সাফল্যের চূড়ায় এই ইঞ্জিনিয়ার কৃষক, ৩০০ প্রজাতির দেশি সবজি চাষ করেন খরা প্রবণ এলাকায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    দূরে, পশ্চিম আকাশে, বাদল মেঘের দল আন্নামালাই পর্বতশ্রেণীর উঁচু উঁচু শৃঙ্গগুলিকে ঢেকে দিয়েছিল সেদিন। সেই দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন রামেশ্বরন দম্পতি। কেরালা ও তামিলনাড়ুর মাঝে থাকা আন্নামালাই পর্বতশ্রেণীর মাথার ওপরে পাক খাওয়া ওই মেঘের দল, পথ ভুলেও এখানে আসে না। অথচ দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু ঢুকে গিয়েছিল তামিলনাড়ুতে।

    তাঁরা যেখানে থাকেন, সেই দিন্দিগাল জেলার ভাগ্যে বৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠার সুযোগ নেই। কারণ এটি বৃষ্টিছায়া অঞ্চল। ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হয় বর্ষাকালে, দু-একবার।

    খরা প্রবণ দিন্দিগাল

    প্রায় ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন জায়গায় জমি লিজ নিয়ে চাষ করে আসছেন দম্পতি। সব জায়গায় লাভের মুখ দেখলেও, এই অঞ্চলে চাষ করে লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না তাঁরা। কারণ এলাকাটি খরা প্রবণ। গোটা এলাকায় ভৌমজলের নিদারুণ অভাব, কাছাকাছি কোনও নদীও নেই।

    কৃষক দম্পতির মেধাবী পুত্র আধিয়াগাই

     এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। কীভাবে তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে বকেয়া অর্থ  মেটাবেন, সেই চিন্তাই কুরে কুরে খাচ্ছিল দম্পতিকে।

    জানলা দিয়ে বাবা মায়ের বিষণ্ণ ও চিন্তিত মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন পুত্র আধিয়াগাই। বাবা মায়ের ম্লান মুখ ও বিষন্ন বিকেলটা হঠাৎই পালটে দিয়েছিল বহুজাতিক সংস্থায় লোভনীয় চাকরির স্বপ্ন দেখা, ২২ বছরের আধিয়াগাই রামেশ্বরনকে।

     ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে দিলেন আধিয়াগাই। খরা কবলিত যে জমিতে তাঁর বাবা মায়ের রক্ত আর ঘাম ঝরছে, তাঁকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর জন্য, সেই জমিতেই সোনা ফলিয়ে দেখিয়ে দেবেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আধিয়াগাই।

    সংবাদ মাধ্যমকে পরে  বলেছিলেন,“আমার জিনে থাকা এক কৃষক, আমার পরিবেশ ও আমার প্যাশন আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়্রতে বাধ্য করল। ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে দিলাম ফোর্থ ইয়ারে। পুরো সময়ের জৈব-কৃষক হয়ে গেলাম আমি।”

      ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে, চাষ করবেন আধিয়াগাই

    আধিয়াগাই-এর বাবা মায়ের মাথায় যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। তাঁদের ছেলে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের লোভনীয় জীবন ছেড়ে তাঁদেরই মতো কাদা মাখবে শেষে! চুরমার হয়ে গিয়েছিল তাঁদের সব স্বপ্ন। 

    কিন্তু নিজের স্বপ্ন নিয়ে  সবুজ বিপ্লবী, কৃষি বিজ্ঞানী ও অর্গানিক ফার্মিং বিশেষজ্ঞ জি নাম্মাল্ভারের কাছে গিয়েছিলেন  আধিয়াগাই। তাঁর  রাসায়নিক মুক্ত সবজি চাষ নিয়ে করা কয়েকটি ওয়ার্কশপে যোগ দিলেন আধিয়াগাই।

    তাঁর মতো একজন সপ্রতিভ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াকে কৃষকদের মাঝে দেখে জি নাম্মাল্ভারও অবাক। কিন্তু জহুরীর চোখ  আসল রত্নকে চিনতে ভুল করেনি।

