ভারতের প্রথম মানববোমা দলিত নারী কুয়িলি, উড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশ অস্ত্রঘাঁটি

শিভাগঙ্গাই রাজ্যের রানি ভেলু নাচিয়ারের দুঃসাহসী এই নারী সেনাপতির অধীনে থাকত গেরিলা যুদ্ধে পটু নারীবাহিনী। যাদের মোকাবিলা করার অর্থ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    আজ থেকে প্রায় দুশো সত্তর বছর আগে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে বাস করত অরুণথাথাইয়ার সম্প্রদায়ভুক্ত একটি দলিত পরিবার। গৃহকর্তা পেরিয়ামুথন, তাঁর স্ত্রী রুকু ও তাঁদের মেয়ে কুয়িলিকে আর পাঁচটা মেয়ের মতো মানুষ করেননি। বালিকা কুয়িলির ধনুক থেকে সাঁই সাঁই করে উড়ে যেত তির, আকাশ থেকে নামিয়ে আনত উড়ন্ত পাখি। উঁচু গাছে তরতর করা উঠে কুয়িলি দাঁতে করে নামিয়ে আনত নারকেলের কাঁদি। কুমীর ভর্তি খাল গাছের ঝুরি ধরে দোল খেয়ে পার হয়ে যেত। মোষের পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াত এ প্রান্তর থেকে তেপান্তর।

    কুয়িলির সব দস্যিপনার পিছনে ছিল তার মা রুকুর ভরপুর প্রশ্রয়। রুকু নিজেও এরকমই ডানপিটে ছিলেন। নিজের হাতেই মেয়েকে শিখিয়েছেন তির এবং বর্ষা ছোঁড়া। বাবা পেরিয়ামুথন শিখিয়েছেন তরবারি আর দিশি বন্দুক চালানো। কুয়িলি যখন সদ্য যৌবনে পা দিয়েছেন তখনই ঘটে গেল অঘটন। চাষের ক্ষেতে রাতে হানা দিয়েছিল বুনো মোষের দল, মোষদের তাড়াতে গিয়ে মোষের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন কুয়িলির মা রুকু।

    স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন পেরিয়ামুথন। কন্যা কুয়িলির হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলেন। ভাগ্যান্বেষণে এখানে সেখানে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গিয়েছিলেন শিভাগঙ্গাই রাজ্যে। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মাদুরা জেলার রামনাদ সাব-ডিভিসনে ছিল এই স্বাধীন এস্টেট শিভাগঙ্গাই। সেখানে পেরিয়ামুথন মুচির কাজ শুরু করলেন, তাঁকে সাহায্য করতেন কুয়িলি।

    শিভাগঙ্গাই রাজ্য তখন ব্রিটিশদের দখলে। ১৭৭৩ সালের কালিয়ারকোলি যুদ্ধে ব্রিটিশরা হত্যা করে শিভাগঙ্গাই এস্টেটের রাজা মুথু ভাদুগানাথা পেরিয়াভুদায়াকে। রানি আরু ভেলু নাচিয়ার আত্মগোপন করে আছেন দিন্দিগুল এলাকায় হায়দার আলীর আশ্রয়ে। কিন্তু বিধবা রানি ভেলু নাচিয়ারের হৃদয়ে স্বামী হত্যার প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। হায়দার আলীর সহায়তায় তিনি গোপনে নিজের সেনা দল গঠন করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। সেই সৈন্য নিয়ে ব্রিটিশদের তছনছ করে ছিনিয়ে নেবেন তাঁর স্বামীর স্বপ্নের শিভাগঙ্গাই। পেরিয়ামুথন ও কুয়িলি যোগ দিয়েছিলেন রানি ভেলু নাচিয়ারের সৈন্যদলে নিছকই জীবিকার তাগিদে

