রবিবার, জানুয়ারি ১৯
TheWall
TheWall

দীর্ঘদিন অনাহারে ছিল মৌজউদ্দিনের পরিবার, অকল্পনীয়ভাবে ৫টি মৃত্যু রুখেছিলেন রঞ্জন

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

রূপাঞ্জন গোস্বামী

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের এক সকাল। গত সাতদিন ধরে প্রচুর বরফ পড়েছে কাশ্মীরের হাপাতনারে। তিন চার ফুট বরফের নীচে ডুবে গেছে কাশ্মীরি গ্রামগুলি। রাস্তাঘাট বরফে ঢাকা। গাড়ি চলছে না। মানুষজনের চলাফেরা প্রায় বন্ধ।

সেই সকালে, এক কোমর বরফ ভেঙে চলেছেন রঞ্জন যোশী। চলেছেন পাহাড়ের ওপরে থাকা চারাগপোরা গ্রামে। রঞ্জন জম্মু-কাশ্মীর সরকারের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার দপ্তরের তরুণ কর্মী। কী করে গ্রামটির কাছে পৌঁছবেন তিনি জানেন না। তবুও তাঁকে যেতে হবেই। যে খবরটা তিনি পেয়েছেন, সেটা শোনার পর চুপ করে ক্যাম্পে বসে থাকতে পারেননি। তাই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়, মাট্টানেরর ক্যাম্প থেকে হেঁটেই  রওনা হয়েছেন।

কাশ্মীরের এই এলাকাটা জঙ্গি অধ্যুষিত। যেকোনও মুহূর্তে ভারতীয় সেনার লোক বা চর ভেবে গুলি ছুটে আসতে পারে।  রঞ্জনকে কিডন্যাপ করা হতে পারে। কেউ জানতেও পারবে, না কোন পাহাড়ের কোন খাদে রঞ্জনের লাশ পড়ে আছে। তবুও রঞ্জন বরফ ঠেলে এগোচ্ছেন।

প্রায় চার ঘন্টা বরফ ঠেলে গ্রামটির কাছে অবশেষে পৌঁছে গেলেন রঞ্জন। প্রবল শৈতপ্রবাহের জন্য গোটা গ্রাম ঘরবন্দি। কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ কানে আসে না। রঞ্জনের কাছে থাকা পরিসংখ্যান বলছে, হতদরিদ্র গ্রামটির প্রায় সবাই ঠিকা শ্রমিক। নিজেদের নামমাত্র কৃষি জমিও নেই।

রঞ্জনের পায়ের তলায় বরফ ভাঙার শব্দ পেয়ে একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি  জানলা ফাঁক করলেন। রঞ্জন তাঁর কাছ থেকে আবার খবরটির সত্যতা যাচাই করে নিলেন। ব্যক্তিটি, দূরে একটি টিনে ছাদ দেওয়া ঘর দেখিয়ে দেন।

মৃত্যু আঁধারে একচিলতে আলোর রেখা

ভগ্নপ্রায় মাটির বাড়িটির  কাছে পৌঁছে, ভাঙা দরজায় আস্তে ধাক্কা দিলেন রঞ্জন। মিনিট দশেক পর দরজা খুললেন বছর তিরিশের এক শীর্ণকায়া মহিলা। দরজা খুলেই মাটিতে বসে পড়লেন মহিলাটি। ঘরের ভেতর  ঢুকে পড়লেন রঞ্জন। চেঁচিয়ে বললেন, মৌজউদ্দিন সাব, ম্যায় আ গায়া হুঁ”

কাশ্মীরের হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়, ঘরের তোষকহীন মেঝেতে শোয়া চারটি শরীর নড়ে উঠল। মেঝেতে কেবল চাদরের ওপর শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ, এক বৃদ্ধা আর দুটি বাচ্চা। গত ছমাস ধরে প্রায় অনাহারে আছে পরিবারটি। ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও ন্যূনতম খাবার কিছু পেলেন না রঞ্জন।

সোর্স মারফৎ এই ভয়ঙ্কর খবরটি পেয়েছিলেন রঞ্জন। হাপাতনারের এই পরিবার দীর্ঘদিন অনাহারে আছে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ৭৮ বছর বয়স্ক মৌজউদ্দিন ভাট, তাঁর স্ত্রী ৬৮ বয়স্ক রাজা বেগম, তাঁদের পুত্রবধূ ও ছোট্ট দুই নাতি। অনাহারের ফলে উঠে বসা আর কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন প্রায় সবাই। ঘরের ভেতরের মলমুত্র ত্যাগ করে ফেলেছেন।

মৌজউদ্দিন ভাট ও তাঁর পরিবার পেলেন শীতবস্ত্র, কম্বল ও খাবার

বাড়িতে  পুরুষ বলতে একমাত্র মৌজউদ্দিন ভাট। আট বছর আগে, সত্তর বছর বয়েসে একটি বিল্ডিংয়ে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে ডান পা ভেঙ্গে  প্রতিবন্ধী। উপার্জনের ক্ষমতা হারিয়েছেন। ৬ মাস আগে মৌজউদ্দিন ভাটের একমাত্র ছেলে ফাইয়াজ আহমেদকে জম্মুর পুলিশ ড্রাগ পাচারের দায়ে গ্রেফতার করেছে। ফাইয়াজ শ্রমিকের কাজ করত। সে গ্রেফতার হওয়ায় পরিবারটির আয়ের একমাত্র উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে।