    ঘটনাচক্রে সেই সময়ে খবরের শিরোনামে ছিল কৃত্রিম ভাবে জিনের পরিবর্তন ঘটানো হাইব্রিড বেগুন  BT brinjal। যাকে নিয়ে বিতর্ক চলছিল সারা দেশ জুড়ে। আধিয়াগাই ঠিক করলেন হাইব্রিড সবজি চাষ করবেন না। চাষ করলে বিশুদ্ধ দেশি ও স্থানীয় সবজি চাষ করবেন।

    সম্বল ছিল আত্মবিশ্বাস

    তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাঁর অর্গানিক ফার্ম সফল হবেই। ভয়ঙ্কর খরাতেও তাঁর ফার্মে ফসল ফলবে। কারণ তিনি কেবলমাত্র এলাকার ফসল চাষ করবেন, যেগুলি জলাভাবেও বেঁচে থাকে।

    তিনি  হিসেব কষে দেখেছিলেন, বর্ষাকালে এই বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে একবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি  হলেই তাঁর ফার্মের গাছগুলি অক্টোবর পর্যন্ত টিকে যাবে। ততদিনে উত্তর পূর্বের মৌসুমী বায়ু বৃষ্টি এনে দেবে। তাই ফার্ম হাউসের জন্য, ২০১৪ সালে ৬ একর জমি লিজ নিয়েছিলেন ২৪ বছরের আধিয়াগাই।

    বীজ সংগ্রহ করছেন আধিয়াগাই

    উন্নত ও বিশুদ্ধ দেশী বীজ সংগ্রহের জন্য পাঁচ বছর ধরে তামিলনাড়ুর গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ কৃষকদের সঙ্গে। আধিয়াগাইয়ের কথায় এটি ছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেওয়ার সফর।

    আজ আধিয়াগাইয়ের সেই অর্গানিক ফার্ম শুধু তামিলনাড়ুর নয়, ভারতেরও গর্ব। ছয় একর ফার্মের তিন একর জায়গা জুড়ে হয় চিনা বাদামের চাষ। বাকি তিন একর জায়গায় হয় একদম দেশি বিভিন্ন প্রজাতির টমাটো,কাঁচা লঙ্কা, ঢ্যাঁড়স, বিনস, লাউ, বেগুন ও প্রায় ৩০০ স্থানীয় সবজি ও ফল।

    আধিয়াগাইয়ের ফার্ম

    এক ফসল চাষ না করে আধিয়াগাই বিভিন্ন সবজি চাষ করেন। এর ফলে, কীটপতঙ্গের আক্রমণের আশঙ্কা থাকে খুব কম। কীটনাশক কিনতে হয় না এবং সবজিগুলি হয় বিষমুক্ত।

    কেন স্থানীয় ও বিশুদ্ধ দেশি প্রজাতির সবজি বাছলেন!

    আধিয়াগাইয়ের সুস্পষ্ট উত্তর ছিল, আমাদের জমি খরা কবলিত এলাকায়। স্থানীয় বীজরা প্রাকৃতিক ভাবেই উর্বর এবং খরা প্রতিরোধ সক্ষম। রোগ ও জীবাণুর প্রতিরোধে সক্ষম। স্থানীয় সবজি ফলানোর জন্য অতিরিক্ত যত্ন দরকার নেই। এমনকি গবাদিপশুর মল দরকার হয় না। একবার সামান্য বৃষ্টি হলেই যথেষ্ট ফলন দেবে।”

    উইংস বিনস

    শুধু চাষই নয়,  অবলুপ্ত হতে বসা দেশি সবজি প্রজাতি গুলিকে বাঁচাতে তৈরি করলেন বীজ ব্যাঙ্ক। বর্তমানে তাঁর বীজ ব্যাঙ্কে ১৩ প্রজাতির ঢ্যাঁড়স, ৩০ প্রজাতির বেগুন, ৩০ প্রজাতির লাউ, ১০ প্রজাতির ভুট্টা, ও কিছু দুর্লভ প্রজাতির ২০০ সবজির বীজ আছে।

