শুক্রবার, মে ২৪

কেরলে পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা নির্জন চায়ের দোকানে একটা লাইব্রেরি, কিন্তু কাদের জন্য?

চৈতালী চক্রবর্তী

ঘন জঙ্গলের পথ ধরে জিপ চলেছে। সরু রাস্তা। ক্রমশই ঘন হচ্ছে জঙ্গল। রাস্তাও ক্রমশ সরু হতে হতে একসময় থেমে গেল। এর পর আর গাড়ি নয়, পায়ে চলা পথ। চড়াই উৎরাই ভেঙে ঝোপঝাড় সরিয়ে ঢুকতে হবে আদিবাসীদের গ্রামে। রাতের বেলা তো দূর, দিনের বেলাতেও এই পথ মারান না কেউ। সাংবাদিকদের ভরসা তাই গাইড। কেরলের ইড়ুকি জেলার প্রত্যন্ত ইড়ামালাক্কুড়ি গ্রামেই লুকিয়ে রয়েছে সেই রহস্য। আধুনিক সমাজ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন মুথুভন উপজাতিদের এই নিজস্ব রাজ্যে রমরম করে চলছে একটি লাইব্রেরি। শ’খানেক বই নিয়ে এই লাইব্রেরির দায়িত্বে স্থানীয় চা শ্রমিক এক আদিবাসী। গহীন অরণ্যে খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই যেখানে একটা চ্যালেঞ্জ, সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টাকে স্যালুট জানিয়েছে গোটা দেশ।

ইড়ুকি জেলার মুন্নার থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে প্রত্যন্ত পেট্টিমুড়ি গ্রাম। সেখান থেকেও প্রায় ২২ কিলোমিটার গেলে ইড়ামালাক্কুড়ি। একসময় পথ ছিল খুবই বিপদসঙ্কুল। ভাঙাচোরা রাস্তা সারাতে সম্প্রতি দু’কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেরল সরকার। ইড়ামালাক্কুড়ি এবং তার লাগোয়া পশ্চিমঘাটের পালাক্কাড় ও ত্রিসূর জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে এই মুথুভন উপজাতিরা। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। মূলত মালয়ালম ও তামিল ভাষাতেই তারা সচ্ছন্দ। মনে করা হয়, মাদুরাইয়ের রাজ পরিবারের সদস্য এই উপজাতিরা। কোনও কারণে রাজত্ব বিলুপ্ত হলে রাজপরিবারের কিছু সদস্য সর্বহারা হয়ে মধ্য কেরলের ত্রিভাঙ্কূরে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমঘাটের চারপাশে।

মালয়ালম ভাষায় ‘মুথুভন’ কথার অর্থ হলো যারা পিঠে কিছু বয়ে নিয়ে যায়। জঙ্গল ভেঙে পাহাড়ি পথে আদিবাসীরা সবকিছুই পিঠে বেঁধে নিয়ে চলে। সে খাবারই হোক বা কোলের শিশু। চাষাবাদই এদের প্রধান পেশা। কফি, আখ, আদার চাষ করে মুথুভনরা। তা ছাড়া জঙ্গলের কাঠ কেটে, শিকার করে দিন চলে এদের। গুটি কয়েক চা শ্রমিকও রয়েছে। তারই মধ্যে একজন পিভি চিন্নাথাম্বি। যত রহস্য দানা বেঁধেছে মধ্য বয়স্ক এই ব্যক্তিকে ঘিরেই।

পিভি চিন্নাথাম্বি

ইড়ামালাক্কুড়ি ছোট ছোট কয়েকটি এলাকায় ভেঙেছে। এতদিন আদিবাসীদের হাতেই ছিল গোটা এলাকার দায়িত্বভার, হালে গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়োগ করেছে সরকার। পাহাড় ঘেঁষা ইড়ামালাক্কুড়ির একটি এলাকা ইরুপ্পুকাল্লু। জঙ্গল এখানে অনেকটাই ঘন। সেখানেই একটেরে ছোট্ট বাড়ি আর চায়ের দোকান চিন্নাথাম্বির। দোকান তো নয়, বরং লাইব্রেরি বলাই ভালো। ইড়ামালাক্কুড়ি শুধু নয়, বলা ভালো বিশ্বের সর্বপ্রথম জঙ্গলের ভিতর গড়ে ওঠা একটি লাইব্রেরি।

