ভিক্ষেপাত্র নয়, বইখাতা হাতেই ওদের মানায় ভাল! মুম্বইয়ের স্টেশনে পড়ান বাঙালি ‘স্কাইওয়াক টিচার’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    সে দৃশ্য নতুন ছিল না কারও কাছেই। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত স্টেশনে প্রাত্যহিক জীবন ছুটে চলেছে প্রবল গতিতে, সেই ব্যস্ততার পাশে বসেই ভিক্ষে করছে কয়েকটি ছোট-ছোট বাচ্চা। কেউ দু-পাঁচ টাকা ছুড়ে দিচ্ছেন, বেশিরভাগই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন। বছর বাইশের তরুণীও তাই করতেন রোজ কলেজ যাওয়ার সময়ে। সেদিন কী যেন হল। ভিতর থেকে উঠে আসা কোন এক অজানা বাধায় বসে পড়লেন ওদের পাশে। মুম্বইয়ের ক্যান্ডিভেলি স্টেশনে তখন ভিড় বাড়ছে, বাড়ছে ব্যস্ততা। আর প্রবাসী বাঙালি তরুণীর চোখে ভাসছে, শিশুগুলোর ভবিষ্যতের ছবি।

    বছর দেড়েক আগের ঘটনা। হৈমন্তী সেনের মনে হয়েছিল, বাচ্চাগুলির কি শিক্ষার অধিকার নেই? শিক্ষা কি তাদের জীবনে কি কোনও বদল আনতে পারবে না? শুধু শিক্ষাই বা কেন, অন্য মৌলিক অধিকারগুলোও কি তারা পাচ্ছে? অধিকার শব্দটা কি আদৌ জানে তারা? উত্তরগুলো খুঁজতে রেললাইনের ধারের ভাঙাচোরা ঝুপড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন ২২ বছরের মেয়েটি। 

    স্কাইওয়াকেই ক্লাসরুম।

    বাচ্চাগুলির পরিবারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি রোজ এক ঘণ্টা করে পড়াবেন স্টেশনে ভিক্ষে করা ওই বাচ্চাগুলিকে। “প্রথমে পাত্তাই দেয়নি কেউ। ভেবেছিলেন, হয়তো মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। কেউ ভেবেছিলেন দু’দিনেই হয়তো ‘শখ’ মিটে যাবে। কিন্তু আমি এখটা কথা বুঝতে পেরেছিলাম, ওদের পড়াশোনা নিয়ে পরিবারের কোনও পরিকল্পনাই নেই। সকলে ধরেই নিয়েছে, ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”– বলছিলেন হৈমন্তী।

    কিন্তু কোনও সাপোর্ট না পেয়েও, হাল ছেড়ে দেননি তিনি। তাই ঠিক করেন, কেউ পাশে থাকুক বা না থাকুক, তিনি চেষ্টা করবেনই। তিনি বললেন, ‘‘আমি প্রথমে ঠিক করলাম স্কুলে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা করব ওদের। তার পরে নিজেও পড়াব। সকলেই বারণ করেছিল। বলেছিল, আমি নাকি পারব না। আমার কিছু যায় আসেনি তাতে। আমার চেষ্টা করার ছিল, সফল হই বা না হই।’’

    যেন নতুন অধ্যায় শুরু হল হৈমন্তীর জীবনে। নিজের পড়াশোনা সব সামলে এসে অন্য এক পরীক্ষায় বসতেন তিনি। স্টেশনের সিঁড়িতে বসে অক্ষর পরিচয় করানো, সংখ্যা চেনানো। প্রথমে কেউ আসতেই চাইত না। কখনও আবার প্রবল ভিড়ে দু’দণ্ড শান্তি মেলাই দায় ছিল। কখনও আবার পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয়েছিল। পথচারীদের সমালোচনাও কম আসেনি। এর মধ্যেই প্রকৃতির নিয়মে এল বর্ষা। স্টেশন ভাসছে। স্কাইওয়াকের নীচে বাচ্চাদের নিয়ে সরে গেলেন হৈমন্তী।

    সেই থেকেই হৈমন্তী পরিচিত হয়ে উঠেছেন, ‘স্কাইওয়াক টিচার’ নামে। তখনও জানতেন না, স্কাইওয়াকের পথেই এক দিন আকাশ ছুঁয়ে ফেলার পথে হাঁটবেন তিনি বাচ্চাদের নিয়ে।

    হৈমন্তী কাজ শুরু করার পর থেকে বাধা যেমন এসেছে, সাহায্যও এসেছে অপ্রত্যাশিত ভাবে। এক জন আমাদের পড়াশোনা করতে দেখে, এগিয়ে এসে খোঁজ নিলেন। তার পরের দিনই বেশ কিছু বই, খাতা, পেনসিল, অ্যালফাবেট চার্ট কিনে এনে দিয়েছিলেন তিনি। এক সময়ে পুলিশি ঝঞ্ঝাটের মুখে পড়লে, এগিয়ে এসেছিলেন নিত্যযাত্রীদের একাংশ। শুধু তাই নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি এক ব্যক্তির উদ্যোগে যোগব্যায়ামও শিখতে শুরু করে তারা। হইহই করে আয়োজন করে ফেলে পিকনিকেরও।

    এক সময়ে চাকরিবাকরির চিন্তা ছাড়তে বাধ্য হন হৈমন্তী। শুরু করেন এনজিও। একার উদ্যোগে সাত সদস্যের একটি সংগঠি তৈরি করেন, নাম দেন ‘জুনুন’। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর কাছে। তাঁর কথায়, “আমি জানতাম, ওদের মধ্যে কেউ হয়তো খুব বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে না। আমার উদ্দেশ্যও সেটা নয়। আমি চাই, ওরা পড়াশোনার গুরুত্বটুকু বুঝুক। সহবৎ শিখুক। সমাজের একটা অংশ হোক অন্তত। সেই চেষ্টাই করে চলেছি।”

    অনেক পরিবর্তন এসেছে খুদে পড়ুয়াদের জীবনেও। দেড় বছর আগে যাদের মুখে ছুটত গালাগালির ফোয়ারা, যারা লাইন করে দাঁড়াতেও পারত না, অনেকে পোশাকও পরত না ঠিক করে, তারাই যখন হাক-পা ধুয়ে পরিষ্কার জামা পরে রোজ বিকেলে বইখাতা হাতে পড়তে আসে, তখন হৈমন্তী একা নন, আরও অনেকেই মুগ্ধ হয়ে দেখেন তাদের।

    Babies are reading 😭❤️

    Junoon এতে পোস্ট করেছেন সোমবার, 30 সেপ্টেম্বর, 2019

    ধীরে ধীরে বাচ্চারাও স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে এই অভ্যেসে। লেখাপড়ায় আগ্রহও বেড়েছে তাদের। স্কাইওয়াক টিচার হৈমন্তীর কথায়, “ভিক্ষেপাত্রর বদলে বইখাতা হাতেই তাদের মানায় বেশি। তবে যা বহুদিন ধরে চলে আসছে, তাতে কোনও পরিবর্তন আনা সব সময়েই কঠিন। কিন্তু তা অসাধ্য নয় একেবারেই। ইচ্ছে আর জেদ থাকলে সাফল্য আসেই।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More