বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

ওঁরা ত্রিশূরের চালিকা-শক্তি, চলুন চিনে নিই মহিলা-ব্রিগেডকে

চৈতালী চক্রবর্তী

নারীসাম্য, লিঙ্গবিষম্য এইসব ভারী ভারী কথার দরকার নেই। সমতা মানে একের উপর অন্যের ক্ষমতার আস্ফালন নয়, বরং যোগ্যতা, সামর্থ্য দিয়েই সাবলীল ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। যে নারী হোক, বা পুরুষ তাতে কোনও ভেদাভেদ নেই। আজ মহিলা প্রধানমন্ত্রী, মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান, মহিলা সেনাপ্রধান হলে ‘নারীশক্তির বিজয়’ নিয়ে উল্লাস হয়। কিন্তু কেরলের ত্রিশূরের এই মহিলা প্রশাসনিক কর্তারা মোটেই নারীশক্তির বিজয় নিয়ে গর্ব করতে রাজি নন, বরং নারী-পুরুষ হাতে হাত ধরে, দেশ ও দশের হিতসাধনের ব্রতই নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাঁরা। এই মহিলাবাহিনী পিতৃতন্ত্রের আস্ফালনের কথা বলেন না, তাঁদের উদ্দেশ্য ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ্য সম্মান দেওয়া। কেবল মেয়ে-পুরুষ কেন, ধর্ম, জাতি, ভাষা-সর্বক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠার গুরুদায়িত্ব যাঁরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, চলুন তাঁদের চিনে নিই।

কারও বয়স ৩২, কেউ বা চল্লিশের কোঠায়। কেউ জেলাশাসক, কেউ ডেপুটি মেয়র, কেউ জেলা পঞ্চায়েতের প্রেসিডেন্ট, কেউ বা কেরলের পুলিশ অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর। কেরলের ত্রিশূর জেলার প্রশাসনিক দায়িত্বের শীর্ষে রয়েছেন এঁরাই।


বেআইনি চোরাচালান বন্ধ থেকে শবরীমালার মানব শৃঙ্খল—টি ভি অনুপমা, আইএএস

২০১৮ সালের অগস্ট। বানভাসি কেরল। আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে তছনছ হয়ে গেছে ‘ভগবানের নিজের দেশ।’ চারদিকে শুধু স্বজনহারার যন্ত্রণা। শয়ে শয়ে মৃতদেহ উদ্ধার করছে সেনা। ত্রাণের জন্য হাহাকার রাজ্যজুড়ে। ত্রিসূরের অবস্থা আরও বেহাল। সরকারের পাঠানো ত্রানসামগ্রী রাখার জায়গা নেই। ঠিক হলো বার কাউন্সিলের হলঘরে রাখা হবে ত্রাণের জিনিসপত্র। বেঁকে বসলেন আইনজীবীরা। বার কাউন্সিলের সিকি ভাগ জমি ছাড়বেন না তাঁরা। প্রশাসনও সব দেখে নিশ্চুপ। এগিয়ে এলেন টি ভি অনুপমা। বার কাউন্সিলের নামে এনডিআরএফ আইন ২০০৫–এর ৩৪–এইচ/‌জে/এম ধারায় নোটিস জারি করলেন। এমন একটা আইন প্রয়োগ করা হতে পারে ভাবতেও পারেননি আইনজীবীরা। পিছিয়ে গেলেন। অনুপমার নির্দেশে সর্বহারাদের জন্য ত্রাণের জিনিস মজুত করা শুরু হলো বার কাউন্সিলের হলঘরে। সমাজ ভালো করে চিনল এই তেজস্বিনী নারীকে।

টি ভি অনুপমা

মাল্লাপুরমের পোন্নানির বাসিন্দা টি ভি অনুপমা। বাবা ছিলেন কেরল পুলিশের একজন দুঁদে অফিসার। মা ইঞ্জিনিয়ার। ছেলেবেলা কেটেছে কড়া নিয়মশৃঙ্খলায়। বিজয়মাথা কনভেন্ট হাই স্কুলের ছাত্রী অনুপমা দশমের পরীক্ষায় ১৩ র‍্যাঙ্ক করেন, দ্বাদশে তৃতীয়। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। মেধাবী অনুপমা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাতেও চমক দেন। সেখানে তাঁর র‍্যাঙ্ক ছিল চতুর্থ। ২০১৭ সালে আলাপ্পুঝার জেলাশাসক পদে যোগ দেন। গত বছর, ২০১৮-এ ত্রিশূরের জেলাশাসকের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই এসে পড়ে।

