বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

রাস্তা কারও একার নয়, পেশাও কারও বাঁধা নয়! ১৪ চাকার ট্রাক হাঁকিয়ে নারীমুক্তির সড়কে ছুটছেন যোগিতা

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

আইনের ডিগ্রি ছিল তাঁর। কিন্তু প্র্যাকটিস করার প্রয়োজন পড়েনি কখনও। সংসারেই মন দিয়েছিলেন তিনি। পরে অবশ্য জীবনের বাঁক ঘুরে সামনে আসে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তখন কাজ শুরুও করেছিলেন আইনজীবী হিসেবে। কিন্তু তেমন করে পসার জমেনি। দরকার ছিল টাকা। উনুনে ভাত চড়ানোর জন্য, সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য, মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করার জন্য। আর তখনই কাজে লেগে গেল, বহু বছর আগে হাতে পাওয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স। সংসার চালানোর জন্য স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেছিলেন তিনি। না, গাড়ির নয়। বাসেরও নয়। চালাতে শুরু করেছিলেন ১৪ চাকার দানবীয় ট্রাক!

সে প্রায় ২০ বছর আগের কথা। সেই থেকেই ট্রাক চালিয়ে দেশের কোণা-কোণা চষছেন তিনি। রোজগার করছেন পর্যাপ্ত। এত বছরে জীবন ফিরেছে মূলস্রোতে, ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। কিন্তু ট্রাকচালনার জগতে আজও একই রকম দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছেন দেশের প্রথম ও একমাত্র মহিলা ট্রাকচালক, যোগিতা রঘুবংশী। শুধু তা-ই নয়। কমার্সে স্নাতক হওয়ার পরে আইনের ডিগ্রি সঙ্গে নিয়ে, দেশের সব চেয়ে শিক্ষিত ট্রাকচালকও তিনি।

তবে পুরুষশাসিত এই পেশাকে এত দিন ধরে দু’হাতে শাসন করার পরে যোগিতা অবশ্য বলছেন, কোনও বিপ্লব বা পরিবর্তনের কথা ভেবে এই পেশায় আসেননি তিনি। নতুন কোনও ছক ভাঙা রূপকথার নায়িকা হওয়াও তাঁর অভীষ্ট ছিল না। তিনি ট্রাকের স্টিয়ারিং ধরেছেন, তাঁর দু’টো সন্তানের মুখ চেয়ে। রাতের অন্ধকার ভেঙে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কপথে ছুটেছেন, যাতে আচমকা অন্ধকার নেমে আসা জীবনে খানিক স্বচ্ছলতা আসে।

শুধু শৈশবে কেন‚ বিয়ে হয়ে সংসার শুরুর সময়েও যোগিতার ভাবনায় দূরদূরান্ত অবধি ছিল না ট্রাক চালক হওয়ার কোনও ইচ্ছে বা স্বপ্ন। মহারাষ্ট্রের নন্দুরবারে জন্মানোর পর, নিজের পছন্দমতোই পড়াশোনা করেছিলেন। আইন পাশ করেছিলেন। কিন্তু কাজ শুরু করার আগেই ১৯৯১ সালে বসলেন বিয়ের পিঁড়িতে। পাত্র ভোপালের হাইকোর্টের আইনজীবী। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পরেই যোগিতা জেনেছিলেন, নিজের পেশা সম্পর্কে মিথ্যে কথা বলেছেন তাঁর স্বামী। তিনি মোটেও হাইকোর্টের আইনজীবী নন। তবে তত দিনে যোগিতার কোলে এসে গেছে দু’টি সন্তান। মেয়ে যশিকা এবং ছেলে যশ্বিন।

এর মধ্যে সঙ্কট আরও তীব্র হল, যখন আরও কিছু বছর পরে পথ দুর্ঘটনায় মারা গেলেন স্বামী। দুই ছোটো সন্তানকে নিয়ে যোগিতা তখন অথৈ জলে। সংসার চালাতে তাঁকে উপার্জনের পথে নামতেই হতো। আইনজীবী হিসেবে আদালতে যাতায়াতও শুরু করেছিলেন। কিন্তু কবে পসার জমবে, কবে রোজগার শুরু হবে– সেই অপেক্ষাটুকু করাও তখন যোগিতার কাছে বিলাসিতা।

