তাইজির ডলফিন শিকার উৎসব, খুন হয় প্রায় পনেরো হাজার ডলফিন

মেরে ফেলা হয় আরও ২৫,০০০ অন্যান্য ছোট বড় সামুদ্রিক প্রাণী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    সারা পৃথিবীর কাছে জাপান মানেই শান্তির সাদা পায়রা। রুপকথার ফিনিক্সের মতো হিরোশিমা-নাগাসাকির ছাই থেকে যে দেশ ডানা মেলেছিল মুক্তির আকাশে। শিক্ষিত সুসভ্য দেশ জাপান। সেই জাপান বিশ্বের চোখের আড়ালে গর্বিত ভাবে বয়ে নিয়ে চলেছে এক কলঙ্কময় ইতিহাস। হ্যাঁ, হত্যার ইতিহাস। মানুষ নয়, ডলফিন। শান্তিপ্রিয় সামুদ্রিক প্রাণী ডলফিনদের সবচেয়ে নৃশংস ঘাতক হলো শান্তির পূজারী জাপান।

    অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে হয়ত। তাহলে নজর ফেলুন জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলবর্তী এবং প্রশান্ত মহাসাগরের তীরের আধা শহর তাইজির উপর। প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় কুখ্যাত তাইজি ডলফিন হান্টিং ড্রাইভ। শেষ হয় পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে। মারা যায় পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ও নিরীহ প্রাণী ডলফিন, কাতারে কাতারে। জাপান সরকার প্রতি বছর কম বেশি ২০০০ ডলফিন মারার অনুমতি দেয়। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে ১০-১৫ হাজার ডলফিন মেরে ফেলা হয়। এছাড়াও মেরে ফেলা হয় আরও ২৫,০০০ অন্যান্য ছোট বড় সামুদ্রিক প্রাণী।

    কেন মারা হয় ডলফিন!

    ডলফিনের মাংস জাপানে একটি দুর্লভ ডেলিকেসি। ডলফিনের পাখনার স্যুপের দাম কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন কন্টিনেন্টাল রেস্তোরাঁয় ডলফিনের পদের আকাশ ছোঁয়া দাম। চোরাপথে বিশ্বের নানা প্রান্তে তাই পাড়ি দেয় ক্যানবন্দি ডলফিনের মাংস।

    এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা এবং আরব শেখদের মনোরঞ্জনের জন্য জীবিত ডলফিন ধরা হয়। জাপানের তাইজি থেকে ধরা ডলফিনের বড় ক্রেতা চিন, তাইওয়ান এবং মিশর। বাৎসরিক ডলফিন শিকার নাকি তাইজি গ্রামের অধিবাসীদের সারা বছরের রোজগার দেয়। সেই টাকায় চলে তাঁদের সংসার। তাই সারা পৃথিবীর সমালোচনা ও অভিশাপকে তুড়ি মেরে, সমুদ্রের জল লাল করে, বুক ফুলিয়ে চলে ডলফিন শিকার। জাপান সরকারের প্রত্যক্ষ মদত ও প্রশ্রয়ে।

    শেষ মুহুর্ত, বাতাসে অক্সিজেন খোঁজার চেষ্টায়
    শিকারি কারা!

    বাণিজ্যিক ভাবে ১৬০৬ সাল থেকে তাইজি তিমি, হাঙর, ডলফিন মেরে আসছে। শুরু করেছিলেন তিমি শিকারি ইয়োরোমোতো। প্রাথমিক ভাবে তিনি ছোটো নৌকা করে সমুদ্রে গিয়ে হার্পুন দিয়ে তিমি শিকার করতেন। ১৬৭৫ সাল থেকে তিমি শিকারের জন্য জাহাজ ভাসাতে শুরু করল তাইজির মৎস ব্যবসায়ীরা। ধীরে ধীরে সারা জাপানে ছড়িয়ে পড়েছিল তিমি,হাঙর,ডলফিনের শিকার ও মাংস রপ্তানির ব্যবসা। তাইজিতে এই বাৎসরিক ডলফিন শিকার, উৎসবের আকার ধারণ করে ১৯৬৯ থেকে।

