শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮

বেহেস্তের দূত বা স্বর্গের দেবতারা নয়, আজও সুন্দরবন রক্ষা করেন আরবকন্যা বনবিবি

রূপাঞ্জন গোস্বামী

খুদে দুখের উপাখ্যান

অনেক বছর আগের কথা। সুন্দরবনের মধ্যে ছিল এক গ্রাম। সেই গ্রামে বাপ হারা ছেলে দুখেকে নিয়ে বাস করতেন এক দরিদ্র রমণী। ফাইফরমাস খাটানোর নামে দুখে’কে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে নিয়ে যান দুখের জ্ঞাতি কাকা, পাশের গ্রামের দুই ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ধনা আর মনা। নৌকা জলে নামার আগে দুখের মা দুখেকে বলেন, “বনে আমার মতো তোর আর এক মা আছেন। যখন কোনও বিপদে পড়বি তাঁকে ডাকবি। তিনি তোকে রক্ষা করবেন”। জলে ভাসলো মধুকরদের নৌকা। সুন্দরবনে সে সময় বাস করতেন গাজী নামে এক আউলিয়া। আর জঙ্গল প্রহরায় থাকতেন বাঘরূপী অপশক্তি দক্ষিণ রায় বা রায়মনি। সারা সুন্দরবনের একছত্র অধিপতি এই দক্ষিণ রায়। যেমন সুপুরুষ, তেমন দাপট তেমন অহঙ্কার। গাজী আউলিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ রায়ের বন্ধুত্ব ছিল।

ওদিকে, সুন্দরবনের নদীপথে ব্যবসায়ী ধনা আর মনার নৌবহর ভেসে চলেছে ভাটির টানে। দুখের কাজে মন নেই, মায়ের জন্য তার প্রাণ কাঁদছে। ধনা আর মনার ভয়ে ফেরবার কথা বলতে পারে না। এক রাতে ধনা আর মনার স্বপ্নে দেখা দেন দক্ষিণ রায়। ধনা আর মনাকে স্বপ্নে তিনি বলেন,” আমি তোদের দুই ভাইকে প্রচুর মধু আর ধন সম্পত্তি দেবো। তোরা দুখে’কে আমার কাছে উৎসর্গ কর। না হলে তোদের নৌকা ডুবিয়ে দেবো”। লোভে আর ভয়ে ধনা আর মনা, দুখে’কে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ছল করে দুখে’কে একটি দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে পুকুর থেকে মিষ্টি জল নিয়ে আসতে বলে। সরলমতি দুখে নির্জন দ্বীপে নামে। ধনা আর মনা নৌকা ছেড়ে দেয়। দুখে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে। হঠাৎ তার মনে পড়ে, মা বলেছিলেন, বনের ভেতর দুখের আর এক মা আছে। মায়ের কথা মতো দুখে তখন সেই বনের মা’কে স্মরণ করে।  জলে জঙ্গলে আলোড়ন ওঠে। খুদে দুখের সামনে এসে দাঁড়ান অসামান্য রুপসী এক তরুণী বনবিবি, হাতে খোলা তলোয়ার।  কোলে তুলে নেন দুখে’কে। সব শুনে তাঁর চোখদু’টি রক্তজবার মতো লাল হয়ে ওঠে। দুখে’কে আদর করে অনেক ধনরত্ন দিয়ে কুমিরের পিঠে চড়িয়ে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। ক্রোধে আগুন বনবিবির আদেশে তখন বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে, বাঘরূপী দক্ষিণ রায় ও গাজী আউলিয়াকে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বন্দি করে বনবিবির কাছে নিয়ে আসেন। গাজী আউলিয়া, দক্ষিণ রায়ের সঙ্গ ছেড়ে বনবিবির চরণতলে আশ্রয় নেন। দক্ষিণ রায় উপায় না দেখে বনবিবির বশ্যতা স্বীকার করে নেন। তারপর থেকে আরবকন্যা বনবিবি সুন্দরবনের মানুষের কাছে দেবীর মর্যাদায় পূজিতা হয়ে আসছেন শত শত বছর ধরে।

