মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

পাকিস্তানের রণতরী ডুবিয়ে করাচি বন্দর ছারখার করে দিয়েছিল ভারতীয় নৌসেনা: অপারেশন ট্রাইডেন্ট

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

চৈতালী চক্রবর্তী

১৯৭১ সালের ৩ ও ৪ ডিসেম্বর। ভারতীয় নৌবাহিনীর জ্বালাময়ী প্রতিঘাতে কেঁপে উঠেছিল পাকিস্তানের করাচির নৌবন্দর। ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ভারতের রণতরী ছারখার করে দিয়েছিল শত্রু পক্ষের দম্ভ। ’৭১-এর ভারত-পাক যুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব হয়ে আছে এই নৌযুদ্ধ। ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’ ও ‘অপারেশন পাইথন’ ভারতীয় নৌবাহিনীর গর্বের ইতিহাস লিখেছিল। যুদ্ধের পটভূমিকা যদিও ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছিল বহু আগেই, তবে অতর্কিতে ভারতের নৌসেনার আক্রমণের কোনও জবাবই দিতে পারেনি পাকিস্তান।

‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’-এর কথা ফিরিয়ে আনার কারণ হল, আজ সেই ৪ ডিসেম্বর। ভারতীয় নৌবাহিনীর পরিক্রমকে স্মরণীয় করে রাখতে আজকের দিনেই তাই পালিত হয় নৌসেনা দিবস। গত ২ ডিসেম্বর দেশের প্রতিরক্ষায় আরও এক নতুন ইতিহাস লিখেছে ভারতীয় নৌবাহিনী। প্রথা ভেঙে নৌসেনার পাইলটের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে ২৪ বছরের সাব লেফটেন্যান্ট শিবাঙ্গির স্বরূপের হাতে। এই প্রথম নৌবাহিনীর এয়ার উইংয়ের ডরনিয়ে ২২৮ টুইন টার্বোপ্রপ এয়ারক্রাফ্টের ককপিটে বসলেন কোনও মহিলা।


ভারতীয় নৌসেনার শক্তির কথাই যদি আজ আলোচ্য বিষয় হয় তাহলে ১৯৭১ সালের ভারত-পাক নৌযুদ্ধের কথাই সবচেয়ে আগে উঠে আসে। সেই সময় দাঁড়িয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োগ চমকে দিয়েছিল শত্রুসেনাদের। আঘাতের পর আঘাত আর পাল্টা প্রত্যাঘাতের সময়টুকু দেয়নি। যুদ্ধের প্লট সাজানো চলছিল কয়েক বছর আগে থেকেই।

১৯৬৫ ‘অপারেশন দ্বারকা’র পরে অনেক সতর্ক ভারত, রাশিয়া থেকে এল শক্তিশালী রণতরী

১৯৬৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। ভারতের পশ্চিম উপকূলে অতর্কিতে হামলা চালায় পাকিস্তানের সাতটি রণতরী। করাচি থেকে ২০০ মাইল দক্ষিণে ভারতের দ্বারকায় নৌবাহিনীর রেডার স্টেশনে পাক নৌবহরের সেই হামলার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন দ্বারকা।’ কম্যান্ডার এস এম আনোয়ার সেই অপারেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পাক নৌবাহিনীর সেই হামলায় নিজেদের শক্তিশালী অস্ত্র সামরিক ডুবোজাহাজ ‘পিএনএস গাজি’কে ব্যবহার করেছিল পাকিস্তান। অতর্কিতে সেই হামলায় জয়ের হাসি হেসেছিল পাক নৌবাহিনীই। সেই ধাক্কা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে ভারতীয় নৌসেনাকে। প্রয়োজন পড়ে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী অত্যাধুনিক রণতরীর।

রণতরী ‘ওসা-১’

