কংক্রিটের জঙ্গলে ঘেরা মুম্বই শহর, তার রূপকথার অক্লান্ত নায়কদের নাম ‘ডাব্বাওয়ালা’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মুম্বইয়ের জীবনযাত্রা মুম্বইয়ে পয়সা রোজগারের মতই কঠিন। জীবনযাত্রার খরচ ভারতের অনান্য শহরের চেয়ে অনেক বেশি। তাই মুম্বইয়ের সাধারণ মানুষ পদে পদে পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করেন। অফিস কর্মচারী থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী, কাকভোরে বাড়ি ছাড়তে হয় রোজগারের তাগিদে। ট্রেনে বাসে সফর করে বহু দূরের অফিসে পৌঁছাতে হয়। অত ভোরে বাড়িতে রান্না হয়ে ওঠে না। বাইরে খেলে অতিরিক্ত পয়সা খরচ। এখানেই মুশকিল আসান হয়ে ওঠেন কিছু মানুষ। যাঁদের পরিচয় ডাব্বাওয়ালা।

    ইতিহাস বলছে, ১৮৯০ সালে মহাদেব হাভাজি বাচ্চে ১০০ জন মানুষ নিয়ে তৎকালীন বম্বের অফিসপাড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। তিনি ১০০ যুবককে নিয়ে অফিস কর্মচারীদের বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে অফিসে পৌঁছে দিতেন। আজ ১২৯ বছর পরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার খাদ্য শ্রমিক ২,২০,০০০ গ্রাহকের কাছে রোজ খাবার পৌঁছে দেন। ১৯৬৮ সালে নথিভুক্ত হয় ‘মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ারস অ্যাসোসিয়েশন’। তাদের বার্ষিক আয় এখন বেতনের খরচ বাদ দিয়ে ৬০ কোটি টাকা।

    নেই ন্যূনতম  প্রশিক্ষণ, নেই সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি। ডাব্বাওয়ালারা সবাই একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। যাঁদের বেশিরভাগেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। অথচ, পৃথিবীর চতুর্থ জনবহুল শহর মুম্বইয়ের অসহনীয় ভিড়ে ঠাসা দিনে সঠিক সময়ে খাবার সরবরাহ করার অনন্য রেকর্ড রয়েছে ডাব্বাওয়ালাদের। ১৯৯৮ সালে বিশ্বখ্যাত ব্যবসা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’ ডাব্বাওয়ালাদের নিয়ে গবেষণা চালায়। ‘সিক্স সিগমা দক্ষতা রেটিং’-এ ডাব্বাওয়ালারা  ৯৯.৯৯৯৯ নম্বর পেয়ে হতবাক করে দেন বিশ্বকে। এর অর্থ প্রতি ষাট লাখ টিফিন বক্স নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাত্র একবার ভুল করেন সুতির সাদা কুর্তা পাজামা, মাথায় গান্ধী টুপি পরা ডাব্বাওয়ালারা।

    সকাল ৯ টা

    খুব ভোরে উঠে ৩১ বছরের আনারভাই ডাব্বাওয়ালা স্নান সেরে পুজো করে নিয়েছেন। কপালে লাগিয়ে নিয়েছেন রক্তচন্দনের তিলক। সকাল ৯টা, আনারলাল ডাব্বাওয়ালার সাইকেল রাস্তায় নামল। আনারের সাইকেল সাধারণ সাইকেল নয়। ক্যারিয়ারের ডিজাইন আলাদা অতিরিক্ত রড অতিরিক্ত ভার বহন করার জন্য। মুম্বইয়ের বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যামকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বহুতলে উঠতে নামতে থাকে আনার। সাইকেলে বোঝাই হতে থাকে ডাব্বা (লাঞ্চ-বক্স)। অনেক পুরোনো বহুতলে লিফট নেই, কিন্তু ডাব্বাওয়ালা হতে গেলে সে অজুহাত দেখালে চলবে না।

