মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৮
TheWall
TheWall

যাদব পায়েং, একা হাতে ভারতকে উপহার দিয়েছেন আস্ত একটা অরণ্য, যেখানে থাকে বাঘ হাতি গণ্ডার

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৭৮ সালের জ্বালা ধরানো গ্রীষ্ম। অসমের ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ভাসছে ছোট্ট একটি দ্বীপ অরুণা সাপোরি। সেই দ্বীপের বালির চড়া ধরে হাঁটছিল ১৬ বছরের কিশোর যাদব পায়েং। জোরহাটের বালিগাঁও জগন্নাথ বড়ুয়া আর্য বিদ্যালয় থেকে দশম শ্রেণির পরীক্ষা দিয়ে জন্মস্থানে ফিরছিল সে। প্রায় ১০ বছর পর।

এগিয়ে চলেছিল যাদব আর বুকের ভেতরটা তার হু হু করছিল। এ কী দেখছে সে! মাত্র কয়েক বছরে দ্বীপের সবুজ উধাও! কত গাছ ছিল। সেই গাছের ডালে দোলনা বানিয়ে ঝুলত বালক যাদব। আজ সেখানে শুধু বালি আর বালি। সবুজের লেশমাত্র নেই।

ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে উঠছিল বালুচর

আর একটু এগিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল যাদব 

প্রখর রোদ মাথায় নিয়ে মাটিতে বসে পড়েছিল। অরুনা সাপোরি দ্বীপে ধূ ধূ মরুভূমির মতো তীরে মরে পড়ে আছে কয়েক হাজার সাপ। এঁকেবেঁকে, গায়ে গায়ে জড়িয়ে, কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় কাঠ হয়ে পড়ে আছে।

কারণ, তাদের আবাস কেড়ে নিয়েছে ভূমিক্ষয় আর মানুষের লোভ। দ্বীপের বনজঙ্গল চেঁছেপুঁছে সাফ করে দিয়েছে মানুষ আর ব্রহ্মপুত্রের খামখেয়ালি গতিপথ।

এই দ্বীপেই আছে যাদব পায়েংদের গ্রাম। যদিও পায়েংদের পরিবার এই গ্রামে আর থাকে না। ভূমিক্ষয়ের কারণে ১৯৬৫ সালে পায়েং পরিবার অরুণা সাপোরি ছেড়ে নদীর অন্য তীরে ১২ কিমি দূরের মাজুলিতে বসবাস করে।

এভাবেই অরুণা সাপোরিকে খেয়ে নিচ্ছিল ব্রহ্মপুত্র নদ

কিন্তু গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কারণ গ্রামে আছে পায়েং পরিবারের পশুখামার। যেখানে প্রচুর গোরু -মোষ থাকে। শুয়োর চাষও করা হয়। যাদব পায়েং-এর বাবা এই খামার চালাতেন। কিন্তু বাবা লক্ষ্মীরাম ও মা আফুলি মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মারা যান।

১৩ ভাইবোনের সংসারের হাল ধরতে কিশোর যাদব তাই তার জন্মস্থানে ফিরেছিল। পড়াশোনা ছেড়ে দুধের ব্যবসা দেখবে সে। কিন্তু মৃত সাপেদের ভাগাড় তার কিশোর মনকে খেয়ালি ব্রহ্মপুত্রের স্রোতের মতই অন্যপথে চালিত করল।

খাটালে না গিয়ে যাদব গিয়েছিল দেওরি সম্প্রদায়ের গ্রামে

গ্রামবাসীদের বলেছিল সাপদের করুণ পরিণতির কথা। গ্রামবাসীদের অনেকে সেদিকে না ভেবে পারিবারিক দুধের ব্যবসার দিকে মনযোগ দিতে বলেছিল।

কিন্তু একজন বৃদ্ধ গ্রামবাসী যাদবকে গ্রাম থেকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিশোর যাদবের হাতে ৫০ টা বীজ ও ২৫ টি বাঁশগাছের চারা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “গাছ লাগাও বাবা, শুধু সাপরা কেন আমরা সবাই বাঁচব। একটা কথা মাথায় রেখো, যেখানে গাছ, সেখানেই পাখি। যেখানে পাখি, সেখানে ডিম। যেখানে ডিম, সেখানে সাপ। আবার যেখানে গাছ, সেখানে চারা। যেখানে চারা, সেখানে জঙ্গল। যেখানে জঙ্গল, সেখানে বৃষ্টি। যেখানে বৃষ্টি, সেখানে চাষাবাদ ও তোমাদের গোরু -মোষের ঘাস।”

অবাক হয়ে বৃদ্ধ মানুষটির কথা শুনছিল যাদব। বুকের ভেতর প্রতিটি শব্দ গেঁথে যাচ্ছিল। বৃদ্ধের কাছে শুনেছিল গাছ লাগাবার আদর্শ সময় এপ্রিল থেকে জুন। তাই বৃদ্ধের দেওয়া গাছের চারাগুলি প্রথমে সে খামারের পাশেই বসাল। যাতে রোজ জল দেওয়া যায়।