দক্ষিণ রায়

আরবকন্যা বনবিবি 

বনবিবির জহুরানামা নামে একটি বই থেকে জানতে পারা যায়, তিনি  হলেন ইব্রাহিম নামে এক সুফি ফকিরের কন্যা। ইব্রাহিম সুদূর আরব দেশের মদিনা থেকে আসেন বাংলায়। সঙ্গে আসেন তাঁর দুই স্ত্রী। ইব্রাহিমের প্রথম স্ত্রী গুলাল বিবি তাঁর সতীনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন। সুন্দরবনের জঙ্গলে গুলাল বিবির গর্ভে আরবদূহিতা বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলী জন্ম নেন। জন্মের পর থেকেই বনবিবির ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা সারা সুন্দরবনে প্রচারিত হয়ে যায়। জঙ্গলের পশুপাখি থেকে মানুষ সবাই বনবিবির বশ হয়ে যায়। এ দিকে, যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীনস্থ ভাটির দেশের রাজা ছিলেন  ব্যাঘ্ররূপী অপদেবতা দক্ষিণ রায়। তিনি ছিলেন সুন্দরবনের একছত্র অধিপতি। তিনি বনবিবির বশ্যতা মেনে নেন না। তাঁর অত্যাচার থেকে সুন্দরবনের মানুষদেরকে বাঁচানোর জন্য স্বর্গ থেকে আদেশ আসে মা বনবিবির কাছে।  তাঁর সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। দক্ষিণ রায় প্রতিটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বনবিবির সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

ব্যাঘ্ররূপী দক্ষিণ রায়, শাহ জঙ্গলি,মা বনবিবি ও দুখে

 হিন্দু  মুসলমান নির্বিশেষে করেন বনবিবির আরাধনা 

বনবিবি সারা সুন্দরবনের রক্ষয়িত্রী দেবী। সুন্দরবনের মানুষ বিশ্বাস করেন, তিনি কখনও বাঘের আবার কখনও মুরগির রূপ ধারণ করেন। বাঘ ও বিভিন্ন অপদেবতার উপরে কর্তৃত্ব করেন বনবিবি। তিনি সুন্দরবনের বাউয়ালি (কাঠুরে) আর মৌলে (মধু সংগ্রহকারী), শিউলি ( খেজুর রস সংগ্রহকারী) ও মৎস্যজীবীদের রক্ষাকত্রী। হিন্দুই হোক বা মুসলমান,  সুন্দরবনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব তুলে দেন বনবিবির হাতে। তাই সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ বা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে বনবিবির  পূজা করে জলে নৌকা ভাসান। কারও উপরে কোনও আক্রোশ নেই এই পরমাসুন্দরী এবং ভক্তবৎসলা  দেবীর। বাঘ ও বিভিন্ন অপদেবতার উপরে কর্তৃত্ব করেন বনবিবি। তিনি হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। তাই সুন্দরবনের  গভীর জঙ্গলে কাঠ, গোলপাতা, মধু ও মোম সংগ্রহ বা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে বনবিবির  পূজা করে জলে নৌকা ভাসান।সুন্দরবনের ভেতরে আর বনসংলগ্ন লোকালয়ে প্রতিবছর পয়লা মাঘ ‘বনবিবি’র পূজা হয়। জাতিধর্ম নির্বিশেষে বনবিবি পূজিতা হন।

পূজামন্ডপে মা বনবিবি

পুজো পান  বনবিবির ভাই শাহ জঙ্গলী, শিশু দুখে, গাজী আউলিয়া, শিশু দুখেকে দক্ষিণরায়ের হাতে তুলে দেওয়া ধনা আর মনা এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ দক্ষিণ রায়। বেশিরভাগ মন্ডপে রায়মনি বিরাজ করেন ব্যাঘ্রমূর্তি হয়ে। কোনও কোনও মন্ডপে থাকে দক্ষিণ রায়ের মানব রূপও। পৌরাণিত দেবতার মতো পোশাক পরিহিত। তাঁর হাতে টাঙ্গি ও ঢাল, কোমরবন্ধে ঝোলানো থাকে নানান অস্ত্র। পীঠে থাকে তীর ধনুক। পুজোর সময় বনবিবির পাঁচালি পড়া হয়, বনবিবির মন্ত্রপাঠ করা হয়। পুজো শেষে  প্রসাদ ও শিরনি বিতরণ করা হয়। সুন্দরবনের মানুষ বনবিবির কাছে মানত করেন। মনস্কামনা পূরণ হলে পরবর্তী বছর পয়লা মাঘ মানত পূরণ করা হয়। বনবিবির পুজোকে কেন্দ্র করে কোনও কোনও লোকালয়ে মেলাও বসে। বনবিবির পরেই স্থান দক্ষিণ রায়ের। তাঁর পুজোয় সাজানো হয় ঝাউফুলের নৈবেদ্য।

