শনিবার, এপ্রিল ২০

থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু। খুন হয়েছিলেন? (চতুর্থ ও শেষ পর্ব)

রূপাঞ্জন গোস্বামী

( ……কেউ লিখল ব্রুস লি, মারিজুয়ানা, মরর্ফিন, এলসডি সবই নিতেন। নিজের মৃত্যুর জন্য নিজেই দায়ি মার্শাল আর্ট সম্রাট ব্রুস লি। রেমন্ড চাওয়ের  নিখুঁত চিত্রনাট্যের নিখুঁত সরলীকরণ গিলতে লাগল ব্রুস লি’র সাধের হংকং)

চতুর্থ ও শেষ পর্ব

ব্রুস লি’র  পোস্টমর্টেম রিপোর্ট

কুইন এলিজাবেথ হসপিটালের ডাক্তার ডঃ আর আর লিসেট ব্রুস লির পোস্টমর্টেম করেন। প্রাথমিক পোস্টমর্টেম রিপোর্টে দৃশ্যমান কোনও চোটের খোঁজ মেলেনি। তবে ব্রুস লির ব্রেন ১৩% ফুলে গিয়েছিল।
রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ সেরিব্রাল ইডিমা লেখা থাকলেও, শেষ লাইনে লেখা ছিলো : “It is possible that the edema is the result of some drug intoxication”

ডঃ লিসেটের সেই বিতর্কিত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট

ধোঁয়াশা: কোন ড্রাগের বিষক্রিয়ায় ব্রুস লি মারা গেলেন, রিপোর্টে তা খোলসা করা হল না কেন ?

মৃত্যুর ঘণ্টা খানেক আগে ব্রুস লি বেটির থেকে ইকুয়াজেসিক পিল নিয়েছিলেন। সেরিব্রাল ইডিমার ক্রনিক পেশেন্ট ব্রুস,  এটা জেনেও বেটি ইকুয়াজেসিক পিল দিয়েছিলেন। পুলিশকে বলেছিলেন আগেও দিতেন। ইকুয়াজেসিক পিল ব্রুসের খাওয়া উচিত ছিল না। তৎকালীন হংকংয়ের কাগজগুলিতে অনেক ফরেন্সিক প্যাথলজিস্ট লিখেছিলেন ইকুয়াজেসিক পেনকিলারের মধ্যে থাকা উপাদান দুটি অতিরিক্ত মাত্রায় শরীরে গিয়েই ব্রুস লি’র দ্বিতীয় সেরিব্রাল ইডিমা ঘটিয়েছে। রেমন্ড চাওতো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বেরোবার আগেই বলে দিয়েছিলেন ব্রুস লি’র মৃত্যু বেটির দেওয়া পেনকিলার ওষুধের অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশনে হয়েছে।

ধোঁয়াশা: পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসার আগেই রেমন্ড চাও জানলেন কী করে পেনকিলারের অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশনে ব্রুস লি’ র মৃত্যু হয়েছে? তাহলে উনি কি ওয়াকিবহাল ছিলেন, এই ওষুধে ব্রুস লি’ র মৃত্যু হতে পারে?

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড মনোনীত সায়েন্টিস্ট ডোনাল্ড টিরে, যিনি প্রায় ১০০০ এর ওপর পোস্টমর্টেম করেছেন। তাঁকে পরে দায়িত্ব দেওয়া হয় লি’ র আবার পোস্টমর্টেম করার জন্য। তাঁর রায় হল “death by misadventure” caused by an acute cerebral edema due to a reaction to compounds present in the combination medication Equagesic”।
তার মানে ইনিও বেটির দেওয়া ওষুধকেই দায়ী করছেন। যদিও  এঁর পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আজও সূর্যের মুখ দেখেনি।

ধোঁয়াশা: সেরিব্রাল ইডিমার পেশেন্টের ইকুয়াজেসিক খেলে আবার সেরিব্রাল ইডিমা হতে পারে। এবং সেরিব্রাল ইডিমা প্রাণহাণিকর। রেমন্ড তাহলে ঠিকই জানতেন। কী করে জানলেন? কেনই বা জানলেন ? বেটিও জানতেন ? কেন সাপ্লাই দিয়ে যেতেন মুঠো মুঠো ইকুয়াজেসিক পিল? রেমন্ডের কথায় ?

