লামা ‘সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমি, আজও নাকি বাড়ছে নখ ও চুল

জীবিত অবস্থায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নিজেদের শরীরকে মমি বানানোর এই প্রথাকে বলা হয় শোকুশিনবৎসু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

     লাহুল স্পিতির ঐতিহাসিক টেবো মনাস্ট্রি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে আছে গুয়ে গ্রাম।  বছরে সাত আট মাস এই গ্রাম বরফে ঢাকা থাকে। ১৯৭৫ সালে এক ভয়াবহ ভুমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল হিমাচল প্রদেশের প্রত্যন্তে থাকা এই  গ্রাম।  মাটি থেকে প্রায় ৬০০০ মিটার ওপরে থাকা গ্রামটির সব কিছু ওলোটপালোট হয়ে গিয়েছিল সেই ভুমিকম্পে। কিন্তু সেই  বিধ্বংসী ভুমিকম্পই তুলে এনেছিল এক চাঞ্চল্যকর ইতিহাস।

    পাতালঘুম ছেড়ে উঠে এসেছিলেন ১৪০০ শতাব্দীর বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ‘সাঙ্ঘা তেনজিং‘। তবে জীবিত নয়, মমি হয়ে। ২০০৪ সালে আইটিবিপি জওয়ানরা উঁচু পাহাড়ে রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে সন্ন্যাসী সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমিটি খুঁজে পান।মমিটি এতটাই ভাল অবস্থায় সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল, যে মমিটির চামড়া এবং মাথার চুল দুইই অবিকৃত  ছিল।

    গুয়ে গ্রামে ‘সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মন্দির

    চিন এবং জাপানেও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের এরকম মমির খোঁজ পাওয়া যায়। জীবিত অবস্থায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নিজেদের শরীরকে মমি বানানোর এই প্রথাকে বলা হয় শোকুশিনবৎসু ( Sokushinbutsu)। মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নিজেদেরকে মমি করার প্রস্তুতি নেন। নির্জন কক্ষে নিজেদের বন্দী করে ফেলেন তাঁরা। কারও সঙ্গে দেখা করেন না। খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ একরকম ছেড়েই দেন। তবে এক ধরণের ভেষজ খাবার খুব অল্প পরিমাণে খান, যে খাবার তাঁদের মৃত্যুর পরে পরিবেশে থাকা কীটপতঙ্গদের তাঁদের শরীরের মাংস খাওয়া থেকে বিরত রাখে। কিন্তু এই খাবার শরীরে সামান্য শক্তিরও যোগান দেয় না। ফলে ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি কমতে শুরু করে।

    এক জায়গায় বসে তাঁরা ধ্যানে মগ্ন থাকেন। মোমবাতির আগুন গায়ের খুব কাছে রেখে ধীরে ধীরে নিজেদের ত্বক শুকিয়ে ফেলতে থাকেন। এইভাবে কেটে যায় মাসের পর মাস। একসময় সেই নির্জন কক্ষে নির্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট অবস্থাতেই মৃত্যু হয় মমি হতে চাওয়া বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের। শরীরের জলশুন্যতা, হিমশীতল ও শুষ্ক  আবহাওয়ায় প্রাকৃতিক ভাবেই মমিতে পরিণত হন শ্রদ্ধেয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। পৃথিবীতে এই পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া মমির সংখ্যা প্রায় তিরিশ। বেশিরভাগই পাওয়া গিয়েছে উত্তর জাপানের হনসুতে।

    গুয়ে গ্রামের মন্দিরে ‘সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমি

    জানা যায়, সন্ন্যাসী সাঙ্ঘা তেনজিং জীবিত অবস্থাতেই নিজেকে মমি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ধ্যানে মগ্ন থাকা অবস্থায় তেনজিং যখন বুদ্ধে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন তখন তাঁর বয়েস ছিল মাত্র ৪৫ বছর। বর্তমানে গুয়ে গ্রামে ‘সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মন্দির স্থাপিত হয়েছে। সেই মন্দিরের ভেতরে একটি কাচের বাক্সে সংরক্ষিত আছে ৫০০ বছর পুরানো এই মমিটি। গ্রামবাসীরা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মমিকে ঈশ্বর রূপে পুজো করেন। দেশ বিদেশের পর্যটকরা দেখতে আসেন সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমি।

    মমি বলতেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে মিশরীয় সভ্যতা, ইনকা সভ্যতার মমিদের ছবি। কিন্তু ভারতেও প্রাচীনকালে মমি তৈরির প্রথা ছিল তা ভাবতেই অবাক লাগে। মিশরীয় সভ্যতায় মমি বানাতে মৃতদেহের শরীরে বিশেষ ধরনের রাসায়নিকের প্রলেপ লাগানো হত। কিন্তু ‘সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমিতে সেরকম কোনও রাসায়নিকের প্রলেপ লাগানো হয়নি। তাইএত বছর ধরে মাটির তলায় চাপা পড়ে থেকেও কীভাবে মমিটি নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত ছিল তা অবাক করে দিয়েছে প্রত্নতত্ববিদদের।

    সাঙ্ঘা তেনজিং

    পেনসিল্ভেনিয়া ইউনিভার্সিটির আর্কিওলজি ও অ্যান্থ্রোপলজি মিউজিয়ামের স্কলার  ভিক্টর মেয়ার  নিজে সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমিটি পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, মমিটি খুব কম করে হলেও ৫০০ বছরের পুরানো  এবং মমির শরীরে নাইট্রোজেনের মাত্রা ছিল অস্বাভাবিক। এটি প্রমাণ করে তিনি দীর্ঘদিন অনাহারে ছিলেন।

    ‘সাঙ্ঘা তেনজিং-এর মমিটিকে ঘিরে রয়েছে একটি রহস্যও, যা আজ আজও ভেদ করা সম্ভব হয়নি, কারণ মমিটিকে আর পরীক্ষা করতে দিতে রাজি নন স্থানীয়রা। স্থানীয়রা বলেন, এখনও নাকি বেড়ে চলেছে মমিটির চুল এবং নখ। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এটিকে ভক্তির আতিশয্য বলেছেন, তবে তা মানতে নারাজ ভক্তরা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More