এক চা-ওয়ালার গল্প,যাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করেছিলেন রাষ্ট্রপতি,যাঁর উপমা দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    প্রসাদ রাওয়ের বাবা ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক। পেটের তাগিদে  মিত্রশক্তির  হয়ে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ করে ফিরে এলেন নিজের শহর কটকে। ইতিমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কটকে এসে চরম দারিদ্রের মধ্যে পড়লেন। কেউ চাকরি দিতে চায় না  ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ করা সৈনিককে। শেষে দারিদ্র ও বেকারত্বের জ্বালায় মাত্র ৫ টাকা সম্বল করে, কটকের বক্সীবাজার এলাকায়, রাস্তার পাশে খুলে ফেললেন চায়ের দোকান। উনিশশো ষাটের দশক তখন সবে শুরু হয়েছে ।

    বাবার চায়ের দোকানে ছ’ বছর বয়েস থেকেই আসত প্রসাদ রাও। টলোমলো পায়ে, খদ্দেরকে গরম চায়ের গ্লাস দিতে গিয়ে কচি কচি হাতের চামড়া পুড়ে উঠে যেত। কিন্তু ক্ষিদে যে বড় বালাই, তাই না দিয়ে উপায় ছিল না। এর ফাঁকে স্কুলে পড়তে যেত সে। প্রত্যেকদিন যাওয়া সম্ভব হতো না। কিন্তু তাতেও ক্লাসে দারুণ রেজাল্ট করত প্রসাদ। সে ভেবেছিল বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কারণ সে যে বস্তিতে থাকত সবার সব সময় অসুখ লেগেই থাকত।

    কিন্তু এগারো ক্লাসে পড়ার সময়, পড়াশুনায় ইতি টানতে হল। কারণ বাবা মারা গেলেন, পড়াশুনো করলে যে সংসার চলবে না। সেই থেকে আজও সেই দোকানে চা বেচেন ৬১ বছরের প্রসাদ রাও। দোকানেই কেটে গেছে ৫৪ বছর। আমাদের মনে হতেই পারে, এ আর এমন কী ব্যাপার। ভারতের লক্ষ লক্ষ চা-ওয়ালার জীবনের গল্পটাতো একই।

    কিন্তু না, প্রসাদ রাওয়ের গল্পটা সম্পূর্ণ অন্য

    দারিদ্রের ঘাত প্রতিঘাতের একেকটা সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে একদিন এই প্রসাদ পৌঁছে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি ভবন। এক প্রজাতন্ত্র দিবসে, ভারতের মহামহিম রাষ্ট্রপতির হাত থেকে গ্রহণ করেছিলেন ভারতের চতুর্থ জাতীয় সম্মান পদ্মশ্রী। কেন? ওড়িশার এই অনন্য চা বিক্রেতা তাঁর বিক্রি করা প্রত্যেক কাপ চায়ের দামের অর্ধেক খরচ করেন বস্তিবাসী শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য। এবং তা করে আসছেন দশকের পর দশক ধরে।

    পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করেছিলেন রাষ্ট্রপতি

    “বস্তিতে থাকার জন্য আমি অনুভব করেছিলাম ,বাবা মায়েরা ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া করতে উৎসাহ দিত না। বরং শিশু শ্রমিক হিসেবে খাটিয়ে রোজগারের ধান্দা করত। স্কুলের খাতায় নাম না লিখিয়ে শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাত। ক্ষেতে, বাড়ির পরিচারক হিসেবে, ইটভাটাতে বাচ্চাগুলো যা রোজগার করতো বাড়ির লোকে তা ছিনিয়ে নিত।

    সেই টাকায় বাবারা মদ কিনে খেয়ে বাড়িতে অশান্তি করতো। সেই শিশুদেরই মারধোর করত। বস্তির প্রত্যেকটি দিন আমাকে কুরে কুরে খেত। আমি হতে চেয়েছিলাম ডাক্তার হলাম চা-ওয়ালা। আমার হওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই আমি চেয়েছি আমার বস্তির বাচ্চাগুলো যেন সুযোগ না হারায় “ প্রসাদ রাও

    স্বপ্নের স্কুলে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকায়

    প্রায় তিন দশক আগে, বিক্রি হওয়া প্রতি কাপ চায়ের দামের অর্ধেক জমাতে শুরু করেন আলাদা বাক্সে। বছর খানেকের মধ্যে বেশ কিছু টাকা হাতে এলে, তাঁর নিজের বাড়িতেই চারজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে গুরুকূল প্রথায় শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন। তাঁর বাড়িতেই পড়া, খাওয়া আবার টিউশন। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

    যাত্রাপথ সুখের ছিল না

    প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ঢেউ আছড়ে পড়ত তাঁর বাড়ির উঠোনে। বস্তির বাচ্চাদের নিজের তৈরি স্কুলে নিয়ে এলেই মারমুখী হয়ে তেড়ে আসতেন বস্তির নিরক্ষর বাবা মায়েরা। চলত গালাগালির বন্যা।