    তৈলচিত্রে রানি ভেলু নাচিয়ার

    শিভাগঙ্গাইয়ের রানি যে অজ্ঞাতবাসে থেকে ভিতরে ভিতরে ব্রিটিশদের ওপর চরম আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে খবর চরের মারফত পৌঁছে গিয়েছিল ব্রিটিশদের কাছে। রানিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ব্রিটিশরা। এক রাতে রানির ডেরায় হানা দিল ব্রিটিশের পাঠানো আততায়ী। রানি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে আততায়ী এগিয়ে গিয়েছিল রানির কক্ষের দিকে। কিন্তু সে খেয়াল করেনি তার পিছু নিয়েছে এক বাঘিনী , রাতের অন্ধকারে কুয়িলির চোখ দুটো বাঘের মতোই জ্বলছিল। রানির শরীরে আততায়ীর তরবারির কোপ পড়ার আগেই শুন্যে উড়ে আসে মার্শাল আর্ট সিলামবম-এ পটু কুয়িলি। আঘাত হানেন আততায়ীর শরীরে।

    অন্ধকারে শোনা যায় ঝটাপটির শব্দ আর আর্তনাদ। রানির অনান্য দেহরক্ষীরা ছুটে আসে। রানির হাতে উঠে আসে তরবারি। জ্বলে ওঠে মশাল। দেখা যায় মাটিতে পড়ে আছে আততায়ীর প্রাণহীন দেহ। কুয়িলির শরীরও রক্তাক্ত, আততায়ী শেষ আঘাত হেনেছে কুয়িলির বাহুতে। রানি ছুটে যান কুয়িলির কাছে। নিজের শাড়ি ছিঁড়ে ক্ষতে বাঁধন দেন। সেই দিন থেকে রানি ও তাঁর বেতনভুক যোদ্ধার সম্পর্ক হয়ে যায় মা ও মেয়ের। কুয়িলির নাম হয়ে যায় ভিরামাঙ্গাই বা বীর নারী।


    বীর যোদ্ধা কুয়িলি

    কিন্তু হাল ছাড়ে না ব্রিটিশরা। রানিকে হত্যার চক্রান্ত চালিয়েই যায়। তারা গোপনে প্রচুর টাকা দিয়ে বশ করে ফেলে রানির সৈন্যদলের এক মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষককে। যে নিঃশব্দে ও অস্ত্র ছাড়াই রানির শরীরে সিলামবমের কৌশলে চরম আঘাত হেনে রাণীকে হত্যা করবে। কিন্তু রানির নিজস্ব দেহরক্ষী কুয়িলির দৃষ্টি ছিল বাজপাখির থেকেও তীক্ষ্ণ। সবার আগে রানিকে হত্যার এই চক্রান্ত সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়েছিলেন। তারপর একদিন নিজের মার্শাল আর্টের শিক্ষাগুরুকে তাঁরই শেখানো কৌশলে হত্যা করেছিলেন রানিমাকে বাঁচাতে।

    ১৭৮০ সাল। রানি লক্ষীবাঈয়ের অনেক আগে, প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রানি ভেলু নাচিয়ার। তাঁকে সাহায্য করেছিল গোপালা নায়েকার, হায়দার আলি, তাঁর পুত্র টিপু সুলতান ও মারুথু পান্ডিয়ার ভাইয়েরা। রানি ভেলু নাচিয়ারের নেতৃত্বে হাজার হাজার সেনা নিয়ে এগিয়ে চলল শিভাগঙ্গাইয়ের পথে।

    দলিত যুবতী কুয়িলি তখন রানির সেনাবাহিনীর মহিলা বিগ্রেডের সেনাপতি। কুয়িলির অধীনে থাকা নারী সৈন্যেরা যুদ্ধের পোষাকে থাকত না। সাধারণ পোশাকে জনসাধারণের ভিড়ে মিশে থাকত। শাড়ির ভেতর বিশেষ কায়দায় লুকানো থাকত অস্ত্র। সুযোগ বুঝে ব্রিটিশদের ওপর চালাতো গেরিলা আক্রমণ। ব্রিটিশরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত। পড়ে থাকত ব্রিটিশ সেনাদের লাশ। এভাবে একের পর এক যুদ্ধে জয়ী হতে লাগলেন কুয়িলি। শিভাগঙ্গাই রাজ্যের জনগণ কুয়িলিকে বলত  ভিরথালাপাথি (বীর সেনাপতি)।

