বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

মেক্সিকোর এক হাড়হিম করা অমীমাংসিত রহস্যের নাম ‘লা পাসকুয়ালিটা’

মেক্সিকোর চিহুয়াহুয়া শহরের প্রান্তে ,  একটি  দোকান ‘লা পপুলার‘। দোকানের ভেতর কাঁচের ঘেরাটোপে,  কনের সাজে সাজা এক তরুণী পুতুল বা ম্যানিকুইন। পুতুলটির  নাম, ‘লা পাসকুয়ালিটা ‘। তাকে ঘিরে শুধু মেক্সিকো নয়  সারা পৃথিবীতে, এক জটিল রহস্য ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রায় নয় দশক ধরে। কনের পোশাক বিক্রি করে শতাব্দী প্রাচীন ‘লা পপুলার‘ দোকানটি।

রহস্যের সুত্রপাত হয় ১৯৩০ সালে । হঠাৎই মাস খানেকের জন্য বন্ধ হয়ে যায় দোকান । তারপর আবার যখন ঝাঁপ খোলে, শোরুমের কাঠের তৈরি পুরোনো পুতুলটির বদলে এক নতুন পুতুল বসান মালিক পক্ষ ।  সেই বছরেরই ২৫ মার্চ। একেবারে জীবন্ত এক ম্যানিকুইন।  চমকে যান দোকানের পুরোনো ক্রেতারা । প্রমাণ আকারের , প্রায় জীবন্ত পুতুলটির সঙ্গে দোকানের মালিকের মেয়ের হুবহু  মিল।

দোকানের মালিকের মেয়ে ,  রূপসী  পাসকুয়ালিটা এসপারজাকে আগে দোকানে মাঝে মাঝে দেখা যেত। নতুন করে  দোকান খোলার পর থেকে ,  সেই মালিকের মেয়ে আর আসেননি। পরে শহরবাসী জানতে পারে এক বিয়োগান্তক কাহিনী। মাস খানেক আগে, বিয়ের রাতে,  ব্ল্যাক-উইডো মাকড়শার কামড়ে  মারা যান যুবতী পাসকুয়ালিটা। শহরে দ্রুত নতুন খবর  ছড়িয়ে পড়ে। দোকানের কাঁচ ঘেরা  পুতুলটি নিছকই পুতুল নয়।

সেটা মালিকের মেয়ে পাসকুয়ালিটার মমি করা মৃতদেহ। সংস্কারাচ্ছন্ন শহরবাসীদের অধিকাংশই এটা বিশ্বাস করেন, এবং এখনও। কিছু কিছু যুক্তিবাদী করেন না। দোকানটির মালিক পক্ষ এ বিষয়ে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেন না। মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন কর্মচারীরাও। শিহরণ জাগানো ঘটনাটি নিয়ে দিনের পর দিন মানুষের আগ্রহ বেড়ে চলে। দোকানে কেনাকাটার ছুতোয়  ভিড় উপচে পড়তে থাকে। পাসকুয়ালিটাকে এক ঝলক দেখে, সবার মুখে এক কথা। না,পাসকুয়ালিটা পুতুল হতে পারেনা।

কেন সবাই ভাবেন ,পাসকুয়ালিটা পুতুল হতে পারেনা?

ত্বকের উপর নিখুঁত ভাবে হাজার হাজার ভাঁজ আনা, মিহি রোম বসানো, কালচে নীল শিরা ফুটিয়ে তোলা। হাতের তালুর ভিতরের দিকে নিখুঁত গভীর, অগভীর রেখা ফুটিয়ে তোলা। চোখটা অবিশ্বাস্য রকমের জীবন্ত করে তোলা। মোমের মূর্তির ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে , এ ভাবে নিখুঁত মানুষের দেহ ফুটিয়ে তোলা কোনও শিল্পীর পক্ষে সম্ভব নয়।
আরও কিছু ভুতুড়ে তথ্য কানে আসতে লাগলো শহরবাসীর। রাতে নাকি এক ম্যাজিশিয়ান দোকানটিতে  আসেন। গভীর রাতে ম্যাজিশিয়ান আর পাসকুয়ালিটা শহরের পথে  ঘুরতে বের হন। অনেকে নাকি দেখেওছেন।
দোকানের বহু ক্রেতা বলেছেন , লা পাসকুয়ালিটা নাকি চোখ ঘুরিয়ে তাঁদের গতিবিধি লক্ষ করেন । তঁদের রক্ত জল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বেশিরভাগ দিন সকালে দোকানটি  খোলার পর দেখা যায়, পাসকুয়ালিটা  ঘুরে গেছেন একটি নির্দিষ্ট দিকে। যে দিকে তাঁর বাবা বসতেন।