১৯৬৮ সাল। যুদ্ধের গন্ধ তখন আরও গাঢ়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শক্তিশালী রণতরী ‘ওসা-১’ চেয়ে পাঠায় ভারত। ওসা-১ যুদ্ধজাহাজ থেকে নির্ভুল লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে শত্রুজাহাজকে ধ্বংস করা যেত নিমেষে। নিজেদের মিসাইল বোট স্কোয়াড্রন তৈরির জন্য আটটি ‘ওসা-১’ রণতরীর দরকার ছিল ভারতের। শোনা যায় ভারতের নৌবাহিনীর কম্যান্ডাররা এই রণতরীর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন রাশিয়াতে গিয়ে। ১৯৭১ সাল নাগাদ ভারতের অস্ত্রভাণ্ডারে যোগ দেয় রাশিয়ার এই রণতরী।

১৯৭১ সাল, নৌবহর সাজাচ্ছে ভারত, চুপিচুপি করাচি বন্দরের তথ্য সংগ্রহ করলেন গোয়েন্দারা

পূর্ব পাকিস্তানে তখন মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালাচ্ছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাষা আন্দোলন ততদিনে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। মার্চে ভারতীয় সেনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হাত ধরে পাকিস্তানের কব্জা থেকে মুক্ত হয়ে জন্ম হল স্বাধীন বাংলাদেশের। এই হার মেনে নিতে পারল না পাকিস্তান। জলপথে ভারতকে জবাব দেবে ঠিক করল। ফের পাঠানো হল পিএনএস গাজিকে। এই ডুবোজাহাজ ততদিনে আরও উন্নত ও শক্তিশালী। হামলা ঠেকাতে আসরে নামল ভারতের প্রথম উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রণতরী ‘আইএনএস বিক্রান্ত’। জয় হল ভারতীয় নৌবাহিনীর।

জয় তো হল, পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল ভারতীয় নৌবাহিনী। ফের যদি জলপথে হামলার পরিকল্পনা করে পাকিস্তান, তাহলে তাদের সেই বিষদাঁতই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পরে নৌসেনা অফিসাররা ঠিক করলেন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি বন্দর ও পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস করতে পারলেই পাকিস্তানের মনোবল ভেঙে যাবে। অতি গোপনে নৌঅভিযানের প্রস্তুতি শুরু হল।করাচি বন্দরের নকশা ও হালহকিকতের খবর এনে দিলেন গোয়েন্দারা। কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে করাচি বন্দরের আদলে অস্থায়ী বন্দর তৈরি করে ভারতীয় নৌবাহিনীকে সমুদ্রযুদ্ধের উন্নত প্রশিক্ষণ দেয় সোভিয়েতের নৌবাহিনী।

‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’-এর প্লট তৈরি, ছক সাজালেন নৌসেনা বীররা

করাচিতে অতর্কিতে প্রবল প্রত্যাঘাতের নাম দেওয়া হল ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট।’ রণসাজে সেজে উঠল ভারতের তিন ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রণতরী আইএনএস নিপাত (K86), আইএনএস নির্ঘাত (K89) ও আইএনএস বীর (K82)। প্রতিটি রণতরীর মধ্যে ছিল ৪টি করে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি SS-N-2B Styx SSM ক্ষেপণাস্ত্র। যাদের প্রত্যেকের পাল্লা ৪০ নটিক্যাল মাইল। তাছাড়াও ২টি আর্নালা গোত্রের অ্যান্টি-সাবমেরিন করভেট আইএনএস কিলতান ও আইএনএস কাচালি এই অভিযানে অংশ নিয়েছিল। ছিল ফিল্ড ট্যাঙ্কার আইএনএস পোশাক।

৩ ডিসেম্বর রাতে গুজরাটের ওখা বন্দর থেকে করাচির দিকে ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করে এই তিন রণতরী। আইএনএস নিপাতের কম্যান্ডার ছিলেন লেফটেন্যান্ট বিএন কাভিনা, আইএনএস নির্ঘাতের কম্যান্ডার লেফটেন্যান্ট আইজে শর্মা, আইএনএস বীরের কম্যান্ডার লেফটেন্যান্ট ওপি মেহতা।

