চিনা ড্রাগনের থাবা থেকে অরুণাচল ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এক ভারতীয় সিংহ, শহিদ যশবন্ত সিং

২০

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মিষ্টি চেহারা ও স্বভাবের গাড়োয়ালি যুবক যশবন্ত সিং। ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ান, নম্বর ৪০৩৯০০৯, বয়স মাত্র ২১ বছর। যশবন্ত অরুণাচলের তাওয়াং সীমান্ত প্রহরায় আছেন তাঁর ৪ নং গাড়োয়াল রেজিমেন্টের সঙ্গে। হাসি, ঠাট্টা, গানে, গল্পে তিনি জমিয়ে রাখেন তাঁর ইউনিটকে। তিনি সবার প্রিয়। সকালে তাঁর মুখ দেখলে নাকি দিন ভালো যায়।

ডিউটি চেঞ্জের সময় পোস্ট থেকে ক্যাম্পে যাওয়া আসার পথে রোজ তাঁর দেখা হয় দুই মনপা উপজাতীয় সুন্দরী যুবতীর সঙ্গে। সুন্দরী যুবতী দুটির গাল গোলাপের মতো লাল, একজনের নাম সেলা অন্যজন তার ছোট বোন নুরা। সুঠাম চেহারা আর মিষ্টি স্বভাবের যশবন্তকে তারা অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ভালোবেসে ফেলল।

ভারতের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়গুলিতে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। সে সমাজে নারীরাই সর্বেসর্বা। মেয়েরা এগিয়ে এসে অক্লেশে ছেলেদেরকে প্রেম নিবেদন করতে পারে। তাই একদিন দুজনে একসাথে যশবন্তকে প্রেম নিবেদন করে বসলো। চমকে উঠলেন যশবন্ত, ফর্সা মুখ মুহূর্তে লাল হয়ে গেলো, “শুনুন, এসব কী বলছেন ? আমি বিবাহিত, বাড়িতে আমার স্ত্রী আছে”।

কিন্তু প্রেমে অন্ধ দুই পাহাড়ি তরুণী নাছোড়বান্দা। সেলা আর নুরা বললো, “চিন্তা নেই, আমরা দুজন তোমার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী হতেও রাজি। তোমার প্রথম স্ত্রীকে আমরা আমাদের বড় দিদি হিসেবে সেবা করবো”।

শহিদ যশবন্ত সিং

তাতেও রাজি নন যশবন্ত। এই ভাবে দিনের পর দিন চললো যশবন্তের মন পাওয়ার চেষ্টা। শেষমেশ দুই বোনে একটা ফন্দি আঁটলো। পুরুষের মন জয় করতে হলে পুরুষকে খাইয়ে খুশি করতে হবে। তারা রোজ ভালো রান্না করে নিয়ে আসতে লাগলো। যশবন্তও মেয়ে দুটিকে ভালোবেসে ফেললেন, কিন্তু এ ভালোবাসা প্রেম নয়। পিঠোপিঠি বয়সের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে যে ভালোবাসা থাকে, সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা।

অন্যদিক থেকে সেলা আর নুরার যশবন্তের প্রতি অনুরাগ ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো। রোজ বিকেলে দুই বোন নদীর ধারে যশবন্তের সঙ্গে দেখা করতো। যশবন্ত তাদেরকে কখনও হাত জড়ো করে, কখনও ধমক দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সেলা আর নুরা শুধু হাসে। উল্টে যশবন্তকে বোঝাবার চেষ্টা করে।

সালটা ১৯৬২, মাসটা নভেম্বর, পূর্ব সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে ইতিমধ্যে ভারত ও চিনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সীমান্তে গোলাগুলির আওয়াজ ক্রমশ বাড়ছে। রাইফেলম্যান যশবন্তর রাইফেল আগুন ঝরায় অমিতবিক্রমে। কাছেই, গ্রামের বাড়িতে দুই বোন রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারে না। প্রতিটা গুলির শব্দের সঙ্গে  চলে তাদের প্রার্থনা। একটা প্রাণ বাঁচুক, সে প্রাণ যে তাদেরও প্রাণ। যশবন্তের।

৪ নং গাড়োয়াল রেজিমেন্ট ( প্রথম সারির বাম দিক থেকে দ্বিতীয় হলেন যশবন্ত সিং)

