শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

কালো হিরের গায়ে লেগেছিল ব্রহ্মার অভিশাপ, তাই কি আত্মহত্যা রাশিয়ার রাজকন্যাদের!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

দুনিয়ার সপ্তম বৃহৎ কালো হিরে Black Orlov, অপর নাম ‘Eyes of Brahma’। ‘অভিশপ্ত’ হিসেবে কুখ্যাত কালো হিরেটির গায়ে জড়িয়ে আছে একটি গা ছমছমে জনশ্রুতি। কে বা কারা এই উপাখ্যানটির শুরু করেছিলেন তা জানা যায় না। তবে উপাখ্যানটির উৎপত্তি সম্ভবত মার্কিন মুলুকে।

কাহিনিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতবর্ষ, জড়িয়ে আছেন হিন্দু দেবতা প্রজাপতি ব্রহ্মা ও তাঁর অভিশাপ। কাহিনিটা উল্কাগতিতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন গবেষক, পুরাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদেরা ‘অভিশপ্ত হীরক রহস্য‘ উন্মোচনে নামেন। এঁদের কেউ বলেছেন স্রেফ গালগল্প, কেউ খুঁজে পেয়েছেন সত্যতা। তাই সত্য ও মিথ্যার কুয়াশায় এখনও রহস্যাবৃত হয়ে আছে কালো হিরে ‘ব্ল্যাক অর্লভ‘ নাকি ‘ব্রহ্মার চোখ‘।

এই সেই ‘ব্ল্যাক অর্লভ’ বা ‘ব্রহ্মার চোখ’ হিরে

জনশ্রুতি

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ, দক্ষিণ ভারতের একটি মন্দিরে অনান্য দেবতার সঙ্গে বিরাজ করছিলেন সৃষ্টি, বেদ ও ধর্মের  দেবতা প্রজাপতি ব্রহ্মা। অনন্তশয্যায় শয়ান বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে যাঁর উৎপত্তি। বৈদিক যজ্ঞের অন্যতম পুরোহিত এবং চতুর্মুখ, চতুর্ভুজ ও হংসবাহন ব্রহ্মা সুঠাম দেহের অধিকারী। তাঁর চারটি হাতে থাকে কমন্ডলু, স্রক্, ঘৃতপাত্র বা পুস্তক এবং অক্ষমালা।

মন্দিরে বিরাজমান ব্রহ্মামূর্তিটির চতুর্মুখের মধ্যে একটি মুখে দু’ চোখের জায়গায় বসানো ছিল দুটি চকচকে কালো পাথর। মূর্তিটি কত শতাব্দী প্রাচীন তার কোনও ধারণা ছিলনা মন্দিরের সন্ন্যাসীদের। কিন্তু মূর্তির চোখদুটির দাম যে আকাশ ছোঁয়া, তা সম্ভবত আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এক জেসুইট পাদ্রি। অনান্য জেসুইট সম্প্রদায়ের পাদ্রিদের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন তিনি।

এর পর, একদিন রাতের আঁধারে মন্দির থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিল ব্রহ্মা মূর্তির একটি চোখ। উজ্বল কৃষ্ণকালো পাথরের একটি চোখ। যা ছিল বিশুদ্ধ কালো হিরে। জেসুইট পাদ্রি নিজেই চোখটি চুরি করেছিলেন, নাকি মন্দিরের কোনও পুরোহিত, নাকি উভয়পক্ষের যোগসাজসে ব্রহ্মার চোখটি মন্দিরের বাইরে এসেছিল, তা কখনও জানা যায়নি।

কিন্তু জনশ্রুতি বলছে সেই রাতেই কালো হিরেটির গায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল গিয়েছিল ব্রহ্মার অভিশাপ। অভিশপ্ত হয়ে গিয়েছিল ১৯৫ ক্যারেটের দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য কালো হিরেটি। কয়েক দিনের মধ্যে ভারত থেকে কালো  হিরে Eyes of Brahma কোনও অজানা পথে পাচার হয়ে যায় বিদেশে। সেইসঙ্গে অভিশাপের মেঘ ছড়িয়ে পড়ে রাশিয়া, ফ্রান্স,  ইতালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, না জানি আরও কত দেশের আকাশে।

তারপর কেটে গিয়েছিল একশো বছরেও বেশি সময়। ১৯৩২ সালে হিরেটির সন্ধান মেলে আমেরিকায়। জে ডব্লিউ প্যারিস নামে একজন ইউরোপিয় হিরে ব্যবসায়ী হিরেটি নিয়ে ক্রেতার খোঁজে আসেন আমেরিকায়।