৪ ডিসেম্বরের রাত, করাচি বন্দরে প্রবল আঘাত হানল ভারতীয় নৌসেনা

রাত সাড়ে ১০টা অস্ত্রসাজে সজ্জিত ভারতের নৌবহর পৌঁছল করাচির দক্ষিণপ্রান্তে ১৮০ নটিক্যাল মাইলে। রেডারে ধরা দিল পাকিস্তানের যুদ্ধজাহাজ।

আরও পড়ুন: ইন্দ্রলাল রায়, ভারতের প্রথম ‘ফাইটার এস’, বিশ্বযুদ্ধে একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন জার্মানির ৯ টি যুদ্ধবিমান

রাত ১০টা ৪৫ মিনিট। প্রথম আঘাত হানল আইএনএস নির্ঘাত। রাতের অন্ধকার চিরে গর্জে উঠল শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত করল পিএনএস খাইবার যুদ্ধজাহাজের ডান দিকে। আগুন ধরে গেল বয়লার রুমে। আর সময় নষ্ট নয়। আবারও গর্জে উঠল ক্ষেপণাস্ত্র। বিকট বিস্ফোরণে ছারখার হয়ে গেল পিএনএস খাইবার। মৃত্যু হল শত্রুপক্ষের প্রায় ২২২ জনের।

জ্বলছে করাচি বন্দর

রাত ১১টা। এবার শত্রুপক্ষের দিকে ধেয়ে গেল ভারতের আইএনএস নিপাত। পরপর দু’টি মিসাইলের ধাক্কায় ধরাশায়ী হল পাকিস্তানের এমভি ভেনাস চ্যালেঞ্জার, পিএনএস শাহাজাহান ও সি-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার।

রাত ১১টা ২০মিনিট। আইএনএস বীর নিশানা করল পিএনএস মুহাফিজকে। এক ধাক্কায় ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল পাক রণতরী। শোনা যায়, এই আঘাতে মৃত্যু হয়েছিল পাকিস্তানের ৩৩ জন নৌসেনার।

এর পরেও পাকিস্তানের একাধিক যুদ্ধজাহাজের জ্বালানি নষ্ট করেছিল ভারতীয় নৌবাহিনী। ডুবিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানের আধুনিক রণতরী। একটা গোটা রাতের অপারেশনে সামান্য আঁচড়ও লাগেনি ভারতীয় নৌসেনার গায়ে। বিজয়ের হাসি হেসে ৭ ডিসেম্বর ফিরে এসেছিল মুম্বইয়ের বন্দরে। শোনা যায়, গুজরাটের ওখা বন্দরে নাকি ক্রমাগত এয়ার স্ট্রাইক চালাচ্ছিল পাকিস্তান। তবে ভারতের একটিও রণতরীর ক্ষতি করতে পারেনি।

৪ ডিসেম্বর যুদ্ধজয়ের এই দিনটিকেই নৌসেনা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে । ওই তিন রণতরী ‘কিলার স্কোয়াড্রন’-এর তিন কম্যান্ডার লেফটেন্যান্ট বাহাদুর কাভিনা, লেফটেন্যান্ট ইন্দ্রজিৎ শর্মা ও লেফটেন্যান্ট ওম প্রকাশ মেহতাকে ‘বীর চক্র’ সম্মান দেওয়া হয়। পুরো অপারেশনের নির্ভুল ও দক্ষ পরিকল্পনার জন্য জি এম হীরানন্দানিকে দেওয়া হয় ‘নৌসেনা মেডেল।’ পরবর্তীকালে তিনি নৌসেনার ভাইস অ্যাডমিরাল হন। অসীম সাহসের জন্য কম্যান্ডার বাবরু ভান যাদব পেয়েছিলেন ‘মহাবীর চক্র।’

Share.

Comments are closed.