একদিন বিকেলে, নদীর ধারে তিনজন গল্প করছে। হঠাৎ তারা দেখলো ভারতীয় সৈন্যরা সীমান্তের দিকে ছুটছে। জানতে পারে চিনা সৈন্যরা আবার আক্রমণ করেছে। কালবিলম্ব না করে যশবন্ত হাতে তুলে নেন রাইফেল। হরিণের গতিতে দৌড়ায় সীমান্তর দিকে। পিছন পিছন যায়, সেলা আর নুরা। দৌড়াতে দৌড়াতে পিছন ফিরে বার বার বারণ করেন যশবন্ত, কিন্তু দুই বোন কথা শোনে না।

এর আগেও চিনা সৈন্যরা স্থানীয় মনপা উপজাতীর ছদ্মবেশে ভারতীয় সেনার ওপরে হামলা চালিয়ে বড়মাপের ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। তারপর চিনারা আরও দুটি ভয়ঙ্কর আক্রমণ শানিয়েছিল আর্টিলারি, মর্টার আর এমএমজি (মিডিয়াম মেশিনগান) নিয়ে। বহু জওয়ান শহিদ হলেও ভারতীয় সেনা মাটি কামড়ে পড়ে থাকায় চিনা সেনারা ভারতীয় এলাকা দখল করতে পারেনি।

যশবন্তের রণভুমি

এ বার শুরু হলো  চিনা সৈন্যদলের চতুর্থ আক্রমণ। চিনের সৈন্যরা ক্রমশ মিডিয়াম মেশিনগান নিয়ে এগোতে থাকে। তিনদিক থেকে অতর্কিত ও বিধ্বংসী আক্রমণের মুখে পড়ে ৪ নং গাড়োয়াল রাইফেল। চিনা সেনার মিডিয়াম মেশিনগানের দাপটে, ৪ নং গাড়োয়াল রেজিমেন্টের লাইট মেশিনগানগুলি চালাবার সুযোগ মেলে না। চিনা সেনার ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে পড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৬২ জন জওয়ান ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

বেশ কয়েকজন সেনা শহিদ হওয়ার পর, যুদ্ধরত ভারতীয় সেনাদের কাছে নির্দেশ যায়, সাময়িকভাবে পিছিয়ে আসার জন্য। পিছিয়ে আসে ভারতীয় সেনা। কিন্তু পিছিয়ে আসেন না যশবন্ত। তিনটি বাঙ্কার থেকে একাই ঘুরে ঘুরে ফায়ারিং করতে থাকেন চিনের পিপলস আর্মির ওপর। চিনা সেনারা ধোঁকা খায়। ভাবে, তিনটি বাঙ্কারে প্রচুর ভারতীয় সেনা মজুদ আছে। তাই তারা আর এগিয়ে আসতে সাহস করে না। ইতিমধ্যেই যশবন্তর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দুই বোন। বাঁচলে যশবন্তর সঙ্গে বাঁচবে, মরলে তাঁর সঙ্গেই মরবে। অমর হবে তাদের প্রেম। যশবন্ত এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে গিয়ে গুলি চালান। রাইফেলের ম্যাগাজিন খালি হলেই লোড করে দেয় দুই বোন।

যশবন্ত বুঝতে পারছেন, গোলা বারুদ ফুরিয়ে আসছে। আর ধুরন্ধর চিনা সেনারা তার কৌশল শীঘ্রই ধরে ফেলবে। তাই তিনি আবার সেলা আর নুরাকে মিনতি করেন, কিন্তু দুই বোন কিছুতেই তাদের প্রিয়তমকে ছেড়ে যাবে না। ইতিমধ্যে কেটে গেছে প্রায় ৭২ ঘন্টা। যশবন্ত একা চিনের রেড আর্মির হাজারের বেশি জওয়ানকে ঠেকিয়ে রেখেছেন তাঁর রাইফেলের ঝাঁঝে। এই ৭২ ঘন্টায় যশোবন্তর গুলিতে নিকেশ হয়েছে চিনের প্রায় ৩০০ সেনা।

দেশমাতৃকার চরণে যশবন্তের উপহার দেওয়া এই ৭২ ঘন্টায় ভারতীয় সেনা সুযোগ পেয়েছে যুদ্ধক্ষত্রে যুদ্ধের রসদ নিয়ে আসার। নতুন উদ্যমে, যুদ্ধে চিনকে কড়া জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেছে ভারতীয় সেনা।

