লিকাইয়ের চোখের জলে আজও রামধনু আঁকে চেরাপুঞ্জির ‘নোহকালিকাই’ ফলস

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ইস্ট খাসি হিলে পুবের সূর্য সবে উঠেছে। বেরিয়ে পড়ে লিকাই। পাহাড়ের ওপর সবুজ ঘাসের কার্পেটে তুলি দিয়ে আঁকা এক ছোট্ট মিষ্টি ‘রংযাইরতেহ’ নামের গ্রাম থেকে। সেই মায়াবী ঝর্ণার শব্দ তার কানে আসে। গাছের ডাল সরিয়ে রোজ দেখে ঝর্ণাটিকে। আশ যেন মেটে না। কত উপর থেকে কত আশা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নীচে। টলটলে সবুজ জলের ছোট্ট হ্রদে। ছিটকে পড়া জলের কুচিতে সূর্যের আলো পড়ে তৈরি হয় রামধনু। সেটা দেখে রোজ কাজে যায় লিকাই।

রামধনু যেমন মিলিয়ে যায় রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে। লিকাইয়ের জীবন থেকে মিলিয়ে গেছে রঙ। মাত্র উনিশ বছর বয়েসেই সে বিধবা। হারিয়ে ফেলেছে তার আশৈশবের সঙ্গী, তার প্রেমিক, তার স্বামীকে কোনও এক বর্ষার রাতে। সাপের ছোবলে।সেই থেকে লিকাই একা। তার ২ বছরের শিশুকন্যাটিকে বুকে জড়িয়ে বাঁচে। কিন্তু বাঁচতে গেলেও অর্থ লাগে।

তাছাড়া খাসিদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজে একটা মেয়ে বসে বসে খাবে তা সে ভাবতে পারে না। তাছাড়া তাকে বসিয়ে খাওয়াবেই বা কে। লিকাইকে তাই উপার্জনের জন্য পথে নামতে হয়। মালবাহকের কাজ করে লিকাই। জঙ্গলে মহাজনেরা কাঠ কাটায়। অনেকের সঙ্গে সেই কাঠ নিয়ে এসে রাস্তায় জমা করে।

প্রতিবেশীর কাছে মেয়েকে রেখে কাজে আসে লিকাই। তাই সারাক্ষণ মন পড়ে থাকে মেয়ের কাছে। মেয়ে তার ঠিক মতো আছে তো! সামনেই খাদ, দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়েনি তো! প্রতিবেশী মহিলা ঘুমিয়ে পড়েনি তো! বা ঘুমোলেও মেয়েকে ঘুম পাড়িয়েছে তো! নানান চিন্তা ঘিরে ধরে লিকাইকে।

দিনের শেষ মোটটা নামিয়ে পয়সা বুঝে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পাকদণ্ডি পথ দিয়ে লিকাই দৌড়ায় বাড়ির দিকে। বাড়ি ফিরে মেয়েকে কোলে নিয়ে তার শান্তি। চুমুতে চুমুতে আরও লাল করে দেয় মেয়ের গাল দুটো। দশ বারো ঘন্টা পরে মা’ কে পেয়ে আঁকড়ে ধরে মেয়েও। আনন্দে আবেগে ডুকরে কেঁদে ওঠে। এমনি করে দিন কেটে যায় অভাগী মা ও মেয়ের।

গ্রামেরই এক যুবক লিকাইয়ের প্রেমে পড়ে যায়। রোজ ভোরে গ্রামের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে লিকাইয়ের জন্য। প্রেম নিবেদন করে। কিন্তু জীবনের কাছে আঘাত পাওয়া লিকাই সায় দেয় না। যুবকটি তাকে বোঝায়, তার মেয়ের বাবা দরকার। আর তারা দু’জনে মিলে ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে তাকে। লিকাইকে একা চাপ নিতে হবে না। দেখায় নানান স্বপ্ন প্রেম নিবেদন চলতে থাকে দিনের পর দিন। চলতে থাকে লিকাইয়ের প্রত্যাখ্যান।

ধীরে ধীরে লিকাই মানুষটিকে ভালোবেসে ফেলে। কাজ টাজ বিশেষ কিছু করে না যুবকটি। জঙ্গলে পাখি, খরগোশ, সজারু, হরিণ শিকার ছাড়া। তাও রোজ শিকারে যায় না। একদিন তার নতুন প্রেমিককে বিয়ে করে নিল লিকাই। খাসি সমাজের নিয়মে লিকাইয়ের নতুন স্বামী লিকাইয়ের বাড়িতে চলে এল। লিকাই কাজে যায়। ঘর আর মেয়ে সামলায় তার দ্বিতীয় স্বামী। শিকারে যাওয়ার সময় প্রতিবেশীর বাড়ি দিয়ে যায় লিকাইয়ের মেয়েকে।

সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে বাড়ি ফেরে  ক্লান্ত লিকাই। এসেই কোলে তুলে নেয় একরত্তি মেয়েটাকে। তাকে নিয়ে মেতে ওঠে। পরম মমতায় গরম জলে কাপড় ভিজিয়ে তার গা মুছিয়ে দেয়। চুল আঁচড়ে দিয়ে পরিষ্কার পোষাক পরিয়ে দেয়।এই সময় মেয়েটিও এক মুহূর্ত মায়ের কাছ ছাড়া হতে চায় না। কোল থেকে নামালেই কাঁদে। রাতে স্বামী লিকাইকে সোহাগ জানাতে গিয়ে দেখে হাড়ভাঙা খাটুনিতে ক্লান্ত লিকাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এভাবেই চলে দিনের পর দিন।

