মঙ্গলবার, মে ২১

অ্যাকাডেমির সামনে নাটকের পোস্টারও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল….

সব বাধা কাটিয়ে গোবরডাঙার ‘শিল্পায়ন’ নাট্যদল এখন দেশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একের পর এক নতুন প্রযোজনায়। জাতীয় পুরষ্কারও জুটেছে প্রতিভার জোরে। সেই অসাধ্য সাধনের নানা কথা দলের কর্ণধার ও পরিচালক আশিস চট্টোপাধ্যায়ের মুখে। শুনলেন বিপ্লবকুমার ঘোষ।

মফসসলের দল বলে কম অপমান তো জোটেনি। অভিনয়ে বাধা দেওয়া, পোষ্টার ছিঁড়ে ফেলা, আমন্ত্রিত শো বাতিল করানো – সবই ঘটেছে। তবুও হাল ছাড়েননি আপনি। তাই না?

চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম শুধু নিজেদের প্রতিভা জাহির করার জন্য নয়, যত অপমান সহ্য করেছি তা সুদে আসলে ফেরৎ দেব বলে। জীবনের শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিলাম যখন গোবরডাঙা ছেড়ে কলকাতায় নাটক মঞ্চস্থ করার ইচ্ছে পূরণ করতে এই শহরে পা রেখেছিলাম। আমাদের অন্যায় ছিল, মফসসল শহর ছেড়ে কেন কলকাতায় এলাম! শহরের মুষ্টিমেয় কয়েজকজন এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁরা শুধু যে গোবরডাঙা তাই নয়, কোনও জেলার দলকেই এখানে নাটক মঞ্চস্থ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। এটা হয় কখনও? আমরা কোনও বাধা মানিনি।

আশিস চট্টোপাধ্যায়

এটা তো বেশ কিছুদিন আগেকার ঘটনা। কিন্তু কোন নাটকটি মঞ্চস্থ করতে এখানে এসেছিলেন?

দল তৈরি হওয়ার পরে আমাদের প্রথম প্রযোজনা ছিল দীপা ব্রহ্ম অভিনীত, আমার রচনা ও নির্দেশনায় ‘মালাডাক’ নাটকটি। এই নাটকটি যখন প্রায় প্রতি জেলাতেই বিপুল প্রশংসা ও আশীর্বাদ পেয়েছে তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিই, কলকাতাতেও এই নাটকের ‘শো’ করব। ব্যস্‌, এটা জানাজানি হতেই কিছু লোকের গাত্রদাহ শুরু হয়ে গেল। তাঁদের মৌরসি পাট্টা বুঝি বেহাত হবে। প্রথমেই বাধা এল, যেন অ্যাকাডেমিতে শো করার অনুমতি না পাই। তা-ও যখন হল না, তখন সব পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চাইল।

এর পরেও এত মনোবল ছিল আপনাদের?

বলতে লজ্জা নেই, আমাদের দল তৈরি হয়েছে গোবরডাঙা রেলস্টেশনের খোলা প্ল্যাটফর্মে। আমরা কখনও পিছিয়ে যেতে শিখিনি।

মানে?

তখন ১৯৮০ সাল। এই এলাকায় শুরু থেকেই নাটক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কাজকর্মে বহু মানুষ জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ না থাকাতে সেই চাপা আগুন ধীরে ধীরে আরও চাপা পড়ে যাচ্ছিল। মহলাকক্ষের অভাবে তখন বাধ্য হয়ে ১৮-১৯ বছরের কিছু তরুণ গোবরডাঙা রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই প্রতিষ্ঠা করেছিল এই ‘শিল্পায়ন’ নাট্যদলটি। এই স্টেশনেই ছিল আসবাবহীন একটি অফিস। এখানেই সবাই এসে জড়ো হতেন। ট্রেন আসা বা যাওয়ার সময় আমাদের সবাইকেই চলে যেতে হোত স্টেশন সংলগ্ন ফাঁকা মাঠে বা ধানক্ষেতে। ওখানেই চলত নাটকের মহড়া। পরে অবশ্য একটি ঘর জুটেছিল। এভাবেই চলছিল। কিন্তু শূন্য থেকে শুরু করে প্রবল পরিশ্রমে মফসসলের ভাঙাচোরা মঞ্চ, আলো আর দৃশ্যসজ্জার দীর্ঘ উপকরণ নিয়ে নাট্যচর্চা করতে গিয়ে শিল্পায়ন বুঝতে পেরেছিল, এভাবে আর যাই হোক আধুনিক থিয়েটারের উত্তরাধিকারকে বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সেই হতাশা থেকেই কী কলকাতার পথে পা বাড়ানো?