আরও রহস্যজনক ঘটনা হলো, সপ্তাহে দু’দিন, লা পাসকুয়ালিটা নামের পুতুলটির পোশাক পরিবর্তন করা হয়। পৃথিবীর সমস্ত দোকানের, সমস্ত পুতুলদের পোশাক পরিবর্তন  জনসমক্ষেই হয়। কিন্তু , লা পাসকুয়ালিটার পোশাক পরিবর্তনের সময় চারিদিকে পর্দা টেনে দেওয়া হয়। পোশাক পরিবর্তনের জন্য নিযুক্ত এক জন কর্মচারী  ছাড়া ওই ঘেরাটোপে আর কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। দোকানের বাকি কর্মচারীরাও না। পোশাক পরিবর্তন হয় গভীর রাতে।

তেমনই একজন কর্মচারী হলেন সোনিয়া বার্সিয়াগা। যিনি সপ্তাহে দু’বার পাসকুয়ালিটার পোশাক পরিবর্তন করাতেন। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে  বলেছিলেন, “প্রতিবার আমি পাসকুয়ালিটার কাছে যখন যাই। আমার হাত পা অসাড় হয়ে যায়। ঘামতে থাকি। পাসকুয়ালিটার চোখ, চুল, কান, ঠোঁট, হাত, পা, অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক। বুড়ো আঙুলের ছাপ দেওয়ার জায়গা, বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝের ফাঁকের কুঁচকানো রেখা গুলি একেবারে সত্যিকারের মানুষের মতো। এমন কি পায়ে শিরাস্ফীতিও (varicose veins)আছে ।  একেবারে আসল মানুষের মতো। আমার কিন্তু মনে হয় ও আসল মানুষ।”

  প্রশ্নগুলি এসেছিল

লা পাসকুয়ালিটা নামের পুতুলটি যদি সত্যিই শবদেহ হয়, ৮৮ বছর পরেও কি ভাবে এতো নিখুঁত রয়েছে?
● সামান্য কাঁচের ঘেরাটোপে আছে পাসকুয়ালিটা, আবহাওয়ার একটুও প্রভাব পড়েনি কেন ?
●  যদি মালিক কন্যার শব সংরক্ষণ হয়েও থাকে, যাঁরা শবদেহটি সংরক্ষণ করেছেন প্রায় নয় দশক ধরে তাঁরা মুখ খোলেননি কেন? তাঁরাতো আরও ব্যবসা পেতেন !
●  ৮৮ বছর ধরে একটা শবকে এতো ভালো কন্ডিশনে  রাখাটা রীতিমতো বিস্ময়কর। একটি  ছোট্ট, কনের পোশাক বিক্রি করা, দোকানের পক্ষে এতো খরচ সামলানো কি সম্ভব?
● সবাইকে লুকিয়ে, সব তথ্য গোপন করে, সবার মুখ বন্ধ করে ৮৮ বছর ধরে একটা শবদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব?
●  ১৯৩০ সাল  থেকে একদিনের জন্যও পাসকুয়ালিটাকে দোকান ছাড়া হতে দেখা যায়নি। তবে শব সংরক্ষণের মতো জটিল ও সময়সাপেক্ষ  কাজটা হয় কখন?
● যাঁদের পুতুল, অর্থাৎ ‘লা পপুলার’ দোকানের মালিক পক্ষ কি বলেছেন পুতুলটি শব? তাহলে বিশ্বাস করবো কেন ?