ধোঁয়াশা: কেন পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হল না? কী বিস্ফোরণ ঘটাতো সেই রিপোর্ট ?

কুইন এলিজাবেথ হসপিটালের ডাক্তার ডঃ আর আর লিসেটের রিপোর্টে বলা হয়েছে  “There are no external signs of injury”। এর অর্থ ব্রুসের মৃতদেহে বাইরে কোনও আঘাতের আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তাহলে নিচের ছবিটা ভাল করে দেখুন।

বাম দিকে ব্রুস মর্গের বেডে শুয়ে,ডান দিকে কফিনে

ওপরের বামদিকের ছবিতে ব্রুস লি’র কপালে আঘাতের দাগ দেখা যাচ্ছে। ব্রুসের বাম ভুরুও থ্যাঁতলানো। যা জোরে আঘাত পেলে হয়। সেরিব্রাল ইডিমায় হয় না। ব্রুস লি’র বাম দিকের গলার নীচটা দেখুন অস্বাভাবিক রকমের ফোলা। ঘাড়ের হাড় সরে গেলে বা তীব্র আঘাতের ফলে এরকম ফোলা ভাব আসতে পারে। সেরিব্রাল ইডিমায় এই উপসর্গ হয় না। কফিনের ছবিতে  ব্রুস লির গলা অদ্ভুত ভাবে কেমন ঢেকে রাখা হয়েছিল দেখুন। কফিনের ছবিতেও ব্রুস লি’র কপাল ও গালের ক্ষত দৃশ্যমান। বাম ভুরুর নিচে থ্যাঁতলানো অংশও। মর্গ বিউটিশিয়ান চাপা দিতে পারেননি।

ধোঁয়াশাঃ  সারা বিশ্ব বুঝতে পারছে ব্রুস লি মাথায় ও মুখে আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু পোস্টমর্টেম করেছেন যে ডাক্তার তিনি দেখতে পেলেন না।

“the congestion of the rectum is unusual and I am unable to specifically account for this.”
ব্রুস লি’র প্রথম পোস্টমর্টেম-এর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ব্রুস লি’র মলদ্বারের ভেতরের দিকের অস্বাভাবিক রকমের বডি ফ্লুইড জমে ছিল। এর কারণ আজও অজানা?

ধোঁয়াশাঃ    সেরিব্রাল  ইডিমায় মলদ্বারের ভেতরে ফ্লুইড জমবে? ডাক্তারই তো নিজেই বলছেন ‘ unusual’ । মলদ্বারের ভেতরে বডি ফ্লুইড জমার কারণ কেন আজও জানা গেল না?

 জীবনের শেষ মাসে ব্রুসের অস্থিরতা

শেষ দু’বছরে ব্রুস লি’র ওজন কমেছিল ২০ কেজি

ব্রুসের বন্ধু,  ইন্ডিয়ানা জোন্স খ্যাত অভিনেতা চাক নরিস দাবি করেন,  ব্রুস পেশী শিথিল করার ওষুধের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন। এটা নিয়ে আবার বিতর্ক শুরু হয়। ব্রুস তাঁর শরীর টিউনে রাখতে নিয়মিত হারবাল সাপ্লিমেন্ট খেতেন। তাতে কি কিছু মেশানো থাকতে পারে?
কাউকে যদি রোজ অত্যন্ত কম মাত্রায় পটাসিয়াম সায়ানাইড দেওয়া যায়, তাঁর মৃত্যু কিন্তু স্বাভাবিক মৃত্যুর মতোই দেখতে লাগবে। বাইরে থেকে বিষক্রিয়ার সামান্য লক্ষণও নজরে আসবে না। ‘দ্য ব্রুস লি স্টোরি’ বইটিতে লিন্ডা লিখেছিলেন , ‘জীবনের শেষের দিকের ব্রুস কে দুর্বল দেখাত। যেন সে বিশাল ভারী কোনও জিনিস বইছে। সে সব দিক থেকে সবার থেকে আঘাত পাচ্ছিল। তাই সে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে গার্ড করার পজিশনে  হাত পা রাখতো।‘ শেষ দুই বছরের ব্রুসের ওজন কমে গিয়েছিলো কুড়ি কেজি। জীবনের শেষ মাসে  ব্রুস এতটাই মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন,  যে তাঁর সব সময় মনে হতো কেউ তাঁর খাবার বা পানীয়তে বিষ মিশিয়ে দিতে পারে। তাঁর সব সময় মনে হতো, তুমি ব্রুস তোমাকে ধীরে ধীরে বিষ দেওয়া হচ্ছে। এমন একজন এটা দিচ্ছে যার তোমার কাছে থাকার অধিকার আছে। তোমার খাদ্য ও পানীয়র  কাছে পৌঁছনোর অধিকার আছে। কিন্তু তুমি তাকে চেনো না।