অনিবার্য ভাবেই তাই আমাদের চোখ ছিল কলকাতার দিকে। সেই কলকাতা– যেখানে মানুষ চিরকালই শিল্পসংস্কৃতির যোগ্য মূল্য দিয়েছে। শুধু তাই নয়। আধুনিক নাট্যচর্চার সমস্ত সুবিধাই তো এই শহরে মজুত থাকে। তাই আর দেরি না করে সমস্ত মফসসলি অভিমান ত্যাগ করে শিল্পায়নের নাট্যকর্মীরা নতুন করে লড়তে এল এই শহরে। বাংলার নাট্যমঞ্চে আমরাও ব্রাত্য হতে চাই না এটাও ছিল আমাদের শপথ।

এই শহর কিন্তু আপনাদের ফিরিয়ে দেয়নি। পরবর্তীতে বহু নাটক শুধু মঞ্চস্থ হয়নি, বাংলা জুড়ে বেশ আলোড়নও তুলেছিল। তাই না?

হ্যাঁ। মালাডাক নাটকটি দিয়ে শুরু। তার পরে যে নাটকগুলি শুধু কলকাতা নয়, বাংলার প্রতিটি প্রান্তে আলোড়ন তুলল তার মধ্যে রয়েছে– ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’,   ‘তারাপ্রসন্নের কীর্তি’, ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘সত্য শাইলক’, ‘অঙ্কুর’, ‘খোয়াব’, ‘ভূত পূরাণ’, চৈতন্যে চে’, ‘আদিম’, ‘পড়শি’, ‘হোমসের দাদাগিরি’, ‘বোল’ এবং ‘তমস’ এর মতো প্রযোজনা। প্রতিটি নাটকই কম বেশি পুরষ্কার পেয়েছে শুধু কলকাতা নয়, জেলাগুলি থেকে। দিল্লিতেও আমন্ত্রিত হয়েছে প্রায় সবকটি প্রযোজনাই।

 

সরকারি পুরষ্কার তো আপনারা পেয়েছেন?

থিয়েটার নির্দেশনার কীর্তি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার সম্মান ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ প্রযোজনাটির জন্য। শুধু তাই নয়, ওই বছরেই ‘তমস’ নাটকটির জন্য ‘সায়ক’ প্রদান করেছিল শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের সম্মান। আরও অনেক স্বীকৃতি ও সম্মানের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে ‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সম্মান’।

মফস্সলের দল বলে এক সময়ে কলকাতায় পা রাখতে পারেননি, আর এখন এ বছরেই নাকি আপনারা দিল্লির ‘এন এস ডি ভারতরঙ্গ মহোৎসবে আমন্ত্রিত হয়েছেন?

শুধু বাংলা বলব না, গোবরডাঙার মতো মফস্সল শহরের প্রথম নাট্যদল হিসেবে ‘শিল্পায়ন’এর ‘বোল আমন্ত্রিত হয়েছে এটা আমাদের অনেক বড় প্রাপ্তি। বাংলার মুখ আরও উজ্জ্বল হল বাংলার বাইরেও।

সে দিনের সেই সব কথা আজ মনে পড়লে অভিমান হয় না?

হয় তো বটেই। সে দিন যাঁরা আন্দোলন করে বাধা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন জেলার দল জেলায় নাটক করুক, কলকাতায় নয় তাঁরা কি ভুলে গিয়েছিলেন যে  কলকাতাও একটি জেলা? আসলে কলকাতা কিংবা মফসসল এরকম কোনও কাজিয়ায় না গিয়ে ভাল কিংবা খারাপ এই অভিধাতেই চিহ্নিত হওয়ার কথা আমাদের থিয়েটারের। কিন্তু বাধ সেধেছে রাজনৈতিক কায়েমি সুবিধাবাদ।

শুনেছি আপনি চিরকালই স্পষ্ট কথা বলেন। একগুঁয়ে, সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলে দিতে পারেন সব সময়।

হ্যাঁ, এখনও বলি, মিডিয়ার কাছে মফসসল চিরকাল ব্রাত্য। তাদের সার্চলাইট সব যেন মহানগরকে ঘিরেই। সম্ভবত ‘মহান’ ব্যক্তিত্বদের ‘ম্যানেজ’ করা যায় না বলেই তাঁদের প্রশংসাপত্র মফসসলের থিয়েটারের কপালে জোটে না। মফসসলের ভাল কাজকেও তাঁরা ‘নীরবতা’ দেখিয়ে পুরোপুরি সমাধিস্থ করার চেষ্টা করেন। আর তাই, একটি নাট্যদল যখন মঞ্চস্থ করে কিংবা মনোযোগী হয় ভীষ্ম সাহনির কালজয়ী উপন্যাস উপস্থাপনা করার জন্য তখন কিন্তু সেটা কোনও খবর হয় না। আবার এর উল্টোটাও কখনও সত্যি হয়। মফসসলের কোনও নাট্যদলের কাজ দেখে উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে আসেন মহানগরের কোনও কোনও মানুষ।

যেমন?