জীবনের এই দুঃসময়েই কাজে লেগে গিয়েছিল ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ। তালিম নিলেন ট্রাক চালানোয়। কারণ এই গাড়িটি চালিয়েই কম সময়ে বেশি রোজগার করা যায়। তালিম নিতে বেশি দিন সময় লাগল না। ট্রাক নিয়ে যোগিতা টুকটুক করে বেরিয়ে পড়লেন জাতীয় সড়ক ধরে। প্রথমে দুয়েকটা ছোটো ছোটো ট্রিপ। জিনিস পৌঁছে দেওয়া, আনা। হাতে এল তৎক্ষণাৎ টাকা। সেই শুরু। এখন রাতের অন্ধকার চিরে জাতীয় সড়ক দিয়ে মাইলের পর মাইল ছুটে যাওয়া যোগিতার কাছে জলভাত।

যোগিতা মনে করেন‚ তাঁর টাকার দরকার ছিল‚ সেটা দিয়েছে ট্রাকের স্টিয়ারিং। পেশা নিয়ে কোনও কুণ্ঠা নেই তাঁর। আবার নেই বিপ্লবের আস্বাদনও। দু’সন্তানের মা হয়েও এমন পেশায় এসে আলাদা কোনও গর্ব বা অহঙ্কার নেই তাঁর। তবে শিক্ষার ডিগ্রির কথা মনে পড়লে, এখনও এক চিলতে মলিন হাসি ফুটে ওঠে কলেজপড়ুয়া দুই সন্তানের মা যোগিতার মুখে। তবে ওইটুকুই। পাঁচ লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ পথ ট্রাক চালিয়ে পাড়িয়ে দেওয়া যোগিতার এখন শুধু পেশা নয়, নেশাও হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাক চালানো। আফশোস নেই। আছে শুধুই আত্মবিশ্বাস।

বলা বাহুল্য, বাবা-মায়ের মতের বিরূদ্ধেই এই পেশায় এসেছিলেন যোগিতা। পাশে ছিলেন না শ্বশুর-শাশুড়িও। আর বাইরের মানুষের প্রশ্ন তো ছিলই।

যোগিতা বলছিলেন, “আজও আমায় শুনতে হয়, রাতবিরেতে এত বাইরে ঘুরতে হয়, মুশকিলে পড়তে হয় না কখনও?” তাঁর সাফ জবাব, “মহিলা এবং পুরুষের মধ্যে আমি ফারাক দেখি না। যারা দেখেন, তাঁরাই এই সমস্যা তৈরি করেছেন। এবং অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের দুর্বল করে রেখেছেন।”

নিজে মেয়ে বলে নিজেকে কোনও ভাবেই দুর্বল বলে মানতে নারাজ যোগিতা। তবে ট্রাক চালানোর পাশাপাশি, অবসর সময়ে তাই সেলাইও করেন  তিনি। তৈরি করেন নিজের পোশাক। বানিয়ে দেন ছেলে-মেয়েকেও। কিন্তু এর পাশাপাশিই ছেলেমেয়েদেরও সেভাবেই বড় করেছেন। তারাও নিজের ইচ্ছেমতো পেশা বেছে নেবে বড় হলেই। ট্রাকের স্টিয়ারিং, সেলাই মেশিন, মাতৃত্বের এই সমাহার যোগিতাকে অনন্যা করে তুলেছে।

কিন্তু পেশা নিয়ে যতই আবেগ থাক, যোগিতার কিছু অনুযোগও রয়েছে। এক, ট্রাক ওভারলোডিংয়ের তিনি ঘোরতর বিরোধী। এতে বহু দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানান তিনি। দুই, যোগিতা চান ট্রাক চালকেরা নেশাভাং করে রোজগারের টাকা না উড়িয়ে, নিজেদের জীবন শুধরে নিন। চান এই পেশার প্রতি একটু সন্মান। ট্রাক চালনা আর উচ্ছৃঙ্খলতা কখনওই সমার্থক নয় তাঁর কাছে।

