বৃহস্পতিবার, জুন ২০

কেন রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেলেন উত্তর সাইবেরিয়ার গ্রামবাসীরা! বিজ্ঞানীরাও খুশি, কিন্তু কেন!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

রাশিয়ার উত্তরে অবস্থিত তুষারে ছাওয়া দেশ সাইবেরিয়া। আয়তনে প্রায় এক কোটি একত্রিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। রাশিয়ার প্রায় ৭৭% জুড়ে আছে এই সাইবেরিয়া প্রদেশটি। সাইবেরিয়ার উত্তরে আছে উত্তর মহাসাগর এবং দক্ষিণে কাজাকিস্তান, মঙ্গোলিয়া ও চিন সীমান্ত। পৃথিবীর শীতলতম স্থানগুলির অবস্থান এই সাইবেরিয়াতেই।

সাইবেরিয়ারও উত্তরে আছে তুষারাবৃত ইয়াকুটিয়া এলাকা। এই এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম নারটস্ক। আর সেখানেই থাকেন কোটিপতি কৃষক প্রোকপি নগোভিটসোয়েন। চমকে উঠলেন? বিশ্বের এরকম একটা এলাকায় কী করে এক জন কোটিপতি মানুষ থাকতে পারেন ভেবে? চমকের তো সবে শুরু। জানেন কি, কী ভাবে কোটিপতি হয়েছেন এই মানুষটি?

প্রোকপির বাড়ির পিছনের দিকে আছে বরফ জমা মাঠ। মাঠের ভেতর কাঠের ছাউনি, তার ভিতরে থাকা ছাইরঙা ত্রিপলটা তুলে ধরলেন প্রোকপি। ত্রিপলের নীচ থেকে বার করে আনলেন অতিকায় থালার আকারের একটি হাড়, হাতির পূর্বপুরুষ লোমশ ম্যামথের মেরুদন্ডের একটি অংশ।

ম্যামথের শরীরের বিভিন্ন অংশ সাংবাদিকদের দেখাচ্ছেন কোটিপতি প্রোকপি

মুচকি হেসে তিনি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জানালেন, “আমার কয়েক জন বন্ধু  এগুলো গ্রামের উত্তর দিক থেকে পেয়েছে, তাঁরা এখন এগুলো বিক্রি করতে চান। কিন্তু এটা ম্যামথের দাঁত নয়। তাই এর খদ্দের নেই।” সারা বিশ্ব ইয়াকুটিয়া গ্রামকে চেনে লোমশ ম্যামথের গ্রাম হিসেবেই। ইয়াকুটিয়ার সর্বত্র, টন টন বরফের নীচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ম্যামথের হাড়। আর্কটিক সমুদ্রবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ইয়াকুটিয়া সারা বছর ঢেকে থাকে বরফে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে প্রাগৈতিহাসিক জীবজন্তুদের প্রাকৃতিক ফ্রিজ।

লোমশ ম্যামথ

ম্যামথ কী!

ম্যামথ একটি বিলুপ্ত প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। তার একটি প্রজাতি হলো লোমশ ম্যামথ ( Mammuthus primigenius)।প্লিসটোসিন যুগে লক্ষ লক্ষ রোমশ ম্যামথ সাইবেরিয়া অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। পূর্ব এশিয়ার ম্যামথ অঞ্চলে আজ থেকে প্রায় চার লক্ষ বছর আগে লোমশ ম্যামথ প্রজাতিটি জন্ম নেয়। এরা আকৃতিতে ছিলো অতিকায়। গড়পড়তা পুরুষ ম্যামথ উচ্চতায় ছিল প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট এবং এদের ওজন ছিল প্রায় ৬ মেট্রিক টন! শেষ বরফ যুগের ঠান্ডা পরিবেশে লোমশ ম্যামথ সহজেই মানিয়ে নিয়েছিল। শরীরে লোমের প্রাচুর্য থাকায় তুষারাবৃত পরিবেশে ভালই থাকত এরা। শরীরের তুলনায় এদের কান ছোট ছিল, কিন্তু বিশাল বিশাল দাঁত ছিল। এদের দাঁত এদের ৬০ বছরের জীবনকালে ছ’গুণ বড় হতো। লম্বায় এক একটি দাঁত কুড়ি ফুট পর্যন্ত হতে পারত। একটি দাঁতের ওজন ২০০ থেকে ২৫০ কেজি হতো।  আজ লোমশ ম্যামথ বিলুপ্ত, কিন্তু  তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই ইয়াকুটিয়া অঞ্চলের স্থায়ী বরফের তলায় চাপা পড়ে আছে।

