সোমবার, এপ্রিল ২২

কলকাতায় ধৃত হাইজ্যাকার আজ সফল মিডিয়া মালিক,সয়ে মিন্ট-এর স্বপ্ন উড়ান

রূপাঞ্জন গোস্বামী

কলকাতার আকাশে উড়ে আসছে একটি ভিনদেশী বিমান । লগ বুকে আদৌ যার নাম নেই। সতর্ক দমদম বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার। যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে থাকে বিমানটির সঙ্গে। কমতে থাকে দমদম বিমানবন্দরের সঙ্গে বিমানটির দূরত্ব। বিমানটির পাইলটের সঙ্গে কথা হয় কন্ট্রোল টাওয়ারের। কথা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরে বেজে ওঠে সিকিউরিটি অ্যালার্ম । চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করা হয়। চোখ কপালে ওঠে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের। থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩০৫ প্যাসেঞ্জার বিমান ছিনতাই করে সটান কলকাতা উড়ে আসছে দুই বার্মিজ বিমান ছিনতাইকারী।

বারাসাত কোর্টে সয়ে মিন্ট ও তিন কিয়াও

ঘন্টা তিনেক আগে

ব্যাংকক-ইয়াংগনগামী প্লেনের ককপিটে হটাৎ ঢুকে পড়ে দুই বার্মিজ যুবক। এক যুবকের হাতে টিস্যু পেপারে মোড়া একটি বুদ্ধমুর্তি। অপর যুবকটির হাতেও টিস্যু পেপারে মোড়া একটা গোলাকার বস্তু। যুবক দুটি পাইলটকে বলে বিমানের মুখ ঘুরিয়ে কলকাতায় নিয়ে যেতে। না হলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিমান ধ্বংস করে দেবে। হুমকি দেয় , বুদ্ধমূর্তিটি আসলে একটি গ্রেনেড। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিমানে। ছিনতাইকারী যুবক দুটি যাত্রীদের বলে , বার্মার মিলিটারি অপশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তারা বিমান ছিনতাই করেছে। যাত্রীরা শান্তিতে বসুন, তাঁদের কোনও ক্ষতি  তারা করবে না।

কলকাতা বিমানবন্দর

বিমানকে নির্বিঘ্নে নামতে দেয় কলকাতা এটিসি। বিমান ঘিরে ফেলেছে প্রশিক্ষিত কম্ব্যাট ফোর্স । না যা ভাবা হয়েছিলো তা হলনা । বিনা প্রতিরোধে আত্মসমর্পণ করলো দুই বার্মিজ ছিনতাইকারী সোয়ে মিন্ট এবং তিন কিয়াও । তাদের কাছ থেকে পাওয়া গেলো লাফিং বুদ্ধের একটা মুর্তি এবং টিস্যু পেপারে মোড়া একটি সাবানের বল। যেগুলির  ভেতর বারুদের নাম গন্ধ নেই। গ্রেফতার হওয়ার আগে বার্মিজ দুই যুবক স্লোগান তুললো ” বার্মার জুন্টা সরকারের পতন চাই, মায়ানমারের মুক্তি চাই”

নিজের  অফিসে মিন্ট

বিচার শুরু

গ্রেফতার করে বারাসাত কোর্টে তোলা হলো দুই হাইজ্যাকারকে। কিন্তু আশ্চর্য্যজনক ব্যাপার হলো , ছিনতাই হওয়া বিমানের কোনও যাত্রী , বিমানের পাইলট, বিমানসেবিকা থেকে থাই এয়ারওয়েজ কতৃপক্ষ, কেউ কোনও অভিযোগ লিপিবদ্ধ করলেন না । দুই যুবক ভারতে বিপ্লবীর সম্মান পেলো। তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন ভারতের লোকসভার ত্রিশ জন সাংসদ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘর আয়ত্ত্বাধীন রিফিউজিদের হাই কমিশন। ফলে জামিন পেয়ে যান দুজনে , কিন্তু মামলা চলতে থাকে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য লড়ে যান সীতারাম ইয়েচুরি, মেধা পাটেকর, এন রাম, সৈয়দ মির্জা নন্দিতা হাস্কর সহ আরও অনেকে। তিনমাস জেল খেটে, ২০০৩ সালে বেকসুর খালাস পেয়ে যান সয়ে মিন্ট এবং তিন কিয়াও। সয়ে মিন্ট ভারতে থেকে যান রাজনৈতিক শরণার্থী হয়ে। ভারতে বসেই মায়ানমারের সংগ্রামে সাহায্য করতে থাকেন। অপর ছিনতাইকারী তিন কিয়াও ফিরে যান মায়ানমারে, নেমে পড়েন সরাসরি সংগ্রামে।