‘‘২০১০ সালের পর থেকে দু’টো বড় পরিবর্তন হয়েছে ইড়ামালাক্কুড়ির। এক, গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়োগ, দুই, লাইব্রেরি তৈরি,’’ হাসি মুখে জানিয়েছেন চিন্নাথাম্বি। ছেঁড়াফাটা ফতুয়া, লুঙ্গিতে মলিন চেহারার প্রৌঢ়ের দু’চোখে সাহস আর হার না মানার প্রয়াস স্পষ্ট। বাঁশের দরমা দেওয়া দোকানটা আধাআধি ভাগ করা হয়েছে। একদিকে চায়ের বড় বড় কৌটো, অন্যদিকে বাঁশ দিয়ে তৈরি বেঞ্চির উপরে ও নীচে গাদাখানেক বই। মাদুর বিছিয়ে পরম যত্নে পর পর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বৃষ্টির জল থেকে বাঁচাতে মাঝে মাঝে চটের কাপড়ে মুড়ে রাখা হয় বইগুলো।

শুরুটা হয়েছিল ১৬০টি বই দিয়ে। চিন্নাথাম্বি জানালেন, লাইব্রেরিতে এখন অজস্র বই। দিনে দিনে সংখ্যাটা বাড়ছে। তার সব কৃতিত্বটাই স্থানীয় এক শিক্ষক পি কে মুরলীধরনের। তাঁর প্রচেষ্টাতেই এই লাইব্রেরির সূচনা এবং বর্তমানে জনপ্রিয়তা।

পিভি চিন্নাথাম্বির চায়ের দোকান। এখানেই বই পড়তে আসে আদিবাসীরা।

মুরলীধরনও মুথুভন সম্প্রদায়ের। ইড়ামালাক্কুড়িতে গত ১৭ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। পশ্চিমঘাটের আশপাশের জেলাগুলিতে শিশু শিক্ষার প্রচারে মাঝে মাঝেই শিবির, কর্মশালা করেন তিনি। ২০১৬ সালে মালয়ালমে তাঁর প্রথম বই ‘ইড়ামালাক্কুড়ি ওরাম পড়ুলাম’ (The Truth Of Edamalakkudy) প্রকাশিত হয়। সেই বই নাড়া দেয় কেরল সরকারকে। প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় শিক্ষার প্রসারের জন্য তৎপর হয় সরকার।

আরও পড়ুন: তিন চাকার চলন্ত লাইব্রেরিতে বই ফেরিওয়ালা, শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে বই পৌঁছে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে

‘‘২০০৯ অথবা ২০১০ সালে আমার এক বন্ধু উন্নি প্রশান্ত ইড়ামালাক্কুড়িতে আসেন। তিরুঅনন্তপুরমের রেড এফএম ও আকাশবাণীতে কাজ করতেন উন্নি। চিন্নাথাম্বির কুঁড়েতে তিনি বেশ কয়েক মাস ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেই ইড়ামালাক্কুড়িতে লাইব্রেরি তৈরির পরিকল্পনা করি আমরা,’’ বলেছেন মুরলীধরন ওরফে মুরলী মাশ। আদিবাসীরা এই নামেই ডাকে তাঁকে। মুরলী মাশের কথায়, আদিবাসী এলাকায় লাইব্রেরি চালানোটা ছিল সত্যি চ্যালেঞ্জ। এক তো শিক্ষার আলো নামমাত্র, তার উপরে বিপদসঙ্কুল পথে শহর থেকে বই আনাটা ছিল কষ্টসাধ্য। তবে পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে এগিয়ে আসে আদিবাসীরাই। শেখার ইচ্ছাটা ছিল তাদের অদম্য। এই উৎসাহ দেখেই মালয়ালম দৈনিক ‘কেরল কৌমুদি’-র এক সাংবাদিক আরও কয়েকজনের সঙ্গে ১৬০টি বই নিয়ে হাজির হয়ে যান ইড়ামালাক্কুড়িতে। আদিবাসীদের বোঝার সুবিধার জন্য সব বই ছিল মালয়ালম বা তামিল ভাষায় লেখা। ঝোলা করে সেই সব বই বয়ে নিয়ে আসে আদিবাসীরা। চিন্নাথাম্বির চায়ের দোকানের একপাশে শুরু হয়ে যায় আদিবাসী মুথুভনদের প্রথম লাইব্রেরি।

