জলের নীচে ডুবে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা তাদের, মালয় সমুদ্রে বাস বাজাউ উপজাতির

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    প্রায় হাজার বছর আগের কথা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোহর রাজ্যের রাজকন্যা দায়াং আয়েশাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সুলু রাজ্যের রাজার সঙ্গে বিয়ে দিতে। তাই জোহরের রাজার বিশাল রাজকীয় নৌবহর চলেছে সমুদ্র পথে। কয়েকশো নৌকার বহর। রাজকন্যাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাজাউ নামের এক উপজাতি। যারা এই এলাকার সমুদ্রকে নিজের হাতের তালুর মতই চেনে।

    ব্রুনেইয়ের তৎকালীন সুলতান আগেই আয়েশাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জোহরের রাজা তাঁর মেয়ের সঙ্গে ব্রুনেইয়ের সুলতানকে বিয়ে দিতে রাজি নন। এই অপমান ভুলতে পারেননি ব্রুনেইয়ের সুলতান। সুলুর রাজার সঙ্গে আয়েশার বিয়ে তিনি মেনে নিতেও পারেননি। তাই অন্য কৌশল নিলেন সুলতান। আরও বড় নৌবহর নিয়ে এসে অতর্কিতে আক্রমণ করলেন জোহর রাজ্যের নৌবহরকে। গভীর সমুদ্রে তুমুল লড়াইয়ের পর ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন জোহরের রাজকন্যাকে।

    দেশে ফিরেই রাজকন্যাকে বিয়ে করলেন সুলতানের। আর বিপদে পড়লেন কয়েকশো বাজাউ ও তাদের পরিবার। দেশের ফিরলে জোহরের রাজা কোতল করবেন। প্রাণের ভয়ে তারা আর দেশে ফিরতে পারেনি। স্থলের সঙ্গে তাদের চিরকালের জন্য বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সমুদ্রই হয়ে যায় তাদের ঘর।  ঘুরতে থাকে বাজাউরা বিভিন্ন উপসাগরে, দেশহীন যাযাবর হয়ে।

    আজও কিন্তু সমুদ্রেই আছেন বাজাউরা

    সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল বাজাউ-লাউটদের আজও পুরো জীবন কাটে সমুদ্রে। প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উপসাগর রয়েছে। যাদের নাম সুলু, সেলেবিস, বান্দা, মালুকু, জাভা, ফ্লোরেস এবং সাভু। এই উপসাগরগুলির নীল জলে ঘুরে বেড়ান বাজাউরা, তাঁদের বিশেষ আকৃতির নৌকা লেপা-লেপাতে চড়ে। নির্দিষ্ট কোনও ঠিকানা নেই এদের। তাই এদের বলা হয়  Sea Gypsies” বা “Sea Nomads“।

    সমুদ্রের অগভীর জলে বাজাউদের অস্থায়ী বসতি

    সমুদ্রের অগভীর এলাকায়, তীর থেকে আধ কিলোমিটার সমুদ্রের ভেতরে বাজাউরা তৈরি করে তাদের অস্থায়ী গ্রাম। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা বাড়িগুলি কয়েক ঘন্টার মধ্যে খুলে ফেলা যায়। বাড়িগুলির নীচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ বয়ে যায়। ছোট ছোট ডিঙির মত নৌকা করে চলে এ বাড়ি সে বাড়ি যাওয়া আসা। বাড়ি থেকে নেমে আসে মই। ওপরে ওঠার জন্য। জলের ওপরে বানানো হলেও ঘরগুলি কিন্তু পোক্ত। ২০০৪ সালে হওয়া সুনামিতে বাজাউদের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সুনামি ঠিক তাদের ঘরের নীচ দিয়ে গেছে।

    ঘরের সামনে বাজাউ মহিলা

    কেউ কেউ আবার নৌকাতেই থাকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি, এই উপজাতির অনেক মানুষ আছে যারা মাটিতে কোনওদিন পা রাখেনি। রাখবেই বা কী করে। নিজের দেশ নেই, নাম শুনলেই পুলিশ তাড়া করে।

    বাজাউরা নিজেদের বয়স বলতে পারে না। এই যুগেও, সময় কিংবা তারিখ সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। ঠিক যেমন তারা জানে না বিদ্যুৎ কী ও কেন লাগে। সামুদ্রিক মাছের তেলের মশাল আজও তাদের রাতের অন্ধকার কাটায়। সমুদ্র তীরবর্তী কিছু সহৃদয় গ্রাম এদের জ্বালানী কাঠ ও জল ও জামা কাপড় দেয়। বিনিময়ে বাজাউরা দেয় মাছ।

