রকৃতি নিজেই সেই ক্ষতিটুকু মেরামত করে দেয়। তাই প্রাকৃতিক কারণগুলি তেমন মারাত্মক নয়।

মনুষ্যসৃষ্ট কারণ:  ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পিছনে মূল দায়ী কিন্তু মানুষ। মানুষ সভ্যতার অমৃত নিয়ে হলাহল ঢেলে দিচ্ছে সেই পরিবেশে, যেখান থেকে সে বাঁচার রসদ নেয়। ওজোন স্তরকে সরাসরি ধ্বংস করছে বায়ুমন্ডলে উড়িয়ে দেওয়া আধুনিক সভ্যতার এই বিষগুলি।

ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC):  বিজ্ঞানীদের মত, পৃথিবীর সুরক্ষা চাদর ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্থ করার ক্ষেত্রে প্রধান অপরাধী ক্লোরোফ্লুরোকার্বন নামক এই রাসায়নিক যৌগটি।  ক্লোরোফ্লুরোকার্বনকে পরিবেশে ছাড়ছে  এয়ার কন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রের সার্কিট, ফোম শিল্প, রং শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, সুগন্ধি শিল্প, ট্যানারির বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ।

দূষিত হচ্ছে বাতাস

অন্যান্য মনুষ্যসৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থ:   কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, যানবাহন, নাইলন শিল্প, নাইট্রাস অক্সাইড(N2O)। বায়ুমন্ডলে জেটপ্লেনের ছেড়ে দেওয়া নাইট্রোজেন অক্সাইড(NO)।  এছাড়া অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের হ্যালোন যৌগ, অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে ভেঙে গিয়ে ব্রোমিন পরমাণুর সৃষ্টি করে। এই ব্রোমিন পরমাণু ওজোন গ্যাসকে ভেঙে দেয়। কলকারখানা, যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া থেকে বাতাসে মেশা সালফারের কণা,  মিথেন, মিথাইল ব্রোমাইড, মিথাইল ক্লোরাইড প্রভৃতি রাসায়নিক গুলিও ওজোন স্তরের ক্ষতির জন্য দায়ী। এবং যেগুলি পরিবেশে আসার জন্য মানুষই দায়ী।

ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে কী ক্ষতি হচ্ছে

অতিরিক্ত  অতিবেগুনী রশ্মি পৃথিবীতে এসে পড়ায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ও পৃথিবীর তাপের ভারসাম্য হারাচ্ছে। খাদ্য শৃঙ্খলের ক্ষতি হওয়ায় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হয়েছে ফলে বিপন্ন হয়েছে জীব বৈচিত্র। পৃথিবীতে ধোঁয়াশা ও অ্যাসিড বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রিন হাউস এফেক্টের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়নের পালে হাওয়া লেগেছে।

মাত্রাতিরিক্ত অতি বেগুনী রশ্মির প্রভাবে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। জীবকোষের উপর অতি বেগুনী রশ্মির প্রভাব খুব মারাত্মক।এই রশ্মি কোষের সৃষ্টি এবং বৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোষগুলোকে ভেঙ্গে ফেলছে। ফলে প্রাণী জগতের অনেক প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটছে। মানুষের ওপর তো ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার প্রভাব ভয়ঙ্কর। অতি বেগুনী রশ্মির প্রভাবে ত্বকের ক্যানসার হচ্ছে। ওজোন স্তরের মাত্র ৫% ক্ষতির জন্য সারা বিশ্বে ৫ লাখ মানুষ ত্বকের ক্যানসারে ভুগছেন। পৃথিবীতে ১% অতি বেগুনী রশ্মি বৃদ্ধির ফলে সাদা চামড়ার লোকদের মধ্যে নন-মেলোনোমা জাতীয় ত্বকের ক্যানসার বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ গুণ। কম বয়েসে চোখে ছানি পড়ছে। নখ ও চুল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অতি বেগুনী রশ্মির প্রভাবে হওয়া ত্বকের ক্যানসার

