অ্যান্টার্কটিকায় ভাসছে অতিকায় পান্না সবুজ হিমশৈল, কেন এমন রঙ, শতাব্দী প্রাচীন রহস্য উন্মোচিত হল কি!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    সম্ভবত পৃথিবীর সব থেকে আকর্ষণীয় অঞ্চল অ্যান্টার্কটিকা। বিশ্বের শীতলতম ও শুষ্কতম মহাদেশ। পৃথিবীর দক্ষিণতম মহাদেশ, যেখানে ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরু অবস্থিত। দক্ষিণ মহাসাগর দিয়ে ঘেরা এই মহাদেশে লুকিয়ে আছে কত অজানা রহস্য। যার সন্ধানে ছুটে গেছেন রবার্ট ফ্যালকন স্কট, আমুন্ডসেনের মত প্রবাদপ্রতিম অভিযাত্রী থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত বিজ্ঞানী।

    অ্যান্টার্কটিকা

    ১.৯ কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরে মহাদেশটির  ৯৮ ভাগ ঢাকা আছে । দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করে  − ১০° সেলসিয়াস থেকে −৬৩ °সেলসিয়াসের মধ্যে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সূর্য দেখতে পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত গোধূলির মতো সামান্য আলো পাওয়া যায়।

    যে সব  উদ্ভিদ ও প্রাণী ভয়াবহ ঠাণ্ডার সঙ্গে লড়াই করতে পারে তারাই অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে টিকে থাকতে পারে। এই সব উদ্ভিদ ও প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে, খুনে তিমি, পেঙ্গুইন, সিল, কুমেরু চিংড়ি, কৃমি জাতীয় প্রাণী এবং বিভিন্ন প্রকার শৈবাল ও  অন্যান্য মাইক্রোঅর্গানিজম এবং ১০০০ এরও বেশি প্রজাতির ছত্রাক।

    এ হেন অ্যান্টার্কটিকার বেশ কিছু রহস্য বিজ্ঞানীরা উন্মোচন করতে পারলেও, একটা রহস্য তাঁদের ভাবিয়ে চলেছিল প্রায় একশো বছর ধরে। সেটি হলো অ্যান্টার্কটিকার পান্না সবুজ হিমশৈল।

    সবুজ হিমশৈল

     অ্যান্টার্কটিক হিমশৈল 

    অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগে প্রবল তুষারপাতের ফলে তৈরি হয় হল শক্ত বরফের বিরাট চলমান স্তুপ বা হিমবাহ (Glacier)।  নিজের ওজনের ভারে এবং মাধ্যাকর্ষণের টানে হিমবাহগুলি ধীরগতিতে অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগের ঢাল বেয়ে সমুদ্রের দিকে এগোতে শুরু করে।

    এভাবেই তৈরি হয় হিমশৈল

    তবে হিমবাহের বরফ এত পুরু হয় এবং হিমবাহের গতি এতই কম, সেটি যে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে তা চোখে দেখে বোঝা যায় না। এই হিমবাহই সমুদ্রের জলে এসে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। সমুদ্রে ভাসতে থাকে অতিকায় বরফ খণ্ড, লক্ষ লক্ষ টন বরফ নিয়ে। এই বরফ খণ্ডগুলির নামই হিমশৈল (Ice Berg)

    হিমশৈলের ৯ ভাগের মাত্র একভাগ থাকে জলের উপরে, বাকি ৮ ভাগ থাকে জলের নীচে। এই হিমশৈলে ধাক্কা খেয়ে ১৯১১ সালে ডুবে গিয়েছিলো বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক। প্রাণ হারিয়েছিলেন দেড় হাজারেরও বেশি যাত্রী।

    সাধারণ হিমশৈল

    সবুজ হিমশৈল!