স্টুডিওতে কেউ তাঁর খাবারে হাত দেওয়ায় ক্ষিপ্ত ব্রুস

সেই জন্য ব্রুস তাঁর খাবার আলাদা রাখতেন। তাঁর খাবারের সামনে কেউ গেলেই ব্রুস রেগে যেতেন।  এন্টার দ্য ড্রাগনের শ্যুটিং চলাকালীন এক স্টান্টম্যান ব্রুসের পানীয়ের ফ্লাস্কের পাশে চলে গিয়েছিলেন বলে ব্রুস প্রচন্ড ক্ষেপে গেছিলেন।
 চার্লস লো এন্টার দ্য ড্রাগনের ইউনিট ক্যামেরাম্যান ছিলেন। তিনি দেখতেন   ব্রুস লি’কে  প্রচুর পরিমাণে হারবাল শেক খেতে।তারপরই জল খেতেন। হার্বাল শেকে নাইট্রোফেনলিক (Nitrophenolic ) ও নাইট্রোক্রেসলিক (Nitrocresolic) ধরণের আগাছানাশক রাসায়নিক মেশানো থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেছিলেন। কারন এই দুটি রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় উপসর্গই হলো প্রচুর তেষ্টা পাওয়া। ব্রুস শেক খাওয়ার পরেই অস্বাভাবিক পরিমানে জল খেতেন।

ধোঁয়াশাঃ জীবনের শেষ মাসে লৌহকঠিন মানসিকতার ব্রুস ভেঙে পড়েছিলেন কেন?  ব্রুসের এরকম মানসিক অবস্থার জন্য কারা দায়ী? 

প্রিয় পাঠক, জানিনা চারটি পর্বের প্রায় শেষে এসে ব্রুস লি’র মৃত্যুকে আপনার  এখনও  স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হচ্ছে কিনা। আমার মত জানতে চাইলে বলবো, ব্রুসের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। কারণ আশপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি আমার স্বাভাবিক লাগেনি। ব্র্যান্ডনের মৃত্যুর মতোই আমার কাছে ব্রুস লি’র মৃত্যু অস্বাভাবিক। হ্যাঁ, খুন হয়ে থাকতে পারেন ব্রুস লি। আমার মতোই খুনের তত্ত্ব বিশ্বাস করেন  ব্রুস লি’র কিছু বন্ধু, সাংবাদিক, সহ অভিনেতারা। বিভিন্ন তত্ত্ব ঘুরে ঘুরে আসছে ব্রুসের মৃত্যুর ৩৫ বছর পরও।

ব্রুসকে কারা খুন করতে পারে

প্রথম তত্ব

চিনা মাফিয়া গ্যাং চাইনিজ ট্রায়াড ( Chinese Triads) খুন করতে পারে ব্রুস লিকে। কারণ সে প্রোটেকশন মানি দিতে চায়নি। চাইনিজ ট্রায়াড পয়সা লাগিয়েছিল হংকং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। ব্রুস লিকে তাদের ফিল্মে অভিনয় করাতে চাইছিল। কিন্তু ব্রুস রাজি হয়নি। চাইনিজ ট্রায়াড হচ্ছে অসংখ্য শাখাপ্রশাখা যুক্ত চিনা মাফিয়াদল। যারা আজও চিন ,হংকং , ম্যাকাও এবং তাইওয়ান ছাড়াও আমেরিকা, কানাডা, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া , থাইল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে তাদের অপরাধের জাল বিছিয়ে রেখেছে।