    অচিরেই রানি ভেলু নাচিয়ার বুঝতে পেরেছিলেন শিভাগঙ্গাই ছিনিয়ে নেওয়ার  যুদ্ধটা যত সহজ ভেবেছিলেন ততটা সহজ নয়।। তাঁর সেনাবাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া সত্বেও যুদ্ধে পিছু হটছে ব্রিটিশদের আধুনিক বন্দুক, কামান ও গোলাবারুদের বিপুল সম্ভারের জন্য। ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে তাই রানির পরাজয় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ওদিকে কুয়িলির মাথার মধ্যে ঘুরছে এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা। যেটা সফল হলে ভেঙে যাবে ব্রিটিশ সেনাদের মেরুদণ্ড।

    ছদ্মবেশ ধরে কুয়িলি একদিন ঢুকে পড়েছিলেন শিভাগঙ্গাই রাজ্যে।  জানতে পেরেছিলেন ব্রিটিশদের অস্ত্রশস্ত্র ও  গোলা- বারুদের বিশাল ও মূল ঘাঁটিটি আছে শিভাগাঙ্গাইয়ের দুর্গে। কিন্তু সেই দুর্গে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে ব্রিটিশরা। একমাত্র বিজয়া দশমীর দিন নারীদের দুর্গে প্রবেশের অধিকার আছে। কারণ সারা শিভাগঙ্গাই রাজ্যে সেদিন উৎসব পালিত হয়। দুর্গের ভিতরে থাকা ‘রাজেশ্বরী আম্মান’ মন্দিরে  নারীরা পুজো দিতে যান।

    ফিরে গেলেন কুয়িলি চিন্তিত রাণীর কাছে। রাণীকে বললেন একবার শেষ চেষ্টা করার অনুমতি দিতে। কুয়িলি নিজস্ব বাহিনী নিয়ে দূর্গে গেরিলা হানা দেবেন। রানি যেন বাকি সেনাকে তৈরি রাখেন। দুর্গ দখল হয়েছে খবর পাওয়া মাত্র ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ব্রিটিশদের ওপর।

    ১৭৮০ সালের বিজয় দশমী। শয়ে শয়ে মহিলা রাজেশ্বরী আম্মার জয়গান গাইতে গাইতে দূর্গে প্রবেশ করছে। শঙ্খ , উলুধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজে মন্দির চত্ত্বর গমগম করছে। দুর্গ আগলে রাখা ব্রিটিশ সেনারা একটু ঢিলেঢালা মেজাজে। কিন্তু তবুও তারা নজর রাখছে এই সুযোগে কোনও পুরুষ দুর্গে যাতে না ঢুকতে পারে। তারা বুঝতেই পারেনি ভিড়ের সুযোগ নিয়ে দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়েছে ভেলু নাচিয়ারের অপ্রতিরোধ্য সেনাপতি কুয়িলি ও তাঁর নারীবাহিনীর সেরা যোদ্ধারা। যারা প্রয়োজনে পুরুষ যোদ্ধাদের থেকেও ভয়াবহ ও নৃশংস হয়ে উঠতে জানে। কুয়িলির সেনারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ভীড়ের মধ্যে। বোমার আওয়াজ পেলেই যে যেখানে আছে সেখান থেকে ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর আঘাত হানবে।

    অনেকদিন আগে মনস্থির করে ফেলেছেন কুয়িলি, শিভাগঙ্গাইকে ব্রিটিশদের গোলামি থেকে বাঁচাতে এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। রানি ভেলু নাচিয়ারের বিষণ্ণ মুখ দেখে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল, রানি যে তাঁর দ্বিতীয় মা। মায়ের সম্মান, মাটির সম্মান, দেশের সম্মানের জন্য তাঁর তুচ্ছ জীবনটা উৎসর্গ করবেন কুয়িলি।