স্বভাবে ডাকাবুকো অনুপমা একসময় সরকারি কর্তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের কমিশনার হিসেবে যোগ দেওয়ার পরেই এক দলের নেতাকে গ্রেফতার করান তিনি। ১৫ মাস ধরে বেআইনি পথে খাবার চালান বন্ধ করতে কড়া ভূমিকা নেন তিনি। আটক করান বহু ব্যবসায়ীকে। তাঁর এই নির্ভীক ও সাহসী পদক্ষেপের জন্যই একসময় খাদ্য সুরক্ষা দফতরের কমিশনের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শবরীমালায় মহিলাদের প্রবেশাধিকার তথা লিঙ্গসাম্যের দাবিতে কেরলের ৬২০ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে যে মানব-পাঁচিল গড়ে তুলেছিলেন মহিলারা তাতে অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল অনুপমাকে।


ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর থেকে ক্লাসিকাল ডান্সার—ডঃ রেনু রাজ, আইএএস

মেডিক্যালের ছাত্রী থেকে সাভিল সার্ভিসের জার্নিটা খুব একটা সহজ ছিল না রেনু রাজের কাছে। কেরলের কোট্টায়ামের বাসিন্দা রেনুর বাবা সরকারি কর্মচারী ছিলেন। মা গৃহবধূ। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে রেনুর কিছু করে দেখানোর ইচ্ছা ছিল অদম্য। সেন্ট টেরেসা’স হাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কোট্টায়ামের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেন রেনু।

ডঃ রেনু রাজ

২৭ বছর বয়সেই কোল্লাম জেলার এএসআই হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন রেনু। পাশাপাশি চলতে থাকে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি। জানিয়েছেন, ডাক্তারির পাশাপাশি আইএএস হওয়ার বাসনাও ছিল ছেলেবেলা থেকে। ২০১৪ সালে ইউপিএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় র‍্যাঙ্ক করে সকলকে চমকে দেন। জেলাশাসকের অধীনে ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে শুরু হয় তাঁর জার্নি।

ত্রিশূরে ডঃ রেনু রাজ পরিচিত নাম। কেরলের বন্যার সময় বহু আর্তের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। একদিকে সরকারি পদের দায়িত্ব, অন্যদিকে ডাক্তারি— দুটোই সমান ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন রেনু। ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর ডঃ রেনু রাজের পাশাপাশি, তাঁর আরও একটা পরিচয় রয়েছে, সেটা হলো ক্লাসিকাল ডান্সার। জেলার যে কোনও উৎসবে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায় রেনুকে। তখন তিনি আমলা নন, জনসাধারণের সঙ্গে মিশে পাড়ার মেয়ে রেনু রাজ।


দুঁদে পুলিশ অফিসার থেকে সাহিত্যিক, ত্রিশূরের মুখ—ডঃ বি সন্ধ্যা, আইপিএস

ত্রিশূরের লৌহমানবী ডঃ বি সন্ধ্যা। তার কৃতিত্বের নজির অনেক। কেরল পুলিশ অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর জেনারেল সন্ধ্যা বহু জটিল কেসের সমাধান করেছেন। অপরাধীদের শাস্তি দিয়েছেন কড়া হাতেই।

কোট্টায়ামে জন্ম। নিতান্তই ছাপোষা পরিবারের মেয়ে একদিন কট্টোর পুলিশ অফিসার হয়ে উঠবেন সেটা মনে হয় ভাবতেও পারেননি সন্ধ্যার বাবা ভারথাদাস। মেয়েকে নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ নেই। জানিয়েছেন, মেধাবী সন্ধ্যা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েই পাড়ি দেন অস্ট্রেলিয়া। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট নিয়ে সেখানেই স্নাতক করেন। স্নাতকোত্তর পন্ডিচেরী ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৯৯ সালে। বিড়লা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি-র পর সিভিল সার্ভিসে দুরন্ত র‍্যাঙ্ক।

ডঃ বি সন্ধ্যা

মহিলাদের সম্মানের জন্য লড়াই করেছেন কলেজ থেকেই। বলেছেন, পারিবারিক হিংসার শিকার বা পুরুষের হাতে লাঞ্ছিতাকে যোগ্য বিচার পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতেই তাঁর এই আইপিএস অফিসার হওয়ার সিদ্ধান্ত। শুরুটা হয় শোরনুরের সহকারী পুলিশ সুপার দিয়ে। এর পর আলাথুরের জয়েন্ট পুলিশ সুপার। ত্রিশূরেরই সহকারী ইনস্পেকটর জেনারেল থেকে পরবর্তীতে ডেপুটি ইনস্পেকটর জেনারেল (ক্রাইম)। বর্তমানে কেরল পুলিশ অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর জেনারেল। কেরল পুলিশ তো বটেই ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশ (IAWP)-র তরফে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন সন্ধ্যা।