চাইনিজ ট্রায়াড। সারা শরীরে বিশেষ উল্কি এদের লোগো

দ্বিতীয় তত্ব

তাকে খুন করেছে চিনা মার্শাল আর্টের এক গুপ্তঘাতক বাহিনী । ব্রুস লি আমেরিকায় তাঁর ঘরানার মার্শাল আর্ট জিত-কুন -ডো শেখাতে একটি স্কুল খুলেছিলেন। ব্রুস লি চিনের মার্শাল আর্টের গোপন কৌশল পশ্চিমী লোকেদের শিখিয়ে দিচ্ছে বলে চিনের রক্ষণশীল মার্শাল আর্ট গুরুরা একজন অসম্ভব পারদর্শী কুংফু বিশারদকে শ্যুটিং-এর স্টান্ট ম্যানদের ভিড়ে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সেই গুপ্তঘাতক ব্রুস লি’র ওপর মারণ আঘাত ডিম মাক (Dim Mak) প্রয়োগ করে, কোনও এক ফাইট সিকোয়েন্সে। অত্যন্ত ভয়ানক এই কৌশল। একটি মাত্র আঘাত পড়বে শরীরের এক বিশেষ স্থানে। ধীরে ধীরে পরবর্তী কয়েক মাসে শরীরের শক্তি কমে যাবে। দেহের কলাকোষে পুষ্টিদ্রব্য সরবরাহ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। শরীরে অক্সিজেন ঢুকবে কম। তারপর নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু মনে হবে স্বাভাবিক মৃত্যু।

মারণ আঘাত ডিম মাক, শরীরের এক বিশেষ প্রেশার পয়েন্টে ছোট্ট আঘাত, নিশ্চিত মৃত্যু কয়েক মাসের মধ্যে

তৃতীয় তত্ত্ব

জনপ্রিয় থিওরি । ইতালিয়ান মাফিয়ারা হলিউডে ব্রুস লিকে নিয়ে সিনেমা করতে চাইছিল। কিন্তু ব্রুস লি হংকংয়ে থেকে ইংরেজি সিনেমা করতে চাইছিলেন। ব্রুসের সব কটা ছবি সুপার হিট হচ্ছিল। হলিউডের অ্যাকশন ফিল্মগুলো মাছি তাড়াচ্ছিল ব্রুসের জন্য। কোটি কোটি ডলার লোকসান হচ্ছিল। তাই তারা ব্রুস লি’র খাবারে বিষ মেশায় ব্রুস লি’ র বিশ্বস্ত লোককে দিয়ে।

চতুর্থ তত্ব

রেমন্ড চাওয়ের সঙ্গে ব্রুসের সম্পর্ক ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছিল। গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওতে ব্রুস ও রেমন্ড চাওয়ের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকতো। রেমন্ড চাও একবার প্রেসের সামনে বলে বসেন, ব্রুস লি’ কে সামলানো আর একজন মাথামোটা বখাটে ছেলেকে সামলানো এক কথা। এতে ব্রুস মারাত্মক রেগে গিয়ে রেমন্ডকে আঘাত করে বসেন। এছাড়াও ব্রুসের সঙ্গে এন্টার দ্য ড্রাগনের কপি রাইট নিয়ে ব্রুসের মৃত্যুর আগের দিনই রেমন্ডের তুলকালাম ঝগড়া হয়েছিল। রেমন্ডের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছিল। ব্রুস ক্রমশ রেমন্ডের বাজার নিয়ে নিচ্ছিলেন। রেমন্ড বেটি টিং পেইকে দিয়ে মুঠো মুঠো ইকুয়াজেসিক পিল দেন। রেমন্ড আগেই জানতেন এর পরিণাম কী হতে চলেছে। বেটি টিং পেই-এর কিছু করার ছিলোনা কারণ তাইওয়ানের কুখ্যাত সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা তাইওয়ান গ্রুভ-এর সঙ্গে পুরোনো  সম্পর্ক ছিলো রেমন্ডের।আর  অভিনেত্রী বেটি নিজে একজন তাইওয়ানিজ। রেমন্ডের কথা মতো কাজ না করলে বেটির প্রাণ সংশয় হতে পারতো। সারা পৃথিবীর সন্দেহ  ঘুরে ফিরে এসে পড়ছে রেমন্ড চাও এবং বেটি টিং পেইয়ের ওপরেই এবং সঙ্গত কারণে।

