আওকিগাহারা অরণ্য রহস্য! ‘বৃক্ষের সমুদ্রে’ আত্মহত্যা করে চলেছেন শয়ে শয়ে মানুষ

প্রেমে ব্যর্থ হওয়া মানুষেরা নিজেদের জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য ছুটে আসতে শুরু করে আওকিগাহারা বনে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    সূর্যোদয়ের দেশে সে অরণ্যের অবস্থান হলেও, সূর্যের আলো মোটে ঢোকে না সেখানে। চিরহরিৎ বৃক্ষরাজির ঘন বসবাসের ফাঁকে কোনও আলোর আভাস নেই। স্যাঁৎস্যাঁতে মাটি। ঘন গাছপালায় হাঁটাও দুষ্কর। জাপানের হনশু দ্বীপের ফুজি পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে আওকিগাহারা নামের এই অরণ্য।

    আয়তন ৩০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। এ অরণ্যের অপর নাম, বৃক্ষ-সাগর। সমুদ্রের মতোই নাকি অসীম সংখ্যক গাছ রয়েছে এখানে। কিন্তু বিখ্যাত এ অরণ্যের কুখ্যাতিও জগৎজোড়া। এ অরণ্যকে অনেকেই বলেন ‘আত্মহত্যার অরণ্য’। শয়তানের বন বলেও একে ডাকেন অনেকে। বলাই বাহুল্য, এমন ভীতিপ্রদ এবং নেতিবাচক আখ্যা অর্জন করার পিছনে নিশ্চয় কোনও কারণ রয়েছে এই অরণ্যের।

    Image result for aokigahara forestআত্মহত্যার অরণ্য আওকিগাহারা

    শোনা যায়, এই অরণ্যের আনাচ-কানাচে নাকি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের লাশ। অবাক হওয়ার ব্যাপার হলেও এটাই সত্যি। পরিসংখ্যান বলছে, এই বনে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০টির বেশি মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। তদন্ত করে জানা যায়, এই সব দেহের মালিকই প্রায় সকলেই কোনও না কোনও সময়ে এই বনে এসে আত্মহত্যা করেছিলেন।

    Image result for aokigahara forestজনশ্রুতি কথিত আছে, কোনও পর্যটক যদি এই বনে গিয়ে আত্মহত্যার কারণ নিয়ে সন্দিহান হন, তাহলে তাঁকে সেখানে যেতে বাধা দেন স্থানীয়রা। কারণ তিনি নিজে শেষমেশ বেঁচে ফিরবেন কিনা, তা নিশ্চিত নয়। এই বনে ঘটা আত্মহত্যার প্রায় সব কাহিনিই চমকে দেওয়ার মতো। প্রতি বছর একাধিক আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষ এই বনকে বেছে নেন। তাই এই বনের রয়েছে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল, তাদের ব্যবহৃত জামা-কাপড়, ব্যাগ, ঘড়ি। প্রবেশপথে পড়ে আছে অসংখ্য পরিত্যক্ত গাড়ি। এঁরা সকলেই বনে ঘুরতে আসার নাম করে আর ফিরে যাননি।

    আত্মহত্যার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কারণ: উপন্যাস!

    এই বনটির আত্মহত্যার বন হিসেবে নাম করার পেছনের বিভিন্ন কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য কাহিনিটি হল: ১৯৬০ সালে সেইচো মাতসুমোতোর নামে এক জাপানি লেখকের একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় ‘কুরোয় কাইজু’ নামের। রোম্যান্টিক ধারার এই উপন্যাসটি পাঠকদের কাছে ব্যাপক ভাবে সমাদৃত হয়। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে দেখা যায় দুই প্রেমিক-প্রেমিকা আওকিগাহারা বনে এসে আত্মহত্যা করেন।

    Image result for matsumoto writer suicideঅনেকে মনে করেন, বিখ্যাত এই উপন্যাসটি পাঠকের মনেএতই গভীর অনুভূতি ও আবেগ সৃষ্টি করে, যা তাদের আওকিগাহারা বনে গিয়ে আত্মহত্যা করতে উৎসাহিত করে! আর এই কারণেই হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি বা আত্মহত্যাপ্রবণ লোকেরা, বিশেষ করে প্রেমে ব্যর্থ হওয়া মানুষেরা নিজেদের জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য ছুটে আসতে শুরু করে আওকিগাহারা বনে। এই কারণে পরবর্তী কালে ওই উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করা হয় জাপানে।

    দেখুন ভিডিও।

    আবারও নিষিদ্ধ বই!