নতুন স্বামীর মনে জমতে থাকে বিষ। তাকে উপেক্ষা করছে লিকাই। তার রাগ গিয়ে পড়ে ছোট্ট মেয়েটার ওপরে। লিকাই বেরিয়ে গেলে বিনা কারণে অত্যাচার করে ওই একরত্তি মেয়েটার ওপরে। কখনও খেতে দেয় না। কখনও মারধোর করে।

লিকাইয়ের নজরে পড়ে মেয়ের পরিবর্তন। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে মেয়ে। বাড়ি ফিরে লিকাই রোজ দেখে মেয়েটির চোখ বেয়ে নামা জলের দাগ। স্বামীকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পায় না। ছোট্ট মেয়েটিও হয়তো আরও যন্ত্রণার ভয়ে মাকে কিছু বলে না। মা আর মেয়ে দু’জনে দু’জনকে আরও আঁকড়ে ধরে। নতুন স্বামীর সঙ্গে লিকাইয়ের বাড়তে থাকে দূরত্ব।

এক দিন একটু আগেই বাড়ি ফিরেছিল লিকাই। খাসি পাহাড়ে সূর্য তখনও ডোবেনি। বাড়ি ফিরে দেখে তার স্বামী মাংস রান্না করে রেখেছে তার জন্য। লিকাই ফিরতেই থালা ভর্তি মাংস ধরিয়ে দেয়। মেয়েকে আশেপাশে দেখতে পায় না লিকাই। ভাবে স্বামী রান্না করছিল তাই প্রতিবেশীর বাড়িতে মেয়েকে রেখে এসেছে। লিকাই ভাবে খেয়ে নিয়ে মেয়েকে আনতে যাবে।সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্ষুধার্ত লিকাই মাংসটা গোগ্রাসে খেয়ে নেয়। লিকাইয়ের খাওয়া শেষ হলে তার স্বামী ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

আয়েস করে রোজকার অভ্যাস মত পান সাজতে বসে লিকাই। পানটা মুখে পুরে মেয়েকে আনতে যাবে সে। জাঁতা দিয়ে সুপারি কাটতে গিয়ে পানের বাটার পাশে সে অদ্ভুত কিছু দেখতে পায় লিকাই। তার গলা দিয়ে আর্ত চিৎকার বেরিয়ে আসে, “না-আ-আ–আ-আ-আ–আ”।

লিকাইয়ের  চিৎকার এ পাহাড়ে ও পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে লিকাইয়ের কাছে ফিরে আসে। পানের বাটার কাছে পড়ে আছে ছোট্ট একটি আঙ্গুল। মা চিনতে পারে তার মেয়ের আঙ্গুল। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী কেঁপে ওঠে লিকাইয়ের সামনে। সে তার শিশুকন্যার মাংস খেয়েছে। ঈর্ষান্বিত স্বামী তার শিশুকন্যাকে মেরে লিকাইকে খাইয়েছে।

লিকাইয়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে গ্রামবাসীরা। পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্বামীকে খুঁজে বের করে মারধোর করতেই স্বীকার করে সে, কিভাবে শিশুটিকে মেরে তার মাথা হাড়গোড় খাদে ফেলে,তার মাংস রান্না করে লিকাইকে খাইয়েছে। প্রমাণ লোপাট করার সময় হয়ত শিশুটির একটি আঙ্গুল পড়ে গিয়েছিল ঘরের মধ্যে।

পাথর হয়ে গিয়েছিল লিকাই। তাকিয়ে ছিল ছোট্ট আঙ্গুলটির দিকে। আঙ্গুলটিকে তুলে নিয়ে তাতে ঠোঁট ছুঁইয়েছিল লিকাই। রক্ত শুকিয়ে আছে আছে আঙ্গুলটির চারপাশে। তারপর হঠাৎই পাগলের মত ঘর ছেড়ে জঙ্গলের পথে ছুটতে শুরু করল লিকাই। পিছন পিছন গ্রামবাসীরা। মা হয়ে মেয়েকে খেয়েছে লিকাই। এক রাক্ষুসীর অভিশপ্ত জীবন নিয়ে কীভাবে বাঁচবে সে। দৌড়ে চলে লিকাই তীরের বেগে পাকদণ্ডি পথে। গ্রামবাসীরা আসছে পিছন পিছন।

ওই তো সেই ঝর্ণা। ওই তো তার মেয়ে ঝর্ণার মাঝে রামধনু হয়ে ডাকছে তাকে। লিকাই ঝর্ণা হবে। ঝর্ণা হয়ে রামধনু মেয়েকে বুকে জড়িয়ে থাকবে। আর কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না।

“আসছি মা… আসছি…এই তো মা এসে গেছি” পাগলের মত বিড়বিড় করে বকতে বকতে ঝর্ণার ধারে সবচেয়ে বড় পাথরটার ওপর উঠে দাঁড়ায়। খাসি পাহাড়ে ডুবন্ত সূর্য তখন দিনের শেষ রামধনু আঁকছিল ঝর্ণার বুকে। লিকাই রামধনুর বুকে দেখে মেয়ের মুখ। দু’হাত বাড়িয়ে মেয়ে ডাকছে তাকে।

দু’হাত বাড়িয়েই ঝাঁপ দেয় লিকাই ১১১৫ ফুট নীচে, তখনও তার হাতে ধরা ছোট্ট আঙ্গুলটি। সত্যিই লিকাই পৌঁছে যায় মেয়ের কাছে। আর কেউ কোনও দিন তাদের আলাদা করতে পারেনি। ঝর্ণা হয়ে গেছে লিকাই। ঝর্ণার নাম ‘নোহকালিকাই‘। আজও খাসি পাহাড়ে চেরাপুঞ্জির কাছে রামধনু মেয়েকে পরম মমতায় বুকে আঁকড়েই বাঁচছে লিকাই। অমর হয়ে।

সূত্র: খাসি লোকগাথা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More