বুধবার, অক্টোবর ১৬

আরও দেড় হাজার বছর ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়াবে মাদাম কুরির নোটবুক

রূপাঞ্জন গোস্বামী

৪ জুলাই, সানসেলমজ, ফ্রান্স

পাহাড়ের ঢালে চুপটি করে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্য নিবাসটির জানলার বাইরে, পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণতা বাড়িয়ে মৃত্যুর ধূসর ছায়া ক্রমশ ম্যাপল গাছগুলোকে ঘিরে ফেলেছিল। ঘরের ভিতর বিছানায় শুয়ে ছিলেন আধুনিক পদার্থবিদ্যার জননী মাদাম কুরি। প্রথম মহিলা হিসেবে যিনি দুটি ভিন্ন বিভাগে, ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

মায়ের বিছানা থেকে একটু দূরে বসেছিলেন ছোট মেয়ে ইভ। বিছানার সঙ্গে মিশে যাওয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করছিলেন , “মা যেন ভয়ঙ্কর রকম চুপচাপ হয়ে গেল। আর কাঁপছে না মায়ের সদা ব্যস্ত হাত দু’টো।” মাকে সামান্য ছোঁয়ারও অনুমতি ছিল না। মায়ের হাত দু’টি ইতিমধ্যে শক্ত হতে শুরু করেছিল। হাতের চামড়ার জায়গায় জায়গায় পুড়ে যাওয়ার মতো অসংখ্য কালো কুচকুচে দাগ দেখতে পাচ্ছিলেন ইভ। তেজস্ক্রিয়তার চুম্বনের দাগ।

ঘরের ভিতরে ডাক্তার ও নার্সর চলাফেরা দ্রুত থেকে হতে শুরু করেছিল। একসময় ডাক্তার মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে ইভকে বলে গিয়েছিলেন,” মাদাম আর নেই।” মাদামের মৃত্যুর কারণ  aplastic pernicious anaemia। তেজস্ক্রিয়তার ফলে মাদাম কুরির হাড়ের ভেতরে থাকা মজ্জা তার সক্রিয়তা হারিয়েছিল। ফলে শরীরে রক্তকণিকা তৈরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তেজস্ক্রিয়তা

তেজস্ক্রিয়তা কী!

কোনও কোনও ভারী মৌলিক পদার্থের একটি প্রাণঘাতী বৈশিষ্ট্য থাকে। সেটি হল, এই পদার্থগুলির থেকে অবিরাম অত্যন্ত ক্ষতিকর আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি নির্গত হতে থাকে। যাদের বলা হয় তেজস্ক্রিয় রশ্মি। তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গমনের এই ঘটনাকে তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity) বলে। যে সব মৌলিক পদার্থ থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয় তাদেরকে তেজস্ক্রিয় মৌল বলে।

ফরাসি বিজ্ঞানী আঁতোয়া অঁরি বেকরেল, ১৮৮৬ সালে এক্সরে নিয়ে গবেষণা করার সময় দেখতে পান ইউরেনিয়াম ধাতুর পরমাণু থেকে অস্বাভাবিক ক্ষমতাসম্পন্ন রশ্মি নির্গত হচ্ছে। যা প্রায় সব কিছুকেই ভেদ করতে সক্ষম। ঘটনাটি সারা বিশ্বের বিজ্ঞান জগতে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

ইউরেনিনাইট বা পিচব্লেন্ড

বিজ্ঞানী বেকরেলের গবেষণাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন মাদাম কুরি। ইউরেনিনাইট বা পিচব্লেন্ড থেকে ইউরেনিয়ামথোরিয়াম নিষ্কাশন করার পর একদিন মাদাম কুরি আবিষ্কার করলেন, পিচব্লেন্ডের ভেতর লুকিয়ে আছে আর একটি ভয়ঙ্কর তেজস্ক্রিয় মৌল।

যার শক্তি, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের সম্মিলিত শক্তির চেয়েও কয়েক লক্ষগুণ বেশি শক্তিশালী। মাদাম কুরি, ১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে ফরাসি পদার্থবিদ ও স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে আবিষ্কার করেছিলেন অমিত শক্তিধর পোলোনিয়াম। মেরি কুরি তেজস্ক্রিয় মৌলটির নাম নিজের দেশ পোল্যান্ডের নামে রেখেছিলেন। এর পাঁচ মাস পরে পিচব্লেন্ড থেকে আলাদা ভাবে রেডিয়াম নিষ্কাশন করেছিলেন কুরি দম্পতি।