নিহত চিনা সৈন্যদের সমাধিক্ষেত্র

১৬ নভেম্বর ১৯৬২

কিন্তু, যশবন্ত যেটা আশঙ্কা করেছিলেন, সেটাই ঘটল। যশবন্ত সিং ও সেলা আর নুরাকে খাবার জোগান দিতেন যে মনপা ব্যক্তি, তাঁকে চিনের সেনারা ধরে করে ফেলল। চিনের বাহিনী জানতে পারলো, ভারতীয় সীমান্তের বাঙ্কারগুলিতে সেনার মাত্র একজন ভারতীয় জওয়ান। সেই ঘুরে ঘুরে নিপুণ নিশানায় গুলি করে মারছে চিনা সেনাদের।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন চিনা জেনারেল। মাত্র একজন মানুষ ৭২ ঘন্টা ঠেকিয়ে রেখেছে অমিত শক্তিশালী রেড আর্মিকে! মাত্র একজন মানুষের জন্য চিনের হাজারের বেশি সেনা তিনদিন ধরে এক জায়গায় বসে আছে! মাত্র একজন মানুষের জন্য নেফা (অরুণাচল) হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যেতে বসেছে! মাত্র একজন মানুষ তাঁদের ৩০০ সেনার প্রাণ নিয়েছে!

কালবিলম্ব না করে, চিন  ১২ জন বাছাই করা চিনা কম্যান্ডোকে পাঠালো যশবন্তকে মারার জন্য। রাতের অন্ধকারে তারা এগিয়ে এলো চুপিসারে।

১৭ নভেম্বর, ১৯৬২

শেষ লড়াই

নতুন সূর্যের আভা পূর্ব হিমালয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতর্কিতে আক্রমণ চালালো চিনা কম্যান্ডো বাহিনী। খোলা আকাশের নিচে ৭২ ঘন্টা ধরে প্রবল শীতে প্রায় জমতে থাকা, পরিশ্রমে ও অনাহারে থাকা তিন যুবক যুবতী কিছু বোঝার আগেই গ্রেনেড ছুঁড়ল চিনারা। যশবন্তের চোখের সামনে গড়িয়ে পড়লো প্রাণোচ্ছল তরুণী সেলা। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার লেগেছে সেলার মাথায়। ভারতের ইতিহাসের মোড় ঘোরানো দিনের প্রথম শহিদ হলো ১৯ বছরের মনপা যুবতী সেলা।

গ্রেনেডের স্প্লিন্টার আহত হয়েও বীরবিক্রমে লড়াই শুরু করলেন যশবন্ত। ইতিমধ্যে গায়ে এসে বিঁধেছে শত্রুপক্ষের গোটা পাঁচেক বুলেট। এই অবস্থাতেও উঠে দাঁড়িয়ে একহাতে রাইফেল ধরে গুঁড়িয়ে দিলেন কয়েকজন চিনা সৈনের মাথা। একসময় শেষ হয়ে গেলো যশবন্তর রাইফেলের গুলি। রইলো একটি মাত্র বুলেট। রক্তাক্ত দেহে যশবন্ত নুরাকে দ্রুত তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে বললো। মৃত্যুপথযাত্রী যশবন্তের শেষ কথাটুকু সজল চোখে মেনে নিলো নুরা। একবার সেলা দিদির রক্তাক্ত মৃতদেহের দিকে, আরেক বার প্রিয়তম যশবন্তের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে নিচে নামতে লাগলো নুরা।

দূরে পাহাড়ে শোনা যাচ্ছে চিনের সৈন্যদলের উল্লাস। হাজারে হাজারে এগিয়ে আসছে তারা। ভারতের সীমানায় একা পড়ে রইল, ভারতের পূর্ব সীমান্তের  অতন্দ্রপ্রহরী, ২১ বছরের যশবন্ত সিং রাওয়াত। রক্তস্নাত দেহের পাশে পড়ে আছে সারা গায়ে গুলির ক্ষত।  ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে চিনা মিলিটারি বুটের আওয়াজ। আর মাত্র পনেরো কুড়ি ফুট দূরে।

