বিপদসঙ্কুল সুন্দরবনের জল, জঙ্গল ও জীবনের অতন্দ্র প্রহরী এই আরব কন্যা

সুন্দরবনের মানুষ বিশ্বাস করেন, তিনি কখনও বাঘের আবার কখনও মুরগির রূপ ধারণ করে বাঘ ও বিভিন্ন অপদেবতার উপরে কর্তৃত্ব করেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    খুদে দুখের উপাখ্যান

    অনেক বছর আগের কথা। সুন্দরবনের মধ্যে ছিল এক গ্রাম। সেই গ্রামে বাপ হারা ছেলে দুখেকে নিয়ে বাস করতেন এক দরিদ্র রমণী। ফাইফরমাস খাটানোর নামে দুখে’কে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে নিয়ে যান দুখের জ্ঞাতি কাকা, পাশের গ্রামের দুই ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ধনা আর মনা।নৌকা জলে নামার আগে দুখের মা দুখেকে বলেন, “বনে আমার মতো তোর আর এক মা আছেন। যখন কোনও বিপদে পড়বি তাঁকে ডাকবি। তিনি তোকে রক্ষা করবেন”।

    সুন্দরবনে সে সময় বাস করতেন গাজী নামে এক আউলিয়া। জঙ্গল প্রহরায় থাকতেন বাঘরূপী অপশক্তি দক্ষিণ রায় বা রায়মনি। সারা সুন্দরবনের একছত্র অধিপতি ছিলেন এই দক্ষিণ রায়। যেমন সুপুরুষ, তেমন দাপট আর  অহঙ্কার। গাজী আউলিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ রায়ের বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ়।

    দুখেকে নিয়ে জলে ভাসলো মধুকরদের নৌকা। সুন্দরবনের নদীপথে ব্যবসায়ী ধনা আর মনার নৌবহর ভেসে চলেছে ভাটির টানে। দুখের কাজে মন নেই, মায়ের জন্য তার প্রাণ কাঁদছে। ধনা আর মনার ভয়ে ফেরবার কথা বলতে পারে না। এক রাতে ধনা আর মনার স্বপ্নে দেখা দেন দক্ষিণ রায়। ধনা আর মনাকে স্বপ্নে দক্ষিণ রায় বলেন,” আমি তোদের দুই ভাইকে প্রচুর মধু আর ধন সম্পত্তি দেবো। তোরা দুখে’কে আমার কাছে উৎসর্গ কর। না হলে তোদের নৌকা ডুবিয়ে দেব”।

    লোভে আর ভয়ে ধনা আর মনা, দুখে’কে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ছল করে দুখে’কে একটি দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে দ্বীপের  পুকুর থেকে মিষ্টি জল নিয়ে আসতে বলে। সরলমতি দুখে নির্জন দ্বীপে নামে। ধনা আর মনা নৌকা ছেড়ে দেয়। দুখে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে।

    হঠাৎ তার মনে পড়ে, মা বলেছিলেন, বনের ভেতর দুখের আর এক মা আছে। মায়ের কথা মতো দুখে তখন সেই বনের মা’কে স্মরণ করে।  জলে জঙ্গলে আলোড়ন ওঠে। খুদে দুখের সামনে এসে দাঁড়ান অসামান্য রুপসী এক তরুণী, হাতে খোলা তলোয়ার। দুখের মুখে সব শুনে কোলে তুলে নেন দুখে’কে। ক্রোধে তাঁর চোখদু’টি রক্তজবার মতো লাল হয়ে ওঠে। না তিনি কোনও বেহেস্তের দূত বা স্বর্গের দেবী নন। তিনি হলেন আরবকন্যা বনবিবি

    মা বনবিবি

    দুখে’কে আদর করে অনেক ধনরত্ন দিয়ে কুমিরের পিঠে চড়িয়ে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন বনবিবি। তাঁর আদেশে  বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে, বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বন্দি করে বনবিবির দরবারে নিয়ে আসেন।

    দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির চরণতলে আশ্রয় নেন গাজী আউলিয়া। উপায় না দেখে খানিকটা নিমরাজি হয়ে দক্ষিণ রায় এরপর বনবিবির বশ্যতা স্বীকার করে নেন। সেইদিন থেকে থেকে আরবকন্যা বনবিবি সুন্দরবনের মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদায় পূজিতা হয়ে আসছেন শত শত বছর ধরে।

    দক্ষিণ রায়

    সুফি ফকিরের কন্যা ছিলেন বনবিবি 

    বনবিবির জহুরানামা নামে একটি বই থেকে জানতে পারা যায়, তিনি ইব্রাহিম নামে এক সুফি ফকিরের কন্যা ছিলেন। ইব্রাহিম সুদূর আরব দেশের মদিনা থেকে এসেছিলেন বাংলায়। সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর দুই স্ত্রী। ইব্রাহিমের প্রথম স্ত্রী গুলাল বিবি তাঁর সতীনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন। সুন্দরবনের জঙ্গলে গুলাল বিবির গর্ভে আরবদূহিতা বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলী জন্ম নেন। জন্মের পর থেকেই বনবিবির ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা সারা সুন্দরবনে প্রচারিত হয়ে যায়।জঙ্গলের পশুপাখি থেকে মানুষ, সবাই বনবিবির বশ হয়ে যায়।

