শুক্রবার, জুন ২১

রাত পোহালেই নববর্ষ! মঙ্গল শোভাযাত্রায় পা মিলিয়ে ১৪২৬-কে স্বাগত জানাবে শহর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধ্যরাত থেকেই জেগে উঠবেন তাঁরা। বড় বড় তুলি, বালতি বালতি রং নিয়ে পথে নামবেন তাঁরা। শুরু করবেন রাস্তা জুড়ে রঙিন আল্পনা আঁকার কাজ। এ দিকে শয়ে শয়ে মুখোশ, ঘোড়া, গাছ, পাখির প্রতিকৃতি তৈরি হয়ে গেছে শেষ কয়েক মাস ধরে। শেষ মুহূর্তে সেগুলো গুছিয়ে নেওয়ার পালা। তার পরে অপেক্ষা রাত পোহানোর। নতুন আশার আলো নিয়ে ফুটে উঠবে নতুন বাংলা বছরের প্রথম সূর্যরশ্মি। এপার বাংলার তরফে তাঁরা স্বাগত জানাবেন, বাংলা নববর্ষ, ১৪২৬-কে।

তাঁরা মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্রের তরুণ-তরুণীরা। এই প্রথম নয়, এই নিয়ে তৃতীয় বার তাঁরা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজন করতে চলেছেন মঙ্গল শোভাযাত্রার। উদ্যোক্তাদের অন্যতম মুখ পৃথা বিশ্বাস জানালেন, মধ্যরাত থেকে আল্পনা দেওয়া শুরু হবে। তার পরে সকাল আটটায় দক্ষিণ কলকাতার গাঙ্গুলিবাগান থেকে শুরু করে এই শোভাযাত্রা যাবে যাদবপুর পর্যন্ত। পৃথা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রথম শুরু করলেও, এখন সারা রাজ্য জুড়েই বিভিন্ন এলাকায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে।

শোভাযাত্রার এই পথে থাকবে নানা রকমের মুখোশ, ঘোড়া, প্যাঁচা, বাঘ পুতুল। থাকবে বাঙালি নাচ, গান, নাটক, বাঁশি, আবৃত্তি, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। থাকবেন চিত্রশিল্পীরা, থাকবেন নানা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। থাকবেন স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকেরা এবং আরও হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। পায়ে পায়ে উৎসবে-উদযাপনে তাঁরা এগিয়ে যাবেন অসাম্প্রদায়িক বাংলার সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে।

হ্যাঁ, এই সম্প্রীতির বার্তা ছড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এই শোভাযাত্রাকে নিছক বর্ষবরণের উদযাপন বলে মানতে রাজি নন তাঁরা। জানাচ্ছেন, বাংলাদেশেই প্রতি বছর এই মঙ্গল শোভাযাত্রা হয় পয়লা বৈশাখে। সেই যাত্রার অনুপ্রেরণাতেই কলকাতাতেও এমনটা আয়োজন করার কথা ভেবেছেন তাঁরা। তাঁদের মনে হয়েছে, যে স্বৈরাচার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে ওপার বাংলা শোভাযাত্রায় নেমেছে, সে পরিস্থিতির শিকার এপার বাংলাও। তাই আদি সংস্কৃতির হাত ধরে, ঐতিহ্যকে হাতিয়ার করে, বিভাজন ঘোচানোর চেষ্টায় নিযুক্ত হয়েছেন তাঁরা।

প্রায় তিন দশক আগে বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে এক দিন শুরু হয়েছিল এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৫ সালে সামরিক স্বৈরাচার চলার সময়ে ঢাকার চারুকলার কয়েক জন ছাত্র যশোরে গিয়ে গড়ে তোলেন এক নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠান, চারুপীঠ। রঙ, পেন্সিল আর কাদামাটি দিয়ে সেখানে শিশুরা মেতে উঠল। সে বছরই বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে শোভাযাত্রার আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। যশোর শহরে এই তরুণদের আয়োজনে চৈত্রের শেষ রাতে আল্পনা আঁকা হয়। শোভাযাত্রার জন্য পরি ও পাখি তৈরি করেন চারুকলার পড়ুয়ারা। তৈরি করেন বাঘের মুখোশ।

