পুরীর জগন্নাথদেবের ‘রোসাঘর’, বিশ্বের সর্ববৃহৎ রন্ধনশালা, আয়োজন দেখে হতবাক হতে হয়

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন স্বয়ং মহালক্ষী নিজে রান্না করেন রোসাঘরে, বাকি রন্ধনকারী বা সুয়াররা সবাই তাঁর সহকারী। তিনি রান্না করেন বলেই জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ এত সুস্বাদু।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    হিন্দুরা যুগ যুগ থেকে বিশ্বাস করে আসছেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিপালক ভগবান শ্রী বিষ্ণু ভারতের দক্ষিণে অবস্থিত রামেশ্বরমে  স্নান করেন, উত্তরে অবস্থিত বদ্রীনাথে ধ্যান করেন, পূর্বে অবস্থিত পুরীতে আহার গ্রহণ করেন ও পশ্চিমে অবস্থিত দ্বারকায় অবসর যাপন করেন।

    তাই ভগবান শ্রী বিষ্ণুর উচ্ছিষ্ট আহার মহাপ্রসাদ ভক্ষণের অভিপ্রায় নিয়ে হিন্দুরা প্রাচীন কাল থেকেই  জীবনে  অন্তত একবার পুরীধামে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেই জন্য পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের মহাপ্রসাদের গুরুত্ব সারাবিশ্বের  হিন্দুদের কাছে অসীম। মন্দিরের দেশ ভারতবর্ষে থাকা লক্ষ লক্ষ মন্দিরের মধ্যে এর মধ্যে কেবলমাত্র পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের বিগ্রহের সামনে উৎসর্গ করা খাদ্যসামগ্রীকেই মহাপ্রসাদ বলা হয়।

    মহাপ্রসাদ

    কী কী উৎসর্গ করা হয় প্রভু জগন্নাথকে!

    সারাদিনে সকাল  থেকে রাত পর্যন্ত বহুবার  জগন্নাথদেবকে ভোগ অর্পণ করা হয়। সোনার থালায় ও মাটির পাত্রে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। খাদ্য সামগ্রী শ্রীযন্ত্রের ওপর রেখে রত্নসিংহাসনের কাছ এবং ভোগমণ্ডপে রাখা হয়। এদের মধ্যে আছে গোপালবল্লভ ভোগ, সকাল ধূপ, ভোগমণ্ডপ ভোগ, মধ্যাহ্ন ধূপ, দ্বিতীয় ভোগমণ্ডপ ভোগ, সন্ধ্যা ধূপ, বড়া সিঙ্ঘারা ভোগ

    প্রভু জগ্ননাথের নিজস্ব আহার্যকে বলা হয় কোঠাভোগ। এর মধ্যে আছে সকাল ধূপ, মধ্যানহ ধূপ, সন্ধ্যা ধূপ, বড়া সিঙ্ঘারা ভোগ। কোঠাভোগ রান্না করেন মহাসুয়ার বা বরিষ্ঠ রাঁধুনীরা। রান্না করা হয় রথের কাঠ দিয়ে।

    মহাপ্রসাদ দুই ধরণের হয়। সাঙ্কুড়িসুখিলা। সাঙকুড়ির মধ্যে এর মধ্যে থাকে চার ধরণের ভাত বা অন্ন, সালি অন্ন, ক্ষীর অন্ন,  দধি অন্ন, শীতল অন্ন। অন্যান্য আহার্য্যের মধ্যে থাকে মিষ্টি ডাল, সবজি ডাল,বিভিন্ন মিক্সড কারি, শাক ভাজা, খাট্টা (টক) ও পরিজ। সুখিলা প্রসাদের মধ্যে আছে শুকনো মিষ্টি ও পিঠা। জগন্নাথদেবের রোসাঘরে প্রায় ৫০০ পদের রান্নার আয়োজন থাকে।

    আরেক ধরণের শুকনো মহাপ্রসাদকে বলা হয় ‘নির্মাল্য’। কৈবল্য বৈকুণ্ঠে ভাতকে শুকিয়ে নির্মাল্য তৈরি করা হয়।আধ্যাত্মিক দিক থেকে নির্মাল্যর শক্তি মহাপ্রসাদের মতই। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী বলা হয় মৃত্যু শয্যায় শুয়ে থাকা ব্যক্তিকে নির্মাল্য দেওয়া হলে তাঁর পাপক্ষয় হবে, তিনি স্বর্গলাভ করবেন।

    প্রভু জগন্নাথের ‘রোসাঘর’ বিশ্বের সর্ববৃহৎ রন্ধনশালা!

    পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের  দক্ষিণ-পূর্বে  জগন্নাথের রসুইঘরের অবস্থান। যা রোসাঘর নামে সর্বজনবিদিত। পৃথিবীর এই সর্ববৃহৎ রন্ধনশালাটি দিনে ২০০০০, বিশেষ বিশেষ দিনে প্রায় এক লাখ ও রথযাত্রার সময় প্রায় ১০ লক্ষ লোকের মহাপ্রসাদের যোগান দিতে পারে অক্লেষে।

    রোসাঘর বা রন্ধনশালাটি দৈর্ঘে দেড়শো ফুট ,প্রস্থে একশো ফুট এবং উচ্চতা কুড়ি ফুট। ‘রোসাঘর’ কমপ্লেক্সের ভেতরে আছে ৩২টি রন্ধন কক্ষ। রোসাঘরে রান্নার কাজে যুক্ত থাকেন ৬০০ রাঁধুনী বা সুয়ার ও ৪০০ সহযোগী, তাঁরা প্রত্যেকদিন প্রভু জগন্নাথের জন্য নানাবিধ সুস্বাদু আহার্য বানান। সুয়ার ছাড়া রান্নাঘরে কেউ ঢুকতে পারেন না।

    জগন্নাথদেবের রন্ধনশালা ‘রোসাঘর’
    রন্ধনশালার ভেতরে আছে ২৫০ টি অগ্নিযন্ত্র বা উনুন

    প্রায় সমস্ত উনুন মাটি দিয়ে তৈরি, মাত্র ১০ টি  উনুন সিমেন্ট দিয়ে তৈরি। তাতে পিঠা তৈরি করা হয়। মাটির উনুন বানানোর দায়িত্বে আছে কুম্ভকার নিজোগ সোসাইটি।  রন্ধনশালায় তিন প্রকার উনুন ব্যবহার করা হয় অন্ন চুলি, আহিয়া চুলিপিঠা চুলি। যে উনুনে ভাত বা অন্ন রান্না করা হয় সেই উনুনগুলি দৈর্ঘ্যে চার ফুট, প্রস্থে আড়াই ফুট ও উচ্চতায় দুই ফুট। পাত্র বসাবার জন্য প্রতিটি উনুনে ছ’টি ঝিক থাকে। দুটি অন্ন চুলির মাঝের আয়তাকার জায়গাটিকে  বলা হয়, আহিয়া চুলি। সব ধরণের ডাল ও সবজি রান্না হয় আহিয়া চুলিতে।

    রান্না হয় মাটির পাত্রে ও কাঠের আগুনে

    বিভিন্ন মাপের মাটির পাত্র আসে কুম্ভরাপাড়া থেকে। রান্নার জন্য আগে রাজ্যের বিভিন্ন জঙ্গল থেকে কাঠ আসত। কিন্তু পরে অরণ্যের অধিকার কেন্দ্রের হাতে চলে যাওয়ার পর উড়িষ্যার ফরেস্ট করপোরেশন জগন্নাথদেবের রন্ধনশালায় কাঠের যোগান দেয়। রন্ধনশালার চত্ত্বরে দুটি কুয়ো আছে, যাদের নাম গঙ্গাযমুনা। কুয়াগুলির ব্যাস ১০ ফুট গভীরতা প্রায় ১০০ ফুট। অত্যন্ত পবিত্র এই কুয়ো দুটির জল ব্যবহার করা হয় রান্নার কাজে।