    কেউ চেঁচাতেন, “পড়ে কী হবে ? লোকের বাড়িতে কাজ করে আমার মেয়ে মাসে ৭০০ টাকা আনে। তাকে পড়িয়ে কেন আমাদের পেটে লাথি মারছিস?” অনেক সময় শিশুদের মদ্যপ বাবা কাকাদের হাতে মার খেতে হয়েছে প্রসাদ রাওকে। হুমকি আসত সেই সব মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা নাম মাত্র মূল্যে শিশু শ্রম কিনতেন। চায়ের দোকান ভাঙচুর হয়েছে। কিন্তু হাল ছাড়েননি প্রসাদ রাও চায়েওয়ালা

    “শিশুদের কাছে শিশু না হতে পারলে তাদের শিক্ষা দেওয়া অসম্ভব”- প্রসাদ রাও

    তারপর দশকের পর দশক কাটল। প্রসাদ রাও চায়েওয়ালার বাড়ির গুরুকুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। কমতে লাগল বস্তির মানুষদের গালাগালি। একসময় বস্তির মানুষ হার মানলো প্রসাদের অদম্য মনোবলের কাছে।

    ডানা মেলল মুক্তির ‘আশা ও আশ্বাসন’

    একদিন ঘিঞ্জি আপরিচ্ছন্ন বস্তিতে মাথা তুলল দুই কামরার একটা স্কুল, নাম ‘আশা ও আশ্বাসন’। আজও এই স্কুলের সমস্ত খরচ চলে তাঁর চায়ের দোকানের রোজগার থেকে। তবে এখন অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। স্কুলের বড় ঘরটিতে একশো জন ছাত্র ছাত্রীকে পড়ান প্রসাদ রাও ও তাঁর সেচ্ছাসেবক বন্ধু রাধেশ্যাম দাস। ছোট ঘরটি স্কুলের অফিস ও রান্না ঘর। নিজে হাতে বাচ্চাদের জন্য এখনও রান্না করেন প্রসাদ রাও।

    “আমি রোজ ডালমা (ডাল চাল সবজি দিয়ে খিচুড়ি ) রান্না করি। এটা বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয়। কয়েকমাস আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কটকে এসেছিলেন। আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল তিনি বলেছিলেন আমার তৈরি ডালমা ভারতের স্কুলগুলিতে দেওয়া খাবারের মধ্যে অন্যতম সেরা পুষ্টিকর খাবার।” প্রসাদ রাও

    ক্লাস ওয়ান থেকে থ্রি পর্যন্ত পড়া যায় প্রসাদ রাও চায়েওয়ালার স্কুলে। ক্লাস থ্রি পাস করার পর শিশুদের অন্য স্কুলে ভর্তি করে দেন প্রসাদ। যাঁরা একসময় প্রসাদকে শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেরই ছেলে মেয়েরা সমাজে আজ প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা, তাঁদের বাবা মাকে বস্তির জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে অন্য জায়গায় বাড়ি করে চলে গেছেন। এই স্বপ্নই তো  নিরন্তর দেখেছিলেন প্রসাদ রাও।

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই দেখা করতে চেয়েছিলেন প্রসাদের সঙ্গে

    বিনয়ী এই চায়েওয়ালার খবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর রেডিও শো মন কি বাত-এ উল্লেখ করেন। যেখানে তিনি বলেন, প্রসাদ রাও এর চিন্তাধারা, তমসো মা জ্যোতির্গময় (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৩।২৮) বাণীটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রধানমন্ত্রী প্রসাদ রাওকে ‘দিয়া’ বলে সম্বোধন করেন, যিনি দরিদ্র শিশুদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

    পদ্মশ্রী পাওয়ার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল সংবাদমাধ্যম। তিনি সবাইকে অকুন্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন মাথা নিচু করে।
    “আমি গর্বিত জনগণ আমাকে তাঁদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। তবে আমি বলব বলেন আমি এই হতদরিদ্র বাচ্চার জীবনের রূপান্তর ঘটাইনি। বরং শিশুরাই আমার হতাশ জীবনকে আলোকিত করেছে। আজ আমার ছোট্ট স্কুল, আমার মন্দির। যেখানে আমি জীবন্ত ভগবানের সেবা করি। ৬১ বছর বয়েসে আমি নিজেকে সবচেয়ে ফিট ও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ বলে মনে করি। কারণ ওদের সেবা করে আমি যা পাই পৃথিবীর কোনও সম্পদ আমায় তা দিতে পারবে না।”- প্রসাদ রাও

    সেরিব্রাল স্ট্রোকে প্যারালিসিস হয়ে গিয়েছিল, ছয় মাস বিছানায় শুয়ে ফের উঠে দাঁড়িয়েছেন প্রসাদ রাও। তাঁকে যে উঠে দাঁড়াতেই হবে। তাঁকে যে রোজ চায়ের দোকান খুলতেই হবে। না হলে বাচ্চাগুলো আবার ইটভাটাতে ফিরে যাবে, ক্রীতদাস হয়ে। না, স্বপ্নের মৃত্যু হতে দেবেন না প্রসাদ রাও, তাই আজও পা টেনে টেনে এগিয়ে চলেন অন্ধকারের প্রদীপ হয়ে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More