    ভিড়ের মধ্যে কুয়িলি নিজের শরীরে মন্দিরেরই বড় বড় প্রদীপ থেকে নেওয়া তেল আর ঘি জবজবে করে মেখে নেন।  দুর্গের একেবারে পিছনের দিকে ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার।মন্দির থেকে বেশ খানিকটা দূরে। অকম্পিত হৃদয়ে কুয়িলি এগিয়ে চলেন গোলাবারুদের ঘাঁটির দিকে। সেখানে পায়েচারি করছে কিছু ব্রিটিশ সেনা। সুন্দরী ও যৌবনবতী এক নারীকে স্বেচ্ছায় তাদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বুঝি  ব্রিটিশ সৈন্যদের মনে পাশবিক প্রবৃত্তিটা জেগে উঠেছিল।

    হাসতে হাসতে কুয়িলি এগিয়ে চলেন আত্মবলিদানের পথে। দূরে মন্দিরে ঠিক তখনই মুহূর্মুহু বাজছে থাকে শঙ্খ, চড়া আওয়াজে বাজতে থাকে ঢাক ঢোল কাঁসর। কুয়িলি বুঝতে পারেন মায়ের মন্দিরে আরতি শুরু হল। সেও অর্ঘ্য দেবে মায়ের পায়ে, নিজের রক্ত আর মাংস। কুয়িলি জানে মা তাঁর অর্ঘ্য নেবেন।

    কুয়িলির স্মৃতিস্তম্ভ

    গোলাবারুদের ঘাঁটির দরজার সামনে এসে গেছে এখন কুয়িলি। লোভাতুর ব্রিটিশ সেনারা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। চকিতে চিতার ক্ষীপ্রতায় দরজা দিয়ে অস্ত্রঘাঁটির ভেতরে ঢুকে পড়েন কুয়িলি। সামনেই পিপের পর পিপে ভর্তি বারুদ। অনেক পিপের মুখ খোলা। চকমকি ঠুকে নিজের কাপড়ে আগুন লাগিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে কুয়িলির শরীর।  বিপদ বুঝে ছুটে আসে ব্রিটিশ বন্দুকের গুলি। একের পর এক উত্তপ্ত গুলিকে নিজের জ্বলন্ত দেহে আশ্রয় দিতে দিতে কুয়িলি মারেন মরণঝাঁপ, বারুদের পিপেগুলির ওপর। পরমুহূর্তেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। অস্ত্রঘাঁটির ছাদ ফাটিয়ে বিশাল একটা আগুনের গোলা আকাশ ছোঁয়।

    আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন মন্দিরে উপস্থিত শয়ে শয়ে মহিলা। হুড়োহুড়ি পড়ে যায় দিশেহারা ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে। এই সুযোগে ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কুয়িলির নারী যোদ্ধারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাকি ব্রিটিশ সেনাকে সাফ করে দুর্গ দখল করে নেয় তারা। দুর্গ জয়ের খবর পেয়ে  উজ্জীবিত রানি ভেলু নাচিয়ার কিছুদিনের মধ্যেই গোলাবারুদহীন ব্রিটিশদের হারিয়ে শিভাগঙ্গাই রাজ্য পুনর্দখল করে ফেলেন। কিন্তু কুয়িলিকে আর ফিরে পাননি।

    এর পর কেটে গেছে প্রায় দুশো চল্লিশ বছর, রানি ভেলু নাচিয়ারের মুখে হাসি ফোটাতে বিজয়া দশমীর বিকেলে নিজেকে রক্তের নদীতে বিসর্জন দিয়েছিলেন যে দলিতকন্যা, সেই কুয়িলির বলিদান কি আদৌ মনে রেখেছে ভারতের ইতিহাস!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More