পঞ্চম তত্ব

তাইওয়ানিজ অভিনেত্রী বেটি টিং তেই তাঁকে বিষ দেন চিনের সিক্রেট টং সোসাইটির হয়ে। ব্রুস নিজে চাইনিজ হয়ে জাপানি মার্শাল আর্টের ভক্ত ছিলেন। ব্রুসের কাছের বৃত্তে অনেক জাপানি ছিলেন। ব্রুস তাঁর মার্শাল আর্ট ঘরানায় ও ছবিতে জাপানি কুবাডো ( Okinawan Kobudō) অস্ত্র নানচাকু ব্যাবহার করতেন। যা চিনের গরিমায় আঘাত লাগাবার জন্য যথেষ্ট। ব্রুস লি’ র জিত-কুন-ডোর ছাত্র ভেন জর্জ লি জানিয়েছিলেন ১৯৭৩ সালের জুন মাসে ব্রুসলি তাঁকে বলেছিলেন হংকং ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। ব্রুস লি হংকং ছাড়তে চাইছিলেন। ব্রুসের প্রথম ছাত্র জেমস ডেমিলি বিশ্বাস করতেন  ব্রুস লি খুন হয়েছেন। তিনি নিজেই তদন্ত শুরু করেন এবং সিদ্ধান্তে আসেন, ব্রুস কে খুন করা হয়েছে। খুন করিয়েছে হংকং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সেই সব লোক। যাদের ব্রুস লি পছন্দ করতেন না।

চিনের কুখ্যাত টং সোসাইটি

ষষ্ঠ তত্ব

ব্রুস লি’র দাদা পিটার লি’ র সন্দেহ ছিল দুধ কলা দিয়ে পোষা এক কাল  সাপের দিকে। এনগান ব্রুসের ছোটো বেলার এক বন্ধু এবং ব্রুস লি’ র বিশ্বাস ভাজন খানসামা। ব্রুস লি’কে যিনি খাবার থেকে পানীয় সব সাজিয়ে দিতেন। ব্রুস লি’ র বাড়িতেই থাকতেন। ব্রুস লি’র সব সম্পত্তি বেনামে এই ব্যক্তির নামে ছিল। যদিও ব্রুসের মৃত্যুর পর এই ব্যক্তি আইনজীবী মারফত সব সম্পত্তি লিন্ডাকে হস্তান্তর করে দেন। তার পরিবর্তে এনগান পান বিশাল অঙ্কের টাকা। তারপর হটাৎ হংকং থেকে গায়েব হয়ে যান।  তাঁকে আবার ১৯৭৪ সালে দেখা যায় ইংল্যান্ডে। এদিকে শুধু ব্রুসের ক্যালিফোর্নিয়ার সম্পত্তির মূল্যই নির্ধারিত হয় প্রায় ২৮ লক্ষ ইউএস ডলার। এর পর হংকং ও আনান্য দেশের সম্পত্তির কথা বাদই দিলাম। লিন্ডা রাতারাতি বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়ে যান।

শেষদিকে লিন্ডার সঙ্গে ব্রুসের সম্পর্ক ক্রমশ শীতল হতে শুরু করেছিল। কারণ মহিলাদের প্রতি ব্রুসের অতিরিক্ত আকর্ষণ। মিতোসি উয়েহারা তাঁর ব্রুস লি : দ্য ইনকম্পেয়ারেবল ফাইটার বইতে লিখেছেন যখন ব্রুস কে মৃত ঘোষণা করা হলো লিন্ডা বেটিকে অনুরোধ করেছিলেন যে বেটি যেন বলেন ব্রুস তাঁর নিজের বাড়িতেই মারা গেছেন। ব্রুসের মৃত্যুর পরের দিনই লিন্ডা ব্রুসের স্টান্ট ম্যানদের সঙ্গে ব্রুসের জীবন সেলিব্রেট করতে এক ব্যাঙ্কয়েট পার্টি দেন। সেদিন পার্টিতে উপস্থিত একজন স্টান্টম্যান বিলি চ্যাং উই এনগাই, বইটির লেখক লেখক মিতোসিকে বলেছিলেন এক অদ্ভুত ঘটনার কথা। পার্টিতে লোকেরা ব্রুসের মৃত্যু সম্পর্কে গস্যিপ করছিলেন যে কিভাবে ব্রুস কে হত্যা করা হয়েছে। লিন্ডা হিস্টিরিয়ায় ভোগা রুগীর মতোই চেঁচিয়ে উঠেছিলেন বলেছিলেন “আমি যখন জানতে চাইছি না ব্রুস কী ভাবে মারা গেছেন, তোমরা এতে নাক গলাচ্ছ কেন?” লিন্ডা ও  এনগান সন্দেহের বৃত্তে এসেই গেছেন এভাবে।