কুরি দম্পতি

যখন বোহেমিয়া থেকে পিচব্লেন্ডের টিন আসত, মাদাম কুরির ল্যাবরেটরিতে,  উত্তেজনার বশে অনেক সময় তিনি ইলেক্ট্রোমিটার নিয়ে পিচব্লেন্ডের ভেতরে সটান হাত ডুবিয়ে দিতেন। গোপন রহস্য জানার জন্য এত উদগ্রীব হয়ে পড়তেন যে নিজের সুরক্ষা নেওয়ার সময়টুকু নষ্ট করতে চাইতেন না।

অথচ তিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের তেজস্ক্রিয় মৌলের টেস্ট টিউব ধরতে বলতেন চিমটা দিয়ে। তাঁদের সুরক্ষিত করতেন সিসার আস্তরণ দেওয়া দস্তানা দিয়ে। কিন্তু অসীম অবহেলায় নিজের ল্যাবরেটরি ড্রেসের পকেটে রাখতেন তেজস্ক্রিয় পদার্থ ভর্তি টেস্ট টিউব।

আবিষ্কারকের শরীরে ছোবল মেরেছিল আবিষ্কার

যে দুটি মৌল আবিষ্কারের জন্য তাঁর ভুবনজোড়া নাম, সেই বিখ্যাত দুটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ পোলোনিয়াম ও রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তাই মেরি কুরির মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছিল। মেরী শেলী রচিত  ফ্রাঙ্কেনস্টাইন: অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস নামক বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাসটির দানবটির মতোই, রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম কামড় বসিয়েছিল আবিষ্কারকের শরীরে।

মাদাম কুরি হিরোশিমা নাগাসাকির ভাগ্যাহত লক্ষ লক্ষ মানুষদের মত তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যে মারা যাননি। দিনের পর দিন, এক পা এক পা করে, নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

মাদাম কুরিকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত একটি বিখ্যাত সমাধিক্ষেত্রে। যেখানে শুয়ে আছেন ফ্রান্সের বিখ্যাত মানুষেরা, যেমন দার্শনিক রুশো, ভলতেয়ার ও আরও অনেকে। মৃত্যুর পরেও তাঁর শরীরের তেজস্ক্রিয় ক্ষমতা বজায় ছিল। তাই তাঁর দেহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশকে বাঁচাতে, মাদাম কুরির কফিনকে এক ইঞ্চি পুরু সিসার আস্তরণ দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছিল।

মাদাম কুরির সমাধি

 আরও ১৫০০ বছর!

৮৫ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন মাদাম কুরি। তবুও তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, যেমন ফার্নিচার, রান্না শেখার বই, ল্যাবরেটরি নোটবুক গুলো এখনও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে চলেছে। এবং ছড়িয়ে চলবে আগামী ১৫০০ বছর। কারণ এই সমস্ত জিনিসপত্র রেডিয়াম-২২৬ দ্বারা দূষিত। যার তেজস্ক্রিয়তার আয়ু ১৬০০ বছর।

বিজ্ঞানের খনি হিসেবে পরিচিত মাদাম কুরির ল্যাবরেটরি নোটবুক। যেটি ফ্রান্সে লাইব্রেরিতে সিসার বাক্সে অত্যন্ত সুরক্ষিত ভাবে রাখা আছে। মাদাম কুরির বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি অতিথি ও গবেষকদের দেখতে দেওয়া হয়। তবে তার আগে সবাইকে একটি আইনি হলফনামায় সই করতে হয়। লিখিত ভাবে ঘোষণা করতে হয়, মাদাম কুরির জিনিসপত্র দেখতে গিয়ে শারীরিক ক্ষতি হলে কতৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

মাদাম কুরির সেই বিখ্যাত নোটবুক

খুনিদের চিনতে পেরেছিলেন মাদাম কুরি

মাদাম কুরি প্রায়ই ল্যাবরেটরিতে তাঁর ছাত্র ও সহ-বিজ্ঞানীদের বলতেন, “পোলোনিয়াম আর রেডিয়াম আমার ওপর রাগ পুষে রেখেছে।” কেন এ কথা বলতেন তিনি! তাঁর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ তখন কেউ অনুধাবন করতে পারেননি। কিন্তু তিনি জানতেন কী হতে চলেছে।

তিনি তাঁর ভবিষ্যতের খুনিদের আগে থেকেই চিনতে পেরেছিলেন। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, অনেক দেরি করে ফেলেছেন। তাই নিজের সুরক্ষার ব্যাপারে ছিল তাঁর চরম অবহেলা। নাকি, নিজের আবিষ্কারের হলাহল নিজে পান করে নীলকন্ঠ হতে চেয়েছিলেন। হয়তো এভাবেই বিজ্ঞান ও ভবিষৎ প্রজন্মকে তেজস্ক্রিয়তা সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়ে গিয়েছিলেন, নিজেকে নিজের ল্যাবরেটরির গিনিপিগ বানিয়ে।

Comments are closed.