আর কত দিন চালাবেন ট্রাক? ৫০ বছর পার করে ফেলা যোগিতা বলেন, “জানি না। মনে হয় না কখনও ছাড়তে পারব।” তাঁর কথায়, “যাঁর যে কাজ যত দিন করতে ভাল লাগে, তত দিন করে যাওয়া উচিত। তা হলেই আর পেশার জাঁতাকলে হাঁপিয়ে উঠবেন না কেউ।  আমার ড্রাইভিং করতে ভাল লাগে, করছি। করব যত দিন খুশি।”– সরল দর্শন, সহজ জীবন।

পথে চলতে চলতেই দেখেন মানুষ। কখনও তাঁদের অবাক দৃষ্টি, কখনও বা বিদ্রুপ পার করে আবার ট্রাক ছোটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কখনও পথে শুয়ে টায়ার পালটে নেওয়া, কখনও আবার ঘুষখোর পুলিশের সঙ্গে রফা করা– সবই এখন অবলীলায় সামলান যোগিতা। লিঙ্গভিত্তিক পেশাবিভাজন ফুৎকারে উড়ে যায় তাঁর জেদ আর সঙ্কল্পের কাছে।

“হয়তো মেকানিকের কাছে গেলাম গাড়ি সারাতে, সে ভাবল স্কুটি সারাতে এসেছি। তার পরে আমার বাহন দেখে তার মুখের ভোল বদলে যায়। হয়ত রাতের ধাবায় একলা মেয়েকে দেখে কেউ টিটকিরি মারল, তার পরে যখন দেখে সে একটা দশ চাকার ট্রাক চালিয়ে নিয়ে এসেছে, থমকে যায় তারাও।” হাসতে হাসতে বলছিলেন যোগিতা। হ্যাঁ, এই সব প্রতিকূলতাই তাঁর কাছে এখন হাসির খোরাক। প্রথম দিকে মহিলা ট্রাক-ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বক্রচক্ষু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছেন এক সময়ে। কিন্তু এখন, অবলীলায় এড়িয়ে যেতে পারেন এ সব।

প্রায় দু’দশকের এই পেশায় কি বদলেছে কোনও কিছু?  যোগিতার উত্তর, “অনেক কিছুই বদলেছে। তবে সে দিনও লোকে বিশ্বাস করত না আমি ট্রাক চালাই, আজও বিশ্বাস করে না। এটায় কোনও বদল নেই।”–- হেসে বললেন যোগিতা।

বদল নেই আরও অনেক কিছুতেই। যেমন এত বছর এই পেশায় দক্ষ হয়ে ওঠার পরেও, আজও যে সংস্থাগুলির হয়ে পণ্য সরবরাহ করেন তিনি, সেখানে শৌচালয় ব্যবহার করতে পারেন না। কারণ এই পেশায় কেউ মহিলা শৌচাগার তৈরির প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেনি।

এর মধ্যেই মিলেছে স্বীকৃতি। ২০১৩ সালে মাহিন্দ্রার তরফে তাঁকে ‘মাহিন্দ্রা ট্রান্সপোর্ট এক্সেলেন্স’ পুরস্কার দেওয়া হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় তাঁর নিজের একটি আস্ত ট্রাক, নিজস্ব বাহন। সেই নিজস্ব ট্রাক নিয়ে যোগিতা এখন সারা ভারত চষে বেড়ান অকুতোভয়ে। ভোপাল থেকে কেরল, জম্মু, জলন্ধর হয়ে ফের ভোপাল ফিরতে পারেন দশ দিনে। ট্রাকের পরিযায়ী জীবনেই এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যোগিতা। এভাবেই ঘুরতে চান সারা দেশ। কেবিনই ঘর হয়ে উঠেছে। পথই তীর্থ। এক সময়ে যে পেশায় আসা হয়েছিল প্রয়োজনের তাড়নায়, তা আজ প্যাশন।

পেশাগত স্বাধীনতায় অবিচল থেকে, যোগিতা নিজের অজ্ঞাতেই নারীমুক্তির পথে বেশ কয়েকটা মাইলফলক পেরিয়ে এসেছেন ট্রাক হাঁকিয়ে!

আরও পড়ুন…

পাখিরা জল খাবে, তাই ছ’লক্ষ টাকা খরচ করে একা হাতে ১০ হাজার মাটির পাত্র বানিয়ে বিলোচ্ছেন বৃদ্ধ

Comments are closed.