ম্যামথের দাঁতের সব চেয়ে বড় ক্রেতা চিন

ম্যামথের দাঁতের অবৈধ ব্যবসাতেও চিনের হাত

পৃথিবীতে হাতির দাঁতের সব চেয়ে বড় ক্রেতা ছিলো চিন। হাতির দাঁতের তৈরি নানান শৌখিন সামগ্রী সারা পৃথিবী জুড়ে বিক্রি করত চিন। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ও বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাপটে, চিন হাতির দাঁতের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। এখন চিনে আইভরি বা হাতির দাঁত আমদানি বা বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু এত দিন যাঁরা হাতির দাঁত খোদাইয়ের কাজ ও ব্যবসা করতেন, তাঁরা এখন  রাশিয়া থেকে হাতির প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষ লোমশ ম্যামথের দাঁত আমদানি করে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করে চলেছেন। ম্যামথের দাঁতের ব্যবসায়িক নাম এখন আইস আইভরি।  ২০১৭ সালে রাশিয়া থেকে প্রায় ৭২ টন ম্যামথের দাঁত রপ্তানি করা হয়। যার ৮০% কেনেন চিনের ব্যবসায়ীরা। সাইবেরিয়ার কাছেই চিনের সীমান্ত থাকায়, রাশিয়া ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক ভাল হওয়ায় এবং দুই দেশের মধ্যে ভিসা পদ্ধতি অনেক নমনীয় হওয়ায়, চিনের ব্যবসায়ীরা আজকাল সরাসরি ইয়াকুটিয়া চলে আসছেন।

চোরাপথে চালান হয়ে যাচ্ছে ম্যামথের দাঁত

জীবাশ্মবিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ লক্ষ টন ম্যামথের দাঁত চাপা পড়ে আছে। সাইবেরিয়ার উত্তরের গ্রামগুলির  শিকারি এবং মৎস্যজীবীরা কয়েকশো বছর ধরেই নদী ও সমুদ্রের ধারের বরফ সরে যাওয়া অংশ থেকে ম্যামথের হাড় ও দাঁত কুড়িয়ে আনছেন। কিন্তু, গত এক দশকে  আইস আইভরি খোঁজার ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। ভাগ্য বদলাতে ও রাতারাতি কোটিপতি হতে দলে দলে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ম্যামথের দাঁত খুঁজতে। যেমন ভাবে এত বছর ধরে সোনার সন্ধানে মানুষ ঝাঁপিয়েছে ব্রাজিলের আমাজনে কিংবা হীরের সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায়।

ম্যামথের খনি

ম্যামথের খনি

প্রায় ১২ লক্ষ বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত এই ইয়াকুটিয়া এলাকা। যা আয়তনে ফ্রান্সের পাঁচ গুণ। বেশির ভাগ জায়গায় যাওয়ার জন্য কোনও রাস্তাই নেই। বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছতে হয়। ম্যামথের দাঁত সংগ্রহ করা বেশ কঠিন, এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কয়েকশো কিলোমিটার দূর থেকে বরফ ঠেলে আনতে হয়। রাশিয়ায় ম্যামথের দাঁতের ব্যবসায়ীরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লাইসেন্স পেলেও এখনও এটা সুসংগঠিত বা স্বীকৃত ব্যবসার পর্যায়ে আসেনি। ম্যামথের দাঁত সংগ্রহকারীরা একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য লাইসেন্স নেন। গরম জলের জেট দিয়ে বরফের ভেতর সুড়ঙ্গ কেটে জমে যাওয়া নদীর ধারে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। এ ভাবেই  বরফের সাম্রাজ্যে তৈরি হয়ে যায় ম্যামথের হাড়ের খনি। লোমশ ম্যামথের উন্নত মানের দাঁত বা আইস আইভরি এক কেজি এক হাজার ডলারে বিক্রি হয় চিনে। এটাই ইয়াকুটিয়ার মানুষদের উপার্জনের একমাত্র পথ। আর এর জেরেই ইয়াকুটিয়ার উত্তরের গ্রামবাসীরা প্রায় সকলেই কোটিপতি।

লাইসেন্স মিললেও স্বস্তি নেই

২০১৩ সালে, রাশিয়ার পার্লামেন্টে আইস আইভরি বা ম্যামথের দাঁত নিয়ে ব্যবসা করার সম্ভাবনা নিয়ে একটা বিল আসে। কিন্তু  বিলটি পাস হয়নি বলে ব্যবসাটি এখনও আইনের অনুমোদন পায়নি। এখনও অবৈধ হয়ে আছে। তাই রাশিয়া থেকে সোজা পথে লোমশ ম্যামথের দাঁত রফতানি করা একটু কঠিন। কিন্তু কাছেই আছে চিন। চিনের হাতির দাঁতের বেআইনি শিল্প বাঁচাতে দরকার ম্যামথের দাঁত। তাই বেআইনি ভাবে রাশিয়া থেকে চিনে চলে যায় টন টন আইস আইভরি। কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা চান এই ব্যবসার আইনি অনুমোদন। এর জন্য তাঁরা গত বছর ইয়াকুটিয়া অঞ্চলের প্রধান শহর ইয়াকুটস্কে  বিশাল প্রতিবাদ মিছিলেও সামিল হন। তাঁরা জানান, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স থাকা সত্বেও সরকার তাঁদের হেনস্থা করছে। তাঁরা রাশিয়ার ভাষায় স্লোগান দেন ,”Return tusks back to the people!