    সেপ্টেম্বরের এক তারিখ থেকে শুরু হয় এই নির্মম ইরুকা হত্যালীলা। ডলফিনকে জাপানিরা বলে ইরুকা। চলে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন পর্যন্ত। পুরো ছ’মাস তাইজি গ্রামের সমুদ্রতটের বালির রঙ  লাল হয়ে যায়। গোনডো( তিমি) শিকার শেষ হয় আরও দু’মাস পরে। এপ্রিলের শেষে।

    এই উৎসবে মারা হয় বটল নোজ ডলফিন, প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড ডলফিন, প্যাসিফিক হোয়াইট সিটেড ডলফিন, শর্ট ফিন পাইলট হোয়েল, রিসসোস ডলফিন, স্ট্রাইপড ডলফিন। এছাড়াও ফলস কিলার হোয়েল মারা হয় প্রচুর সংখ্যায়। শুশুক জাতীয় প্রাণী পরপোইজেস-এর কথা বাদই দিলাম। ওদের হত্যা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না। যে সব প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীদের হত্যা করা হয় তাদের সব কটিকেই WWF ( World Wild Fund) বিপন্ন প্রজাতি বলে ঘোষণা করেছে।

    ডলফিনদের বধ্যভূমি The Cove

    নৃশংসভাবে মারা হয় ডলফিনদের

    তাইজির কিছু বাছা ডলফিন শিকারি সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে শিকারে নামে। গভীর সমুদ্রে চলে যায় কয়েকশো ট্রলার। ডলফিনদের ঝাঁক দেখতে পাওয়ার পর, ট্রলারগুলি একটি ব্যুহ তৈরি করে ডলফিনের ঝাঁকটিকে ঘিরে। একটা ট্রলার থেকে স্টিলের পাইপের এক প্রান্ত সমুদ্রের জলে নামিয়ে দেওয়া হয়। তারপর একটি কাঠের হাতুড়ি দিয়ে পাইপে আঘাত করা হয়।  সুরেলা একটা শব্দের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের জলে ।

    ডলফিনরা সেই আওয়াজে আকর্ষিত হয়ে ট্রলারটির আশপাশে পাক খেতে থাকে। ট্রলারগুলি থেকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ছোট ছোট মাছ। তারপর জলের নিচে শব্দ তৈরি করতে করতে ট্রলারটি রওনা দেয় তীরের দিকে। পিছনে ‘U’ আকৃতির ব্যুহ তৈরি করে তীরের দিকে এগোতে থাকে বাকি ট্রলারগুলিও। ডলফিনরা জানতে পারে না, তাদের পিছন পিছন সমুদ্রের জলে নেমে পড়তে শুরু করেছে বিশাল এক জাল। যা তাদের আর সমুদ্রে ফিরে যেতে দেবে না।

    পালাবার পথ বন্ধ

    এই ভাবে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো শব্দের জাদুতে  ডলফিনদের সম্মোহিত করে একটি নির্দিষ্ট খাঁড়ির দিকে নিয়ে আসে তাইজির শিকারিরা। যে খাঁড়ির ভেতরে ডলফিনরা ঢুকতে পারবে, কিন্তু বেরোতে পারবে না। কারণ বেরোবার পথ জাল দিয়ে বন্ধ করা। খাঁড়িতে আটক হওয়া ডলফিনগুলি প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভারী জাল কেটে বেরোতে পারে না। তাদের শান্ত করার জন্য সারারাত তাদের কোনও ক্ষতি করা হয় না। অনেক সময় ছোট ছোট মাছ খাবার জন্য দেওয়া হয়। সকাল হতেই বোটে করে জলে নেমে পড়ে শিকারিরা।