আমেরিকায় আসার সপ্তাহ খানেকের মধ্যে হিরেটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন প্যারিস সাহেব। কিন্তু হিরে বিক্রির মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে,  এপ্রিলের ৭ তারিখে মানহাটনের একটি বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। অভিশপ্ত হিরের প্রথম বলি ছিলেন জে ডব্লিউ প্যারিস। এর আগের একশো বছরে কী হয়েছিল তা জানা যায়নি।

জনশ্রুতি আছে হিরেটি পাওয়ার পর থেকে প্রবল দুশ্চিন্তায় ভুগতেন প্যারিস সাহেব, ব্যবসায় মন্দার ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করেছিল। আত্মহত্যার আগে প্যারিস সাহেব দুটি চিঠি লিখেছিলেন। একটি তাঁর স্ত্রীকে ও অপরটি তাঁর এক হিরে ব্যবসায়ী বন্ধুকে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে চিঠির বয়ান কোনওদিন প্রকাশিত হয়নি।

১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের সময় রাশিয়ার রাজপরিবারের অনেক সদস্য প্রাণ বাঁচাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। সেরকমই একজন ছিলেন রাজকন্যা  লিওনিলা ভিক্টরভনা বারিয়াটিনস্কি। তিনি বিয়ে করেছিলেন রয়াল নেভির অফিসার প্রিন্স অ্যান্ড্রে গিলস্টোনকে। তাঁর কাছে Eyes of Brahma নামের কালো হিরেটি আসে।

হিরেটি পাওয়ার পর কেমন যেন পালটে গিয়েছিলেন রাজকন্যা লিওনিলা। মুখের হাসি একেবারে মুছে গিয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যে অজ্ঞাত কারণে তিনি হিরেটি দিয়ে দিয়েছিলেন রাশিয়ার আর এক রাজকন্যা নাদিয়া ভাইজিন অর্লভকে। রাজকন্যা লিওনিলা চেয়েছিলেন হিরেটি বংশের ভেতরেই থাকুক। হিরেটি নাদিয়াকে দিয়ে দেওয়ার এক মাসের মধ্যে প্রাসাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন রাজকন্যা লিওনিলা।

অপর রাজকন্যা নাদিয়া ভাইজিন অর্লভও দেশ ছেড়ে রোমে চলে  গিয়েছিলেন। সেই সময় প্রিন্সেস নাদিয়া ছিলেন এক রাশিয়ান জহুরীর স্ত্রী। হিরেটি তাঁর কাছে আসার পর নাদিয়াও কেমন পালটে গিয়েছিলেন, সারাক্ষণ নিজেকে ঘরে বন্দী রাখতেন।কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। হিরেটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন সবসময়।

 রাজকন্যা লিওনিলা আত্মহত্যা করার এক মাসের মধ্যে, ১৯৪৭ সালের ২ ডিসেম্বর, রোমের একটি প্রাসাদের ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরে আত্মহত্যা করেন প্রিন্সেস নাদিয়াও। তারপরই Eyes of Brahma নামের ‘অভিশপ্ত’ কালো হিরেটির নাম হয়ে যায় Black Orlov। রাজকন্যা নাদিয়া অর্লভের নামেই নামকরণ হয় হিরেটির।

নাদিয়া ভাইজিন অর্লভ

শুরু হয়েছিল শাপমোচনের প্রয়াস

১৯৫০ সালে হিরেটি আসে চার্লস এফ উইলসন নামে এক ইংরেজ মালিকের হাতে। তিনি অভিশপ্ত হিরেটিকে অভিশাপমুক্ত করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাই তিনি এক অস্ট্রেলিয় জহুরীকে ১৯৫ ক্যারেটের হিরেটি কেটে ফেলতে বলেন। চার্লস এফ উইলসনে নিশ্চিত ছিলেন এর ফলেই হিরেটির শাপমুক্তি ঘটবে। মালিক অনুরোধে অস্ট্রেলিয় জহুরী হিরেটিকে তিন খণ্ডে কেটে ফেলেন। হিরেটিকে কাটতে দু’বছর সময় লেগেছিল। তিনটি খণ্ডে বিভক্ত হওয়ার ফলেই নাকি হিরেটির শাপমুক্তি ঘটে।