ব্রুস লি’ র ছেলে ব্র্যান্ডন লি’ র রহস্য জনক মৃত্যু

মাত্র ২৮ বছর বয়েসে রহস্যজনক ভাবে মারা যান ব্রুস লি’র ছেলে ব্র্যান্ডন লি

সবে হলিউডে অভিনয় করতে শুরু করেছিলেন ব্রুস লি’ র একমাত্র ছেলে ব্র্যান্ডন লি। কয়েকটা ছবি করার পর ১৯৯৩ সালে ‘দ্য ক্রো’ ছবির শ্যুটিংয়ের আগে সাংবাদিকদের বলেন,  তিনি তাঁর বাবার মৃত্যুর কারণ জানতে আবার তদন্ত চাইবেন। তাঁর কাছে এই সংক্রান্ত কিছু প্রমাণও আছে। ‘ দ্য ক্রো’ শেষ করে তিনি কেসটি নতুন করে তোলার জন্য আবেদন করবেন। ওই বছরেরই ৩১ মার্চ ‘দ্য ক্রো’ শ্যুটিংয়ের সময় সহ অভিনেতা মাইকেল মাসেসের ছোঁড়া গুলিতে প্রাণ হারান। চিত্রনাট্যে ব্র্যান্ডন লি’কে তাক করে ভিলেনের গুলি ছোঁড়ার কথা ছিল। ব্র্যান্ডন লি’ র প্রাণ হারানোর কথা ছিল। কিন্তু . ৪৪ ক্যালিবারের ম্যাগনাম রিভলভারের ম্যাগাজিনে নকল গুলি থাকার কথাছিল। কিন্তু সেখানে ভরে দেওয়া হয়েছিল আসল বুলেট।’ দ্য ক্রো’ ছবির সেটেই প্রাণ হারান ব্রুস লির পুত্র ব্র্যান্ডন। ছবিটা শেষ করে যাঁর ব্রুস লি’র রহস্যজনক মৃত্যুর নতুন করে তদন্তের আইনানুগ দাবি জানানোর কথা ছিলো। তিনি তার আগেই প্রাণ হারালেন মাত্র ২৮ বছর বয়েসে।

ধোঁয়াশা: ব্রুস লি’ র ছেলে ব্র্যান্ডন নতুন কিছু তথ্য খুঁজে পেয়েছিলেন তার ভিত্তিতে নতুন করে তদন্ত চাইতে চলেছিলেন মাত্র কয়েক মাস পর। তার আগেই তাঁরও রহস্যজনক মৃত্যু ঘটল। ব্র্যান্ডনকে কি সরিয়ে দেওয়া হল ?

ব্রুস লি’র বন্ধু এবং লিন্ডার দ্বিতীয় স্বামী  টম ব্লিকার

ব্রুসের পুরোনো বন্ধু , পরবর্তীকালে লিন্ডার স্বামী   টম ব্লিকার,  তিনি নিজে পেশায় একজন বিখ্যাত হলিউডি চিত্রনাট্যকার। যাঁর লেখা  Unsettled Matters: The Life and Death of Bruce Lee : a Biography  বেস্টসেলারের তালিকায় ছিল। তিনি  বিখ্যাত জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়চে ভেলএ (Deutsche Welle) একটি বিষ্ফোরক ইন্টারভিউ দেন।

ডয়চে ভেল– আপনি কি মনে করেন  ব্রুস দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁর মৃত্যু আসছে ?
টম ব্লিকার – হ্যাঁ সেটাই মনে হয়। মনে রাখবেন ব্রুস লি তাঁর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে লিন্ডাকে বলেছিলেন, তিনি লিন্ডার মতো আয়ু পাবেন না। কারণ তিনিই তাঁর জীবন বেশিদূর টানতে পারবেন না।

ডয়চে ভেল – ব্রুস লি’র পুত্র ব্র্যান্ডন লি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে দাবি করেছিলেন ব্রুস লি’ র মৃত্যুর আসল কারণ তিনি জানেন। এবং তাঁর কাছে প্রমাণও আছে। এটা কি সত্যি ?

