সোমবার, এপ্রিল ২২

আলসেমির জন্যই গায়েব হয়েছিলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষ, সাধু সাবধান

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বারান্দায় রোদ্দুর
আমি আরাম কেদারায় বসে
দুই পা নাচাই রে।

সভ্যতার শীর্ষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমরা কি আরামেই না পা নাচাচ্ছি। ‘খেটে খা’ কথাটি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! পৃথিবীতে টিঁকে থাকা নিয়ে ডারউইনের থিওরি হাইজ্যাক করে, আজ বেমালুম নিজের থিওরি চালাচ্ছে যন্ত্র সভ্যতা। যন্ত্রই আজ আমাদের চালায় সভ্যতা।আর, আমরা হাত পা গুটিয়ে, মাথা চালিয়ে আরও যন্ত্রের পর যন্ত্র জন্ম দিয়ে যাই। শুনছি , মাথার কাজও কেড়ে নিয়ে, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হতে চলেছে আমাদেরই মস্তিস্কপ্রসূত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। সে একাই নামিয়ে দেবে জাগতিক সব কাজ। এর পর থেকে মাথাও খাটাতে হবে না আমাদের। ব্যাস, আর আমাদের কোনও কাম নাই। শুধু আরামই আরাম। এই ভেবে যদি সুখস্বপ্ন দেখতে থাকেন, তবে জেনে রাখুন ,এই স্বপ্নই হবে মানব সভ্যতার শেষ স্বপ্ন। ঈশান কোনে মেঘ জমতে শুরু করেছে।যন্ত্র সভ্যতা নামক কুড়ুল দিয়ে কায়িক ও মানসিক পরিশ্রমকে জবাই করে, সোফা নির্ভর জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি আমরা। গোদা বাংলায়, কুঁড়ে হয়ে যাচ্ছি আমরা। ক্রমশ অলস থেকে অলসতর হয়ে যাচ্ছি আমরা। এই অলসতা হয়তো আমাদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে  নিয়ে চলেছে।

প্রত্নতত্ববিদদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে থেকে জানা গেছে,মানুষের অলসতাই পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে তার খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন,পুরোনো প্রস্তর যুগের হোমো ইরেকটাস শ্রেণীর মানুষের কথা। হোমো ইরেকটাস শ্রেণীর আদিম মানবরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল স্রেফ তাদের কুঁড়েমির জন্যই। প্রত্নতত্ত্ববিদরা, অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলায় আদিম প্রস্তর যুগের মানুষের সংখ্যা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে, কিছু আশ্চর্যজনক তথ্য আবিস্কার করেছেন। তাঁরা জেনেছেন হোমো ইরেকটাস প্রজাতির আদিম মানবরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় প্রস্তরনির্মিত যন্ত্রপাতি তৈরি ও নতুন জীবনশৈলী উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভীষণ অলস ছিল।নতুন কিছু করার ভাবনা বা চেষ্টাই তাদের ছিল না। তারা এতটাই আরামপ্রিয় ও অলস ছিলো। এবং সেটাই তাদের কাল হয়েছিল। সেটাই হয়েছিল তাদের অবলুপ্তির অন্যতম কারণ।

ডারউইন সাহেব জীববিবর্তন সংক্রান্ত প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদে বলে গিয়েছিলেন জীবন সংগ্রামের কথা, তাঁর স্ট্রাগল ফর একজিস্টেন্স থিওরিতে। যে জীব প্রকৃতি ও প্রজাতির সঙ্গে সংগ্রামে তার উদ্ভাবনী শক্তি বা বৈচিত্র্য দেখাতে পারবে,সেই সংগ্রাম জিতে পৃথিবীতে টিকে থাকবে। কারণ, তারাই পৃথিবীতে টিকে থাকার যোগ্য। ডারউইনের এই মতবাদকেই হারবার্ট স্পেন্সার বলেছিলেন সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। অর্থাৎ, যোগ্যরা পৃথিবীতে টিকে থাকো। আর,যাদের পৃথিবীতে লড়াই করে বেঁচে থাকার মতো ক্ষমতা নেই, যাদের প্রকৃতির মনমৌজী হবার মতো উদ্ভাবনী ক্ষমতা নেই, তারা সোজা বাউন্ডারি লাইনের বাইরে যাও। এই ভাবে বাউন্ডারি লাইনের বাইরে থাকতে থাকতে ,পাকাপাকি ভাবে মাঠের বাইরে চলে গেছিলো হোমো ইরেকটাস।হারিয়ে গেছিলো পৃথিবী থেকে।

অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলায় গবেষণারত প্রত্নতাত্বিক দলটিতে আছেন, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিশিষ্ট প্রফেসর , ডঃ শেরি শিপটন। তাঁর কথায় জানা গেছে, হোমো ইরেকটাসরা নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য নিজেদেরকেই উদ্দীপ্ত করতে পারেনি। টিকে থাকার নতুন নতুন কৌশল রপ্ত করার ক্ষেত্রে, তারা ছিলো বিশ্ব কুঁড়ে।এই টিকে থাকার কৌশলগুলি কিন্তু হোমো ইরেকটাস-পরবর্তী প্রস্তর যুগের আদিম মানবরা রপ্ত করেছিল।পরবর্তী কালে রপ্ত করেছিলাম আমরা,হোমো স্যাপিয়েন্সরাও।

একটা আদিম মানব গোষ্ঠীর সাফল্যের সঙ্গে পৃথিবীতে টিকে থাকার মূল কারণই হলো, প্রস্তর নির্মিত যন্ত্রপাতি ও পরিবেশ থেকে রসদ সংগ্রহে নিত্য নতুন উদ্ভাবনী শক্তির ব্যবহার। আর এখানেই পিছিয়ে পড়েছিল হোমো ইরেকটাস শ্রেণীর আদিম মানুষরা। তারা, তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যেমন বর্শা, কুড়ুল হাতুড়ি তৈরির জন্য তাদের আস্তানার একদম সামনের পাথরগুলি সংগ্রহ করতো। সেগুলি নিম্নমানের হওয়া সত্বেও। এলাকাটিতে, ডঃ শেরি শিপটনরা অভিযান চালিয়ে খুঁজে পেয়েছেন এক চমকপ্রদ তথ্য। হোমো ইরেকটাসদের বাসস্থান থেকে অল্প দূরেই ছিল একটি অনুচ্চ পাহাড়। সেটি টপকাতে পারলেই তারা তাদের যন্ত্রপাতির জন্য উচ্চমানের পাথর পেতে পারত। উচ্চমানের পাথর দিয়ে উচ্চমানের বর্শা, হাতুড়ি, কুঠার ও আরও অনেক যন্ত্রপাতি হতো। যেগুলি টেকসই তো হতোই,এবং অনেক কার্যকরী হতো ইরেকটাসদের জীবন যাত্রায়। কিন্তু তারা এতই কুঁড়ে ছিল, পাহাড় চড়ার পরিশ্রমটুকুও করতে চায়নি। তার চেয়ে পাহাড়ের নীচে থেকে নিম্নমানের পাথর কুড়িয়ে হাতুড়ি, কুঠার,বর্শা বানিয়েছে। যেগুলি বিপদের দিনে তাদের বাঁচাতে কাজে আসেনি।

হোমো ইরেকটাসকে বাদ দিলে, পরবর্তী প্রস্তর যুগের অনান্য শ্রেণীর আদিম মানুষরা কিন্তু ভালো মানের পাথর সংগ্রহের জন্য পাহাড় চড়তো। এবং অনেক দূর থেকে তাদের আস্তানায় ভারী ভারী পাথর নিয়ে আসতো।হোমো ইরেকটাসের সঙ্গে প্রাথমিক হোমো সাপিয়েন্স এবং নিয়নডার্থল শ্রেণীর আদিম মানবদের এটাই ছিল সব চেয়ে বড় পার্থক্য। প্রাথমিক হোমো সাপিয়েন্স ও নিয়নডার্থলরা কুঁড়ে ছিলোনা। শরীর ও মাথাকে সমান খাটাতো।তারা,সবচেয়ে বেশি ভরসা রাখত নিজের শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার ওপর। কিন্তু হোমো ইরেকটাসরা আরাম ছাড়া খুব একটা কিছু করেনি বলেই ,পৃথিবী থেকে ধাঁ হয়ে গেছে। আমরাও কি আলসেমির আদর খেতে খেতে হোমো ইরেকটাসের পথে চলেছি? কবে, কে যেন বলেছিলেন,“আরাম হারাম হ্যায়“। ভেবেই বলুন, না ভেবেই বলুন, ঠিকই বলেছিলেন। তাই না ?

Shares

Leave A Reply