    আনারকে কুড়িটা বিল্ডিংয়ে উঠতে নামতে হয়। বাঁধা সময়ের মধ্যে। সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে গ্রাহকের বাড়ি থেকে ৪০ টা টিফিন বক্স সংগ্রহ করল আনারলাল। ডাব্বা গুলো গড়ে ৪০ কিমি দূরে যাবে। বাড়ি থেকে অনেক দূরে অফিসে বসে কেউ পরম তৃপ্তিতে খাবেন মায়ের বা স্ত্রীয়ের রান্না করা খাবার। আনারভাইয়ের সাইকেল তাই তীব্র গতিতে ছুটে চলে। রাস্তার কাদা, ট্রাফিক, মুম্বইয়ের বিখ্যাত বর্ষার অজুহাত দিলে হবে না। ঠিক সময়ে খানা পৌঁছাতেই হবে।

    সকাল ১১ টা

    কাছের রেল স্টেশনে পৌঁছে গেলেন আনারভাই। বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাব্বাওয়ালারা জড়ো হয়েছেন ডাব্বা নিয়ে। ডাব্বার গায়ে থাকা কোড অনুযায়ী, ডাব্বা বাছাই করা শুরু হলো। প্রত্যেকটি এলাকার জন্য নির্দিষ্ট কোড আছে। আনারভাইয়ের আনা বেশির ভাগ ডাব্বা অন্য ডাব্বাওয়লার কাছে চলে গেল। যারা শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় যাবে। আনারভাই সেরকমই একটা টিমে ঢুকে পড়লেন। এখন তিনি প্রায় ৩০টি নতুন ডাব্বা বইছেন। যেগুলি তাঁর এলাকার নয়।

    আনারভাই আর তাঁর দলের লোকেরা টিফিন-বক্সগুলি তুলে হেডক্রেটে (মাথায় বইবার কাঠের বিশেষ পাটাতন) তোলেন। এক একটা হেডক্রেটে থাকে ৬০টা টিফিন বক্স। আন্দাজ করতে পারছেন ওজনটা! আপনি ভাবতে থাকুন, ততক্ষণে আনারভাই মাথায় ৬০টা টিফিন বক্স নিয়ে ছুটতে শুরু করেছেন রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম ধরে।

    মুম্বাইয়ের ব্যস্ত সময়ের জনাকীর্ণ রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে, জনতাকে মেসির মতো ডজ করতে করতে এগিয়ে যান আনারভাই। কারণ তাঁকে দ্রুত এগোতে হবে। রেলের ওভারব্রিজ দিয়ে উঠে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে আসেন আনারভাই। তাঁকে নির্দিষ্ট ট্রেন ধরতেই হবে। না হলে টিফিন লেট হয়ে যাবে। কোনও অজুহাত শোনা হবে না।

    ট্রেনের ভেন্ডার কামরায় ডাব্বাওয়ালের ভিড়। ট্রেনে উঠে পড়েন আনারভাই। মাথা থেকে ক্রেট নামান।
    ট্রেনযাত্রার সময়টুকু ডাব্বাওয়ালাদের বিশ্রামের সময়। আনারভাইরা নিজেদের সুখ দুঃখের কথা ভাগ করে নেন। একের পর স্টেশন পেরিয়ে যায়। ডাব্বাওয়ালাদের প্রত্যেকটি দলকে নির্দিষ্ট স্টেশনের জন্য বরাদ্দ করা আছে। আনারভাই তাঁর টিমের সঙ্গে নামলেন চার্চগেট স্টেশনে। এই ট্রেনের শেষ স্টেশন।

    বেলা ১২ টা

    আর সময় নেই হাতে। ঘড়ির কাঁটা দ্রুত দৌড়াচ্ছে। প্ল্যাটফর্ম ধরে তার চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে শুরু করেছেন শয়ে শয়ে ডাব্বাওয়ালা। দৌড়াতে শুরু করেছেন আনারভাই। চার্চগেট স্টেশনের বাইরে ডাব্বাওয়ালাদের ভিড়। শেষ ধাপের গন্তব্যগুলির জন্য আবার ডাব্বা বাছাই শুরু হলো নির্দিষ্ট কোড অনুযায়ী। আনারভাইয়ের নিয়ে আসা ডাব্বা বক্স চলে গেল অন্য ডাব্বাওয়ালার কাছে।

