রবিবার, এপ্রিল ২১

গাঙ্গুলি নয়, এ অন্য লালমোহন, যার রসে মজেছেন হেমন্ত-কিশোর-মান্না

চৈতালী চক্রবর্তী

শিলিগুড়ির গা ঘেঁষে ডাবগ্রাম ও ফুলবাড়ি দু’টি লাগোয়া গ্রাম। এনজেপি ছুঁয়ে তিনবাত্তির মোড় পেরিয়ে ফুলবাড়ি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় সময়ের শহুরে আদল লেগেছে। ফুলবাড়ি এখন ঝকঝকে শিলিগুড়িকে টেক্কা দিতে কোমর বাঁধছে। বদলে যাওয়া ফুলবাড়িতে অপরিবর্তিত বলে কি আর কিছু বাকি আছে? তার একান্ত আপন, নিজস্ব? গ্রামে ঢুকে এই প্রশ্ন করলে সমস্বরে এলাকার লোকজন বলবেন, ‘আছে, আছে, নিশ্চয়ই আছে!’ ফুলবাড়ির এক্কেবারে নিজের ‘লালমোহন’।

এই লালমোহনকে নিয়ে উন্মাদনা আগেও ছিল, এখনও আছে। রাজগঞ্জের ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে তার নিবাস। নিতান্ত ছোট্ট, একটেরে ঘরে লালমোহনের সুখের সংসার। এলাকাবাসীর নয়নের মণি এই লালমোহনই ফুলবাড়িকে দিয়েছে তার পরিচিতি। বলা বাহুল্য, লালমোহনের পরিচয়েই ফুলবাড়ি বা ফুলবাড়ির নামের প্রসারের আড়ালে রয়েছে লালমোহন।

কে এই লালমোহন? না, সত্যজিতের থুড়ি ফেলুদার লালমোহন নয়। এই লালমোহন কোনও ব্যক্তিও নয়। এই লালমোহন রসে চোবানো, গোল-গোল, চেহারায় অনেকটা গোলাপজামুনের তুতো ভাই। এতটাই নরম, জিভের সঙ্গে পরিচয় হলেই নাকি গলে জল হয়ে যায়। স্বাদে স্বর্গীয় অনুভূতি।

শহুরে মিষ্টির ইতিহাসে যাকে পান্তুয়া বলে হই চই করা হয়, ফুলবাড়িতে তারই নাম লালমোহন। তবে ৭০ বছর আগে ফুলবাড়িতে যিনি প্রথম লালমোহনকে নিয়ে এসেছিলেন প্রয়াত সেই মণীন্দ্রনাথ ঘোষ অবশ্য লালমোহনকে পান্তুয়া বলতে রাজি ছিলেন না মোটেই। এই লাল, রসে টইটম্বুর মিষ্টি ছিল তাঁর সন্তানের মতোই। আদর করে তাই নাম রেখেছিলেন লালমোহন। পান্তুয়া নয়, লেডিকেনি বা গোলাপজামুন নয়, ফুলবাড়িতে, বিশেষত মণীন্দ্রনাথ ঘোষের তৈরি ‘ফুলবাড়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এ এই মিষ্টির একমাত্র পরিচয় তাই লালমোহন।

মণীন্দ্রনাথ গত হয়েছেন অনেক দিন। দোকানের ভার এখন তাঁর ছেলে রতন ঘোষের হাতেই। বাবার মতোই তিনিও বানান নরম-তুলতুলে রসে ভরা লালমোহন। ভোর বেলা দোকার ঝাঁপ খুলতেই শুরু হয় লোকজনের আনাগোনা। কড়াই বসিয়ে রস জ্বাল দিয়ে মিষ্টি তৈরি শুরু হয়ে যায়। বেলা গড়াতেই বাড়ে খদ্দেরের ভিড়। এলাকার তো বটেই, আশপাশের কয়েকটি এলাকায় ধরাবাঁধা খদ্দের লালমোহনের, এমনটাই জানিয়েছেন রতন বাবু। কেউ দোকানের গায়ে সাইকেল ঠেস দিয়ে রেখেই তড়িঘড়ি ভিতরে ঢুকে পেল্লায় হাঁক দেন, ‘আমাকে কুড়ি পিস লালমোহন,’ আবার কেউ আগে থেকেই অর্ডার দিয়ে যান। কারণ সময় যত বাড়বে কড়াই ফাঁকা শুরু করবে। গরম গরম তুলতুলে স্বাদের মজা পেতে আগে থেকেই তাই এত দৌড়োদৌড়ি।

উৎসব-অনুষ্ঠানে তো কথাই নেই। বর্ষবরণ থেকে ভাইফোঁটা, জামাইষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী— লালমোহনের চাহিদায় টান নেই। সেই সময় আরও কয়েক কড়াই বেশি মিষ্টি বানাতে হয়। চলতি বছর পয়লা বৈশাখে তো কথাই নেই। রতনবাবু জানালেন, বর্ষবরণ মানেই তো মিষ্টি। রসিক বাঙালির নতুন বছর মানেই হলো হালখাতা আর সঙ্গে হরেক রকম মিষ্টি। এই সময় সব মিষ্টির দোকানেই উপচে পড়ে ভিড়। ফুলবাড়ি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বাংলা নববর্ষে লালমোহনের চাহিদা কিছু বেশি। অনেকেই আগে থাকতে অর্ডার দিয়ে রাখেন। দামেও খুব বেশি হেরফের হয় না। বড় পি, ১২টাকা আর ছোট পিস ৭-৮টাকা।