    এর পরে ১৯৯৩ সালে আর এক জাপানি লেখক ওয়াতারু তসুরুমুইয়ের ‘দ্য কমপ্লিট সুইসাইড ম্যানুয়াল’ নামের একটি বই প্রকাশিত হয়। অদ্ভুত ব্যাপার হল, তিনিও এই বইটিতে আত্মহত্যার জন্য সঠিক স্থান হিসেবে আওকিগাহারা বনকে উল্লেখ করেন! পুরনো সেই উপন্যাস এবং তার পরবর্তী আত্মহত্যার ঘটনাগুলির কথাও উল্লেখ করেন বিস্তারিত ভাবে! লেখকের ভাষায়, “এ যেন এক সহজ পথ। ওই বনে গিয়ে ভয়ঙ্কর সবুজের মধ্যে হারিয়ে যাও। তার পর কোনো গাছে উঠে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ো- শেষ করে দাও নিজেকে!”

    Image result for the complete suicide manual pdfএই কারণেই কিনা জানা নেই, বনটিতে আবারও আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তেই থাকে। আরও ভয় পেয়ে যাওয়ার মতো বিষয় হল, বনে পড়ে থাকা বেশ কয়েকটি মৃতদেহের পাশে পাওয়া গিয়েছিল ওয়াতারুর লেখা সেই বইটি! পরে নিষিদ্ধ হয় সেটিও।

    আত্মহত্যার সংখ্যা

    ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫০০ মতো জাপানি এখানে আত্মহত্যা করেছেন। ১৯৭০ সাল থেকে প্রতি বছরে একবার করে আওকিগাহারা বনে মৃতদেহের সন্ধান করা হয়। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও অনেক সাংবাদিকরা এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।

    Image result for golden bridge san francisco suicide
    সানফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন ব্রিজ

    ২০০২ সালে এই বনে মৃতদেহ পাওয়া যায় ৭৮টি, ২০০৩ সালে ১০০টি এবং ২০০৪ সালে ১০৮টি। তবে ২০১০ সালে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২৪৭ জন মানুষ এই বনে এসে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার জন্য ‘সানফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন ব্রিজ’-এর পরেই এই অরণ্য। গলায় দড়ি দিয়ে অথবা বেশি পরিমাণে মাদক নিয়েই মূলত আত্মহত্যা করা হয় এই অরণ্যে।

    Image result for aokigahara forestসম্প্রতি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা এই বনে কিছু মেঠো পথ তৈরি করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে মৃতদেহ সংগ্রহ করে বাইরে আনা হয়। ইদানীং ভ্রমণকারীরা তাদের যাওয়ার পথে প্লাস্টিকের এক ধরনের টেপ ব্যবহার করেন, যাতে তাঁদের যাওয়ার চিহ্ন দেখে তাঁরা পথ খুঁজে বার করতে পারেন।

    Image result for aokigahara forestনির্জনতায় শিহরন জাগে, নির্লিপ্ত হয় মানুষ

    আওকিগাহারা বন যে খুব ঘন গাছপালায় ঘেরা, তা আগেই জানা গেছে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এই বনে বন্যপ্রাণীদের বসবাস তেমন নেই বললেই চলে। কিছু সরীসৃপ আর পোকামাকড় হয়তো রয়েছে। তাই এ বনের পরিবেশ যেন একটু বেশিই নির্জন। সেই কারণে, সকলে বলেন, বনের ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই নাকি অজানা এক শিহরন হয় শরীরে।

    Image result for aokigahara forestঘন অথচ নির্জন পরিবেশ মনের ভাবনা অন্য রকম করে তোলে। মনে হয়, বাইরের দুনিয়ায় ফিরে যাওয়া অপ্রাসঙ্গিক। তবে এসব কথাই লোকমুখে প্রচারিত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান থেকে প্রাপ্ত। আসলে ঠিক কী ঘটে, তা কেউই বলতে পারেননি। হয়তো যারা পারতেন, তারা কেউ বনের বাইরে জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে আসেননি। যারা এসেছেন, তারা বোঝাতে পারেননি।