অপরাধ দমন করেন যে হাতে সেই হাতেই আবার লেখেন কবিতা, গদ্য, উপন্যাস। ‘থারাথু’ ‘বালাভাডি’ ‘এথরা নান্না আম্মু’ শিশু সাহিত্যের উপর একাধিক বই লিখে পুরস্কার পেয়েছেন। কবিতা, উপন্যাস লিখেও নাম করেছেন সন্ধ্যা।


সমাজকর্মী থেকে মেয়র—অজিতা জয়নারায়ণ

৩৩ বছর ধরে সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। অজিতা জয়নারায়ণের কর্মজীবন শুরু হয় পুরসভার কাউন্সিলর থেকে। বর্তমানে শহরের মেয়র অজিতা তাঁর সমাজসেবামূলক নানা কাজের জন্যই পরিচিত।

অজিতা জয়নারায়ণ

এরনাকুলামের মুথাকুন্নামের বাসিন্দা অজিতার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী নিয়ে ভরা সংসার। অঙ্গনওয়াড়িতে শিক্ষিকার কাজ করেছেন অনেক বছর। নিজস্ব ডেয়ারি ফার্মও রয়েছে তাঁর। এলাকার ঘরে ঘরে দুধ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন দীর্ঘ ১৮ বছর। সংসারের দায়িত্ব পালন করে নিপুণ হাতে। সেখানে তিনি একজন গর্বিত মা, স্নেহময়ী দিদিমা। আবার মেয়রের চেয়ারে বসলেই তাঁর অন্য রূপ। তখন তিনি বজ্রকঠিন। কড়া হাতে অপরাধ দমনের নির্দেশ দেন।


জেলা পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট মেরি টমাস ও ডেপুটি মেয়র বীণা মুরলী

ত্রিসূর প্রশাসনে এই দুই মহিলারও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। মেরি টমাস জেলা পঞ্চায়েতের প্রেসিডেন্ট। জাত, ধর্মের উর্ধ্বে উঠে সমাজ সেবাই তাঁর ব্রত।

মেরি টমাস

ডেপুটি মেয়র বীণা মুরলীও অসংখ্যবার তাঁর কৃতিত্বের নজির রেখেছেন অনেক বার। শান্ত, হাসি মুখের বীণাকে ভালোবাসেন তাঁর এলাকার সকলেই। তিনিও যুক্ত সমাজ সেবামূলক কাজের সঙ্গে।

বীণা মুরলী

মেয়েদের ভূমিকার বিষয়ে এক বিশ্লেষণে লেনিন বলেছিলেন— ‘প্যারি কমিউনের মতোই বুর্জোয়া শক্তিকে উৎখাত করবার জন্য প্রলেতারিয়েত মহিলারা এগিয়ে আসবেনই, অংশগ্রহণ করবেন বিপ্লবী প্রলেতারিয়েত হিসেবে।’ তবে সে ছিল সর্বহারা, গ্রামীণ-নারী জাগরণের প্রসঙ্গ। নারী সাম্যের লড়াইটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ইওরোপের নারীরা সমতার লক্ষ্যে তাঁদের আন্দোলন অক্লান্ত ভাবে চালিয়ে গিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে তাঁদের এই আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে এবং তা ইউরোপের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। লিঙ্গসমতার অনুপ্রেরণা জোরদার ভাবে এসেছে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে যেখানে নারী ও পুরুষের অধিকার সমান ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘Declaration of Universal Human Rights’ সনদের উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো ‘CEDAW’ (Convention for the Elimination of Discrimination Against Women)। নারী আন্দোলন গতি পেয়েছে গোটা বিশ্বেই। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন অনেক যশস্বী মহিলা। আন্দোলনের আঁচ এসে পৌঁছেছে ভারতেও। সামন্ত প্রভুদের নিপীড়ণ, কৃষকদের শোষণের বিরুদ্ধে একসময়ে গর্জে উঠেছিলেন তিস্তা পাড়ের চাষি মেয়েরা।

ভারতের মতো দেশে যেখানে তিন বছরের শিশু থেকে আশির বৃদ্ধাও বিকৃত যৌন লালসার শিকার হন, সেখানে নারী জাগরণ, নারী শক্তি এই কথাগুলো হয়তো বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। ত্রিশূরের টি ভি অনুপমা, বি সন্ধ্যার মতো নারীরা সেখানে গর্জে উঠে সমাজ বদলাবার ডাক দেবেন। কিন্তু ঘুণধরা সমাজ আদৌ তার পুরনো খোলস ছেড়ে বেরোবে কি? প্রশ্ন একটা থেকেই যাচ্ছে।

আরও পড়ুন:

কেউ বর্ণ বিদ্বেষের শিকার, কেউ থেকেছেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, বাঁচার লড়াই শেখালেন সাত নারী

Comments are closed.