১৯৭৯ সালে একাই সবুজ যুদ্ধে নেমে পড়েছিল কিশোর যাদব পায়েং

এপ্রিল মাসের শেষে অরুনা সাপোরি দ্বীপের ক্ষয়ে যেতে বসা অংশে একাই বিভিন্ন গাছ ও বাঁশের কয়েকশো চারা লাগিয়েছিল। একইসঙ্গে ছড়িয়েছিল হাজার হাজার বীজ। এক বছর ধরে ঘুরে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সেগুলি জোগাড় করেছিল। সে বছর একটু আগেই অসমে এসেছিল বর্ষা। যাদব পায়েং-এর লাগানো  চারাগাছের শিকড় আঁকড়ে ধরেছিল ক্ষয়ে যেতে থাকা মাটি।

তারপর থেকে প্রতিবছর একই ভাবে গাছ লাগিয়ে চলেছে কিশোর যাদব। গাছগুলি বয়সে ও মাথায় বাড়ে, একই ভাবে বয়সে ও মাথায় বাড়তে থাকে যাদবও। এভাবেই কেটে যায় ৪০ বছর। আজ, বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে বিশ্ব তাকিয়ে দেখে, চার দশক ধরে রক্তজল করা পরিশ্রম করে যাদব পায়েং ভারতকে উপহার দিয়েছেন ১৩৬০ একর জায়গা জুড়ে থাকা আস্ত একটা অরণ্য।

যাদব পায়েং-এর তৈরি ‘মোলাই ফরেস্ট’

যাদব পায়েং-এর লাগানো বাঁশ, বহেরা, সেগুন, গাম্ভরি, কাস্টার্ড আপেল, তারা ফল, গুলমোহর, ডেভিল’স ট্রি, তেঁতুল, তুঁত, কাঁঠাল, কুল,জাম, কলা গাছ, এলিফ্যান্ট গ্রাস এখন যাদবের মাথা ডিঙিয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। যেখানে আগে ধূ ধূ করত বালির চর, সেখানে এখন অবস্থান করছে এক দুর্ভেদ্য জঙ্গল।

যাদবের তৈরি করা  অরণ্যে এখন পাঁচটি রয়াল বেঙ্গল টাইগার, তিন বা চারটি একশৃঙ্গ গণ্ডার,শতাধিক হরিণ, বুনো শুয়োর, কয়েকশো শকুন, শতাধিক প্রজাতির পাখি বাস করে। আর বাস করে হাজার হাজার সাপ। যাদের জন্যই যাদব এই অবিস্মরণীয় মিশন শুরু করেছিলেন।

আজ স্থানীয় মানুষরা তাঁদের ‘নয়নের মণি’ যাদবকে ডাকেন মোলাই নামে। যার অর্থ জঙ্গল। আর সারাভারত বা বিশ্ব তাঁকে চেনে ফরেস্ট ম্যান নামে।

‘ফরেস্ট ম্যান’ যাদব পায়েং

৩৯ বছর বয়সে, গ্রামের বড়দের আদেশে যাদব বিয়ে করেন ২৫ বছরের বিনীতাকে। তাঁদের তিন সন্তান, মুনমুনি, সঞ্জীব ও সঞ্জয়। সন্তানদের পড়াশুনোর জন্য যাদবকে ২০১১ সালে জোড়হাটের কোকিলামুখে চলে আসতে হয়। তবু একদিনের জন্যও বিচ্ছেদ হয়নি অরণ্যের সঙ্গে। যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘মোলাই ফরেস্ট‘।

এখনও রাত তিনটেতে ওঠেন যাদব পায়েং

শুরু হয় ম্যারাথন দৌড়। এক ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে পৌঁছন কার্তিক সাপোরিতে। সেখান থেকে নিজেই ডিঙি নৌকা বেয়ে পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে নামেন দ্বীপে। সেখান থেকে আবার আধ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে পৌঁছন অরুনা সাপোরিতে থাকা তাঁর পশুখামারে।

নিজের হাতে তৈরি করা জঙ্গল পেরিয়ে খামারে যাচ্ছেন যাদব

এখন চারজন কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও নিজে হাতে গোরুদের গোবর পরিষ্কার করেন। দুধ সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য শহরে পাঠান। সকাল ৯ টার মধ্যে এসব করে, প্রাতরাশ সেরে জঙ্গলে ঢোকেন গোবর ছড়াতে ও গাছ লাগাতে।

যে জঙ্গলে বছরে ৩~৪ মাসের জন্য আশ্রয় নেয় ১১৫ টি হাতির একটি দল। যে জঙ্গলে থাকা বাঘেরা গত ৪০ বছরে যাদব মোলাই পায়েং-এর খামারের ৮৫ টি গরু, ৯৫ টি মোষ, ১০ টি শুয়োর খেয়েছে।

যাদব পায়েং এর মোলাই ফরেস্টে আজ এরা নির্ভয়ে বাস করে

তাতে অবশ্য একটুও বিচলিত হননি যাদব। তাঁর কথায়, মানুষ ওদের জঙ্গল কেড়েছে, তাই মানুষকেই তার দাম দিতে হবে। মজা করে বলেন, “বাঘেরা তো পশুপালন ব্যাপারটা বোঝে না। ওদের দোষ দিয়ে লাভ কী!”