    শুকনো মশলাকে প্রাচীন পদ্ধতিতে পাথরে কুটে  গুঁড়ো করা হয়। কখনও জল বা ঘি দিয়ে পেস্ট করে নেওয়া হয়। এর পরে প্রাচীন রন্ধনশৈলীতে জগন্নাথদেবের আহার্য্য রান্না করা হয়। চার ধরণের রন্ধনশৈলীর সাহায্যে রান্না হয় পুরীর মন্দিরে, ভীমপাক, নালপাক, সৌরিপাক, গৌরিপাক। একটি উনুনে একটা পাত্রের ওপর আরেকটা পাত্র, এভাবে পর পর বিভিন্ন মাপের নটি মাটির পাত্র বা নবচক্র বসানো থাকে। নীচের পাত্র থেকে ওঠা বাষ্পের ভাপে রান্না হয় ওপরের পাত্রটিতে থাকা খাদ্যবস্তু। রান্নার সময় খাদ্যবস্তুতে হাত দেওয়া হয় না বা নাড়াচাড়া করা হয় না। 

    প্রত্যেকটি পাত্রে আলাদা আলাদা খাদ্যবস্তু রান্না করা হয়। দেবী লক্ষ্মী স্বয়ং রান্নার তদারকি করেন। বিস্ময়করভাবে সবার আগে সবচেয়ে ওপরে থাকা পাত্রটির রান্না সমাপ্ত হয়। তারপরে রান্না সমাপ্ত হয় তার ঠিক নীচে থাকা পাত্রটির। এভাবে সব শেষে সুসিদ্ধ হয় উনুনের ওপরে রাখা শেষ পাত্রটিতে থাকা খাদ্যবস্তু। 

    কী কী বাজার করা হয় প্রভু জগন্নাথের রান্না ঘরের জন্য!

    জগন্নাথদেবের রন্ধনশালার রান্নার সমস্ত উপাদান আসে মহালক্ষ্মী ভাণ্ডার থেকে। যেটি চালায় সুয়ার নিজোগা কোয়াপরেটিভ সোসাইটি। রান্নার সমস্ত উপকরণই অত্যন্ত উচ্চমানের হতে হবে। তবে খুব কম উপকরণেরই জগন্নাথের রান্নাঘরে প্রবেশের অধিকার আছে। রান্নাঘরে সব সবজি বা সব মশলা ব্যবহারের অনুমতি নেই। মহাপ্রসাদে আপনি আলু ,টোমাটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ছোলা, ক্যামসিকাম, লঙ্কা, করলা, ঢেড়স, পেঁয়াজ , রসুন, সবুজ বিনস ও সেদ্ধ চাল পাবেন না।

    সবজি- কাঁচকলা, পালং, কুমড়ো, বেগুন, আমের মুকুল, তালের মুকুল, মুলো,পটল,দেশি আলু, ঝিঙে, কন্দমূল, সারু, কঙ্কন।

    ফল- তাল, কলা, আপেল, আঙুর, নারকেল, আমলকি, সীতাফল, ছিক্কু, পেয়ারা, কমলালেবু ও কিশমিশ।
    মশলা- এলাচ, লাল এলাচ, দারুচিনি, কালো গোলমরিচ, আদা, কাল সর্ষে, আজোয়ান, লবঙ্গ, জায়ফল, গুড়, সাদা চিনি ও লবণ।
    ডাল- উরদ ডাল, অড়হড় ডাল,মটর ডাল, মুগ ডাল।
    দুগ্ধজাত সামগ্রী-  দুধ, দই, মাখন, ছানা, রাবড়ি, খোয়া, ক্ষীর ও ঘি।

    এছাড়াও বেসন, আটা ও ময়দা রান্নার জন্য কেনা হয়। তবে জগন্নাথের রন্ধনশালায় পনির  ও চাপাটি হয় না। তবে সেদ্ধ গমের আটা থেকে তৈরি ‘খালি রোটি’  তৈরি করে দেবতাকে উৎসর্গ করা হয়। প্রচুর ধরণে  পিঠা তৈরি হয়।

    কিংবদন্তী আছে জগন্নাথদেবের রান্নাঘরকে ঘিরে

    ● মহালক্ষ্মী নিজে রান্না করেন রোসাঘরে, বাকি সুয়াররা সবাই তাঁর সহকারী। তিনি রান্না করেন বলেই জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ এত সুস্বাদু। তাঁর রান্না খেয়ে প্রভু জগন্নাথ তৃপ্ত হন ও সুস্থ থাকেন। মহালক্ষ্মী রান্নায় মনোযোগ দেন না বলেই রথযাত্রার সময় প্রভু জগন্নাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রভু জগন্নাথ যখন থাকেন গুন্ডিচা মন্দিরে, মা লক্ষ্মী রান্নায় উৎসাহ দেখান না। তাই সেই সময়ে খাবার ততোটা সুস্বাদু হয় না।