‘‘ময়মনসিংহ থেকে এসে আমার বাবা এই দোকান তৈরি করেছিলেন,’’ বললেন রতনবাবু। বাংলাদেশেই নাকি একসময় এই মিষ্টির চল ছিল বেশি। এ পার বাংলায় লালমোহনের সঙ্গে পরিচয়টা মণীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। দেশভাগের পর ময়মনসিংহ থেকে সোজা ফুলবাড়িতে এসে বসতি গড়ে তোলেন মণীন্দ্রনাথ। ও পার বাংলা থেকে তিনিই লালমোহনকে এ পারে নিয়ে আসেন। নামটা অবশ্য তাঁরই দেওয়া। লালচে রঙা মিষ্টির স্বাদ যেন ঠিক মোহনের বাঁশীর মতোই সুমধুর। তারপর থেকে ফুলবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লালমোহন।

এই মিষ্টির স্বাদ চেখেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোরকুমার, জানালেন রতনবাবু। দোকানের অটোগ্রাফ খাতায় নামী দামি ব্যক্তিত্বদের ছড়াছড়ি। সকলেই মিষ্টি খেয়ে এর গুণগান করে গেছেন। জানালেন, শিলিগুড়িতে দু’বার অনুষ্ঠান করতে এসেছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী মান্না দে। সেই সময় ফুলবাড়ির এই দোকানের নাম শোনেন তিনি। অনেকগুলো লালমোহন খেয়ে প্রশংসা তো করেইছিলেন, অর্ডার দিয়ে মুম্বইতেও নিয়ে গিয়েছিলেন। রঞ্জিত মল্লিক, তাঁর মেয়ে কোয়েল, মিঠুন চক্রবর্তী, উষা উত্থুপ, সব্যসাচী চক্রবর্তী, কতজনের নাম, কে কটা লালমোহন খেয়েছেন, সেই হিসেবও আবছা দিতে পারে ঘোষ পরিবার। অভিনেত্রী লিনা চন্দ্রভারকর, অমিত কুমার এই মিষ্টি খেয়ে তারিফ করেছেন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এই দোকানে সামনে শ্যুটিং করেছেন বলেও জানালেন তাঁরা।

‘‘লালমোহন আসলে ছানার তৈরি তেলেভাজা মিষ্টি,’’ বললেন রতনবাবু। এর রেসিপি নাকি তাঁর বাবার একান্তই ব্যক্তিগত ছিল। তবে রেসিপির কিছুটা বলতে বিশেষ আপত্তি করেননি রতনবাবু। ছানার সঙ্গে ময়দা, ক্ষীর মিশিয়ে ভালোকরে মেখে গোল, গোল করে তেলে ভেজে তুলতে হয়। তারপর চিনির শিরায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়। রেসিপি দেখে বানালে অবশ্য সেই স্বাদ আসবে না। রতনবাবুর কথায়, লালমোহনের স্বাদের কারিগর আসলে ঘোষ পরিবারই। দিল্লি, মুম্বই শুধু নয়, আমেরিকা, লন্ডনেও এই মিষ্টি পৌঁছে গেছে বলে জানালেন তিনি।

‘‘আড়ে বহরে ফুলবাড়ি অনেকটাই বদলেছে। পুরনো বাড়ির জায়গায় হু হু করে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে। তবে লালমোহনের খ্যাতি কিছু কমেনি। বাংলাদেশ থেকে আত্মীয়-বন্ধুরা এলে লালমোহন খাবেই খাবে,’’ জানালেন দোকানেরই এক প্রবীণ খদ্দের। মিষ্টির তারিখ করতে গিয়ে স্মৃতির পথে ফিরে গেলেন রায় দম্পতি। দোকানে লালমোহন খেতে এসেছিলেন তাঁরা। রাজ কুমার রায়ের কথায়, ‘‘এই এলাকাতেই থাকি। ছোট থেকেই লালমোহন খাচ্ছি। স্বাদের কথা আর নাই বা বললাম।’’

রসগোল্লা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, তবে এত খ্যাতি সত্ত্বেও লালমোহনের গায়ে তেমন কোনও ট্যাগ লাগেনি। ‘‘বাবার পর আমি দোকান সামলাচ্ছি। কতদিন পারবো জানি না। আমার ছেলের তেমন উৎসাহ নেই। বংশের ঐতিহ্য হয়তো আমার পরেই শেষ,’’ চিন্তিত রতনবাবু। তবে লালমোহনকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। অটোগ্রাফ খাতাগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন দোকানে।

মেজাজটাই আসল রাজা। আর এই মেজাজই ধরে রাখতে চান রতনবাবু। আক্ষেপ শুধু একটাই, ‘‘ফেলুদার লালমোহনকে এই মিষ্টি খাওয়াতে পারলাম না।’’

Shares

Comments are closed.