ইয়াকুটিয়া অঞ্চলের আইনজীবী ভ্লাদিমির প্রোকোপিয়েভের কথায়, “আইস আইভরি ব্যবসায় সরকারি সিলমোহর এখনও বিশ বাঁও জলে। যত দিন না ইয়াকুটিয়া প্রশাসন মস্কোকে দিয়ে বিল পাস করাতে পারছে, তত দিন পরিস্থিতি এমনই থাকবে।”

সাইবেরিয়ায় ম্যামথের দাঁত সংগ্রহকারীরা

 আইস আইভরির বেআইনি ব্যবসার মূলে আঘাত করেছে একটি ফিল্ম

সরকারি গড়িমসি তো আছেই। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে হাজির হয়েছে রাশিয়ার  Rossiya 24 চ্যানেল।  চ্যানেলটি এক নাগাড়ে দেখিয়ে চলেছে একটি ডকুমেন্টরি ফিল্ম। ফিল্মটির নাম ‘ আইল্যান্ড অফ স্কেলিটনস’। ছবিটিতে ম্যামথের দাঁত সংগ্রহকারীদের কোটিপতি চোরাশিকারি বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, অন্ধ ইয়াকুটিয়া প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে এই অপরাধমূলক ব্যবসা ( criminal trade) চলছে।  এর জন্য মেরু অঞ্চলের স্থায়ী বরফ খোঁড়া হচ্ছে, যা পৃথিবীর পরিবেশের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়াও ম্যামথের দাঁত সংগ্রহকারীদের দৌরাত্ম্যে  ইয়াকুটিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে।

ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরাও

শিল্প ও চাষবাসহীন অঞ্চলটিতে আইস আইভরি নিয়ে নতুন ব্যবসা  যেমন স্থানীয় মানুষদের অর্থ উপার্জনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সে রকম ভাবেই ইয়াকুটিয়া আজ সারা পৃথিবীর জীবাশ্মবিজ্ঞানীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুষারযুগে বাস করা, বর্তমানে বিলুপ্ত ম্যামথের বিভিন্ন প্রজাতি ও নতুন কোনও প্রাণী  আবিষ্কারের আশায় তাঁরাও তুষার গাঁইতি, ছেনি আর হাতুড়ি নিয়ে নেমে পড়েছেন ইয়াকুটিয়াতে।

ম্যামথের দাঁত খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেলো প্রাগৈতিহাসিক যুগের সিংহ শাবক

ইউকুটিয়া অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের জীবাশ্মবিদ ভ্যালেরি প্লটনিকভ তাই সম্পুর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন। তিনি বলেছেন, এই আইস আইভরি নিয়ে কাড়াকাড়ি কিন্তু বিজ্ঞানের পক্ষে শুভ। কারণ এর ফলে বরফের তলা থেকে বিভিন্ন ফসিল উঠে আসছে।  তাঁদের মতো জীবাশ্মবিজ্ঞানীদের পক্ষে সেটি অত্যন্ত খুশির খবর। ম্যামথের দাঁতের জন্য বরফ খোঁড়াখুঁড়ির ফলে, গত গ্রীষ্মে এক প্রাগৈতিহাসিক সিংহছানার ফসিল পাওয়া গেছে। বর্তমানে প্লটনিকভ এই ফসিলটিকে নিয়ে রিসার্চ করছেন। প্লটনিকভ জানিয়েছেন, “আমাদের সঙ্গে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংগ্রহকারীদের মেলবন্ধন আছে। অনেক সময় তাঁরা গবেষকদের বিনামূল্যে প্রাগৈতিহাসিক নমুনা দিয়ে দেন। সেগুলি তাঁদের ব্যবসার কাজে না লাগলেও, বিজ্ঞানীদের কাজে লাগে।”  তবে কোনও কোনও সংগ্রহকারী  বিদেশে প্রদর্শনীতে ম্যামথের ফসিল পাঠিয়ে মুনাফা করেন বলে ততটা সাহায্য করেন না বিজ্ঞানীদের। তবে অবৈধ ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞানীদের কাছে ম্যামথের দাঁত ছাড়া বাদ বাকি ফসিল বেচে দেন, সামান্য অর্থের বিনিময়ে।

তাই রাশিয়ার ইয়াকুটিয়ার অবৈধ আইস আইভরি ব্যবসা ও তাতে চিনের ভূমিকা নিয়ে সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠলেও, খুশি পরিবেশপ্রেমীরা। কারণ, চিনের ও চোরাশিকারিদের হাত থেকে পৃথিবীর অবশিষ্ট জীবিত হাতিদের বাঁচিয়ে দিচ্ছে ম্যামথের হাড়। হাতীদের ওপর থেকে নজর সরেছে তাদের। নজর পড়েছে ম্যামথের দিকে।

Comments are closed.