জাগো দুর্গা,জাগো দশপ্রহরণধারিণী….দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

চলে গেলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। ‘জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী’ – যে গান না শুনলে মহালয়াই হয় না বাঙালির, সেই গান তাঁরই গাওয়া। তাঁকে নিয়ে লিখলেন সুমন্ত্র মিত্র

সারা পৃথিবীর বাঙালি মহালয়ার এই গান গত ৬০ বছর ধরে অপার মুগ্ধতায় শুনে আসছে। ভবিষ্যতেও শুনবে।

এ ছাড়াও ওঁর কণ্ঠে অজস্র শ্রুতিমধুর রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাঙালির সোনাঝরা সন্ধ্যার সঙ্গী। সেই সব সন্ধ্যায়, যখন অফিস ফেরতা বাঙালি তার প্রাণের আরাম পেত ফিয়েস্তা রেকর্ড প্লেয়ারে। সেই গান এখনও অনেকেই শোনে ব্লু টুথ স্পিকার বা হেডফোনে।

আরও পড়ুন : গান ও ব্যক্তিত্ব – দুই মিলিয়েই দ্বিজেনদা: হৈমন্তী শুক্ল

একজন লম্বা ঋজু, শিরদাঁড়া সোজা আপাদমস্তক বাঙালি ভদ্রলোক। সাদা কলারওয়ালা পাঞ্জাবি আর কালো ফ্রেমের চশমা। এ যেন সেই চিরন্তন বাঙালিয়ানার প্রতীক। আজ যা আমরা খুব নিষ্ঠা নিয়েই প্রায় ভুলতে বসেছি। ওঁর গায়কি আর সাজপোশাকের সঙ্গে প্রবাদপ্রতিম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাদৃশ্য ছিল বেশ কিছুটা। কিন্তু তার সঙ্গেই ছিল ওঁর নিজস্ব স্বকীয়তা। প্রায় সারাজীবনই প্রচারবিমুখ হয়ে কাটিয়ে দিলেন বাংলা গানের এই দিকপাল।

দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলপনা রায় (মিত্র) গ্রুপ ফটো,এইচ এম ভি তে

আজকাল দেখি, কোনও শিল্পীর একটি গান জনপ্রিয় হলেই তিনি কোন টুথপেস্টে দাঁত মাজেন, কোন জুতো পরেন, আর এই বছর পুজোয় উনি আটলান্টায় না আজমীরে গান গাইতে যাচ্ছেন, সবই আমরা মুহূর্তের মধ্যে জেনে যাই প্রচার মাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রবল ঢক্কানিনাদে। অথচ এত জনপ্রিয়তার পরও, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় তাঁর গায়ক জীবন একবারও সোচ্চারে প্রকট করলেন না। বরং রাখলেন প্রচ্ছন্ন করেই।  এই শান্ত, স্থিতধী, প্রচারবিমুখ অভিজাত বাঙালিয়ানা আজকের দিনে বিরল আর শিক্ষণীয়। আমার প্রয়াত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মা’র (আল্পনা রায়ের (মিত্র) মুখে ছোটবেলায় ওঁর সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছি। মা বলতেন, খুব আন্তরিক, স্নেহপ্রবণ, কোমলপ্রাণ মানুষ ছিলেন দ্বিজেনবাবু। তাঁর গানের মতোই স্নিগ্ধ, মধুর, নম্র। একজন ঋজু ভদ্রলোক বাঙালি।

প্রবাদপ্রতিম পঙ্কজ মল্লিক, শান্তিদেব ঘোষ, সন্তোষ সেনগুপ্তকে শিক্ষক রূপে পেয়েছেন।

১৯৪৫ সালে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে আধুনিক গানে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে লাদাখে ভারতীয় সেনাদের গান শোনাতেও গিয়েছিলেন। আইপিটিএর দৌলতে সলিল চৌধুরীর সঙ্গে ছিল ওঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। সেই সূত্র ধরেই হিন্দি গানের জগতে প্রবেশ।

বিমল রায়ের বিখ্যাত  ‘মধুমতি’ ছবিতে গান গেয়েছেন। ডুয়েট গান গেয়েছেন কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গেও।

সলিল চৌধুরীর কথায় ও সুরে ‘শ্যামল বরণী ওগো কন্যা’ এই সেদিনও ‘সারেগামাপা’তে এক নবীন শিল্পীর গলায় শুনলাম। হ্যাঁ, ওঁরই গাওয়া। ওঁদের যুগলের আর এক অনন্য সৃষ্টি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘রেখো মা দাসে রে মনে’ ।
বিশ্বভারতী ও অল ইন্ডিয়া রেডিওর এক্সপার্ট কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ওঁর আরও একটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল সম্ভবত উনিই একমাত্র শিল্পী যিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ ১৯৬১ এবং সার্ধশতবর্ষের অনুষ্ঠানে ২০১১য় সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন।
যে সময় উনি গান গাইছেন, সেই পাঁচ-ছয়-সাতের দশকে, একই শিল্পী রবীন্দ্রসঙ্গীত আর বাংলা আধুনিক ও হিন্দি ছবির গান সমান দক্ষতায় গাইছেন ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন, এমন কৃতিত্ব বোধহয় ওঁকে বাদ দিলে শুধু সেই চিরদীপ্তিমান হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কারও নেই।

‘সাড়ে ৭৪’ এর সেই কালজয়ী বিখ্যাত গান ‘আমার এই যৌবন’এ শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের পাশে, আজ্ঞে হ্যাঁ, উনি ছিলেন ছবিতে ।


পদ্মভূষণ আর সঙ্গীত নাটক অকাদেমি ছাড়াও প্রভূত পুরস্কার পেয়েছেন।

ওঁর গান নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। শুধু সঙ্গীতের একজন ছাত্র হিসেবে বাংলা গানের এই পরম শ্রদ্ধেয় অভিজাত মহীরুহর সম্পর্কে একটাই কথা বলার, ওঁর আর এক বিখ্যাত গান ‘একদিন ফিরে যাব চলে’ র সূত্র ধরে, বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন উনি আরও বেশ কিছুদিন থাকলে বড় ভালো হত।

আরও পড়ুন

গান ও ব্যক্তিত্ব – দুই মিলিয়েই দ্বিজেনদা: হৈমন্তী শুক্ল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More