    সূর্যরশ্মি লাল রঙ শোষন করে ও নীল রঙের প্রতিফলন ঘটায় বলে বিশুদ্ধ বরফ হয় হালকা নীল রঙের। অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রে ভাসতে থাকা বেশির ভাগ হিমশৈলের রঙ সাদা নয়তো হালকা নীল। কিন্তু ১৯০০ সাল থেকেই সাগর দাপিয়ে বেড়ানো বেশকিছু অভিযাত্রী ও নাবিক জানিয়ে গেছেন দক্ষিণ মহাসাগরে ভাসতে থাকা সবুজ রঙা, অদ্ভুতদর্শন হিমশৈলের কথা। অ্যান্টার্কটিকার পূর্ব দিকের সমুদ্রে ভেসে বেড়ায় অত্যন্ত দুর্লভ এই সবুজ হিমশৈলগুলি

    প্রতি ১০০০ হিমশৈলের মধ্যে একটা হিমশৈল সবুজ রঙের হয়। কিন্তু কেন এই  হিমশৈলগুলি  রঙ সবুজ! উত্তর খুঁজতে, তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল সামুদ্রিক আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদের উপস্থিতির কারণেই এই সবুজ হিমশৈলের সৃষ্টি। কিন্তু বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভিন্ন মত পোষণ করায় স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। রহস্যটা রহস্য হয়েই ছিল মাত্র কয়েক মাস আগে পর্যন্তও।

    রহস্য উন্মোচনে নামলেন বিজ্ঞানীরা

    অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া ইউনিভার্সিটির সমুদ্রবিজ্ঞানী (oceanographer) লরা হেরেইজ, ১৯৮০ সাল নাগাদ অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে যান। গিয়ে Amery Ice Shelf  এর  বরফে থাকা লোহার পরিমাণ পরীক্ষা করেন। সেই বরফের মধ্যে হিমবাহের বরফের তুলনায় ৫০০ গুণ বেশি লোহা ছিল।

    লরার পরীক্ষার ফলাফল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির হিমবাহবিদ, স্টিফেন ওয়ারেনের গুরু মস্তিষ্কে। সবুজ হিমশৈল রহস্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলেন সদলবলে। অ্যান্টার্কটিকা পৌঁছে সটান পর্বতারোহণের সরঞ্জাম নিয়ে উঠে পড়েছিলেন একটি প্রকাণ্ড হিমশৈলের মাথায়। যার রঙ ছিল সবুজ।

    বিজ্ঞানী স্টিফেন ওয়ারেন

    হিমশৈলের শিখরে উঠে হতবাক হয়ে যান বিজ্ঞানী ওয়ারেন। না, হিমশৈলের গাঢ় সবুজ রঙ দেখে ওয়ারেন অবাক হননি। অবাক হয়েছিলেন হিমবাহটির স্বচ্ছতা দেখে। অন্য হিমশৈলের ভেতরে দৃষ্টি যায় না  ভেতরে বাতাসের বুদবুদ থাকায়।। কিন্তু পান্না সবুজ হিমবাহটি ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ। এবং সবুজ হিমশৈলটির ভেতর কোনও বাতাসের বুদবুদ ছিল না। ওয়ারেন বুঝেছিলেন সেটি সাধারণ কোনও হিমশৈল নয়।

    নিজের প্রথম তত্ত্ব নিজেই খারিজ করেছিলেন ওয়ারেন

    ওয়ারেন ও তাঁর দলের গবেষকরা প্রথমে ভেবেছিলেন সমুদ্রের জলের অশুদ্ধতা সবুজ রঙের জন্য দায়ী। সমুদ্রের জল অশুদ্ধ হয়েছে জলে  দ্রবীভূত জৈব কার্বন ও বহু আগে মৃত সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর আণুবীক্ষণিক দেহাবশেষের জন্য। অশুদ্ধ জল জমে বরফ হয়ে গেছে।

    অ্যান্টার্কটিকায় সবুজ হিমশৈল নিয়ে গবেষণারত ওয়ারেনের টিম

    সাধারণত বিশুদ্ধ বরফ নীল রঙের। বরফে মিশে যাওয়া জৈব কার্বন ছিল হলুদ বর্ণের।  হলুদ আর নীল রঙ মিশে সবুজ রঙ তৈরি করছে। কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই ভুল প্রমাণিত করলেন। ১৯৯৬ সালের অভিযানে ওয়ারেন আর তাঁর সহযোগী গবেষকরা দেখলেন সবুজ হিমশৈলে ও নীল হিমশৈলে একই পরিমাণে জৈব কার্বন আছে। তাহলে সব হিমশৈলেরই সবুজ রঙ হওয়ার কথা। সুতরাং অন্য এমন কিছু ঘটছে যা কি না পান্না সবুজ হিমশৈলের সবুজ রঙের জন্য দায়ী।