তিনটি খণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে বড় হীরকখণ্ডটির সঙ্গে  ব্ল্যাক অর্লভ নামটি রয়ে যায় ১৯৫ ক্যারেট থেকে ব্ল্যাক অর্লভ-এর ওজন দাঁড়ায় ৬৭.৫০ ক্যারেটে। তারপর থেকে ব্ল্যাক অর্লভ হিরেটি ঘুরেছে প্রচুর প্রাইভেট ডিলারদের হাতে। তাঁদের কেউই ব্রহ্মার অভিশাপের প্রকোপে পড়েননি। কারও অপমৃত্যু ঘটেনি।

পরবর্তীকালে  ব্ল্যাক অর্লভ হিরেটিকে ১০৮টি হীরকখচিত লকেটে বসিয়ে দেওয়া হয়। লকেটটিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়  ১২৪টি হীরকখচিত একটি হারে। ব্ল্যাক অর্লভ আজও সর্ববৃহৎ কুশন-কাট কালো হিরে এবং পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ কালো হিরে। দাম কমপক্ষে ১৫ লক্ষ ডলার।

হিরের হার থেকে ঝুলছে ব্ল্যাক অর্লভ হীরকখচিত লকেট

২০০৪ সালে বিখ্যাত জহুরী ডেনিস পেটিমেজেস বলেছিলেন, তিনি নিশ্চিত হিরেটির সঙ্গে আর অভিশাপ জড়িয়ে নেই। তাই ২০০৬ সালে ‘অস্কার’ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী ফেলিসিটি হফম্যান ব্ল্যাক অর্লভ হীরকখচিত নেকলেসটি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে পরেছিলেন। তবে বেশিক্ষণ পরে থাকেননি। তার কারণটাও কাউকে বলেননি।

সত্য না মিথ্যা!

জনশ্রুতি প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। লোকগবেষকদের দীর্ঘদিনের প্রাণপাত করা পরিশ্রমে হয়ত কোনও কোনও জনশ্রুতির সত্যতা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জনশ্রুতির সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব হয়না। ব্ল্যাক অর্লভ হিরেটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

যাঁরা ‘ব্রহ্মার অভিশাপ’ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন তাঁরা বলতে চেয়েছেন, হিরেটির নাম Eyes of Brahma হল কেন! হিরেটির সঙ্গে কেন জড়িয়ে গেলেন হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা! ভারতের বাইরে হিরেটি খ্রীস্টান মালিকদের হাতে হাতে ঘুরেছে। তাঁরা কেন হিরেটিকে একজন হিন্দু দেবতার নাম দেবেন। তাছাড়া সারা ইউরোপে হিন্দু দেবতা হিসেবে ব্রহ্মা ততটা পরিচিত নন। তাঁর চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত কৃষ্ণ ও শিব। এই দলটির অভিমত  Eyes of Brahma নামটির মধ্যেই পুরো কাহিনি ও কাহিনির সত্যতা লুকিয়ে আছে।

কিছু গবেষক বলেছেন ভারতে কালো হিরে পাওয়া যায় না, তাই এই হিরে ভারতের নয়। বিপক্ষের গবেষকরা বলছেন হাজার বছর ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রত্ন কেনাবেচার ব্যবসা করে আসছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের হাত ধরেই হয়ত কালো হিরে ভারতের মন্দিরে এসেছিল। 

 কিছু গবেষক প্রশ্ন তুলেছিলেন, এমন তিনজন আত্মহত্যা করলেন যাঁদের তিনজনের কাছেই এই হিরেটি ছিলো, এটা কি নিছকই কাকতালীয় ?  তাছাড়া ১৯৫ ক্যারেটের হিরেটি হঠাৎ কাটবার প্রয়োজনীতাই বা পড়ল কেন, না কাটলে তো আরও অনেক বেশি দাম পাওয়া যেত।

 ব্ল্যাক অর্লভ রহস্যের সমাধান হয়নি, তাই আজও চলছে বিতর্ক ও গবেষণা। অন্যদিকে কখনও গোপনে কখনও জনসমক্ষে মালিক থেকে মালিকের হাতে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে  ব্ল্যাক অর্লভ। তবে বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে জনশ্রুতিটিকে কল্পিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার ফসল বলে মনে হয়। কিন্তু এটাও মনে হয়, হীরকখণ্ডটি তার উৎস থেকে বিশ্ব ভ্রমণের পথে বেরিয়ে কিছু মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল, হয়তো সেই সব ঘটনাই ব্ল্যাক অর্লভ হিরেটিকে অশুভ ও অভিশপ্ত করে তুলেছিল। জন্ম দিয়েছিল এই ভয়ঙ্কর জনশ্রুতির।

Comments are closed.