 

 কিছু  প্রশ্ন যার উত্তর পাইনি-

  যে মাসে মালিকের মেয়ে মারা গেলেন সে মাসেই পুরোনো পুতুল বদলাবার দরকার পড়লো কেন?
●  হুবহু পাসকুয়ালিটার  মতো  দেখতে  ম্যানিকুইনটিই  বসানো হোলো কেন?

● ,ব্ল্যাক উইডোর কামড়ে মৃত্যুর পর পাসকুয়ালিটার অন্ত্যেষ্টি সংক্রান্ত কোনও খবর পাওয়া যায়নি কেন? তাঁর সমাধি খুঁজে পাওয়া যায়নি কেন ?
●  এক মাসের মধ্যে  এত নিখুঁত পুতুল বানানো সম্ভব ?

●  কেন,  পর্দা দিয়ে ঘিরে পাসকুয়ালিটার পোশাক পরিবর্তন হয়? গভীর রাতেই কেন  পোশাক পরিবর্তন করা হয়?  কেন এত আড়াল?  এক সময়ের রক্ত মাংসের  দেহের  আরও কিছু বৈশিষ্ট্য যাতে জনসমক্ষে  প্রকাশিত না হয়ে পড়ে? যদি মোমের পুতুলই হবে, এতো লজ্জা কিসের? নাকি মালিক বাড়ির  মেয়ের মৃতদেহর সম্ভ্রম রাখার চেষ্টা ?

● দোকানের কর্মচারীরা কেন পুতুলটির কাছে যেতে চান না ?
●  পোশাক পাল্টাতে গিয়ে,  প্রত্যেকবার কেন সোনিয়া বার্সিয়াগার হাত পা অসাড় হয়ে যায় ?

●  পাসকুয়ালিটা যদি পুতুলই হয়, কোন শিল্পী বানিয়েছেন এতো নিখুঁত পুতুল? তাঁর নাম কী? তিনি পর্দার আড়ালে কেন? জনসমক্ষে এলে  তিনি  তো আরও ক্লায়েন্ট পেতেন? তিনি কি পৃথিবী  বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে এক  আসনে  বসতে চান না ?

●  শিল্পী নিশ্চয় আজ  বেঁচে নেই। কিন্তু  তাঁর পরিবার মুখ খুলছেন না কেন? শিল্পীকে কত টাকা দিয়েছেন দোকানের মালিকপক্ষ? রহস্য ফাঁস করলে তো তার চেয়ে লক্ষগুণ বেশি টাকা মিলবে মিডিয়ার কাছ থেকে।

● এরকম হুবহু মানুষের মতো পুতুল পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই কেন? কোনও শিল্পীই তৈরি করতে পারেননি কেন? এই শিল্পকলা কি শিল্পী একাই জানতেন? তিনি কি কাউকে শিখিয়ে যাননি?

● মালিকপক্ষ  ৮৮ বছর ধরে মৌন আছেন কেন? কেন , তাঁরা একবারও বলেননি পাসকুয়ালিটা একটা পুতুল ?

●  পুতুলটির নাম পাসকুয়ালিটা রাখা হলো কেন? অন্য নামও তো রাখা যেত।

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

যুগের পর যুগ ধরে সাংবাদিকরা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দোকানটির মালিকদের পিছনে। কিন্তু সবাই মৌনব্রত নিয়ে আসছিলেন। বর্তমানের মালিক মারিও গঞ্জালেস অবশ্য  একবার মুখ খুলে ফেলেছিলেন সাংবাদিকদের জ্বালায়। তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল , “পাসকুয়ালিটা কি সত্যিই  একটি মৃতদেহ ?”   নির্লিপ্ত গলায় তিনি বলেন ‘বেশিরভাগ মানুষ তাই বিশ্বাস করেন। কিন্তু , আমি কিছু বলতে পারবো না।”
মারিও গঞ্জালেসের ঠিক পিছনেই দাঁড়ানো,  ৮৮ বছরের তরুণী পাসকুয়ালিটার মুখের একচিলতে হাসিটা কি রহস্যের কুয়াশাটিকে আরও গভীর থেকে গভীরতর করে তুলেছিল।

Leave A Reply