    এলো দ্বিতীয় তত্ত্ব

    ওয়ারেন ও তাঁর টিমের সদস্যরা আবিস্কার করেছিলেন সবুজ  হিমশৈল তৈরি হয়েছে সমুদ্রের জল জমে হওয়া বরফ বা Marine ice দিয়ে। স্থলভাগের হিমবাহের বরফ (Glacier ice) দিয়ে নয়। এই সামুদ্রিক বরফ স্বচ্ছ এবং হিমবাহের বরফের চেয়ে গাঢ় রঙের হয়। কারণ এতে আলো প্রতিফলন করার জন্য কোনও বাতাসের বুদবুদ থাকে না ।

    হিমশৈলের সবুজ রঙের পিছনে আছে আয়রন অক্সাইড

    এই বিজ্ঞানী দলের মতে, হিমশৈলের সবুজ রঙের পিছনে আছে আয়রন অক্সাইড। আয়রন অক্সাইড মাটিতে, পাথরে  এবং মরিচায়  বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঙে পাওয়া যায়, যেমন হলুদ, কমলা, লাল ও বাদামি। বিভিন্ন রঙের হিমশৈল তৈরি হয়, হিমশৈলের বরফে আয়রন অক্সাইডের উপস্থিতির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। হিমশৈলের বরফে লোহার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে হিমশৈলের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা।

    কিন্তু সমুদ্রের জলে সাধারণত লোহার অভাব থাকে। তাহলে সামুদ্রিক বরফে আয়রন অক্সাইড আসছে কোথা থেকে! ওয়ারেন The Journal of Geophysical Research ম্যাগাজিনে সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর গবেষণা পত্রে লিখেছিলেন এই আয়রন অক্সাইড  সমুদ্রে আসছে অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগ থেকে।

     কিন্তু কী ভাবে!

    অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগের হিমবাহগুলি পাথুরে মেঝেতে (bedrock) ঘষা খেতে খেতে সমুদ্রের দিকে এগোয়। ঘর্ষণের ফলে পাথরের পাউডার তৈরি হয়, যাকে বলা হয় glacial flour। যখন হিমবাহ ভেঙে বরফ খণ্ড সমুদ্রে এসে পড়ে, পাথরের লালচে-হলুদ পাউডার সমুদ্রের জলে মিশে যায়।

    সমুদ্রের জল জমে সামুদ্রিক বরফ তৈরি হলে glacial flour বরফে প্রবেশ করে। ফলে সামুদ্রিক বরফ দিয়ে তৈরি হিমশৈলে  glacial flour মিশে যায়।  পাউডারের রঙ লালচে-হলুদ এবং বরফের রঙ হালকা নীল হওয়ায়,  নীল আর লালচে-হলুদ রঙ মিলে তৈরি করে হিমশৈলের সবুজ রঙ ।

    রঙের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে হল যুগান্তকারী আবিস্কার

    আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদের মুখ্য পুষ্টি উপাদান হচ্ছে লোহা। এদের খেয়েই বেঁচে থাকে সমুদ্রের বেশিরভাগ প্রাণী। তাই সমুদ্রের খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি হলো এই সব আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ। কিন্তু সমুদ্রে লোহার পরিমাণ খুবই কম। তাই প্রকৃতির আপন খেয়ালে দক্ষিণ মেরুর মূল স্থলভাগ থেকে দুর্মূল্য লোহা ফেরি করে উন্মুক্ত সমুদ্রে নিয়ে আসছে সবুজ হিমশৈল

    হিমশৈল গুলি সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে একসময় গলে যায়। সামুদ্রিক জীবনের জন্য অপরিহার্য উপাদান লোহা মেশে সাগরের জলে। সুরক্ষিত থাকে সমুদ্রের খাদ্য শৃঙ্খল। বাঁচে জৈব বৈচিত্র।

    গবেষণা পত্রের শেষে তাই ওয়ারেন বলেছেন, ” চিরকাল সবুজ হিমশৈলের রঙের উৎস নিয়ে আমাদের আকর্ষণ ছিল । কিন্তু এখন অনুভব করছি, সেগুলি সত্যিই আমাদের ভাবনার তুলনায় কয়েক কোটি গুণ দামী এবং প্রয়োজনীয়। কারণ সমুদ্রের জীবজগতকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তারা বাঁচিয়ে রেখেছে পুষ্টি উপাদান যুগিয়ে।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More