প্রাণীজগতকে যারা প্রত্যক্ষ ভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই উদ্ভিদ জগতের ওপর ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব আরও মারাত্মক। গ্রিনলাইন অর্থাৎ উদ্ভিদশ্রেণি ক্রমশ নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন অর্থাৎ আণুবীক্ষনিক উদ্ভিদগোষ্ঠী অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। গাছেদের পাতাগুলো আকারে ছোট ও হলুদ হয়ে যাচ্ছে। ক্লোরোফিল নষ্ট হয়ে উদ্ভিদ ক্লোরোসিস রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। বীজের অঙ্কুরোদগম হচ্ছে না। খাদ্যশস্যের ক্ষতি হচ্ছে, ফসলে রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্ভিদের অকালমৃত্যু বাড়ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে।উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে।

 সুখের কথা

রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, পৃথিবী সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। ২০০০ সাল থেকে প্রতি দশকে ৩% হারে ওজোন স্তরের উন্নতি লক্ষ করা গেছে। তবে এখনও অনেক পথ পার হতে হবে আমাদের ওজোন স্তরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে। উত্তর গোলার্ধের ক্ষতিগ্রস্ত ওজোন স্তর পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হবে ২০৩০ সাল নাগাদ আর দক্ষিণ মেরুর ক্ষতিগ্রস্ত ওজোন স্তর ঠিক হতে সময় লেগে যাবে ২০৬০ সাল পর্যন্ত।  রাষ্ট্রসঙ্ঘ সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওজোন স্তরের মেরামতির সাফল্য বিশ্বব্যাপী চুক্তিগুলির সাফল্য।

কী ভাবে এলো সাফল্য

১৯৮৭ সালে কানাডার মন্ট্রিলে পৃথিবীর ১৮০ টি দেশ ‘মট্রিল চুক্তি‘তে সাক্ষর করে। চুক্তিতে সাক্ষর করা দেশগুলি ক্লোরোফ্লুরোকার্বনের  মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক উৎপাদন কমাতে সম্মত হয়েছিল। এবং এর ব্যবহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।  একই সঙ্গে নাইট্রাস অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার কণা নিয়ন্ত্রণ করবে কথা দিয়েছিল। এর পরে ১৯৯২ সালের জুন মাসে, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে হয় বসুন্ধরা সম্মেলন।  এই সম্মেলনে নেওয়া ‘এজেন্ডা ২১’ এর লিপিবদ্ধ বিষয়গুলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে কথা দিয়েছিল সম্মেলনে হাজির দেশগুলি। ওজোন স্তর ধ্বংস করছে যে উপাদানগুলি, তাদের বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব উপাদানগুলি ব্যবহারের উপর জোর দিতে বলা হয়েছিল এই ‘এজেন্ডা ২১’ -এ।

মন্ট্রিয়ল প্রোটোকলের ৩৬ তম অধিবেশন

নাসা’র গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের প্রধান আর্থ-সায়েন্টিস্ট  এবং ওজোন স্তর সংক্রান্ত রিপোর্টটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট পল নিউ-ম্যান জানিয়েছেন, তিনি খুবই খুশি। ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থগুলির উৎপাদন অব্যাহত থাকলে চূড়ান্ত ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো প্রকৃতিকে। তাই সেগুলির উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু পল নিউম্যানের সঙ্গে একমত নন, ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর প্রফেসর বায়ার্ন টুন,  তাঁর মতে এখনও পুরোপুরি সাফল্য আসেনি, “আমরা  ওজোন স্তরের  নির্দিষ্ট কিছু অংশ খুঁজে পেয়েছি যেখানে ওজোন স্তরের ক্ষত সেরে উঠছে”। তিনি বলেছেন ওজোন স্তরের ক্ষতি কাটানোর মূল বাধা চিন। চিন চুক্তিগুলিকে তোয়াক্কা না করে এখনও  ওজোন স্তরের পক্ষে ক্ষতিকারক রঙ আর পিভিসি তৈরি করছে এবং সেটাও নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে।

Shares

Comments are closed.