বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

সমুদ্র সৈকতে বালির দুর্গ, সেখানে ২২ বছর ধরে বাস করেন পাগলা রাজা মার্সিও

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ব্রাজিলের রাজধানী রিও-ডি-জেনেইরোর ‘বাররা-ডা-তিজুকা’  সৈকতে প্রথম সূর্য উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিত্তশালীদের সৈকত এটি। আশেপাশে নামি দামী হোটেল। পর্যটকরা সূর্যোদয় দেখবার জন্যও ভিড় করেছেন সৈকতে। কিন্তু একদল পর্যটকের সূর্যোদয় দেখায় মন নেই। তাঁরা ক্যামেরা বাগিয়ে আছেন, রাজা কখন দুর্গের বাইরে আসবেন, সেই জন্য। হোটেল থেকেই বলে দেওয়া হয়েছে, কিছু দেখুন বা না দেখুন, কিং মার্সিওর দুর্গ অবশ্যই দেখবেন। অবশেষে রাজা বাইরে এলেন। মাথায় মুকুট পরে। এসে দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে অভিবাদন জানালেন দর্শণপ্রার্থীদের।

দুর্গের সামনে কিং মার্সিও

না, বেজে ওঠেনি কাড়া-নাকাড়া। কারণ, একলা দুর্গের একলা রাজা তিনি। মার্সিও মিজায়েল মাটোলিয়াস। শেষ বাইশ বছর ধরে আছেন এই দুর্গে। বাররা ডা তিজুকা  সৈকতে বালির তৈরি দুর্গে। হ্যাঁ নিজের হাতে তৈরি করা বালির দুর্গে। রবীন্দ্রনাথের ‘নকলগড়’ কবিতায় হারাবংশী বীর কুম্ভ মাটি দিয়ে নকল ‘বুঁদির কেল্লা‘ তৈরি করেছিলেন। তিতুমীর-এর বাঁশের কেল্লার কথাও আপনাদের জানা। তা বলে বালির কেল্লা!  তাতে ২২ বছর ধরে বাস করছেন একটি মানুষ! সত্যিই চোখ কপালে ওঠার মতো ব্যাপার।

কুড়ি বছর বয়েসে গুয়ানাবারা থেকে বাররা ডা তিজুকা-তে আসেন মার্সিলো। এসেই জায়গাটার প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু ব্রাজিলের খানদানি বড়লোকরা থাকেন এখানে। বাড়িভাড়া আকাশছোঁয়া। মাথায় একটা প্ল্যান খেলে গেল তাঁর। ব্রাজিলের বিভিন্ন সৈকতে স্থানীয় মানুষজন  বালির ছোট ছোট দুর্গ ও ভাস্কর্য তৈরি করেন। সেগুলির সামনে পর্যটকরা দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে। গুয়ানাবারা সৈকতে বন্ধুর কাছ থেকে ছোটবেলায় বালি দিয়ে দুর্গ তৈরি করা শিখেছিলেন মার্সিলো। তিনি ঠিক করলেন অভিজাত বাররা ডা তিজুকাতেই থাকবেন, এবং একটি পয়সাও খরচ না করেই।

সিংহাসনে পাগলা রাজা

সমুদ্র থেকে কিছুটা দূরে বালির ওপর তৈরি করে নিলেন এক অতিকায় বালির দুর্গ। শেষ বাইশ বছর ধরে মার্সিওর  বাড়ি ভাড়া, মিউনিসিপ্যালিটি ট্যাক্স, ইলেকট্রিক বিলের খরচা নেই। অথচ তিনি থাকেন রিও ডি জেনিরোর সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত এলাকায়।  যেখানে থাকার কথা ভাবতে গেলে অনেক ধনী মানুষদেরই পা কাঁপে।

স্থানীয় লোকে  তাঁকে বলেন কিং মার্সিও। অনেকে বলেন ‘পাগলা রাজা’। নিজের জন্য দুর্গের সামনে বানিয়েছেন কাঠের সিংহাসন। সব সময় মাথায় পরে থাকেন প্লাস্টিকের মুকুট। সারাদিন তাঁকে দেখা যায় নিজের তৈরি যন্ত্রপাতি নিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস বানিয়ে নিতে। কিং মার্সিওর দূর্গ দেখতে বড় হলেও ভেতরে কিন্তু একটি মাত্র ঘর। ঘরটি আয়তনে মাত্র ৩২ বর্গফুট। কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি  ছাদকে ধরে রেখেছে কয়েকটি  কয়েকটি কাঠের বিম। ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তাই নেই পাখা, ফ্রিজ, টেলিভিশন থেকে বৈদ্যুতিক আলোও। ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত  ঠাসা আছে মার্সিওর  সামান্য কিছু সম্পত্তি। তার মধ্যে বেশিরভাগই বই। আর আছে কিছু গলফ স্টিক আর মাছ ধরার ছিপ। বালিতে গলফ খেলতে আর সমুদ্রে মাছ ধরতে কিং মার্সিও ভালোবাসেন। যদিও তাঁর প্যাশন বই পড়া। তবে কিং মার্সিওর দুর্গে কোনও বাথরুম নেই। লাইফগার্ডদের বাথরুম ব্যবহার করেন এবং সেখানেই স্নান করেন।