যাদব পায়েং অরণ্যের আড়ালে রয়ে যেতেন, যদি না জিতু কলিতা নামে স্থানীয় এক ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার ছবি তুলতে গিয়ে তাঁর দেখা পেতেন। ২০১০ সালে ভার্নাকুলার ডেইলি নামে এক পত্রিকায় তিনি যাদবের কথা লেখেন।

মোলাই ফরেস্টে বসে নানা পাখির মেলা

মানুষের নজরে আসে এই অবিশ্বাস্য কীর্তি

২০১২ সালে যাদবের এই অসামান্য ও একক অবদানের জন্য জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি ‘আর্থ-ডে’র দিন তাঁকে Forest Man of India শিরোপা দেয়। ওই বছরেই ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এপিজে আব্দুল কালাম মুম্বইয়ে যাদব পায়েংকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করেন।

পুরষ্কার তুলে দিচ্ছেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এপিজে আব্দুল কালাম

একই বছরে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত  International Forum for Sustainable Development-এর এক কনফারেন্সে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ৯০০ জন বিশেষজ্ঞের মধ্যে যাদব পায়েংও ছিলেন। Wildlife Service Award দিয়েছে Sanctuary Asia। ২০১৫ সালে পেয়েছেন পদ্মশ্রী পুরস্কার।

পদ্মশ্রী পুরস্কার নিচ্ছেন যাদব পায়েং

তবুও ম্লান যাদব পায়েং-এর মুখ

স্থানীয় প্রশাসন ও বনদফতরের কাছ থেকে উৎসাহ তো দূরের কথা, তেমন কোনও সাহায্যই পান না। একসময়  বার বার দৌড়ে যেতেন বনদফতরের অফিসে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলতেন লুপ্তপ্রায় গণ্ডার জঙ্গলে ঢুকেছে। তাদের সূরক্ষা দরকার। না হলে চোরাশিকারীরা মেরে ফেলবে। কিন্তু তাঁর কথা কানেই তোলেনি বনদফতর।

২০১২ সালে আগস্ট মাসে চোরাশিকারীরা একটা গন্ডারকে মারার পর বনদফতরের বিশ্বাস হয়েছিল যাদবের তৈরি করা জঙ্গলে সত্যিই গন্ডার থাকে। প্রসঙ্গ উঠলে আজও ছলছল করে যাদবের চোখ,” জানেন, আমার ছোটো ছেলে আর আমি কয়েক দিন খেতে পারিনি, যখন দেখেছিলাম চোরাশিকারীরা গন্ডারটির খড়গ, লেজ আর নখ কেটে নিয়ে গেছে। কিন্তু কী করব, একটা বিশাল অরণ্যকে সুরক্ষা দেওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়।”

চোরাশিকারীদের হাতে প্রাণ হারাবার ঝুঁকি থাকা সত্বেও জঙ্গল পাহারা দিচ্ছেন পায়েং

তবুও যাদব পায়েং চান, ‘মোলাই ফরেস্ট’ আয়তনে  বাড়ুক

তাঁর স্বপ্ন, অরণ্যটি প্রথমে মাজুলি, তারপর কমলাবাড়ি হয়ে একদিন ডিব্রুগড় জেলার সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন ‘ফরেস্ট ম্যান’ মোলাই পায়েং। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া সমস্ত অর্থ তিনি ব্যয় করছেন বনসৃজনের জন্য। জঙ্গল লাগোয়া আরও ৫০০০ একর বন্ধ্যা জমিকে অরণ্যের রূপ দান করবেন যাদব।

এই বালুচরেই জেগে উঠবে ঘন অরণ্য

রোজ যখন অরুনা সাপোরি দ্বীপের আকাশে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ে, জঙ্গলের উঁচু উঁচু গাছেদের মগডালে চুমু দিয়ে সূর্যের শেষ রশ্মি যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদায় নেয়, তখন যাদব পায়েং-এর সাইকেল ছোটে উল্টো পথে। আবার সাইকেল-নৌকা-সাইকেল পর্ব মিটিয়ে বাড়ি ফেরেন যাদব, ঘড়িতে তখন রাত প্রায় আটটা।

বেলা শেষে বাড়ি ফিরছেন যাদব পায়েং

রাতের খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি বিছানায় যান যাদব। কাকভোরে উঠতে হবে যে! বিছানায় শুয়ে যাদব মনে মনে হিসাব করেন আগামীকাল কতটা জমিতে কতগুলি চারা লাগাবেন। একসময় সবুজ যোদ্ধার সবুজ দুটি চোখে নেমে আসে ঘুম। সত্যিই ঘুমোন, না কি সবুজের স্বপ্নে বিভোর হয়ে সবুজ ভোরের জন্য জেগে থাকেন ভারতের ‘ফরেস্ট ম্যান’ যাদব মোলাই পায়েং!

পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

তাহু ফল, ঐশ-রোষ ও পিগমি সমাজ

Share.

Comments are closed.