বিশ্বরেকর্ড করলেও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি ‘রেড বুক’

১৯৬৭ সালের মধ্যে পৃথিবীর ১১৭টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলএই রেড বুক। কম করেও ৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ষাটের দশক। বিশ্ব ইতিহাসে একের পর এক তুফান তোলা ঘটনার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল মানব সভ্যতার তীরে। সদ্য স্বাধীন হয়ে ডানা মেলছিল ফিদেল কাস্ত্রো-এর কিউবা। কিউবাকে স্বাধীনতা এনে দিয়ে, কিউবার মন্ত্রিত্ব ছেড়ে,কঙ্গো-কিনসাসা আর বলিভিয়াকে স্বাধীন করতে সশস্র সংগ্রামে নেমে পড়েছিলেন আর্জেন্টিনাজাত বিশ্ব-বিপ্লবী চে গেভারা। আমেরিকার সৈন্যরা ভিয়েতনাম যুদ্ধে নামবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তৈরি হচ্ছিল ভিয়েতকং গেরিলারাও।

    আরবরা লড়ছিল ইজরায়েলের সঙ্গে। বিটলসের সুরে উঠে আসছিল এক পৃথিবী উন্মাদনা। খুন হয়ে গিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেনেডি। বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং দিচ্ছিলেন তাঁর বিখ্যাত ভাষণ ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম‘। মহাকাশ নিয়ে প্রায় যুদ্ধে নেমে পড়েছিল আমেরিকা আর রাশিয়া। চাঁদে পা রাখতে চলেছিল প্রথম মানুষ। সুকর্ণ আমূল বদলে দিতে চাইছিলেন ইন্দোনেশিয়াকে। ঘটনাবহুল এই সময়ে ঘটেছিল আর একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা।

    বিশ্ব ইতিহাসকে চমকে দিয়ে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করেছিল লাল মলাটের একটি পকেট বই। যা নাকি, বইয়ের মলাটে লুকিয়ে থাকা সাম্যবাদের অ্যাটম বোমা। বইটি আসলে চিনের তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও জে দং-এর উক্তির সংকলন। যাকে বিশ্ব চেনে ‘রেড বুক’ নামে। বইটির উপর জলনিরোধক লাল ভিনাইল কভার দেওয়া থাকায় বইটির নাম হয়ে যায় ‘রেডবুক’।

    মাও জে দং

    এককালে এই বইটি পৃথিবী কাঁপিয়েছিল। এখনও কাঁপিয়ে যাচ্ছে প্রকাশনার নিরিখে। এখনও সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় প্রথম তিনেই আছে এই ‘রেডবুক’। বাকি দুটি হলো ধর্মগ্রন্থ, বাইবেল ও কোরান শরীফ। তবে প্রকাশের সংখ্যায় নাকি ‘রেড বুক’ সবাইকেই ছাপিয়ে গেছে। ১৯৬৪ সালের ৫ জানুয়ারি, পার্টি কনফারেন্সে ‘মাও জে দং-এর উক্তি’ নামে রেডবুকের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। চিনা ভাষায় ছাপা রেড বুকে থাকা মাওয়ের উক্তিগুলির কোনওটি ছিল এক বাক্যের, কোনওটি কয়েক বাক্যের। কনফারেন্সে আগত সদস্যদের হাতে বইটি তুলে দেওয়া হয়েছিল।

    রেড বুকের প্রথম এডিশনে ছিল ২৩ অধ্যায়। এই অধ্যায়গুলিতে ছিল, ২৩টি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মাও জে দং-এর ২০০ টি উক্তি । রেড বুকের আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটি চিনে বিখ্যাত হয়ে যায়। চিনের কমিউনিষ্ট পার্টিতে হাহাকার পড়ে যায় বইটি সংগ্রহ করার জন্য। বাধ্য হয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই ছাপতে হয় পরের এডিশন। দ্বিতীয় এডিশনে ছিল ২৫টি বিষয় এবং ২৬৭ টি উক্তি।

