সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

রাতের আঁধারে হ্রদের জলে ভুতুড়ে নীল আলো, কিন্তু কেন!

  • 24
  •  
  •  
    24
    Shares

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সেই রাত

পৃথিবীর বুকে সে দিন নেমেছিল ঝিমকালো রাত। আকাশে ফুটে উঠেছিল কোটি কোটি  নক্ষত্র। সমুদ্রের ধারে বালিয়াড়ি ঘেরা লবণাক্ত জলের উপহ্রদের ( Lagoon) তীরে এসে দাঁড়িয়েছিল এক বিষণ্ণ মানব। তার প্রেয়সীকে নিয়ে।

গ্রামের সবাই তাদের রাক্ষস ভাবত। কারণ তাদের  দেখতে ছিল ভয়ঙ্কর। সমাজ  ওদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন দুজনে একসঙ্গে থেকেও তাদের সন্তান ছিল না। এ নিয়ে বড় দুঃখ ছিল তাদের মনে। কিন্তু তবুও তারা একে অপরকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসত।

ওরা ঠিক করেছিল, সে দিন  তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। মরণের পারে গিয়ে আবার দু’জনে নতুন করে সংসার বাঁধবে। যন্ত্রণাহীন সংসার। সন্তান হবে তাদের। তাকে বুকে জড়িয়ে বাঁচবে দু’জনে।

তাই বিদায় চুম্বন দিয়ে বড় একটি পাথরে উঠে পড়েছিল দু’জন। তারপর রাতের আকাশকে সাক্ষী রেখে দু’জনে ঝাঁপ দিয়েছিল উপহ্রদের জলে।

কিন্তু জলে ঝাঁপাতেই জলের নিচে জ্বলে উঠেছিল যেন হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র। দু’জনকে ঘিরে নাচতে শুরু করেছিল রহস্যময় নীল আলো। ভয়ে দু’জনে চোখ বুজে ফেলেছিল। নীল রঙের আলো ছেটানো ঢেউ তাদের ধাক্কা মেরে তীরের কাছে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল।

যখন তারা আবার চোখ খুলেছিল, তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল চরম বিস্ময়। অজানা কোনও মন্ত্রবলে তারা হয়ে উঠেছিল অসামান্য রূপবান আর রূপবতী।

কালো জলে ফণা তোলা আলোকিত নীল ঢেউ তখনও তাদের ঘিরে নাচছিল। পাগলের মত দু’জনে দু’জনকে জড়িয়ে ধরেছিল। হ্রদের জলে চুম্বন দিয়ে ছুটতে শুরু করেছিল  গ্রামের দিকে।

গ্রামের মানুষ তাদের দেখে চিনতেই পারেনি। ঘটনাটি বলার পর, গ্রামবাসীরা নতুন করে তাদের বরণ করে  নিয়েছিল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই, আদিম মানবীর কোলে এসেছিল ফুটফুটে একটি সন্তান।

সন্তানকে নিয়ে তারা একবার এসেছিল উপহ্রদের সেই তীরে। এক বছর আগে, যেখানে তারা তাদের জীবন শেষ করতে চেয়েছিল। হ্রদের জলে সদ্যোজাত শিশুটিকে একবার ছুঁইয়েছিল দম্পতি। তারা মনে করত, এই উপহ্রদ তাদের নতুন জীবনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে তাদের উপহার দিয়েছিল। হ্রদটিই শিশুটির আসল মা।

তারপর থেকে জামাইকার লোকগাথায় ‘যৌবনের হ্রদ নামে পরিচিত হয়ে যায় উপহ্রদটি। হ্রদের জলে  ডুব দিলে নাকি মানুষ সুন্দর হয়ে যায়, প্রজনন শক্তি বৃদ্ধি পায়। লোকগাথাটির অবশ্য কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি নিছকই একটি গল্প।

কিন্তু রহস্যময় নীল আলো!

জুলেভার্ন তাঁর Twenty Thousand Leagues Under the Sea নামে বিশ্ব কাঁপানো বইটির ২৩তম অধ্যায়ে সাগর জলের নীল দ্যুতির কথা লিখেছিলেন। কয়েক শতাব্দী ধরে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজের ক্যাপ্টেনরা রাতের সাগরের জল থেকে ঠিকরে বার হওয়া নীল, সবুজ, সাদা আলোর কথা বলেছেন। কিন্তু  কেউ তা বিশ্বাস করেননি। তবে বিশ্বাস যে একদিন করতেই হবে, এ কথাও বুঝি কেউ ভাবেননি।

কারণ, ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র জামাইকার ফেলমন্ট  শহর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে সত্যিই আছে সেই অবিশ্বাস্য উপহ্রদ দ্য ব্ল্যাক লেগুন। যে উপহ্রদের জল আজও রাতের আঁধারে ছড়ায় উজ্বল নীল দ্যুতি।

এই সেই উপহ্রদ

রাত্রে আপনি উপহ্রদের জলে নামুন। নামার সঙ্গে সঙ্গে আপনার শরীরের চারপাশের জলে, অদৃশ্য নীল নিয়ন বাতি জ্বলে উঠবে। সাঁতার কেটে উঠে আসার পরও আপনার শরীর থেকে ঠিকরে বের হবে নীল রশ্মি। নিজেকে মনে হবে গ্রহান্তরের মানুষ।

আপনার চোখের সামনেই উপহ্রদে তীরে আছড়ে পড়বে আলোকিত নীল ঢেউ। হ্রদের জলে ভাসতে থাকা নৌকাকে ঘিরে রাখবে নীল আলো। নেশা ধরানো মায়াবী নীলে, উপহ্রদের পরিবেশ হয়ে উঠবে স্বর্গীয়। যা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে কষ্ট  হবে আপনার। 

রহস্যটি কী!