    Image result for aokigahara forestঅশুভ শক্তির কাহিনি ও ব্যাখ্যা

    স্থানীয় বহু মানুষ আবার বলেন, এই বনে কোনও অশুভ শক্তির অধিষ্ঠান রয়েছে। তাই এই বনে কেউ গেলে আর ফিরে আসতে পারে না। যদি বা কেউ ফিরে আসে, তাহলে নাকি পরে কোনও না কোনও কারণে তাঁদের অস্বাভাবিক মত্যু হয়। অশুভ শক্তি তাদের হত্যা করে। লোকমুখে এমন কাহিনি বেশ প্রচলিত। এর কারণও আছে।

    Image result for aokigahara forestশোনা যায়, বর্তমানে সম্পদশালী জাপান একসময় এতটা অবস্থাশালী ছিল না। সে সময় জাপানে ঘনঘন দুর্ভিক্ষ হতো। দুর্ভিক্ষের কারণে অনেক পরিবারে নেমে আসত নিদারুণ দুর্ভোগ। না খেয়ে মারা যেত অনেকে। অনাহারের কষ্ট লাঘবে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের রেখে আসা হতো ওই বনে। এতে পরিবারে খাওয়ার মানুষ কমে যেত। আর যাদের বনে রেখে আসা হতো, না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেত তারা।

    Image result for aokigahara forestঅনেকের মতে, অনাহারে কষ্ট পেয়ে মারা যাওয়া এসব দুর্ভাগা মানুষের অতৃপ্ত আত্মা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই বনে। তারাই বেড়াতে যাওয়া মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে, তারাই বুঝি প্রতিশোধ নেয়! তবে এই সব কাহিনি অনেকটাই অনুমান-নির্ভর এবং লোকমুখে প্রচলিত কুসংস্কার। কেউই আজ পর্যন্ত আওকিগাহারা বনের এই আত্মহত্যার ঘটনার পেছনের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

    Image result for aokigahara forestবিষণ্ণতা, একাকীত্ব, মৃত্যুর পরে বন্ধুর খোঁজ

    তবে এ সব জনপ্রিয় কাহিনি ও কুসংস্কারের পাশাপাশি গবেষকরা আরও একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যেটি সামাজিক ও বাস্তবিক ভাবে খানিকটা গ্রহণযোগ্য। তাঁদের মতে, যত দিন যাচ্ছে, জাপাতে তত বিষণ্ণতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ আরও বেশি করে একলা হচ্ছে, অসহায় হচ্ছে একটা বয়সের পরে। একটি সমীক্ষায় জানা গেছে, অনেক জাপানি মানুষই মনে করেন বাস্তব জীবনে যেহেতু তাঁরা একা, তাই তাঁরা ওই বনে গিয়ে আত্মহত্যা করলে অন্য মৃত আত্মাদের সঙ্গে থাকতে পারবেন মৃত্যুর পরে। আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে ফেরা এক ব্যক্তির বক্তব্যও গবেষকদের এই দাবির সত্যতা স্বীকার করে।

    Image result for aokigahara forestসামাজিক বা অলৌকিক, এই আত্মহত্যা প্রবণতার কারণ যাই হোক না কেন, এই বনটির নাম শুনলেই বহু জাপানি মানুষের মনে ভয়ের হিমেল স্রোত বয়ে যায়। কারণ এই বনটিই কেড়ে নিয়েছে তাঁদের অনেকের প্রিয়জনকে। এই অরণ্যে আত্মহত্যা ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন একটি সতর্কবার্তা লিখে রেখেছে প্রবেশ দ্বারে। “তোমার জীবনটি একটি মহামূল্যবান উপহার। শান্ত মনে একবার হলেও ভাই, বোন, সন্তান ও পরিবারের অন্য সকলের কথা ভাবো।” এই লেখা পড়ে কেউ আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত বদলেছেন কিনা তার কোনও প্রমাণ নেই, তবে আত্মহত্যার সংখ্যা যে কমেনি, তা বলছে সরকারি তথ্যই।Image result for aokigahara forest

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More