বনবিবির থানে ভক্তের দল

সুন্দরবনের  অন্যান্য লৌকিক দেবদেবী

চারিদিকে জল, বাদাবন, পানীয় জলের অভাব, রাস্তা নেই , বিদ্যুৎ নেই , ডাক্তার নেই, শুধু নেই আর নেই। এর উপর জলে কুমীর আর কামটের ভয়, ডাঙায় বাঘ আর সাপের ভয়। রাতে ভূতপ্রেতের ভয়। সুন্দরবনের মানুষরা প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদেরকে অসহায় মনে করেন। সেই অসহায়তা কাটিয়ে মনে শক্তি ফেরাতেই বুঝি  বিভিন্ন  লৌকিক দেবতার পুজো করেন। বিশ্বাস করেন,  এই দেবতারাই তাঁদের ও তাঁদের পরিবারকে সব বিপদ থেকে বাঁচাবেন। সুন্দরবনে পুজো পান আমাদের পরিচিত দেবী মনসা, জঙ্গল জননী মা বিশালাক্ষী। তা ছাড়া এমন অনেক দেবতার পুজো হয়, যাঁদের নাম সুন্দরবনের বাইরে অনেকেই শোনেননি। সুন্দরবনে পূজিত হন এক ভয়ঙ্কর দেবতা, বাদাবনের রক্ষক আটেশ্বর। যেখানে তিন জঙ্গল  এক হয়েছে, সেখানে এই দেবতার অধিষ্ঠান, বাবা আটেশ্বর মানুষ ও গবাদি পশুকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন।  সুন্দরবনের বনজীবী, মৎস্যজীবী ও  কৃষিজীবী মানুষেরা এই লৌকিক দেবতাকে যথেষ্ঠ ভয় ও ভক্তি করেন।  সুন্দরবনে আর এক লৌকিক দেবী বাঘের দেবী হিসেবে পূজিতা হন। তিনি হলেন বনদেবী নারায়ণী। সুন্দরবনের গোলপাতা ছাওয়া বেশিরভাগ বাড়ির পাশের জঙ্গলে খড়ের ছাউনি দেওয়া মা নারায়ণীর থান থাকে।  সন্তানদের রক্ষাকর্তা পাঁচু ঠাকুর (পঞ্চানন) ও পেঁচা-পেঁচির পুজোও ভক্তিভরে করে থাকেন সুন্দরবনের মানুষরা। গ্রাম থেকে কিছু দূরে বটতলায় বা পুকুর পাড়ে বা খালের ধারে তালগাছের তলায় বা কোনও উন্মুক্ত স্থানে নির্মিত হয় পাঁচু ঠাকুরের থান। ওলাওঠা বা কলেরা রোগের প্রকোপ আছে সুন্দরবনে। তাই ওলাওঠা রোগ নিরাময়ের দেবী হিসেবে পুজো পান মা ওলা বিবি। জ্বর নিরাময়ের দেবতা হিসেবে পুজো পান আর এক ভয়ঙ্কর দেবতা জ্বরাসুর। বিচিত্র রূপ জ্বরাসুরের। তিনটি মাথা, ন’টি চোখ, ছ’টি হাত, তিনটি পা। মৎস্যজীবীদের প্রাণের দেবতা মাকাল ঠাকুর।  মাছের দেবতা মাকাল ঠাকুরের মূর্তি নেই। একটা ঢিপিই এই দেবতার প্রতিরূপ। সুন্দরবনের মৎস্যজীবীরা  মাছ ধরতে যাওয়ার আগে অস্থায়ী মন্ডপে মাকাল ঠাকুরের পুজো করেন।

