বুধবার, মার্চ ২০

গান ও ব্যক্তিত্ব – দুই মিলিয়েই দ্বিজেনদা: হৈমন্তী শুক্ল

চলে গেলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। বাংলা গানের তিনি এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পী। ‘কপালে সিঁদুর সিঁদুর টিপ পরেছো’ বা ‘সাতনরী হার দেব’ এর জন্য আজও তাকে মনে রেখেছে বাঙালি। পেয়েছিলেন পদ্মবিভূষণও। তাঁকে নিয়ে লিখলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া হৈমন্তী শুক্ল।  

আমার চোখে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় সেরা গায়ক, সেরা ব্যক্তিত্ব। নব্বইয়ের কাছে পৌঁছেও ধুতি পাঞ্জাবি পরে যখন হেঁটে আসেন মনে হয়, এমন ব্যক্তিত্ব কেন সব বাঙালির হয় না। চেহারায়-চলনে বলনে, কণ্ঠের তেজে তিনি মুগ্ধ করে রাখতে পারেন আমজনতাকে। সব প্রজন্মকে বেঁধে রাখতে পেরেছেন ওই সুরেলা কণ্ঠের অভাবনীয় জাদুতে।

‘এক দিন ফিরে যাব চলে’ আমার প্রিয় গান। এত দরদ দিয়ে এমন গান কেউ গাইতে পারে? জানি না। এমন একটা সময় আসে আমাদের সবারই তো সব মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হবে। ধ্রুব সত্যিটাকে অস্বীকার করি কী ভাবে? এখনও যখন ওই গানটা শুনি, তখনই ভাবি, সত্যিই একদিন তো ফিরে যেতে হবেই।

দ্বিজেনদার সঙ্গে কত দিনের, কত কালের যে পরিচয়। সেই কোন ছোটবেলায় উত্তর কলকাতার বাড়িতে আমার বাবা হরিহরণ শুক্লর কাছে তিনি আসতেন। তখন তো ভোরবেলায় আমি বাবার কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিতাম। আমার এখনও মনে আছে, আমার রেওয়াজ শুনে উনি বাবাকে বলেছিলেন, শুধু ক্লাসিকাল কেন, ও সব গানেই নিজেকে তুলে ধরতে পারবে। ওর গলায় সেই তেজ আছে।

আরও পড়ুন : জাগো দুর্গা,জাগো দশপ্রহরণধারিণী….দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়

যেন জ্যোতিষীর বাণীকেও হার মানায়। আমি ক্রমশ পরিপূর্ণ শিল্পী হয়ে উঠলাম। সত্তর দশকের পর থেকে আমার গাওয়া বেশ অনেকগুলো গানই মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হলেই মিচকি হাসতেন। কখনও বা এগিয়ে এসে মাথায় হাত দিতেন। আমার সৌভাগ্য, এমন অভিভাবক পাওয়া কম কথা নয়।

এই তো সেদিন বাণীচক্রে তাঁর সঙ্গে দেখা। আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘শোনও, নব্বই-য়ে পৌঁছে গেলাম।’ বয়স নিয়ে এরকম রসিকতা তিনি তো কখনও করেন না। তাই বিরক্ত মুখে কিছু বলতেই যাচ্ছিলাম। তিনি থামিয়ে দিয়ে এমন কথা বললেন, যা শুনে রাগ তো দূরের কথা, শ্রদ্ধায় মাথা হেঁট হয়ে গেল। বললেন, “তোমার গান শুনে আমার আয়ু বাড়ছে।”

এই হলেন আমার দ্বিজেনদা। কিছুটা ছেলেমানুষিও ছিল। আশির দশকে শহরতলির এক জমজমাট অনুষ্ঠানে গাইতে গেছি। তাবড়, তাবড় শিল্পী। দ্বিজেনদা তো ছিলেনই, পাশের দুরু দুরু বুকে গান গেয়েই স্টেজ থেকে নামছি, দেখি দ্বিজেনদা এগিয়ে এসে বলছেন, ‘খুব সুন্দর গাইলে তুমি’। আমি আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেলেছি।

দূরে কোনও মেলাতেও যখন এক সঙ্গে গেছি, দেখেছি তিনি আড্ডার ছলে এই গান-বাজনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা চিন্তা ভাবনার কথা বলতেন। সারাদিনই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান যেন এই সঙ্গীত দুনিয়া। খবরও রাখতেন। নতুন শিল্পীদের কার কেমন প্রতিভা তিনি তাও আড্ডার ছলে বলে ফেলতেন।

কয়েক দশক আগের কথা। এমনই এক অনুষ্ঠানের শেষে তাঁকে বড় আনমনা ও চিন্তিত দেখলাম। একটু ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলাম। কথা বলতে গিয়েও বলিনি। হঠাৎ তিনি ইশারা করে ডেকে হেসে উঠে বললেন, ‘একটা গানের সুর একটু অদলবদল করা যায় কি না, তাই নিয়ে ভাবছিলাম।’ ভাবা যায়, একজন যোগ্য শিল্পী সঙ্গীত সাধনাকে কোন স্তরে নিয়ে যেতে পারেন।

‘সিঁদুরের টিপ পরেছো’, ‘সাতনরী হার দেব’, এমন সব গানে বাংলা সঙ্গীত জগতের যে সমৃদ্ধি ঘটেছে, তার রেশ রয়ে যাবে অনন্তকাল ধরে, যতদিন বাংলা গান বেঁচে থাকবে, এই পৃথিবীর বুকে।

এমন সব শিল্পী আগামিতেও পৃথিবীতে জন্ম নেবে এমন আশা করা হয়তো ভুল হচ্ছে না। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

অনুলিখন: বিপ্লব কুমার ঘোষ

আরও পড়ুন

জাগো দুর্গা,জাগো দশপ্রহরণধারিণী….দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়

Shares

Comments are closed.