না, ভূতুড়ে বা কোনও অলৌকিক কারণ নেই ঘটনাটির পিছনে। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক আগেই উপহ্রদের জলের নীল দ্যুতির রহস্য রহস্য ভেদ করেছেন। নীল আলোর জন্য দায়ী উপহ্রদের জলে বাস করা কোটি কোটি আণুবীক্ষণিক জীব (microorganisms)। যাদের বলা হয় ডাইনোফ্ল্যাজেল্লেট (dinoflagellates)।

ডাইনোফ্ল্যাজেল্লেট

হ্রদের জলের সামান্য কম্পন হলেই  এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবগুলি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখন তাদের শরীর থেকে উজ্বল নীল আলো বিকিরিত হয়। যাকে বলা হয়  জীব দ্যুতি বা  বায়োলুমিনিসেন্স (Bioluminescence , (Bio= জীব, luminescence= আলোক বিকিরণ)।  রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই জীবগুলি নিজেদের দেহে আলো তৈরি করতে পারে।তবে এই আলোর কোনও উত্তাপ নেই ।

জীব দ্যুতি কেবলমাত্র রাতেই দেখা যায়। স্থলজ ও জলজ উভয় প্রকার প্রাণীতেই এই রকমের দ্যুতি বা আলো দেখতে পাওয়া যায়। হাতের কাছেই আছে উদাহরণ, জোনাকি পোকা।

জীব দ্যুতি নির্গত হচ্ছে জোনাকির শরীর থেকে

দিনের বেলা ডাইনোফ্ল্যাজেল্লেটরা সূর্যালোকের সাহায্যে নিজেদের রিচার্জ করে নেয়। দিনের সূর্যালোক যত প্রখর হবে রাতে হ্রদের জলে ততটাই বেশি উজ্বল আলো ছড়াবে আণুবীক্ষণিক জীবগুলি। মেঘলা দিনের পরে আসা রাতে, হ্রদের জলে নীল আলোর দ্যুতি কমে যায় অনেকটাই।

বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন লুসিফেরিন নামের একটি রাসায়নিকের পদার্থের কারণে এই  আণুবীক্ষণিক জীবগুলি নীল আলো বিকিরণ করে থাকে। লুসিফারেজ নামে এক এনজাইমের সাহায্যে লুসিফেরিন জারিত হয়ে যখন অক্সি-লুসিফেরিনে পরিণত হয়, তখন ডাইনোফ্ল্যাজেল্লেটদের শরীর থেকে এই নীলচে আলো নির্গত হতে থাকে।

শুধু এই উপহ্রদেই নয়

পৃথিবীর কয়েকটি জায়গায় সাগরের জলে একই রকম নীল দ্যুতি দেখতে পাওয়া যায়। সোমালিয়ার পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি ভারত মহাসাগরে  Milky Sea নামে ১৬০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের একটা  অঞ্চল আছে যা রাতে জ্বলজ্বল করে। মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের কয়েকটি জায়গায়, রাতে এ রকম নীল আলো দেখতে পাওয়া যায়। ভারতের কেরালার উপকূলেও এই ঘটনা ঘটেছে।

তবে উজ্বলতার দিক থেকে সেরা কিন্তু জামাইকার উপহ্রদটি। কারণ আলো ছিটানো আনুবীক্ষনিক জীবদের ঘনত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি।  আসলে এই উপহ্রদকে  ঘিরে আছে  red mangrove tree।  এই গাছগুলি উপহ্রদের জলে প্রচুর পরিমাণে  vitamin B12  যোগান দেয়। যা এই আনুবীক্ষনিক জীবদের দ্রুত বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

রেড ম্যানগ্রোভ ঘিরে আছে উপহ্রদটিকে

প্রশ্ন হলো, জীবদের জীব দ্যুতির দরকার পড়ে কেন! এই ঠাণ্ডা আলো বা বায়োলুমিনিসেন্স  স্থলজ ও জলজ জীবদের কাজে লাগে খাবার খুঁজতে, ছদ্মাবেশ ধারণ করতে, আত্মরক্ষায়, শিকারি প্রাণীকে ধোঁকা দিতে।

তবে, এ সবের সঙ্গে সঙ্গে রাতের পৃথিবীকেও সুন্দর করার দায়িত্ব নিয়েছে তারা। সব কৃতিত্ব নক্ষত্ররাই বা নেবে কেন! তাই নিজেরাই নক্ষত্র হয়ে নিজেদের আকাশকে স্বপ্নের মত ঝলমলে করে তুলেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।

Comments are closed.