শেষবারের মতো পিছন ঘুরে ভারত মা’কে দেখল যশবন্ত। নাকি ঘোলাটে চোখে খুঁজলেন গাড়োয়ালের পাহাড়ি গ্রামে তার পথ চেয়ে বসে থাকা মা’কে। নাকি দেখলেন তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে বসা, দিদিকে হারানো পাহাড়ি যুবতী নুরা নিরাপদ আছে কিনা। তারপর, ঠান্ডায় জমতে থাকা সেলার দেহের দিকে একবার তাকিয়ে, রাইফেলের নলটা গলার নিচে ঠেকিয়ে ট্রিগারে চাপ দিলেন যশবন্ত সিং রাওয়াত। পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে খাদে পড়ে গেল তাঁর দেহ।

দিদি সেলা গুলিতে নিহত, শত্রুপক্ষ কয়েকশো ফুট সামনে। যশবন্ত মৃত্যুর আগে নুরাকে পালাতে বলা সত্ত্বেও মৃত দিদির দেহ ও প্রিয়তম যশবন্তকে ছেড়ে পালায়নি নুরা। পাথরের আড়াল থেকে চোখের সামনে দেখেছে প্রিয়তমের মৃত্যু। নাকি নুরাও মরতে চেয়েছিল। মরে মিলতে চেয়েছিল সেলা দিদি আর যশোবন্তের সঙ্গে। চিনা সৈন্যের হাতে ধরা পড়ে গেলো ১৭ বছরের নুরা।

অকথ্য অত্যাচারের পর টেলিফোনের তার দিয়ে নুরাকে ফাঁসিতে লটকে দিলো চিনা সেনা। এক গাড়োয়ালি যুবকের প্রেমে পাগল হয়ে, চিনের হাত থেকে অরুণাচল ছিনিয়ে নিতে, দেশকে নিজেদের প্রাণ অর্ঘ্য দিয়ে গেলো দুই মনপা সুন্দরী সেলা আর নুরা।

এই মনপা যুবতীদের গ্রামেই বাস করতো সেলা আর নুরা

আক্রমণে ফিরলো ভারত

শহিদ যশবন্ত সিং রাওয়াত,  চিনের সেনাদের ৭২ ঘন্টা আটকে রাখায়, প্রচুর সময় পেয়ে গেছিলো ভারতীয় সেনা। প্রচুর গোলাবারুদ ও সৈন্য নিয়ে আক্রমণ শানালো চিনের অগ্রবর্তী বাহিনীর ওপর। ভারতীয় সেনার রুদ্রমূর্তিতে পিছু হটল চিনা সৈন্যদল। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করতে বাধ্য হলো।

ভারতীয় সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে যশবন্ত সিংকে খুঁজে পায়নি। কারণ তিনি সেনাকর্তাদের নির্দেশ মেনে পিছিয়ে আসেনি। ৭২ ঘন্টা ধরে তাঁর অবিশ্বাস্য মরণপণ লড়াইয়ের খবরও ভারতীয় সেনার কাছে ছিল না। ভারতীয় সেনা যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলাতক ভেবে যশবন্ত সিং-এর বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল করার কথা ভাবছে, সেই সময়, একদিন রাত্রে যুদ্ধক্ষেত্রের দায়িত্বে থাকা জেনারেল একটা স্বপ্ন দেখলেন।

স্বপ্নে তিনি দেখলেন  সম্পূর্ণ রণসাজে সজ্জিত হয়ে রাইফেলম্যান যশবন্ত সিং তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি জেনারেলকে বলছেন, তিনি কাপুরুষের মতো রণাঙ্গন থেকে পালাননি, তিনি কোথায় তা চিনা সৈন্যদলের কাছ থেকে জেনে নিতে।
ভারতীয় বাহিনী ও চিনা বাহিনীর মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ে শত্রুপক্ষের কাছ থেকে মৃত্যুঞ্জয়ী বীর শহিদ যশবন্ত সিংহের অবিস্মরণীয় বীরত্বের কাহিনী শুনল ভারতীয় সেনা। শ্রদ্ধায় উঠে দাঁড়ালো দুই বাহিনী।  এক ভারতীয় সেনার আমরণ লড়াইকে কুর্ণিশ জানালো চিনা সৈন্যদল।

যশবন্তগড় (তাওয়াং)
 যশবন্ত সিং- এর শহিদ হওয়ার দ্বিতীয় কাহিনী (সরকারি)