    অন্যদিকে, যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীনস্থ ভাটির দেশের রাজা ছিলেন ব্যাঘ্ররূপী অপদেবতা দক্ষিণ রায়। তিনি ছিলেন সুন্দরবনের একছত্র অধিপতি। তিনি বনবিবির বশ্যতা মেনে নেননি। তাঁর অত্যাচার থেকে সুন্দরবনের মানুষদেরকে বাঁচানোর জন্য স্বর্গ থেকে আদেশ আসে মা বনবিবির কাছে। দক্ষিণরায়ের সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। দক্ষিণ রায় প্রতিটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বনবিবির সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

    ব্যাঘ্ররূপী দক্ষিণ রায়, শাহ জঙ্গলি,মা বনবিবি ও দুখে

     হিন্দু  মুসলমান নির্বিশেষে করেন বনবিবির আরাধনা 

    বনবিবি সারা সুন্দরবনের রক্ষয়িত্রী দেবী। সুন্দরবনের মানুষ বিশ্বাস করেন, তিনি কখনও বাঘের আবার কখনও মুরগির রূপ ধারণ করে বাঘ ও বিভিন্ন অপদেবতার উপরে কর্তৃত্ব করেন। তিনি সুন্দরবনের বাউয়ালি (কাঠুরে) আর মৌলে (মধু সংগ্রহকারী), শিউলি ( খেজুর রস সংগ্রহকারী) ও মৎস্যজীবীদের রক্ষাকত্রী।

    হিন্দুই হন বা মুসলমান, সুন্দরবনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব তুলে দেন বনবিবির হাতে। তাই সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ বা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে বনবিবির  পূজা করে জলে নৌকা ভাসান তাঁরা। কারও উপরে কোনও আক্রোশ নেই এই পরমাসুন্দরী এবং ভক্তবৎসলা দেবীর। তিনি হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। সুন্দরবনের ভেতরে আর বনসংলগ্ন লোকালয়ে প্রতিবছর পয়লা মাঘ ‘বনবিবি’র পূজা হয়। জাতিধর্ম নির্বিশেষে বনবিবি পূজিতা হন।

    পূজামন্ডপে মা বনবিবি

    বনবিবির সঙ্গে পুজো পান  বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, শিশু দুখে, গাজী আউলিয়া। পুজো পান দোর্দণ্ডপ্রতাপ দক্ষিণ রায়।বেশিরভাগ মন্ডপে রায়মনি বিরাজ করেন ব্যাঘ্রমূর্তি হয়ে। কোনও কোনও মন্ডপে থাকে দক্ষিণ রায়ের মানব রূপও। পৌরাণিক দেবতার মতো পোশাক পরিহিত। তাঁর হাতে টাঙ্গি ও ঢাল, কোমরবন্ধে ঝোলানো থাকে নানান অস্ত্র। পীঠে থাকে তীর ধনুক। এমনকি শিশু দুখেকে দক্ষিণরায়ের হাতে তুলে দেওয়া ধনা আর মনার মূর্তিও থাকে মণ্ডপে।

    পুজোর সময় বনবিবির পাঁচালি পড়া হয়। বনবিবির বিশেষ মন্ত্র পাঠ করা হয়। পুজো শেষে  প্রসাদ ও শিরনি বিতরণ করা হয়। সুন্দরবনের মানুষ বনবিবির কাছে মানত করেন। মনস্কামনা পূরণ হলে পরের বছর পয়লা মাঘ মানত পূরণ করা হয়। বনবিবির পুজোকে কেন্দ্র করে কোনও কোনও লোকালয়ে মেলাও বসে। সুন্দরবনের লোকমানসে বনবিবির পরেই স্থান দক্ষিণ রায়ের। তাঁর পুজোর জন্য সাজানো হয় ঝাউফুলের নৈবেদ্য।

    বনবিবির থানে ভক্তের দল

    হাজার দেবদেবী,পীর,আউলিয়া থাকলেও, বাঘ,কুমীর,সাপে ভরা বিপদসঙ্কুল সুন্দরবনের জল,জঙ্গল আর জীবনের মহাকাব্যে শেষ কথা বলেন বনবিবিই। এটাই সুন্দরবনের মানুষের চিরায়ত বিশ্বাস। যে বিশ্বাস সুন্দরবনের অসহনীয় পরিবেশে তাঁদের টিকে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গী।

    হোক না বনবিবি আরব দেশের মেয়ে!  যখন তিনি মানুষ ছিলেন ধর্মে তিনি মুসলিম ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি ‘বনদুর্গা বনবিবি’। দেবতাদের আবার ধর্ম হয় নাকিন! ধর্ম থাকে মানুষের। তাঁর দরবারে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই এবং যিনি ভেদাভেদ করবেন তাঁর ঠাঁই হবে না সুন্দরবনে। তাইতো বনবিবি  ধর্মীয় পঙ্কিলতা থেকে শতশত মাইল দূরে থাকা হিন্দুর মা আর মুসলমানের আম্মা হয়ে শতশত বছর ধরে বিরাজ করছেন এবং করবেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More