মায়ানমারের জনপ্রিয় ‘মিজ্জিমা’ ম্যাগাজিন হাতে মিন্ট

সয়ে মিন্টের রূপকথার উড়ান

আজও মিন্ট দিল্লীতে বাস করেন। ভারতে আজ তিনি নিছকই রাজনৈতিক শরণার্থী নন। তিনি আজ রুপার্ট মারডকের মতোই মিডিয়া ব্যারন। দিল্লিস্থিত বার্মিজ মিডিয়া হাউস মিজ্জিমা (Mizzima) সংস্থাটির এডিটর ইন চিফ । এদের অনলাইন নিউজ পেপার ও মুদ্রিত কাগজ ‘মিজ্জিমা নিউজ‘ ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষায় প্রকাশিত হয়। এবং সারা বার্মা জুড়ে কাগজটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মিন্টের কাগজ ‘মিজ্জিমা নিউজ’ পড়ছেন মায়ানমারের জনগণ

সয়ে মিন্ট ২০০৬ সালে একটি ইন্টারভিউতে বলেন, “আমি মিজ্জিমা নিউজ শুরু করি’ ১৯৯৮ সালের অগস্ট মাসে । বার্মার কথা সারা বিশ্বকে জানাতে। আমাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন ‘ওয়াশিংটন ন্যাশনাল এন্ডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি’, ‘ওপেন সোসাইটি ইনস্টিটিউট ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’ ছাড়াও ভারত , থাইল্যান্ড এবং ইউরোপের শুভানুধ্যায়ীরা।” মিন্টকে কিছুদিন আগেও এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন , ১৯৯০ সালে থাই বিমানটি ছিনতাই করে তিনি অনুতপ্ত কিনা। মিন্টের উত্তর ছিল , “না , আমি বিমান ছিনতাই করার জন্য অনুতপ্ত নই। ওটা ছিল এক শান্তিপূর্ণ নাটক। কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। মায়ানমারের পরিস্থিতি আমাকে এটা করতে বাধ্য করেছিল I এবং আমি এজন্য গর্বিত। আমি পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছি।

কলকাতার এক হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে

২৪ অগস্ট , ২০১৮

গত মাসের ২৪ তারিখে , ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার দফতরের আয়ত্ত্বে থাকা প্রসারভারতী, সয়ে মিন্টের “মিজ্জিমা’ গ্রুপের সঙ্গে একটি মৌ সাক্ষর করে। সংবাদ ও তথ্য আদান প্রদানের উদ্দেশ্যে । এই প্রথম প্রসারভারতী কোনও প্রাইভেট মিডিয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করল। এবং মৌ সাক্ষরিত হলো এমন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে , যার মালিকের গায়ে বিমান ছিনতাইকারীর তকমা লেগে আছে। বিমান ছিনতাইকারী হিসেবে ভারতের আকাশে প্রবেশ করা মিন্ট, ভারতেই আকাশ ছোঁয়া সাফল্য পেলেন সফল উদ্যোগপতি হিসেবে। তাই সয়ে মিন্টের স্বপ্নের উড়ানও , তাঁর নাটকীয়তায় ভরা বিমান ছিনতাইয়ের চেয়ে কোনও অংশে কম নাটকীয় নয় ।

দ্য ওয়ালের ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন।

Shares

Comments are closed.