১৭ নভেম্বর, ১৯৬২

চিনা সেনার মেশিনগানের দাপটে ৪ নং গাড়োয়াল রেজিমেন্টের লাইট মেশিনগানগুলি চালাবার সুযোগ মেলে না। ল্যান্স নায়েক ত্রিলোক সিং, রাইফেলম্যান যশবন্ত সিং ও রাইফেলম্যান গোপাল সিং, চিনের মেশিনগান থামাতে এক আত্মঘাতী মিশনে নামেন। তাঁরা  রেড আর্মির অবিশ্রান্ত গুলিবৃষ্টির মাঝেই হামাগুড়ি দিয়ে পাথর ও ঝোপের আড়াল দিয়ে এগিয়ে যান।

এইভাবে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় পৌঁছে যান চিনা মেশিনগানটির একবারে সামনে, গ্রেনেড ছোঁড়ার দূরত্বে। দাঁত দিয়ে গ্রেনেডের পিন টেনে চিনা মেশিনগানটির দিকে গ্রেনেড ছোঁড়েন যশবন্ত সিং। গ্রেনেডের আঘাতে বাঙ্কারে থাকা পাঁচ চিনা সৈন্য মারা যায়, আহত মেশিনগান চালকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন যশবন্ত।

মেশিনগান নিয়ে নিজেদের বাঙ্কারে ফেরবার পথে ছুটে আসে চিনা সৈন্যদের গুলি। গুলি লাগে যশবন্ত সিংয়ের মাথায়। প্রাণ হারান যশবন্ত। কিছুক্ষণ পর চিনা আক্রমণে প্রাণ হারান  ত্রিলোক সিংও। আহত অবস্থায় গোপাল সিং চিনা মিডিয়াম মেশিনগানটি নিয়ে ভারতীয় বাঙ্কারে ফিরে আসেন।  আবার গর্জে ওঠে ভারতীয় লাইট মেশিনগানগুলি। চিনকে অরুণাচলের মায়া ত্যাগ করতে হয় বাধ্য হয়ে।

যশবন্ত মন্দির। এখানে প্রণামী দেওয়া বারণ

লাজুক যুবক যশবন্ত সিং, হয়ে গেলেন দেবতা, বাবা যশবন্ত সিং রাওয়াত

আজ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যেকটি জওয়ান জানেন বাবা যশবন্ত সিং রাওয়াতের নাম। যশবন্ত সিং যেখানে শহিদ হয়েছিলেন, আজ সেই জায়গার নাম যশবন্তগড়। আজও সেখানে তাঁর নিজস্ব জিনিসপত্র প্রদর্শিত হয়। যশবন্ত সিংয়ের ৪ নং গাড়োয়াল রেজিমেন্ট আজ ভারতের পশ্চিম প্রান্তের সুরক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত।

অরুণাচলে, তাঁর কক্ষে আজও ৪ নং গাড়োয়াল রেজিমেন্টের ছয় জওয়ান প্রহরায় থাকেন। জওয়ানেরা বাবা যশবন্ত সিংকে জীবিত মনে করে তাঁর দেখভাল করেন। নির্জন কক্ষটিতে আজও ভোর ৪.৩০ মিনিটে চা দেওয়া হয়। সকাল ৯টায় ব্রেকফাস্ট ও সন্ধ্যা ৭টায় ডিনার দেওয়া হয়।

যশবন্ত সিংয়ের কক্ষ

“Heroes get rememberedbut legends never die.”

শোনা যায়, বাবা যশবন্ত সিংয়ের ঘরের বিছানার চাদর কুঁচকে থাকতে দেখা যায় প্রতিদিন সকালে। ঘরের জিনিসপত্র আপনা আপনি জায়গা পরিবর্তন করে। মিলিটারি বুটে কাদা লেগে থাকে। ভারতীয় সেনাবাহিনী তো বটেই, এমনকী চিনের পিপলস আর্মির জওয়ান রাও স্বপ্নে দেখেন বাবা যশবন্ত সিং রাওয়াতকে। রণসাজে সজ্জিত হয়ে ভারতীয় সীমান্তে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।