রবিশঙ্কর বলের উৎসাহে এবং তারই নাট্যরূপ ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’-র মতো নাটক নির্দেশকের মুনশিয়ানায় ছিনিয়ে নিতে পেরেছে নাট্য অ্যাকাডেমির ২০০৩ সালের শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান। আর ঠিক তখনই যেন কলকাতামফসসল–এর অদৃশ্য বিভাজন রেখা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।

তার মানেই তো প্রতিভার কাছে কোনও বাধাই বাধা হতে পারে না। তাই না?

না, এটা কোনও শ্লাঘার বিষয় নয়। এই আটত্রিশ বছর লড়াই করেও শিল্পায়ন অনুভব করেছে সামনে আরও কঠিন সময়। মফসসলের গ্রুপগুলিকে তথাকথিত নাট্য প্রতিযোগিতা মঞ্চের ওপর নির্ভর করে চলতে হচ্ছে এখনও। এটা ঠিকই, অনেক প্রতিভাবান নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতাদের জন্ম দিয়েছে এই প্রতিযোগিতা মঞ্চ। দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক অতি নির্ভর এই মফসসলি থিয়েটার এখন পরস্পরকে ‘সেল’ করতে চাইছে। আর তাই এই গ্রুপ থিয়েটারে নন্দনতত্ত্বের রঙ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। আমরা অবশ্য অনেক আগেই বেরিয়ে আসতে পেরেছি এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে।

তবে সমাধান কী?

সংকট বহুমুখী। গ্রুপ থিয়েটারের জন্মই হয়েছিল বাণিজ্যিক থিয়েটারের সমান্তরাল, চলমান জীবনের গভীরতর এবং নির্মোহ বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে। উত্তর কলকাতার সব প্রেক্ষাগৃহ এখন বন্ধ। তবু নতুন করে উদ্বোধন করা হল স্টার থিয়েটারের। গ্রুপ থিয়েটারকেই অভিনয় করতে যেতে হবে সেখানে। তবু ‘সমান্তরাল’ থিয়েটারের অভিধায় এখনও চিহ্নিত হতে হবে তাকে। বর্তমানে মেন স্ট্রিম থিয়েটার কিন্তু এটাই। মজার কথা হল, প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সি একটি আন্দোলন আজও স্বাবলম্বী হতে পারল না। পারল না নিজের পায়ে দাঁড়াতে। গণনাট্যের উৎস থেকে যে গ্রুপ থিয়েটারের জন্ম তা পেশাদারিত্বের ছিঁটে-ফোঁটাও অর্জন করতে পারল না শুধুমাত্র পরিকাঠামোর অভাবে। অন্যদিকে আর্থিক নিরাপত্তার সোনার হরিণের খোঁজে অসংখ্য প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী ছুটে চলেছেন অসুস্থ অস্বাভাবিক চরিত্রে ঘেরা গন্তব্যহীন টিভি সিরিয়ালে মুখ দেখানোর স্বপ্ন পূরণে।

এই সত্যিকে অস্বীকার করা যায় কি?

সার্কাসের ট্র্যাজিডির মতো এটাও সত্যি। তবে এটাই সব নয়। এর বাইরেও ভালো কাজ হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে। মফসসল এবং শহরের কিছু মানুষ তাদের নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রতিভার জোরে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্ম সৃষ্টি করে চলেছেন। নতুন আঙ্গিকে নতুন কিছু বলার চেষ্টাও করছেন তাঁরা আধুনিক থিয়েটারের ভাবনাকে মাথায় রেখে।

শুনেছি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম স্টুডিও থিয়েটার পেয়েছেন আপনারা অর্থাৎ ‘শিল্পায়ন’?

হ্যাঁ, ২০১৬ সালে শিল্পায়নের মুকুটে যোগ হয়েছে বড় একটি পালক। প্রথম স্টুডিও থিয়েটার। নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসু ও ভারত সরকারের সংস্কৃতি বিভাগের আনুকূল্যে। তবে এ বিষয়ে শিল্পায়ন অবশ্যই কৃতজ্ঞ গোবরডাঙ্গা পৌরসভা এবং পৌরপ্রধান সুভাস দত্তের কাছে। তাদের দেওয়া জমিতেই গড়ে উঠেছে এই স্টুডিও থিয়েটার তথা নাট্য বিদ্যালয়।

ওপার বাংলার অনেকেই তো শুনেছি গোবরডাঙ্গার এই কর্মকাণ্ডে সামিল হতে চান, তাই না?

ওপার বাংলার বহু নাট্যব্যক্তিত্ব ইতিমধ্যেই এখানে এসেছেন। ভবিষ্যতেও আসবেন। মজবুত হবে দুই বাংলার সংস্কৃতি।

Shares

Comments are closed.