    বাজাউদের হাউসবোট ‘লেপা-লেপা’

    বাজাউরা তিমি ও ডলফিনের মতই প্রাকৃতিক ডুবুরি 

    অত্যন্ত শান্ত ও আমুদে এই উপজাতিটি সম্পূর্ণ সামুদ্রিক খাবারের ওপর বেঁচে থাকে। বছরের বেশিরভাগ দিনই তাদের সমুদ্রের নীচে নামতে হয় খাদ্য সংগ্রহের জন্য। তাই প্রত্যেকটি বাজাউ পুরুষ ও নারী অবিশ্বাস্য মানের ডুবরী। জলের নীচে তারা জলের ওপরের মতই সাবলীল। ছোট বাজাউ শিশুরাও  সমুদ্রের তলায় অক্লেষে মাছের মতই সাঁতার  কেটে বেড়ায়। এমনকি খেলা করতেও সমুদ্রের জলে নামে। ডাঙার শিশুরা যেমন মাঠে খেলতে যায়।

    বাজাউ শিশুরা খেলা করে সমুদ্রের নিচে

    খুব ভোরে নয় একটু বেলার দিকে সমুদ্রে নামে বাজাউ পুরুষরা। তার আগে ভারী হওয়ার জন্য কোমরে পাথর বেঁধে নেয়।  কাঠ ও ফেলে দেওয়া কাচ দিয়ে নিজেদের অপটু হাতে তৈরি করা জলনিরোধক চশমা চোখে পরে নেয়। যা জলের তলায় দেখতে ও চোখকে চাপ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। সঙ্গে নেন নিজেদের বানানো অদ্ভুতদর্শন একটি কাঠের বন্দুক। যেটা দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে তির ছোঁড়া যায় জলের নীচে।

    এরপর বাজাউরা এক বুক শ্বাস নিয়ে খাদ্যের সন্ধানে নেমে যায় সমুদ্রের ২৩০ ফুট নীচে। অবিশ্বাস্য ভাবে এরা জলের নীচে শ্বাস ধরে থাকতে পারে প্রায় ১০ থেকে ১৩ মিনিট। যা বিশ্বের আর কোনও উপজাতির মানুষরা পারে না। জলের নীচে শিকার করে তাদের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন মাছ, স্টিং রে, স্কুইড, অক্টোপাস। উঠে আসার সময়  শরীরে বাঁধা  ওজন খুলে ফেলে শরীরকে হালকা করে নেয়।

    সমুদ্রের ২০০ ফুট নিচে চলছে শিকার

    জলের নীচে এতক্ষণ দম চেপে রাখার রহস্যটা কী

    বিভিন্ন গবেষকের  জীবজগতের ওপর করা গবেষণাপত্র প্রকাশ করে থাকে বিশ্বখ্যাত জার্নাল Cell। এই পত্রিকাটিতে, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক মেলিসা ইলার্ডোরাসমুস নিয়েলসেন বাজাউদের নিয়ে করা এক গবেষণা পত্রে  দিয়েছেন বাজাউদের এই রহস্যের উত্তর। গবেষকরা জানিয়েছেন বাজাউদের জিনে থাকা কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যই  তাদের প্রাকৃতিক ডুবুরি করেছে।

    বাজাউরা যখন শ্বাস চেপে জলে ডুব দেয় তখন তাদের দেহে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দেয়। হৃদপিন্ড তার কাজ কমিয়ে দেয়। অক্সিজেন বাঁচিয়ে রাখার জন্য। পালস রেট নেমে দাঁড়ায় প্রতি মিনিটে মাত্র ৩০ বার। শরীরের বাইরের দিকের কলাকোষ থেকে রক্তপ্রবাহের অভিমুখ ঘুরে যায় শরীরের ভেতরের দিকে। রক্ত যায় মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড ও ফুসফুসে।

    জলের তলায় খালি হাতে হাঙর ধরা, এটাও একটা খেলা

    মানুষের প্লীহা হল অক্সিজেন যুক্ত লোহিত রক্তকণিকার ভাঁড়ার ঘর। ডুবন্ত বাজাউদের প্লীহা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রক্তের স্রোতে অক্সিজেন যুক্ত লোহিত রক্তকণিকার যোগান বাড়িয়ে দেয়।