চায়ের দোকানে লাইব্রেরি কেন? চিন্নাথাম্বির যুক্তি খুবই সহজ, আদিবাসীদের মধ্যে বই পড়ার ইচ্ছাটা তৈরি করাই ছিল প্রথম লক্ষ্য। চা, স্ন্যাকস কিনতে তাঁর দোকানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিড় জমায়। আসে স্থানীয় চা শ্রমিক, চাষি, কাঠুরেদের মে, বউয়েরাও। রঙিন মলাটের বই দেখে তাদের মধ্যে কৌতুহল জাগে। যারা অক্ষর চেনে তারা বই নিয়ে পড়া শুরু করে, বাকিদেরও পড়তে সাহায্য করে। এইভাবেই বই পড়ার ইচ্ছাটা সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে পড়াশোনা শেখার আগ্রহটাও জন্মায় আদিবাসীদের মধ্যে।

মুন্নার, ইড়ামালাক্কুড়ির মুথুভন সম্প্রদায়ের চা চাষিরা।

বই পড়ার খরচ খুবই সামান্য। ধারবাকি রেখেও বই পড়ে যায় অনেকে। তবে শর্ত একটাই, সঠিক সময় অক্ষত অবস্থায় বই ফেরত দিতে হবে। বইয়ের কোনও রকম অযত্ন চলবে না। চিন্নাথাম্বির কথায়, ‘‘তাঁর লাইব্রেরিতে এককালীন মেম্বারশিপ নিতে গেলে ২৫ টাকা দিতে হয়। আর প্রতি মাসে বই পড়ার খরচ ২ টাকা।’’ অক্ষর চেনার বই দিয়ে শুরুটা হয়েছিল, এখন লাইব্রেরিতে বইয়ের রকম দেখলে চোখ কপালে উঠবে। চিন্নাথাম্বি জানিয়েছেন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, সাহিত্য-উপন্যাস কী নেই এখানে। জনপ্রিয় মালয়ালম লেখক ভাইকম মহম্মদ বাশির, এমটি বাসুদেবান নায়ার, কমলা দাস, এম মুকুন্দন-সহ একগুচ্ছ লেখক-সাহিত্যিকের বই রয়েছে লাইব্রেরিতে। তা ছাড়াও রয়েছে আধুনিক সময়ের অসংখ্য ম্যাগাজিন।

‘কাতিল ওরু লাইব্রেরি’ মানে জঙ্গলের ভিতর লাইব্রেরি। স্থানীয় সংবাদিক থেকে লেখক, সকলেরই কৌতুহলের জায়গা চিন্নাথাম্বির চায়ের দোকানের এই লাইব্রেরি। আদিবাসীরাও যে গড়গড় করে রাজনীতি, অর্থনীতি বা উপন্যাস পড়তে পারে সেটা চোখের দেখা দেখতেই ইড়ামালাক্কুড়িতে মাঝে মাঝেই ভিড় জমান বহিরাগতরা। তবে রাজ্য প্রশাসনের তরফে পুরোপুরি সাহায্য না পেলে এই লাইব্রেরিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন চিন্নাথাম্বি। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘স্থানীয়দের সাহায্যে ৫০,০০০ টাকা জোগাড় করে লাইব্রেরি চালাচ্ছি। এই বয়সে আমি একাই দেখভাল করি। একটা আলমারি আছে তবে সব বই ধরে না। তাই মাটিতে মাদুর বিছিয়ে বইগুলো রাখতে হচ্ছে। গ্রাম পঞ্চায়েত সাহায্য করবে বলেছে। তবে প্রশাসনের তরফে এখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’’

স্থানীয় শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে মুরলী মাশ (বাঁ দিকে) এবং পিভি চিন্নাথাম্বি (ডান দিকে)

শিক্ষক মুরলীধরন জানিয়েছেন, স্থানীয় শিক্ষকদের অ্যাসোসিয়েশন (PTA)সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে। জঙ্গলের ভিতর মুথুভনদের লাইব্রেরির খবর ছড়িয়ে পড়তে আরও নানা জায়গা থেকে সাহায্যের আশ্বাস আসছে। অক্ষর পরিচয় দিয়ে যে লাইব্রেরির সূচনা, এখন সেখানে দেশ-বিদেশের বইয়ের ছড়াছড়ি। পড়াশোনা যে আদিবাসীদের কাছে ছিল বিলাসিতা, এখন তারাই মন দিয়ে উপন্যাস, ম্যাগাজিন পড়ে। এটাই দেশের অন্যতম সম্পদ। এই সম্পদকে রক্ষা করাটাই সরকারের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন:

আগে হত স্ট্রবেরি চাষ, এখন শুধুই বইয়ের বাস, মহারাষ্ট্রের এই হিল স্টেশনের নাম এখন ‘বই-গ্রাম’

Shares

Comments are closed.