মৃত্যুর পর তাঁকে মহাবীরচক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। মৃত্যুর পরেও তাঁর নিয়মমতো প্রমোশন হয়েছে। রাইফেলম্যান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। মৃত্যুর পর এতো উঁচু পদে যাওয়ার উদাহরণ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আর নেই। প্রতি মাসে বাবা যশবন্ত সিং বেতন পেতেন, মিলত প্রাপ্য ছুটিও। বাবা যশবন্ত সিংয়ের সেবক এবং ভারতীয় সেনার পদাতিক সৈন্য রাম নারায়ণ সিং জানিয়েছেন, “সেনাবাহিনীর লোকজন, জেনারেল থেকে সাধারণ সৈনিক, এ পথ দিয়ে গেলে বাবা যশবন্ত সিংকে তাঁদের বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে যান। না হলে তাঁর অভিশাপ লাগবে”।

শোনা যায়, একজন মেজর জেনারেল এই প্রথাকে কুসংস্কার বলে অবমাননা করেন। বাবাকে শ্রদ্ধা না জানিয়ে এগিয়ে যান।  বাবা যশবন্ত সিংয়ের মন্দির থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এক রহস্যময় অ্যাক্সিডেন্টে সেদিনই মারা যান সেই জেনারেল।
“তিনি আমাদের কাছে জীবিত। তিনি অমর, এই ভয়ঙ্কর পাহাড়ি এলাকায় রোজ টহল দিয়ে,  শত্রুর গুলি থেকে আমাদের বাঁচিয়ে চলেছেন। আমরা সেনা জওয়ানরা মানি, তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। কিন্তু তাঁকে দেখা যাচ্ছে না।” কেটে কেটে শব্দগুলি বললেন জওয়ান রাম নারায়ণ সিং।

সেলা পাস ও সেলা লেক

অমর হয়ে আছেন সেলা আর নুরাও

যুদ্ধে যশবন্তকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাহায্য করার জন্য অমর হয়ে আছেন  শহিদ সেলা ও শহিদ নুরাও।  দিরাং থেকে ৪০ কিমি দূরে ১৩,৭২১ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করছে সেলা পাস ও সেলা লেক। যশবন্তের অমানুষিক লড়াইয়ের সাথী হয়ে  মৃত্যুবরণ করা সুন্দরী মনপা যুবতী সেলার নামেই চিন-ভারত সীমান্ত লাগোয়া পাস ও লেকটির নাম দেওয়া হয়েছে।

অরুণাচল ভোলেনি সেলার মিষ্টি বোন নুরাকেও। তাওয়াং-এর ঠিক আগে, জং শহর থেকে ২ কিমি দূরে, ১০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ভারতের একটি অন্যতম সুন্দর জলপ্রপাতের নাম দেওয়া হয়েছে নুরানাং ফলস। চপলমতি ঝরণার ঠিক নিচের বহতা নদীটির নামও দেওয়া হয়েছে নুরানাং।

নুরানাং ঝর্ণা ও নুরানাং নদী

এই পৃথিবী দেখেছে বহু বিখ্যাত ও অমর প্রেমের বিয়োগান্তক পরিণতি। মানুষ মনে রেখেছে রাধা-কৃষ্ণ, লায়লা-মজনু, হীর-রন্ঝা, সিরি-ফরহাদ, আরও কতশত প্রেমগাথাকে। কিন্তু যশবন্তের প্রতি সেলা আর নুরার প্রেম বুঝি সব প্রেমকে ছাপিয়ে গেছে।

অবোধ পাহাড়ি যুবতী দুটি কিছুই পেল না, শুধু মাত্র প্রেমের আশায়, অক্লেশে, হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে দিল। ঠিক যে ভাবে দেশপ্রেমে পাগল যুবক যশবন্ত,  চিনের থাবা থেকে অরুণাচল ছিনিয়ে নিয়ে, ভারত মায়ের আঁচলে বেঁধে রেখে হাসতে হাসতে শহিদ হয়ে গেলেন।

( শহিদ যশবন্ত সিং-এর মৃত্যু নিয়ে অনেক কাহিনী ছড়িয়ে আছে অরুণাচলের পাহাড়ে পাহাড়ে। মনপা উপজাতির মানুষরা যে কাহিনীটিকে ৫৬ বছর ধরে তাঁদের উত্তরপুরুষদের বলে আসছেন, দ্য ওয়ালের পাঠকদের সামনে সেই কাহিনীটিই তুলে ধরা হলো।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More