    অ্যাকোয়ারিয়ামের জন্য যে ডলফিনগুলিকে জীবিত রাখা হবে, তাদের রেখে দেওয়া হয় বড় জালের মধ্যে। যে ডলফিনগুলিকে মাংসের জন্য মারা হবে, তাদের কে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আরেকটি জালের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এর পর জালটিকে টেনে টেনে অগভীর জলে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে ডলফিনদের হারপুন দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হত। তারপর লম্বা করাত দিয়ে গলা কেটে ফেলা হত। কিন্তু জাপান সরকার বর্তমানে সেটা নিষিদ্ধ করেছে।

    এখন ডলফিনের স্পাইনাল কর্ডের ভেতর লম্বা একটি ধাতব রড ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তাতে নাকি মুহূর্তের মধ্যে মারা যায় ডলফিনটি। কিন্তু ২০১১ সালে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, স্পাইনাল কর্ডে রড ঢুকিয়ে দেবার পরও বেঁচে রয়েছে অনেক ডলফিন। ছটফট করছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। শরীরের সব রক্ত গিয়ে মিশছে জলে। প্রশান্ত মহাসাগরের নীলচে-সবুজ জল হয়েছে আলতার মতো লাল।

    তুলে নেওয়া হচ্ছে নৌকায়
    পাশবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

    চিত্র পরিচালক হার্ডি জোন্স BlueVoice.org সংস্থার হয়ে ২০০০ সালে প্রতিবাদ শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন হলিউড অভিনেতা টেড ড্যানসন। তাঁরা বহুবার তাইজিতে যান। ডলফিন হত্যা নিয়ে তৈরি করেন ছবি The Dolphin Defender। সেই প্রথম বিশ্বের সামনে আসে তাইজির নৃশংসতা। শুরু হয় প্রতিবাদ, সারা বিশ্ব জুড়ে।

    সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রতিবাদের ঢেউ শুরু হয়। লড়াই শুরু করে Taiji Twelve নামে এক সংগঠন। ২০০৩ সালে তাইজিতে, রাতের অন্ধকারে জাল কেটে ডলফিনদের ছেড়ে দেন দুই প্রতিবাদী যুবক। তাঁদের গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু এরপর তাঁদের আর খোঁজ মেলেনি। তাইজি ডলফিন হান্টিং ড্রাইভ নিয়ে ২০০৯ সালে তৈরি করা হয় একটি বিখ্যাত তথ্যচিত্র, The Cove। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, তাদের মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম গুলিতে জাপান থেকে আমদানি হওয়া ডলফিন রাখা নিষিদ্ধ করে।

    শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের নিস্ফল বিক্ষোভ
    তবুও ডলফিন শিকার বন্ধ করেনি তাইজি

    প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ২০০৭ সালে একটি অত্যাধুনিক কসাইখানা তৈরি করেছে তাইজি। যেখান থেকে ডলফিনদের মাংস ক্যানবন্দি করে বাজারে পাঠানো হচ্ছে। তবে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পর, তাইজিতে এখন দিনের আলোয় ডলফিন হত্যা প্রায় বন্ধ । রাতের অন্ধকারে চলে ডলফিন নিধন যজ্ঞ। দিনের আলোয় যখন ডলফিন মারা হয়, সুবিশাল প্লাস্টিকের আচ্ছাদনে ঢেকে ফেলা হয় এলাকা। জনসমক্ষে আসে না নীল প্ল্যাস্টিকের ওপারে তাইজির পাশবিকতা। বোঝাই যাচ্ছে, বিলুপ্তপ্রায় ডলফিন প্রজাতিকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার আগে থামবে না জাপান। উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপান। বিশ্ব শান্তির পূজারী জাপান। বুদ্ধময় জাপান। ফলে ডলফিনেরা আজ , সুর্যোদয়ের দেশে অকাল সুর্যাস্তের অপেক্ষায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More