    আবার একটি নতুন দলে ঢুকে পড়লেন আনারভাই। এ বার ডাব্বাগুলি বোঝাই করা হল একটি ট্রলিতে। দ্রুত বেগে ছুটতে শুরু করল ট্রলি, বিভিন্ন অফিস, বিজনেস সেন্টার, স্কুল কলেজ, কোর্ট, ব্যাঙ্কের দিকে।

    এই সময় মুম্বইয়ের সব এলাকাকে আঁকড়ে থাকে  ট্রাফিক জ্যাম। ঝাঁকা-মুটেদের মতই চিৎকার করতে করতে ডাব্বাওয়ালারা এগিয়ে চলেন ট্রলি নিয়ে। পথচারীরা রাস্তা ছেড়ে দেন। কারণ তাঁরা জানেন ডাব্বাওয়ালারা থামতে জানেন না। ওঁদের জীবন মানেই দৌড়। বিজনেস হাবে পৌঁছে আনারভাইয়ের টিম আবার ভেঙে গেল। প্রত্যেক ডাব্বাওয়ালা এ বার আলাদা আলাদা বিল্ডিংয়ে ডাব্বা ডেলিভারি করবেন বিল্ডিংয়ের সাংকেতিক নাম্বার অনুযায়ী।

    আবার শুরু হয় বহুতলে ওঠানামা। যাঁরা ভাগ্যবান তাঁদের কপালে জোটে লিফটওয়ালা বিল্ডিং। আনারভাইকে ছ’টা বিল্ডিংয়ে দিতে হবে ৩০টি লাঞ্চ-বক্স। তারমধ্যে চারটি বিল্ডিংয়ে লিফট নেই।

    কাঁটায় কাঁটায় দুপুর একটা

    আনারভাই সব ডাব্বা ডেলিভারি করে দিয়েছেন। একই সময়ের মধ্যে ৫৫০০ ডাব্বাওয়ালা প্রায় ২২০০০০ লাঞ্চ-বক্স ডেলিভারি করে দেন। নিশ্চিন্ত আনারভাই, গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে পার্কে এসে বসেন। চলে আসেন আরও ডাব্বাওয়ালা। নিজেদের আনা খাবার খান ভাগ করে।

    পাঠকরা ভাবছেন, ক্লান্ত আনারভাই এখন বিশ্রাম করবেন, নয়তো বাড়ি ফিরবেন। না, আনারভাইকে আবার ফিরতে হবে কাজে। আবার বহুতলের তলায় তলায় পৌঁছে খালি ডাব্বা সংগ্রহ করে আবার গ্রাহকদের বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে হবে। সেই একই পদ্ধতিতে। এবং তা করতে হবে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।

    আবার দৌড়াতে শুরু করেন আনারভাই। বৌয়ের ফোন আসে বাড়ি থেকে, মেয়েটার জ্বর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আনারভাই অস্ফুটে বলেন “সন্ধ্যা ৬ টার পর…সন্ধ্যা ৬ টার পর, প্লিজ একটু বোঝো”।

    রানার চলেছে, রানার !
    রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার ।
    দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
    কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার ।

    আনারভাইয়ের স্ত্রী নিশ্চিত পড়েননি কবি সুকান্তের লাইনগুলি, পড়লে অভিমান করতেন না। তিনি ‘রানার’-এর জায়গায় ‘আনার’ এবং ‘খবর’-এর বদলে ‘খাবার’ বসিয়ে দিলে বুঝতেন এই কবিতা তার প্রিয়তমকে নিয়ে লেখা। যিনি থামতে জানেন না। তাঁর কাছে থামা মানেই সংসারে অভাব নেমে আসা। তাই ছুটেই চলেন আনাররা এ যুগের ‘রানার’ হয়ে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More