এই একলা ঘর আমার দেশ

বালির দুর্গে দশকের পর দশক বাস করছেন একটি মানুষ। বিষয়টি শুনতে খুব রোমান্টিক লাগলেও কাজটা মোটেই সহজ সাধ্য নয়। বালির দুর্গকে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রচণ্ড কঠিন কাজ। দুর্গের দেওয়াল ও ছাদের দেখভাল করা মুখের কথা নয়। তার জন্য মার্সিওকে নিয়মিত জল দিয়ে বালি ভিজিয়ে রাখতে হয়। কারণ গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ায় দ্রুত বালি শুকিয়ে যায়। তাই অনেক সময় বালি শুকিয়ে ধ্বসে যায় দুর্গের দেওয়াল। এছাড়াও অনেক সময় ঝড়ে, কয়েক সেকেন্ডে ধূলিসাৎ হয়ে যায় মার্সিও স্বপ্নের দুর্গ। অনেক ধৈর্য নিয়ে ধ্বংসস্তূপের ওপর মার্সিও আবার বানিয়ে নেন নতুন দুর্গ। ট্যুরিস্টরা ভিড় করে দেখেন।গ্রীষ্মের গরমে সমুদ্র সৈকতের তাপমাত্রা ছোঁয় চল্লিশ ডিগ্রী। তখন দুর্গের ভেতর শোয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তখন দিনের বেলাটা কোনও বন্ধুর বাড়ি বা বাড়ির গ্যারেজে কাটান কিং মার্সিও। ২২ বছরে ধরে এটাই তাঁর রুটিন।

চলছে দুর্গের প্রাত্যহিক রক্ষণাবেক্ষণ

কেন এমন ভাবে থাকেন মার্সিলো? তাঁর কথায়, “এখানে অ্যাটলান্টিক অনবদ্য। তাই মানুষ সমুদ্রের সামনে থাকার জন্য এখানে আকাশছোঁয়া বাড়ি ভাড়া গোনেন। জমি কিনে বাড়ির স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু আমার এখানে থাকতে ইচ্ছে করে। সরল হাসিতে ভরে যায় কিং মার্সিওর মুখ। হাসতে হাসতে বলেন, “ভালোবেসে ফেলেছি এই সৈকত। তাই আমার ক্যাসল আমি বানিয়ে নিয়েছি। আমার রাজ্যের আমি রাজা। তবে রাণী নেই আমার। কে বিয়ে করবে আমায়? তবে দুঃখ নেই তার জন্য। থাকার জন্য আমার কোনও খরচা নেই। কোনওবিল দিতে হয় না, মুফতে থাকি“।

কিং মার্সিওকে স্থানীয়রা  যতই পাগল ভাবুন। তাঁর অদ্ভূত জীবনযাত্রার জনই তিনি কিন্তু আজ একজন সেলিব্রেটি। যখন পর্যটকেরা তাঁর দুর্গের পাশ দিয়ে যান অদ্ভুত রাজার অদ্ভুত দুর্গের ছবি নেন। মার্সিও কখনও সিংহাসনে বসেন রাজকীয় ভঙ্গিমায়। বসে বসে বই পড়েন। বইয়ের প্রতি মার্সিওর আছে অকৃত্রিম ভালোবাসা। দুর্গের পাশে আছে একটি কাঠের টেবিল। সেটা বইয়ের লাইব্রেরি এবং দোকানও বটে। পড়তে পারেন, কিনতেও পারেন। বইয়ের নির্দিষ্ট দাম নেই। পাঠক যা মনে করবেন তাই দেবেন। বইয়ের ওপরে একটা নোটিস ঝুলিয়েছেন রাজামশাই, তুলে নিন একটি বই এবং বাক্সে দান করুন। যাতে এই চেষ্টাটা আমি করে যেতে পারি। অনেকে বই পড়তে নিয়ে ফেরত দেন না। কিন্তু কিছু বলেন না মার্সিও। খুঁজতেও বের হন না। আকাশের দিকে দুই হাত তুলে বলেন, “হয়তো তাঁর কেনার পয়সা ছিল না“।

পাগলা রাজার সেই অদ্ভুত দোকান কাম লাইব্রেরি

এই ভাবে কেটে যায় দিন। বছরের পর বছর। দশকের পর দশক। যাঁরা সমুদ্রের তীরে বালির দুর্গ বা ভাস্কর্য বানান তাঁরা এবং পর্যটকরা দিনের শেষে সবাই বাড়ি ও হোটেলে ফিরে যান। নির্জন সৈকতে একা থেকে যান কিং মার্সিও। দুর্গের ভেতর জ্বলে ওঠে মোমবাতি। বইয়ের মধ্যে ডুবে যান মার্সিও। সমুদ্রের ঢেউ কখনও এগিয়ে আসে, কখনও পিছিয়ে যায়। রাত গভীর হয়, সি-গালের ঝাঁকের চিৎকার ক্রমশ কমতে থাকে। বাড়তে থাকে অ্যাটলান্টিকের ঢেউয়ের গর্জন। বাতাসের দাপট। ঠিক তখনই হয়তো, অনেক দূরে, বঙ্গোপসাগরে ভেসে চলা জেলে নৌকোর রেডিওতে বেজে ওঠে “কী আশায় বাঁধি খেলাঘর বেদনার বালুচরে“। কে জানে, হয়তো বেদনার বালুচরে ভেঙে গেছে মার্সিওর খেলাঘর। তাই বাস্তবের বালুচরে, বালির দুর্গে একলাই রাতের পর রাত কাটিয়ে চলেন পাগলা রাজা মার্সিও

Shares

Comments are closed.