“ আমি  পরিবারটির অবস্থা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি । শীর্ণ শিশুগুলি শেষ তিন চারদিন কিছু খায়নি। আমি দারিদ্র দেখেছি, কিন্তু মানুষকে এত ভয়ংকর অবস্থায় থাকতে এই প্রথম দেখলাম । “

সেই মুহূর্তে, রঞ্জন যোশী ভাবেন, তাঁকে এখনই কিছু করতে হবে। আবার বরফ ভেঙে কয়েক কিলোমিটার নীচে নেমে, বরফে ঢাকা একটা মুদির দোকান প্রায় জোর করে খোলালেন। তারপর, যতটা ওজন তাঁর পক্ষে কাঁধে নিয়ে বরফ ভাঙা সম্ভব, ততটা ওজনের খাবার  কিনে আবার ফিরে এলেন। দুধ গরম করে নিজের হাতে সবাইকে খাওয়ালেন। প্রত্যেককে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করলেন সারাদিন ধরে।

ডান দিক থেকে দ্বিতীয় মৌজউদ্দিন ভাটের স্ত্রী, তাঁর পাশে দুই নাতি ও পুত্রবধু (সুস্থ হওয়ার দশ দিন পরের ছবি )

দু’দিন পরে তিনি আবার চারাগপোরা গ্রামে গেলেন। কয়েক কিলোমিটার বরফ ভেঙে। এ বার সহকর্মীদের দেওয়া খাবার পরিবারটিকে দিয়ে এলেন। প্রবল ঠান্ডায় পরিবারটির গায়ে শীতবস্ত্র বলতে কিছু নেই। দরজার ভাঙা পাল্লা দিয়ে হুহু করে বরফ ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। ঠান্ডায় বাচ্চাগুলোর অবস্থা একেবারে সঙ্গীন। সেদিন ক্যাম্পে ফির নিজেকেই প্রশ্ন করেন রঞ্জন, এ ভাবে কতদিন চলবে?

৪ দিনে ১৭ লাখ টাকা তুলে দিল সোশ্যাল মিডিয়া

প্রথম দিন মৌজউদ্দিন ভাটের ঘরে ঢুকেই মোবাইল ফোনে ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও তুলেছিলেন রঞ্জন। ঘরের ভেতরের ছবি, পরিবারটির মৃতপ্রায় সদস্যদের ছবি।

“ ভিডিও নেওয়ার কোনও উদেশ্যই আমার ছিল না। আমি শুধু মনে রাখার জন্যই ভিডিওটা নিয়েছিলাম,যাতে  এত মানুষের মধ্যে তাঁদের কথা ভুলে না যাই। এবং এই ভিডিওটা  দেখিয়ে আমি আমার দফতরকে বোঝাতে পারবো এঁদের অবস্থা।”

বাড়ির সামনে রাজ বেগম ও তাঁর পুত্রবধু (সুস্থ হওয়ার পরের ছবি)

রঞ্জনের বন্ধুরা বলেছিলেন ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করতে। মৌজউদ্দিন ভাটের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ডিটেলস দিয়ে, পরিবারটির জন্য সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলেন রঞ্জন।

“ফেসবুক থেকে অবিশ্বাস্য সাড়া পেলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুম্বাই, দিল্লি, বিদেশ থেকে মেসেঞ্জারে ফোন আসতে লাগল। সবাই জানতে চান, কী ভাবে তাঁরা সাহায্য করবেন। আমি শুধু বলতাম, ন্যূনতম যা পারবেন, মৌজউদ্দিন সাহেবের অ্যাকাউন্টে দিয়ে দিন। মাত্র ৪ দিনে ১৭ লাখ টাকা উঠে গেছিল। আমি নিজে ৩৫০০০ টাকা পাঠিয়েছিলাম আমার অ্যাকাউন্ট থেকে। এর থেকে বেশী আমার ক্ষমতা ছিল না।”

ইতিমধ্যে, খাবার ও শীতবস্ত্র পেয়ে মৌজউদ্দিনের পরিবারের সবাই অনেকটা সুস্থ। তাঁরা মহান আল্লাহ‘র কাছে রঞ্জনের জন্য নিয়মিত প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা করেন তাঁদের জন্যও, যাঁরা সাহায্য পাঠিয়েছেন।

রঞ্জন যোশী

মৌজউদ্দিন ভাটের স্ত্রী রাজ বেগম সজল চোখে বলেছিলেন,”চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখে, আমরা ভেবেছিলাম মানবিকতা মরে গেছে।  রঞ্জনকে দেখে বুঝলাম মানবিকতা এখনও খুন হয়নি।”

এই বছর জানুয়ারী মাসের ২৮ তারিখে চলে গেলেন মৌজউদ্দিন ভাট। তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ, পরিবারের প্রত্যেকের নামে খোলা অ্যাকাউন্টে সমান ভাগে ভাগ করে দিলেন রঞ্জন।

এই ছবি তোলার এগারো দিন পরে মৃত্যু হয় মৌজউদ্দিন ভাটের

বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন পর কারাগার থেকে ছাড়া পেলেন ছেলে ফাইয়াজ। চারাগপোরা ফিরে আবার হাল ধরলেন সংসারের।

ফাইয়াজ বাড়ি ফিরে মায়ের কাছ থেকে শুনলেন এক রূপকথার নায়কের কথা। যিনি তাঁর পরিবারের কাছে মসিহা হয়ে এসেছিলেন। সেই যুবক রঞ্জন যোশী, একজন কাশ্মীরি পন্ডিত। যাঁর পরিবারকে এই কাশ্মীরের বিজবেহারা এলাকা থেকে একদিন অত্যাচার করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধুমাত্র ধর্ম আলাদা ছিল বলে।

Share.

Comments are closed.