    গবেষকরা গিয়েছিলেন বাজাউদের কাছে

    এই গবেষণাটির জন্য মেলিসা ইলার্ডো  ইন্দোনেশিয়া গিয়েছিলেন সঙ্গী গবেষকদের নিয়ে। ৫৯ জন বাজাউকে রাজি করিয়েছিলেন তাঁর গবেষণায় সাহায্য করার জন্য। তিনি বাজাউদের DNA পরীক্ষা ও তাদের প্লীহার আলট্রাসোনগ্রাফি করান।। একই সঙ্গে তিনি বাজাউদের সঙ্গে অতীতে সম্পর্কযুক্ত ও বর্তমানে ডাঙাতেই বাস করা মোরো উপজাতির ৩৪ জন মানুষেরও একই পরীক্ষা করেন। উভয় গোষ্ঠীর সমস্ত পরীক্ষা করে দেখা যায় বাজাউদের প্লীহা, মোরো উপজাতির মানুষদের প্লীহার তুলনায় ৫০% বড়। এই শারীরিক পার্থক্যই বাজাউদের অবিশ্বাস্য ডুবুরি করে তুলেছে।

    অক্টোপাস শিকার

    DNA বিশ্লেষণেও একই জিনিস দেখা গেছে। বাজাউদের জিনে আকস্মিক পরিবর্তন বা মিউটেশন দেখা গেছে। এবং এমন একটি জিনে এই পরিবর্তন হয়েছে যেটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। সেই জিনটি আপৎকালীন প্রয়োজন অনুসারে রক্তস্রোতকে পাঠিয়ে দেয় সেই অঙ্গগুলিতে, যেখানে সব চেয়ে বেশি অক্সিজেন দরকার। যে অঙ্গগুলিতে অক্সিজেন কিছুক্ষণ না গেলে ততটা ক্ষতি হবে না, সে দিকে রক্তস্রোত কমে যায়।

    পরিবর্তন দেখা গেছে বাজাউদের আরেকটি জিনে। যেটি  carbonic anhydrase নামে একটি এনজাইম (enzyme) তৈরি করে। যে এনজাইমটি রক্তস্রোতে খুবই ধীরে কার্বন-ডাই অক্সাইড পাঠায়। ফলে এই পরিবর্তনটিও বাজাউদের শ্বাস ধরে রাখতে সাহায্য করে। প্লীহা সংলগ্ন পেশীর সংকোচন ঘটায় যে জিন তারও পরিবর্তন হয়েছে। যে জিনটি প্লীহার সংকোচন ঘটিয়ে রক্তে অক্সিজেন মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।

    রোজ চলে বাঁচার লড়াই

    পরীক্ষার সমস্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সিদ্ধান্তে আসেন। সামুদ্রিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য, শত শত বছর ধরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য সমুদ্রের গভীরে যাওয়ার অভ্যাস, বাজাউদের বিভিন্ন অঙ্গ ও শ্বসনতন্ত্র এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাই বুঝি বাজাউরা সমুদ্রের জলে মাছের মতই সাবলীল। অন্যদিকে ডাঙার খাবারে অভ্যস্ত হওয়ায় মোরো উপজাতির ডুব দেওয়ার ক্ষমতা নেই।

    জন্ম আছে মৃত্যু আছে; নেই দেশ, নেই ভবিষ্যৎ

    আজও কেন আতঙ্কে থাকে বাজাউরা

    কারণ বাজাউদের দেশ নেই। পরিচয়পত্র নেই। সুলু সমুদ্রে যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়ায় তাঁরা। ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়ার তীর বরাবর। অসুস্থ হলেও তীর ছোঁয়ার উপায় নেই। নাগরিক না হওয়ায় ডাঙায় এলে বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল চিকিৎসা করে না। পুলিশ গ্রেফতার করে ফেলে রাখে জেলে, বিনা বিচারে। তাই জন্মের মত বাজাউদের মৃত্যুও হয় সমুদ্রে। নৌকা করে দূর সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় মৃতদেহ। সমুদ্রের পুত্র-কন্যারা সমুদ্রগর্ভেই বিলীন হয়ে যান সামুদ্রিক জীবের খাদ্য হতে হতে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More