 সুন্দরবনের মানুষদের কাছে গণদেবতাদের জয়জয়কার

এটা কল্পনাতীতভাবে সত্যি। সুন্দরবনের মানুষদের কাছে মানুষই হয়ে উঠেছেন দেবতা। মানুষ-দেবতাদের দাপটে পূরাণের দেবদেবীরা একটু যেন নিষ্প্রভ। কল্পনাতীত হলেও সবটাই কল্পনা নয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্র মশাই, যশোহর-খুলনার ইতিহাস নামে একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ১৫০০ শতকের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণ রায়, বণিক ধনাই ও মনাই এবং গাজীর আউলিয়া নামক ব্যক্তিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পাওয়া যায় আরও কিছু মানুষের নাম আজ যাঁরা দেবতার আসনে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও বিপদসঙ্কুল সুন্দরবনে বসবাসকারী মানুষদের চিরায়ত বিশ্বাসে মানুষ-দেবতারাই তাঁদের ত্রাণকর্তা, হিন্দু পুরাণের দেবতারা নন। বনবিবি ও দক্ষিণ রায়ের পরেই অবস্থান যাঁর, তিনি গাজী আউলিয়া

মা বনবিবির ডান দিকে গাজী আউলিয়া

পেশার তাগিদে সুন্দরবনের জঙ্গলে প্রবেশ করার মুহূর্তে, ও শিকার বা মধু পাওয়ার জন্য ও তাঁদের প্রাণ রক্ষার জন্য সুন্দরবনের মানুষরা হাত জোড় করে বনবিবির সঙ্গে সঙ্গে গাজী আউলিয়ার কাছেও তাঁদের সুরক্ষা প্রার্থনা করেন। সুন্দরবন লাগোয়া লোকালয়ে সাদা দাড়ি, পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি, কোথাও লুঙ্গি পরা গাজী বাবার মূর্তি দেখা যায়। তাঁর ঘাড়ে গামছা। গাজী আউলিয়াকে আমিষ নৈবেদ্য দেওয়ার নিয়ম নেই। তাঁর পুজোর নিরামিষ নৈবেদ্য হলো আতপচালের সিন্নি, বাতাসা ও পাটালি। বনে ঢোকা ছাড়াও পশু-পাখির কামনাতেও স্মরণ করা হয় গাজীর নাম। সুন্দরবনের আর এক লৌকিক দেবতা হলেন ভাঙ্গড় পীর। বনবিবির জহুরানামাতেও এই ভাঙ্গড় পীরের কথা পাওয়া যায়। তাঁর আস্তানেই প্রথমে আসেন বনবিবি ও শাহ জঙ্গলি। গবাদি পশুর রক্ষক হিসেবে পূজিত হন সুফি সাধক মানিক পীর। কুমিরের হাত থেকে রক্ষার জন্য দেওয়া হয় কালু রায়ের পুজো

গ্রামে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মা বনবিবির মূর্তি

পরিশেষে এটাই বলা যায়, হাজার দেবদেবী,পীর,আউলিয়া থাকলেও, বাঘ,কুমীর,সাপে ভরা বিপদসঙ্কুল সুন্দরবনের জল,জঙ্গল আর জীবনের মহাকাব্যে শেষ কথা বলেন বনবিবিই। এটাই সুন্দরবনের মানুষের চিরায়ত বিশ্বাস। যে বিশ্বাস সুন্দরবনের অসহনীয় পরিবেশে তাঁদের টিকে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গী। হোক না বনবিবি আরব দেশের মেয়ে! মানুষ যখন ছিলেন ধর্মে হয়তো তখন তিনি মুসলিম ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি ‘বনদুর্গা বনবিবি’। দেবতাদের আবার ধর্ম হয় নাকি? ধর্ম থাকে মানুষের। তাঁর দরবারে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। যিনি ভেদাভেদ করবেন, তাঁর ঠাঁই নেই সুন্দরবনে। তাইতো বনবিবি আজও ধর্মীয় পঙ্কিলতা থেকে শতশত মাইল দূরে থাকা হিন্দুরও মা, মুসলমানেরও মা।

Shares

Comments are closed.