    আধিয়াগাই জানিয়েছিলেন, “হাইব্রিড প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছের আয়ু মাত্র  ১০০ থেকে ১২০ দিন। কিন্তু স্থানীয় প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছগুলির আয়ু, ছয় মাস থেকে তিন বছর। আমি কয়েকশো প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছ খুঁজে বার করেছি। কঙ্গু নামে এক জায়গায় প্রায় অবলুপ্ত হতে বসা গোলাপী ঢ্যাঁড়সকে  নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি। আমি অবাক হয়েছিলাম তামিলনাড়ুতে পাঁচশ প্রজাতির বেগুন আছে জেনে। “

    বিভিন্ন প্রজাতির ঢ্যাঁড়স, আছে দুর্লভ গোলাপী ঢ্যাঁড়সও

    স্থানীয় চাষিদের রাসায়নিক মুক্ত সবজি চাষ ও  লুপ্তপ্রায় দেশি সবজির চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কম পরিশ্রম করতে হয়নি আধিয়াগাইকে। স্থানীয় কৃষকদের অল্প জায়গায় সবজিগুলি লাগাবার জন্য দিনের পর দিন অনুরোধ করতেন তিনি। বাড়িতে খাবার জন্যও অন্তত একবার চাষ করে দেখতে বলতেন। সাফল্য এসেছিল। কৃষকরা ব্যাবসায়িক ভাবে উৎপাদন করতে শুরু করেছিলেন হারিয়ে যাওয়া সবজি গুলি।

    নানান জাতের বেগুন

    মাটিতে নেমে এসো যুবসমাজ 

    আধিয়াগাই বলছেন ভারত এখন Great Indian Agro Brain-drain নামক অসুখে ভুগছে। রোজ ২০০০ কৃষক চাষ-আবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই আধিয়াগাই যুবসমাজকে কৃষিমুখী করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলছেন, “আমরা যেদিন কৃষিকে আমাদের শিক্ষার মূলস্রোতে  আনতে পারব, সেদিন নিজের আর ভারতের ভবিষ্যতের জন্য চিন্তিত হতে হবে না।”

    তাই চেন্নাই ও মাদুরাইয়ের মত ঘিঞ্জি শহরের বাড়ির ছাদে বা পরিত্যক্ত এক চিলতে জমিতে অর্গানিক ফার্মিং করার পদ্ধতি যুবক যুবতীদের হাতেকলমে শেখাচ্ছেন আধিয়াগাই। এখনও পর্যন্ত, ২০০টিরও বেশি ওয়ার্কশপ করেছেন। শহুরে চাষিদের প্রথমে নিজের বীজ ব্যাঙ্ক থেকে বীজ দেন। ফলনের পর আবার ওঁদের কাছ থেকেই বীজ ফিরিয়ে নেন ব্যাঙ্কে জমা রাখার জন্য।

    আছে অপূর্ণ এক স্বপ্ন

    বাবা মায়ের হতাশা নিজের কঠোর পরিশ্রমে ভুলিয়ে দিয়েছেন আধিয়াগাই। তাঁরা এখন আধিয়াগাইকে নিয়ে গর্বিত। কিন্তু তবুও একটি স্বপ্ন অপূর্ণ আছে ২৯ বছরের আধিয়াগাই রামেশ্বরনের।

    তিনি জানিয়েছেন, আমার বাবার নিজস্ব কোনও জমি নেই। আমার একমাত্র স্বপ্ন, আমাদের নিজের জমি হবে। সেখানে বড় বীজ ব্যাঙ্ক থাকবে। গরীব চাষীদের নিখরচায় বীজ দেওয়ার জন্য। এর ফলে, একদিন হয়তো লুপ্ত হতে বসা বেশ কিছু  সবজিকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যেতে পারবো।”

    স্বপ্নকে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে দূরে আন্নামালাই পর্বতশ্রেণীর মাথায় জমা বাদল মেঘের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসেন  আধিয়াগাই। মেঘেদের অবহেলা এখন আর তাঁর ও তাঁর এলাকার মানুষদের মনে দাগই কাটে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More