টম ব্লিকার – আমি শুনেছি ব্র্যান্ডন পাবলিক স্টেটমেন্ট দিয়েছিল, যে সে তার হলিউডি ছবি ‘দ্য ক্রো‘ শেষ করেই তার পিতার মৃত্যুর কারণ জানতে পুনরায় তদন্ত চাইবে I আমি লিন্ডাকে বিয়ে করার পর ব্র্যান্ডন আমার বাড়িতে আসত। এবং আমার বাড়ির ব্রুস লি রুমে ব্রুস লি’র মৃত্যু সম্পর্কিত ফাইলগুলো ঘাঁটতো।

ডয়চে ভেল –  ব্রুসের সমাধি নিয়েও নাকি রহস্য আছে? ব্রুস কে নাকি সিয়াটলে সমাধিস্থ করা হয়নি। সিয়াটলে ব্রুস লি’ র কবর পরে সিমেন্ট দিয়ে গেঁথে দেওয়া হয় ?

টম ব্লিকার – লিন্ডা ব্রুসের সমাধি সিমেন্ট দিয়ে ঢাকতে দেবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। তবে আমি সিয়াটলে ব্রুস লি’ কে সমাধিস্থ করার সরকারি সার্টিফিকেট পাইনি। আমার মনে হয় ব্রুস লি’ র মরদেহ আমেরিকার সিয়াটলে সমাধিস্থ করা হয়নি। কিন্তু সমাধি সৌধ ওখানে আছে।

বাম দিকে ব্রুসের এবং ডান দিকে পুত্র ব্র্যান্ডনের সমাধি (আমেরিকার সিয়াটলে )

ধোঁয়াশা : হংকং থেকে আমেরিকার সিয়াটলে ব্রুসের কফিন আনা হয়। কফিনে তাহলে ব্রুস লি ছিলেন না ? ব্রুস কে কোথায় সমাধিস্থ করা হয়েছে? সিয়াটলের সমাধি কার অনুমতিতে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল?

ডয়চে ভেল – ব্রুস লি’ র ডেথ সার্টিফিকেট আর ফাইনাল পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জনসমক্ষে আনা হয়নি। এর কি কোনও আইনি কারণ আছে ? এটা তো হংকংয়ের পাবলিক রেকর্ডে থাকা উচিৎ ছিলো। যদি কেউ পরবর্তীকালে কেসটি আবার শুরু করতে চান, ডেথ সার্টিফিকেট আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তো লাগবে। কেউ যদি ব্রুসের মৃত্যুর আবার সরকারি তদন্ত করতে চান কী কী তথ্য তাঁর চাই ?

টম ব্লিকারব্রুস লি’ র মৃত্যুর কারণ চিরতরে চোখের আড়ালে চলে গেছে। কারণ ইংরেজ শাসিত হংকং পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এবং হংকংয়ের ব্রিটিশ সরকার আর নেই। হংকং এখন চিনের অংশ। তবে ব্র্যান্ডন লি’র মর্মান্তিক মৃত্যু রহস্যর তদন্ত যদি কেউ শুরু করেন, ব্রুস লি’ র মৃত্যু রহস্যর পর্দা উঠবেই ।

তথ্যসূত্র:  https://www.theringer.com , http://www.shaolinchamber36.com , http://www.theforensicexaminer.com , https://medium.com , https://allthatsinteresting.com , http://www.lifedaily.com/ , https://www.history.com , https://ew.com , https://www.wattpad.com , http://www.bruceleedivinewind.com , http://www.dw.com

এই  লিঙ্কে পড়ুন : থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু।খুন হয়েছিলেন? (প্রথম পর্ব)

এই  লিঙ্কে পড়ুন : থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু।খুন হয়েছিলেন?(দ্বিতীয় পর্ব)

 এই  লিঙ্কে পড়ুন : থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু।খুন হয়েছিলেন? (তৃতীয় পর্ব)

Shares

Comments are closed.