পরের দিন ছেলেরা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়ি পরে, সানাইয়ের সুরে, ঢাকের তালে নেচে, গেয়ে, প্রদক্ষিণ করে যশোর শহর। সে দিনই জন্ম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার। স্বৈরাচারের ভয়কে জয় করে জীবনের রূপ-রঙ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলেছিল সেখানে। তখন তার নাম ছিল বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। পরের বছর শহরের অন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যোগ দেয় চারুপীঠের এই আয়োজনের সঙ্গে। গঠিত হয় বর্ষবরণ পরিষদ।

কলকাতার শোভাযাত্রা উদ্যোক্তাদের তরফে বিবৃতি, “আমাদের রাজ্যে তথা দেশেও ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় মৌলবাদের উন্মত্ততায় আমরা ব্যথিত। এর বিরুদ্ধে আবহমান মঙ্গসংস্কৃতির উজ্জ্বল ঐতিহ্য নিয়ে বাংলা নববর্ষের দিনে আমরা পথে নামতে চাই। বাংলার সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।”

 

গত দু’বছরের মতোই এ বারও এই শোভাযাত্রার সংখ্যা এক নয়, দুই। বাংলাদেশের আদলে নানা মূর্তি ও মুখোশ নিয়ে একটি শোভাযাত্রা গাঙ্গুলিবাগান থেকে ৮বি বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত ও অন্যটি সুলেখা থেকে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত হবে আয়োজিত হয়েছে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা পশ্চিমবঙ্গ’ ও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’ এই দুই ব্যানারে দু’টি শোভাযাত্রা বেরোবে।

গাঙ্গুলিবাগান থেকে শুরু শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলছে চিত্তরঞ্জন কলোনির সলিল চৌধুরি মঞ্চে। কাঠ, কাগজ, রঙে ফুটে উঠছে মাছ, হাতি, পেঁচা। সুজয় রক্ষিত, প্রদীপ গোস্বামী, ইচ্ছে বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা জানাচ্ছেন, এক মাস আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ বারে বাঘ, সিংহের মুখোশ প্রথম জায়গা করে নেবে সমাগমে। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’র প্রস্তুতি চলছে ঢাকুরিয়ার সুইমিং পুল লাগোয়া কর্মশালায়। সেখানে বড় ময়ূর, একতারা তৈরি হয়েছে। পুতুল নাচের পুতুল এই শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ। বড় সরার উপরে রং-বেরংয়ের হাতের কাজ চোখ টানে। শিল্পী শুভ জোয়ারদারের কথায়, “মৃতপ্রায় এই শিল্পকর্মকে বাঁচিয়ে রাখতে পুতুল নিয়ে হাঁটব।”

গত দু’বছরে শোভাযাত্রার প্রস্তুতিপর্বে বাংলাদেশের শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। তবে এ বার কেউ আসেননি। তবে অন্য দু’বার যাদবপুরে হলেও, এই সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বারই প্রথম দিনহাটা, রায়গঞ্জ, বহরমপুর, বেলডাঙা, শ্রীরামপুর, সল্টলেক, নামখানা-সহ মোট এগারোটি জায়গা থেকে এই শোভাযাত্রা বার করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

বস্তুত, নতুন বছর শুরুর দু’দিন আগেই রামনবমী পালন নিয়ে নানা মতামত তৈরি হয়েছে রাজ্য জুড়ে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির তরফে আয়োজিত অস্ত্র হাতে নিয়ে রামনবমীর মিছিলকে অনেকেই বাংলা সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন। তারই বিপরীতে শুধুমাত্র বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্বল করে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই বিশাল শোভাযাত্রা যেন উদযাপনের মাধ্যমে সম্প্রীতির বার্তাই দিচ্ছে।

দেখুন মধ্যরাতের প্রস্তুতির ভিডিও।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

রাত পোহালেই শুভ নববর্ষ ১৪২৬। তাকে স্বাগত জানাতে, শহরের বুকে আয়োজন করা হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার। তারই প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যরাতে চলছে আল্পনা আঁকা। দেখুন ভিডিও।

The Wall এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 14 এপ্রিল, 2019

Comments are closed.