    ১৯৬৪ সালের মে মাসে, সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন বইটির পরিমার্জন ঘটায়। রেড বুকের ভেতর, মোটা লাল হরফে লেখা  কমিউনিষ্ট ম্যানিফেষ্টো-এর সেই বিখ্যাত “দুনিয়ার মজদুর, এক হও” (Workers of the world, unite)“  স্লোগানটি জুড়ে দেওয়া হয়,। সেই সঙ্গে এই এডিশনে জুড়ে দেওয়া হয় মাও-এর উত্তরাধিকারী বলে চিহ্নিত, চিনের মার্শাল লিন বিয়াও-এর অনুমোদন পত্র। রেড বুকের এই এডিশনটি ছাপা হয়েছিল চিনের গণমুক্তি ফৌজের নেতা ও সদস্যদের জন্য।

    রেড বুকের সর্বশেষ এডিশনটিতে আছে ৩৩টি অধ্যায়ে মাওয়ের ৪২৭টি উক্তি। রেডবুকের অধ্যায়গুলির মধ্যে আছে, কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম, সোশ্যালিজম এবং কমিউনিজম, যুদ্ধ ও শান্তি, সংগ্রাম ও জয়ের স্পর্ধা, মানুষের যুদ্ধ, পিপলস আর্মি, পার্টি কমিটির নেতৃত্ব, প্রভৃতি অধ্যায়। চিনের সংস্কৃতি দফতর ১৯৬৬ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল,  চিনের ৯৯% মানুষের কাছে রেড বুক পৌঁছে দেবেন। চিনের তৎকালীন সরকার চাইছিল, চিনের মানুষ তাঁদের জীবনযাত্রার সব সমস্যার সমাধান করতে মাওয়ের রেড বুক’কে হাতিয়ার করুন। তাই একসময় চিনের মানুষদের জন্য রেড বুক পড়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। চিনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের কাছে বাইবেল হয়ে ওঠে এই রেড বুক।

    ১৯৬৬ সালে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রচার বিভাগ এই রেড বুক’কে বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করার অনুমতি পায়। বইটি বিদেশের পাঠকদের জন্য তৈরি করে চিনের ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ প্রেস। ১৯৬৭ সালের মধ্যে পৃথিবীর ১১৭টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলএই রেড বুক। কম করেও ৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। আমেরিকার বিব্লিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির হিসেবে, ১৯৬৭ সালের মধ্যে ৭২ কোটি কপি ‘রেড বুক’ ছাপা হয়েছে। মুদ্রণ সংখ্যার দিক থেকে হয়তো ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে বিশ্বরেকর্ড। উইকিপিডিয়ার মতে এখনও পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে ‘রেড বুক’ ছাপা হয়েছে ৬৫০ কোটি কপি। আবার www.publishingperspectives.com বা www.kgab.com এর মতে, রেডবুক বিক্রি হয়েছে আরও ২৫০কোটি কপি বেশি, অর্থাৎ ৯০০ কোটি কপি। যিনি যাই বলু্‌ন, ‘রেড বুক’ যে সংখ্যাতত্বের নিরিখে অপ্রতিরোধ্য তা বোঝাই যাচ্ছে।

    একসময় নাকি, পৃথিবী জুড়ে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছিল ‘রেড বুক’। সেই সময় চিনের ছাপাখানাগুলো রেড বুকের যোগান দিতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে কমিউনিজমের উপর লেখা অন্যান্য ক্লাসিকাল বইয়ের চিনা ভাষায় প্রকাশ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে বিশ্বের প্রায় সব দেশের পুলিশ ও প্রশাসনের মাথাব্যথার অন্যতম কারণও ছিল এই রেড বুক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপ্লবের পথে চলা যুবকদের পকেটে লাল বই পেলেই কঠোর শাস্তি ছিল অনিবার্য।

    ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর চিনে রেড বুকের বিজয়রথের গতি স্তিমিত হয়। চিন দেশে বাজার অর্থনীতির স্রষ্টা দেং জিয়াও পিং -এর আমলে বলা শুরু হয়েছিল, ‘রেড বুক’ নাকি কমিউনিজমের কক্ষপথ থেকে সরে গেছে। বইটিতে চেয়ারম্যান মাওকে ঈশ্বর (Cult of personality) বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যা কিনা কমিউনিজমের আদর্শ বিরোধী। সেই থেকে আজ অবধি, সারা বিশ্বে রেড বুকের জনপ্রিয়তা বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবুও  একটি বইয়ের রহস্যময় সাফল্য অবাক করে দিয়েছিল অনেককেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More