    ● মন্দিরে কোনও কুকুরকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কিন্তু, দেবী মহালক্ষ্মী রাঁধুনীদের রান্নায় অখুশী হলে মন্দিরের চত্ত্বরে রহস্যজনকভাবে একটি কুকুরের আবির্ভাব হয়। কুকুরটিকে দেখা গেলেই সমস্ত খাদ্য মাটিতে পুঁতে দিয়ে আবার নতুন করে রান্না করতে হয়। এই কুকুরটিকে বলা হয় কুটুম চন্ডী। তিনি তান্ত্রিক দেবতা, খাদ্য শুদ্ধ করার জন্য সারমেয় রূপে মন্দিরে আসেন।

    ● রন্ধনশালা থেকে শয়ে শয়ে খাদ্যবোঝাই পাত্র যখন প্রভু জগন্নাথকে উৎসর্গ করার জন্য মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন পাত্রগুলি থেকে কোনও খাদ্যের  সুগন্ধ ছড়ায় না। কিন্তু প্রভু জগন্নাথের সেবার পর মন্দির থেকে মহাপ্রসাদ ফেরত আনার সময় সারা মন্দির চত্ত্বরে সুগন্ধ ছড়ায়। ভক্তেরা বিশ্বাস করেন আহার্য্যে ভগবানের স্পর্শ লেগে গেছে, তাই এই সুগন্ধ।

    পৃথিবীর  বৃহত্তম খাওয়ার হোটেলের নাম ‘আনন্দবাজার’

    মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে আছে পৃথিবীর বৃহত্তম খাবারের দোকান আনন্দবাজার। জগন্নাথদেবের রান্নাঘরে রান্না হওয়া মহাপ্রসাদ ভোগমণ্ডপ থেকে  চলে আসে আনন্দবাজারে। দিনে লক্ষ লক্ষ টাকার মহাপ্রসাদ বিক্রি হয় এখান থেকে। জাতি ও বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার ভক্ত সেখানে একসাথে বসে মহাপ্রসাদ খান, বাড়ির জন্য নিয়ে যান। শুভকর্ম ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য মহাপ্রসাদ কিনে বিতরণ করেন। পর্যটকেরা আনন্দবাজার থেকে মহাপ্রসাদ কিনে বাড়ি ফেরেন, কখনও দেশ বিদেশে থাকা আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেন। ভক্তকূল মানেন, মহাপ্রসাদ খেলে অন্তরাত্মা পবিত্র শুদ্ধ হয় , জরা, রোগ ব্যাধির বিনাশ হয়, পাপস্খালন হয়।

    আনন্দবাজারে মহাপ্রসাদ বিক্রি হয়।

    এক জীবনে পুরীতে বাঙালি কতবার যান তার  ইয়ত্তা নেই। বালক বালিকা থেকে তাঁরা যুবক যুবক হন, তারপর প্রবীণ প্রবীণা থেকে বৃদ্ধ বৃদ্ধা। ঘরে থাকা ক্যালেন্ডার পালটানো হয় বছর বছর। পালটে যায় আমাদের শরীর ও মন। পালটে যায় পুরীর সি বিচ ও হোটেলের মানুষগুলি।পালটে যান জগন্নাথদেবের মন্দিরের পান্ডারাও। পালটায় না শুধু  জগন্নাথদেবের রন্ধনশালায় তৈরি হওয়া রান্নার স্বর্গীয় স্বাদ। কীভাবে  শতাব্দীর পর শতাব্দী মহাপ্রসাদের স্বাদ এক থাকে, তা অবাক করে ভক্তদের। তবে রন্ধনশালার দায়িত্বে যখন স্বয়ং মহালক্ষ্মী, স্বাদ একই থাকার কৃতিত্ব ভক্তবৃন্দ প্রশ্নাতীতভাবে তাঁকেই দিতে চান।  আর তাতে সবচেয়ে সন্তুষ্ট হন স্বয়ং প্রভু জগন্নাথদেব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More